kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৭ জুন ২০১৯। ১৩ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

প্লাস্টিকের দূষণে বিলুপ্ত হচ্ছে উদ্ভিদ ও প্রাণী

অনলাইন থেকে

২০ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



তাৎক্ষণিক সংকট বাদ দিয়ে ভবিষ্যতের দিকে তাকানো এবং মহৎ ভাবনা মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। মানুষ হিসেবে নিজেদের এই দক্ষতা নিয়ে আমরা গর্বিত। অন্য প্রাণীরা ব্যস্ত থাকে খাবারের অন্বেষণে, নীড়ের খোঁজে অথবা নীড় তৈরির কাজে। সেখানে মানুষ বোঝে সময়ের গুরুত্ব। এই মহাজগতে নিজ অবস্থান খুঁজে নিতে চাই আমরা। অথবা ডাইনোসরের মতো বৃহৎ প্রাণীর অবলুপ্তি কেন ঘটল, সেই প্রশ্ন নিয়ে বিব্রত থাকি। কোনো কোনো সময় আমরাও বাস্তবতা বুঝতে পারি না বা সে চেষ্টা করি না। আমাদের তেমনই ঘাটতি বা অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে বিশ্ব থেকে বহু প্রজাতি বিলুপ্ত হতে চলেছে, যার দায় অনেকাংশেই আমাদের। জাতিসংঘের নতুন বৈশ্বিক পর্যালোচনা প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, ১০ লাখ উদ্ভিদ ও প্রাণীর প্রজাতি পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

মরিশাসের বৃহদাকার পাখি ডোডোকে শনাক্ত করে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দিতে মানুষের লেগেছে মাত্র ১০০ বছর। তবে বিনাশ বা লয় বা বিলুপ্তি সাম্প্রতিক সময়ে এত দ্রুতগতির হয়ে উঠেছে যে সাধারণভাবে প্রতিটি প্রজাতিকে আলাদাভাবে চেনা আমাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। শনাক্ত করার আগেই আমরা ওই সব প্রাণীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছি। কিছু ক্ষেত্রে প্রজাতিগুলো হয়তো টিকে যাবে। তবে তাদের সংখ্যা অনেকটাই কমে আসবে। বন্য প্রাণীর জৈববস্তুপুঞ্জ ৮২ শতাংশ পড়ে গেছে। গত অর্ধশতাব্দীতে ব্রিটেনের গ্রামগুলোতে কাঁটাচুয়ার সংখ্যা কমে অর্ধেক হয়ে গেছে।

জনসংখ্যা বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে আমাদের খাদ্যগ্রহণ। এই বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ জলবায়ু পরিবর্তন। এর কারণেই বর্ণহীন হয়ে পড়ছে শৈবাল। আবাস হারাচ্ছে তারা। পরিবেশের জরুরি অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে দায়িত্বপূর্ণ পরিকল্পনা অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে। তবে বন্য জীবনের ক্ষেত্রেও বিশেষ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বনভূমি কেটে পরিষ্কার করে গবাদি পশুর চারণভূমি তৈরি করা হচ্ছে। কীটনাশক ও সারের ব্যবহারে দূষিত হচ্ছে বায়ু, পানি ও মাটি। একই সঙ্গে সমুদ্র ও আমাদের খাদ্যশৃঙ্খলায় ঢুকে পড়েছে প্লাস্টিক।

সরকারপ্রধানদের উচিত ব্যক্তিগতভাবে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ। এ বছর উন্নত দেশগুলোর সংগঠন জি সেভেনের শীর্ষ সম্মেলনের সময় স্বাগতিক দেশ হিসেবে এ ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ। তাঁদের বিষয়টি নিয়ে এখনই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আগামী শরতে জীববৈচিত্র্যের বিষয়ে জাতিসংঘের একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে চীনে। নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হবে সেখানে। বর্তমানে যে লক্ষ্যগুলো নিয়ে কাজ চলছে, সেগুলোর অগ্রগতি লজ্জাজনক। ২০১০ সালে জাপানে এই লক্ষ্যগুলো নির্ধারণ করা হয়, যদিও এগুলোর সামান্য কিছু সাফল্যও রয়েছে।

তবে জীববৈচিত্র্যের বিষয়ে যে সমঝোতা চুক্তি রয়েছে, সেটি যুক্তরাষ্ট্র কখনো অনুমোদনই করেনি। ফলে বিষয়টি নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার দায় তাদের কখনোই ছিল না। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে আশাপ্রদ খবর সম্ভবত জীববৈচিত্র্য প্রসঙ্গে গ্রিন নিউ ডিল।

এরই মধ্যে চিন্তা ও পরিকল্পনায় পরিবর্তন এসেছে। তেমন ইঙ্গিতই পাচ্ছি আমরা। ৩৬টি দেশ নিয়ে গঠিত আন্ত সরকারি বাণিজ্য সংস্থা অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) নতুন প্রতিবেদনে বন্য জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করা কম্পানিগুলোর জন্য উচ্চহারে কর ধার্য করার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে প্রতিবেদনে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকারী প্রকল্পগুলোতে অর্থায়ন বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়—এমন প্রকল্পগুলোতে অর্থায়ন কমানোরও প্রস্তাব দেয় সংগঠনটি। জীবাশ্ম জ্বালানি কম্পানি ও কৃষিভিত্তিক শিল্প বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি গ্রহণ করে চলেছে। অনেকেই মনে করে, আমাদের আরো সুচিন্তিত অর্থনৈতিক কাঠামো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা প্রয়োজন।

অভিবাসন, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যয়গুলোর ব্যাপারে সত্যিকারের পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। ১০ লাখ প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে আমরা যদি কিছু করতে না-ই পারি, তাহলে অন্তত একটি বিষয়ে আমরা সচেতন হতে পারি, অন্তত একটি প্রজাতির ব্যাপারে সতর্ক হতে পারি। আর সেই প্রজাতি হচ্ছে আমরা নিজেরা। আমাদের বিশ্বের ৫৫ লাখ কীটপতঙ্গ প্রজাতির ব্যাপারে আগ্রহ না-ও থাকতে পারে। কিন্তু তাদের প্রয়োজন আছে। কারণ তাদের মাধ্যমেই ফসলের পরাগায়ণ সম্পন্ন হয়। বীজ ছড়ায় তারা, আবর্জনা ভেঙে মাটিকে উর্বর করে। আমাদের অজ্ঞতা, লোভ, অলসতা এবং অল্প একটু মনোযোগের ঘাটতির কারণে আমরা সেসব প্রজাতিকে পৃথিবী থেকে বিলুপ্তির পথে ঠেলে দিচ্ছি, যেগুলোর ওপর আমরা নিজেদের স্বার্থেই বড় বেশি নির্ভরশীল।

 

সূত্র : সম্পাদকীয়, দ্য গার্ডিয়ান

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা