বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ বাড়ানো, অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন এবং বড় অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়ন নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। তবে বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিনিয়োগ অনিশ্চয়তার কারণে সরকার আপাতত বিদেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি দেশীয় বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) বিডা আয়োজিত ‘বাংলাদেশে বিনিয়োগ প্রবাহ এবং বিনিয়োগ সহজীকরণ’ শীর্ষক কর্মশালায় বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেন, ‘কূটনৈতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক-সব দিক থেকেই চীন বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে শুধু বিনিয়োগ নয়, প্রতিরক্ষা, রাজনৈতিক সহযোগিতা এবং অন্যান্য কৌশলগত বিষয়ও আলোচনায় আসতে পারে।’
তিনি জানান, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের অন্যতম বড় উৎস হিসেবে চীনের অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে। এ কারণেই চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। প্রায় ৭৮৩ একর জমিতে গড়ে ওঠা এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাজ শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে পারে। পাশাপাশি চীন মোংলা বন্দরে বিনিয়োগ এবং সেখানে নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার প্রতিও আগ্রহ দেখিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময় সম্ভাব্য চীনা বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে একাধিক বৈঠকেরও আয়োজন করা হচ্ছে।
আশিক মাহমুদ বলেন, ‘নতুন সরকারের প্রথম দুই বছর সাধারণত বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে বড় আকারের অবকাঠামো ও শিল্প বিনিয়োগ আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে চীনের কাছে এমন খাতগুলো তুলে ধরা, যেখানে বিনিয়োগ করলে উভয় দেশই লাভবান হবে।’
তবে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে এখনও বড় বাধা হয়ে আছে জ্বালানি সংকট। বিডা চেয়ারম্যানের ভাষ্য, গ্যাসের ঘাটতির কারণে শিল্পকারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যাও বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের অন্যতম কারণ।
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে তার কাজের বড় একটি অংশই জ্বালানি সংকট নিরসনের সঙ্গে যুক্ত। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং শিল্প খাতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, জ্বালানি সংকটের কোনো তাৎক্ষণিক সমাধান নেই। এখনই বড় প্রকল্প শুরু করলেও এর সুফল পেতে দেড় থেকে দুই বছর সময় লাগবে। সরকারের লক্ষ্য ২০২৭-২৮ সালের মধ্যে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটানো।’
বিডা চেয়ারম্যান আরো বলেন, ‘বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার কারণে অনেক বিদেশি বিনিয়োগকারী এখনও অপেক্ষা-দেখো নীতি অনুসরণ করছেন। যদিও চলতি বছরে আয়োজিত বিনিয়োগ সম্মেলনের পর প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে, তবুও অনেক বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ নিতে সময় নিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সরকার দেশীয় বিনিয়োগকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে এবং বন্ধ বা অকার্যকর শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নিয়েছে।’
বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের জন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোতেও জোর দিচ্ছে বিডা। বর্তমানে একটি বিনিয়োগ প্রকল্প নিবন্ধন থেকে উৎপাদনে যেতে ১৮ থেকে ২৪ মাস পর্যন্ত সময় লাগে। বিভিন্ন দপ্তরের অনুমোদন নিতে গিয়ে বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘ সময় ও অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হয়। এই সমস্যা সমাধানে বিডা একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্লাটফর্ম চালুর উদ্যোগ নিয়েছে, যেখানে এক জায়গা থেকেই প্রয়োজনীয় আবেদন ও অনুমোদনের কাজ সম্পন্ন করা যাবে। ম্যানুয়াল প্রক্রিয়া কমিয়ে পুরো ব্যবস্থাকে ডিজিটাল করার মাধ্যমে দুর্নীতি ও হয়রানি কমানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
বর্তমানে সরকার ১০টি অর্থনৈতিক অঞ্চলকে অগ্রাধিকার দিয়ে এগিয়ে নিতে চায়। এর মধ্যে সরকারি ও অংশীদার প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বিডা ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার আওতায় ২৫টি বড় উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে, যার মধ্যে কয়েকটির দৃশ্যমান অগ্রগতি ইতোমধ্যে দেখা গেছে।




