যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানের খরচ মেটাতে কংগ্রেসের কাছে অতিরিক্ত ৮৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার চেয়েছে। বুধবার হোয়াইট হাউস এই অর্থায়নের প্রস্তাব প্রকাশ করে এবং তা কংগ্রেসে পাঠায়। তবে প্রস্তাবটি প্রকাশের পরপরই রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট- উভয় দলের আইনপ্রণেতাদের মধ্যে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে।
হোয়াইট হাউসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত বাজেটের সবচেয়ে বড় অংশ, অর্থাৎ ৬৭ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার, সামরিক খাতে ব্যয় করা হবে। এর আগে গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাজেট ছিল প্রায় এক ট্রিলিয়ন ডলার। আর আগামী অর্থবছরের জন্য ট্রাম্প প্রশাসন প্রায় ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার সামরিক বাজেট চেয়েছে। প্রশাসনের দাবি, নতুন এই অর্থ মূলত ইরান যুদ্ধ পরিচালনার জন্য প্রয়োজন। এই অর্থ দিয়ে সেনা সদস্যদের ব্যয়, যুদ্ধের প্রস্তুতি বজায় রাখা, ব্যবহৃত অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত পুনর্গঠন এবং বিভিন্ন গোপন সামরিক কর্মসূচির খরচ মেটানো হবে। প্রস্তাবে আরো ২১ বিলিয়ন ডলার রাখা হয়েছে নতুন গোলাবারুদ কেনা, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা শিল্পকে শক্তিশালী করা এবং সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য।
এদিকে যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ আরো বেড়েছে। মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট একটি যুদ্ধক্ষমতা-সংক্রান্ত প্রস্তাব পাস করেছে, যেখানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। এর কয়েক সপ্তাহ আগে একই ধরনের একটি প্রস্তাব প্রতিনিধি পরিষদেও পাস হয়েছিল। দুই কক্ষেই ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির কয়েকজন সদস্য প্রায় সব ডেমোক্র্যাট সদস্যের সঙ্গে একযোগে ভোট দেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটিকে যুদ্ধনীতি নিয়ে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এক ধরনের ভর্ৎসনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বুধবার কংগ্রেস ভবন ক্যাপিটলে মধ্যাহ্নভোজের সময় ট্রাম্পের সঙ্গে রিপাবলিকান সিনেটর বিল ক্যাসিডির তর্কও হয়। পরে তা উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডায় রূপ নেয়। ক্যাসিডি ছিলেন সেই রিপাবলিকান সদস্যদের একজন, যিনি ইরানবিরোধী সামরিক অভিযান বন্ধের প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকেই কংগ্রেসের সদস্যরা ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচনা করে আসছেন। তাদের অভিযোগ, যুদ্ধের বর্তমান অবস্থা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে আইনপ্রণেতাদের যথেষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় দলের সদস্যরাই বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী যুদ্ধের জন্য সেনা মোতায়েনের চূড়ান্ত ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন সেই সাংবিধানিক ক্ষমতাকে উপেক্ষা করছেন।
আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা অনেকটাই নির্ধারিত হবে। বর্তমানে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা খুবই কম। ফলে বিতর্কিত এই যুদ্ধের অর্থায়ন নিয়ে ভোট দেওয়া তাদের জন্য রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। জনমত জরিপে ইরান যুদ্ধের প্রতি সমর্থন খুবই কম। ফলে অনেক রিপাবলিকান সদস্য নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় ভোটারদের চাপের মুখে পড়তে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ডেমোক্র্যাট নেতারা অভিযোগ করেছেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। অথচ সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার পরিবর্তে ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধ ব্যয়ের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। সিনেটে ডেমোক্র্যাট দলের নেতা চাক শুমার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, 'আমাদের উচিত আমেরিকান জনগণের খরচ কমানো। ট্রাম্পের জন্য আরেকটি খালি চেক লিখে দেওয়া নয়।' সিনেটের বরাদ্দ কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট প্যাটি মারে বলেছেন, তিনি প্রস্তাবটি খতিয়ে দেখবেন যাতে সেনা সদস্যদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা যায়। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এই বিপর্যয়কর এবং ইচ্ছাকৃতভাবে শুরু করা যুদ্ধের জন্য এত বড় অঙ্কের অর্থ বিনা প্রশ্নে অনুমোদন দিতে চান না।
অতিরিক্ত বাজেট প্রস্তাবে শুধু যুদ্ধ ব্যয় নয়, আরো কয়েকটি খাতের জন্য অর্থ বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। আফ্রিকায় ইবোলা প্রাদুর্ভাব মোকাবিলার জন্য প্রায় ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৮০০ মিলিয়ন ডলার আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার জন্য এবং ৫০০ মিলিয়ন ডলার বৈশ্বিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তা জোরদারের জন্য ব্যয় করা হবে। এই অর্থ রোগ প্রতিরোধ, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যবহার করা হবে। হোয়াইট হাউস বলেছে, ইবোলা যাতে যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে না পড়ে এবং আমেরিকান নাগরিকদের যেন নিরাপদ রাখা যায়, সে জন্য এই অর্থ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সমালোচকেরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, ইবোলা সংকট শুরুর আগেই ট্রাম্প প্রশাসন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডির বাজেট এবং আফ্রিকার জনস্বাস্থ্য কর্মসূচির ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছিল।
নতুন বাজেট প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকদের সহায়তার জন্য ১১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার চাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সাবেক গাড়ির যন্ত্রাংশ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ডেলফির অবসরপ্রাপ্ত কর্মীদের পেনশন বাড়াতে এক বিলিয়ন ডলার বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। ডেলফি একসময় জেনারেল মোটরসের অংশ ছিল। ২০০৯ সালে জেনারেল মোটরসের দেউলিয়া পরিস্থিতি পুনর্গঠনের সময় অনেক কর্মীর পেনশন কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল। হোয়াইট হাউস আরো ৫০০ মিলিয়ন ডলার চেয়েছে ওয়াশিংটন ও আশপাশের এলাকার বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্পের জন্য। পাশাপাশি নিউইয়র্কের গুরুত্বপূর্ণ রেল কেন্দ্র পেন স্টেশন পুনর্নির্মাণে সহায়তার জন্য আরো এক বিলিয়ন ডলার বরাদ্দের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তবে কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা খুবই কম হওয়ায় এই বিশাল ব্যয় পরিকল্পনা অনুমোদন পেতে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থনের প্রয়োজন হবে। ফলে যুদ্ধ ব্যয়সহ পুরো প্রস্তাবটি আগামী সপ্তাহগুলোতে কংগ্রেসে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।




