মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে দুর্বল করার লক্ষ্যেই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। কিন্তু সংঘাত শুরুর প্রায় চার মাস পর যেন উল্টে গেল এই সমিকরণ। সরকার পরিবর্তন বা পারমাণবিক সক্ষমতা ভেঙে দেওয়ার পরিবর্তে ইরান এখন আগের চেয়ে আরও সামরিককেন্দ্রিক, ঝুঁকি নিতে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক প্রভাব নিজেদের কবজায় রাখতে কৌশলগত কর্মসূচির ওপরও দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে তেহরান।
তবে এখন প্রশ্ন হলো—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কি তাদের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পেরেছে? এর আগে তারা বলেছিল, ইরানে সরকার পরিবর্তন, পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস এবং আঞ্চলিক প্রভাব কমিয়ে আনাই এই সংঘাতের মূল লক্ষ্য।
এ প্রশ্নের জবাব বা চলমান এই যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে এখন বিতর্ক বাড়ছে। কারণ, বড় ধরনের কৌশলগত ছাড় না দিয়েই ইরান সংঘাত টিকে গেছে এবং ক্রমাগত চাপের মধ্যেও নিজেকে নতুনভাবে মানিয়ে নিয়েছে। এমন তথ্য তুলে ধরেছে মার্কিন সংবাদ মাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস।
‘ইসলামিক রিপাবলিক ৩.০’
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধের শুরুতে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর ইরানের ক্ষমতার কাঠামোয় বড় পরিবর্তন এসেছে।
বর্তমানে তুলনামূলক তরুণ, আরও কঠোর অবস্থানসম্পন্ন এবং নিরাপত্তাকেন্দ্রিক নেতৃত্ব ক্ষমতায় এসেছে। একই সঙ্গে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) রাষ্ট্র পরিচালনায় আরও শক্তিশালী ভূমিকা গ্রহণ করেছে।
চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিল বলেন, ‘ইরান এখন আরও তরুণ এবং সাহসী একটি প্রজন্মের হাতে পরিচালিত হচ্ছে।’
ইরানের নতুন শাসনব্যবস্থার বিষয়ে কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের সাবেক মার্কিন কূটনীতিক অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, এটি ‘ঐশ্বরিক ক্ষমতা’ থেকে ‘কঠোর ক্ষমতার’ দিকে রূপান্তর।
বিশ্লেষকদের অনেকেই বর্তমান ব্যবস্থাকে ‘ইসলামিক রিপাবলিক ৩.০’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। তাদের মতে, এটি আগের তুলনায় কম ধর্মতান্ত্রিক এবং অনেক বেশি আইআরজিসি-নিয়ন্ত্রিত সামরিক কাঠামোতে পরিণত হয়েছে।
সামরিক ও কৌশলগত ইরান
ইরান দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক হামলা ও অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা করলেও তার পারমাণবিক অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান এখনও ‘নিউক্লিয়ার থ্রেশহোল্ড’ বা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতার কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। অর্থাৎ, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিলে তারা অস্ত্র তৈরির পথে দ্রুত এগোতে পারে।
আঞ্চলিক ক্ষেত্রেও হিজবুল্লাহ, হামাস ও হুথি বিদ্রোহীদের মতো মিত্র গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে ইরান তার প্রভাব বজায় রেখেছে।
যুদ্ধ ও অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন
বর্তমানে নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি এবং শাসন ব্যবস্থার বিভিন্ন ক্ষেত্রে আইআরজিসি প্রধান সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
একই সঙ্গে ইরানের পরিবর্তন এসেছে বৈদেশিক আচরণেও। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, সংঘাতের এই পর্যায়ে প্রথমবারের মতো ইরান সরাসরি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়েছে, যেখানে আগে তারা মূলত প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর ওপর নির্ভর করত।
এটি আগের সতর্ক নীতির পরিবর্তে আরও আত্মবিশ্বাসী ও আক্রমণাত্মক কৌশলের প্রতিফলন বলে মনে করছেন
বিশ্লেষকরা।
আঞ্চলিক স্থায়িত্ব
ইরান এখন লেবানন ও হরমুজ প্রণালিসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ইস্যুকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার অংশ হিসেবে ব্যবহার করছে।
ইরান বিশেষজ্ঞ এবং অবসরপ্রাপ্ত ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ড্যানি সিত্রিনোভিচ বলেন, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের প্রভাব এখনো তাদের প্রতিরোধ কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।
তার মতে, হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ ইরানকে এমন একটি তাস দিয়েছে। যা ব্যবহার করে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে নতুন হামলা থেকে নিরুৎসাহিত করতে পারে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এই যুদ্ধের উদ্দেশ্য ছিল ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা। কিন্তু সেটিই হয়তো দেশটিকে এমন এক পর্যায়ে ঠেলে দিয়েছে, যেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন।
আলোচনায় ইরান কী চাইছে?
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বিলুপ্ত করতে রাজি নয়। বরং তারা সীমিত আকারের একটি সমঝোতা চায়।
তেহরানের দেওয়া সম্ভাব্য ওই কাঠামোর মধ্যে রয়েছে—ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সাময়িক স্থগিত করা, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের একটি অংশ বিদেশে পাঠানো বা পাতলা করা। তবে পারমাণবিক অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রাখা।
এর পাশাপাশি তেহরান নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ এবং জব্দকৃত সম্পদ ফেরত চাচ্ছে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, তারা প্রাথমিকভাবে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার মুক্ত করার দাবি জানিয়েছে, যার পরবর্তী অংশ চুক্তি বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত থাকবে।
ইরানের প্রধান হাতিয়ার
ইরানের প্রধান দুটি হাতিয়ার হলো—তাদের পারমাণবিক প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে বৈশ্বিক জাহাজ চলাচলে প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা।
যদিও ইরানের অর্থনীতি মারাত্মক চাপে রয়েছে এবং যুদ্ধ শেষ হলে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ বাড়তে পারে। তবু তেহরানের ধারণা, একটি চুক্তি করার জন্য ওয়াশিংটনের প্রয়োজন আরও বেশি। ফলে তারা বড় ধরনের ছাড় দিতে অনাগ্রহী।
সানাম ভাকিলের মতে, ইরানের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো ভবিষ্যৎ হামলা প্রতিরোধ, উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি, আরব-ইসরায়েল ঘনিষ্ঠতা দুর্বল করা এবং অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমানো।
এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কী?
প্রাথমিক কোনো সমঝোতা হলেও গভীর মতপার্থক্যগুলো দ্রুত সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা কম। ফলে পারমাণবিক আলোচনা দীর্ঘ সময় ধরে অসম্পূর্ণ অবস্থায় চলতে পারে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ইরান বিশেষজ্ঞ সুজান ম্যালোনি বলেন, আমরা সম্ভবত দীর্ঘ সময়ের জন্য ‘না যুদ্ধ, না শান্তি’ ধরনের একটি পরিস্থিতিতে থাকব। যা ইরানের জন্য সুবিধাজনক।
তার মতে, এই অবস্থা একদিকে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বজায় রাখবে, অন্যদিকে জ্বালানি বাজার ও হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে ইরানের কৌশলগত প্রভাবও অক্ষুণ্ণ রাখবে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো—ইরান অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে ভুল পদক্ষেপ নিতে পারে, যেমনটি অতীতেও করেছে।






