পৃথিবীতে অনেক রকম বাজার আছে। কিন্তু শিশু কেনাবেচার হাটের কথা কল্পনা করতে পারেন! দিল্লিতে এমনই এক অন্ধকার বাজারের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। ধাপে ধাপে অনুসন্ধান করতে গিয়ে পুলিশ জেনেছে, দিল্লির একটি হাসপাতালকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে জমজমাট এই বাজার। দরিদ্র পরিবারের কাছ থেকে অল্প টাকায় তাদের নবজাতক সন্তান কিনে বা চুরি করে এনে চড়া দামে বিক্রি করা হতো নিঃসন্তান কোনো দম্পতির কাছে। পুলিশ এই চক্রের বেশ কয়েকজনকে আটক করেছে।
ব্যাপারটা এমন, রাজস্থানে জন্ম নেওয়া কোনো একটি শিশুকে কিনে বা চুরি করে এনে দিল্লির এক হাসপাতালে এক ডাক্তারের মধ্যস্থতায় বিক্রি করে দেওয়া হলো হরিয়ানার কোনো দম্পতির কাছে। সেই শিশু বড় হয়ে কখনো জানতেই পারবে না, তার আসল মা-বাবা কে। এই বাজারে ছেলেশিশুর দাম বেশি, ৬ থেকে ৮ লাখ রুপি। কন্যাশিশুর দাম একটু কম পড়বে, ৩ থেকে ৪ লাখ রুপিতে আপনি পেয়ে যাবেন ৩ থেকে ৪ দিন বয়সী কোনো কন্যাশিশু।
দিল্লির ব্যস্ত এলাকা পাহাড়গঞ্জের এক বাসিন্দা প্রথমে পুলিশকে তার সন্দেহের কথা জানান। তিনি পুলিশকে জানান, এলাকায় নিয়মিত বিরতিতে একটি নারীকে দেখা যেত, যার কোলে প্রতিবারই একটি নতুন নবজাতক থাকত, যা সন্দেহজনক। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই পুলিশ তদন্ত শুরু করে। এলাকার সিসিটিভির ফুটেজ চেক করার পাশাপাশি নিজস্ব সোর্সকেও কাজে লাগানো হয়। পুলিশ নিশ্চিত হয়, জ্যোতি ওরফে কমলেশ নামের এই নারী শিশু পাচারের সঙ্গে জড়িত। এর পরই তাকে হাতেনাতে ধরতে ফাঁদ পাতে দিল্লি পুলিশ।
পুলিশের একজন নারী সদস্য শিশু কেনার গ্রাহক সেজে কমলেশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তারা দেখা করেন এবং শিশু বিক্রির চুক্তি হয়। অগ্রিম হিসেবে ২০ হাজার রুপি দিতেও রাজি হন ছদ্মবেশী নারী পুলিশ। ৫ জুন ছদ্মবেশী পুলিশের কাছে একটি নবজাতক হস্তান্তর করার সময় কমলেশকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়।
তারপর বেরিয়ে আসে এক চাঞ্চল্যকর আন্তঃরাজ্যীয় শিশু পাচার চক্রের গল্প, যা বলিউড সিনেমাকেও হার মানায়। যার পরতে পরতে লুকিয়ে আছে দারিদ্র্য, লোভ, আর নির্মমতার নানামাত্রিক উপাখ্যান। দরিদ্র পিতা-মাতা থেকে দিল্লির দালাল, সেখান থেকে হাসপাতাল, সেখান থেকে নিঃসন্তান কোনো দম্পতির ঘর- জন্মের সাথে সাথে কিছু অপরাধী মিলে নির্ধারণ করে একটি শিশুর ভাগ্য!
কমলেশকে টানা জিজ্ঞাসাবাদের পর পুলিশ তার দুই সহযোগী—শালু ও ললিতের সন্ধান পায়। পরে প্রতিভা ও বিপিন নামে আরো দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়, যারা মূলত শিশু সংগ্রহ এবং বিক্রির চুক্তি করার দায়িত্বে ছিল। প্রতিভা ও বিপিন যখন বাজারে শিশু সরবরাহকারী মূল ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের ধরা হয়। তাদের কাছ থেকে পুলিশ প্রায় ৩ লাখ রুপিও উদ্ধার করে। দুই সপ্তাহের টানা জিজ্ঞাসাবাদের পর পুলিশ এক মাসের কম বয়সী এমন ৫টি নবজাতককে উদ্ধার করে।
এর পরই পুলিশ আরো নিবিড় অনুসন্ধানে নামে। অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ একটি হাসপাতালের সন্ধান পায়। পশ্চিম দিল্লির রোহিণীর বেগমপুরের হীরা মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতাল, নামে হাসপাতাল হলেও এটি আসলে কোনো চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র নয়, এটিই মূলত শিশু বেচাকেনার বাজার। এই হাসপাতার মালিক ডাক্তার বিবেকীই হলেন এই চক্রের মূল হোতা। পাচারকারীরা নবজাতকদের সংগ্রহ করে এই হাসপাতালে নিয়ে আসত। বিক্রি হওয়ার আগ পর্যন্ত শিশুগুলোকে এই হাসপাতালেই রাখা হতো। ডাক্তার বিবেকী শিশুদের ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করতে সাহায্য করতেন। শিশুদের জন্ম সনদ, জন্ম নেয়ার কাগজপত্র, হাসপাতালের বিল এমনভাবে তৈরি করা হতো, যাতে মনে হয় শিশুটি এই হাসপাতালেই জন্ম নিয়েছে।
পুলিশের তদন্তে দেখা গেছে, একটি কন্যাসন্তান প্রায় এক লাখ রুপিতে কেনা হতো এবং ৩ থেকে ৪ লাখ রুপিতে বিক্রি হতো। আর ছেলেশিশু কেনা হতো প্রায় দুই লাখ রুপিতে, বিক্রি হতো ৬ থেকে ৮ লাখ রুপিতে। পৃথিবীর আর কোনো বাজারে এমন লাভজনক ব্যবসা নেই!
দিল্লি সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্টের ডিসিপি রোহিত রাজবীর সিং পুরো চক্রের গল্প সাংবাদিকদের কাছে বর্নণা করেন। তিনি জানান, শিশু কেনাবেচার সমস্ত চুক্তি ডাক্তার বিবেকীর হাসপাতালেই হতো। তিনি পাচারকারী এবং শিশু কিনতে চাওয়া দম্পতিদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতেন।
হেফাজতে থাকা আসামিদের তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ গুজরাটের সবরকান্থা থেকে সাবাভাই গামার ওরফে কালিয়াকে গ্রেপ্তার করে। মূলত উদয়পুরের বাসিন্দা গামার রাজস্থানের পালি এবং সবরকান্থার দরিদ্র দম্পতিদের কাছ থেকে শিশু কিনত।
উদ্ধার হওয়া শিশুদের প্রকৃত মা-বাবার সন্ধান পাওয়ার চেষ্টা করছে পুলিশ। তারা স্বেচ্ছায় সন্তান বিক্রি করেছে, নাকি তাদের বাধ্য করা হয়েছে, অথবা শিশুগুলোকে চুরি করা হয়েছে কি না—তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ডিসিপি রাজবীর সিং বলেন, মা-বাবা যদি স্বেচ্ছায় পাচারকারীদের কাছে শিশু বিক্রি করে থাকে, তবে তাদেরও এই মামলায় আসামি করা হবে। যারা এ চক্রের কাছ থেকে শিশু কিনেছেন, তাদেরও আসামি করার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
তদন্তে জানা গেছে, গামার এবং তার দল গত এক বছরে অন্তত ৩০টি নবজাতককে বিক্রি করেছে। পুলিশ হরিয়ানার পানিপথ থেকে সানি অরোরা এবং রিতু অরোরা নামের এক দম্পতিকে শনাক্ত ও আটক করেছে, যারা এ চক্রের কাছ থেকে শিশু কিনেছেন। এ ছাড়া মধ্য প্রদেশের গোয়ালিয়র থেকে এই চক্রের কাছ থেকে শিশু কেনা অন্য এক দম্পতিকেও আটক করা হয়েছে।
ডিসিপি রোহিত রাজবীর সিং জানান, এ চক্রের লোভের জালে পড়ে প্রতারিত হয়েছেন এক দম্পতি। তারা একটি পুত্রসন্তান কিনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু চক্রটির কাছে তখন একটি কনাশিশুও ছিল, যাকে দ্রুত বিক্রি করে দেয়া দরকার। চক্রটি ছেলেশিশু কিনতে আগ্রহী দম্পতিকে জানায়, তাদের কাছে ছেলেশিশুর জমজ একটি কন্যাশিশুও রয়েছে। সে দম্পতি ৯ লাখ রুপির প্যাকেজে ‘যমজ’ সন্তান কেনেন। বাস্তবে তারা যমজ ছিল না। তাদের সংগ্রহ করা হয়েছিল দুই এলাকা থেকে।
ডিসিপি রাজবীর সিং এই চক্রটি ভাঙার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য তিন নারী পুলিশ কর্মকর্তা—সাব-ইন্সপেক্টর প্রগতি ও যামিনী এবং হেড কনস্টেবল সুষমার নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করেন।
উদ্ধার হওয়া ৫ নবজাতককে আপাতত চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রকৃত মা-বাবার সন্ধান না পেলে কমিটি পরে তাদের আইনি প্রক্রিয়ায় দত্তক দেওয়ার ব্যবস্থা করবে।