kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ মে ২০১৯। ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৫ রমজান ১৪৪০

গণিতের ধাক্কা প্রভাব ফেলেছে পুরো ফলের ওপর

মাছুম বিল্লাহ

১৩ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



গণিতের ধাক্কা প্রভাব ফেলেছে পুরো ফলের ওপর

প্রতিবছরই এসএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষা অনন্য কিছু বৈশিষ্ট্য নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম নেই। যেমন—এ বছর প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায় অংশগ্রহণ ও পাসের হারে মেয়েরা এগিয়ে আছে। ছাত্রের তুলনায় ১.৫৩ শতাংশ ছাত্রী বেশি পাস করেছে। ছাত্রের তুলনায় ৫২ হাজার ৬৯২ জন বেশি ছাত্রী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে এবং ৫৬ হাজার ৬৩৩ জন ছাত্রী বেশি পাস করেছে। এ বছর আরেকটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মাধ্যমিকের টেস্ট পরীক্ষায় যারা অকৃতকার্য হয়েছিল তারা কড়াকড়ির কারণে বোর্ড পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি। দেশের খ্যাতনামা কিছু প্রতিষ্ঠান আছে যারা টেস্ট পরীক্ষাগুলো অত্যন্ত কঠিন ও কড়াকড়ির মধ্যে নিয়ে থাকে। সেখানে যারা ফেল করে তাদের প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষার্থে বোর্ড পরীক্ষায় অংশ নিতে দেওয়া হয় না। এভাবে স্কুলগুলো সুনাম অর্জন করার চেষ্টা করে। বিষয়টি এবার জাতীয় ক্ষেত্রেও ঘটেছে অর্থাৎ বিদ্যালয়ে টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। ফলে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরো কমেছে। এ রকম ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ছিল সাড়ে পাঁচ লাখ। এটি কতটা আনন্দের আর কতটা যুক্তির কথা সেটা অবশ্য ভেবে দেখার সময় হয়েছে। কারণ কিছু বিষয়ের শিক্ষক ও বিদ্যালয় প্রশাসন চতুর ও দুরন্ত শিক্ষার্থীদের কায়দা করে টেস্ট পরীক্ষায় ফেল করিয়ে পরীক্ষা দিতে দেয় না। এ রকম ঘটনা কোথাও ঘটেছে কি না তা খুঁজে দেখা প্রয়োজন।

মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখার ছাত্র-ছাত্রীরা গণিতের কঠিন প্রশ্নে এবার ধরাশায়ী হয়েছে। সিলেট বোর্ডের প্রায় ২৫ শতাংশ পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে গণিতে। বরিশাল বোর্ডের ১৯ শতাংশ ও ঢাকা বোর্ডের ১৫ শতাংশ শিক্ষার্থী গণিতে ফেল করেছে। গণিতের প্রশ্নপদ্ধতি সৃজনশীল হওয়ায় সারা দেশে গণিত সেভাবে পড়ানোর মতো উপযুক্ত শিক্ষকের অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে পরীক্ষার ফলে। এ ধরনের মন্তব্য করেছেন কিছু শিক্ষক ও শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ। এবার গণিতের প্রশ্নে অবশ্য উদাহরণ থেকে অঙ্ক এসেছে, যা অনেক শিক্ষার্থী করে না, তারা নোট ও গাইড বইয়ের অঙ্ক করে। তার অর্থ এই নয় যে প্রশ্ন কঠিন হয়েছিল। বরং বলা যায় শিক্ষার্থীরা গণিতের মূল বিষয় বা বেসিক বিষয় শেখে না বা শেখানো হয় না বলে এই অবস্থা হয়েছে। এবার সারা দেশে ফেল করেছে তিন লাখ ৭৮ হাজার ৬৫০ জন। এর মূল কারণ গণিতের ফল খারাপ হওয়া। এদের প্রায় দুই লাখ শিক্ষার্থী মানবিক বিভাগের। বিজ্ঞান বিভাগে পাস করেছে ৯৪.৭২ শতাংশ শিক্ষার্থী, ব্যবসায় শিক্ষায় ৮৩.০৩ শতাংশ কিন্তু মানবিক বিভাগে পাস করে মাত্র ৭৪.৩২ শতাংশ। ফলে মানবিক বিভাগে ফল বিপর্যয় ঘটেছে, যার ধাক্কা লেগেছে সার্বিক ফলাফলে। মানবিক বিভাগে এত বিশাল অঙ্কের শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়ার কারণও খুঁজে বের করা দরকার।

গত ছয় বছরের মধ্যে এবারই প্রথম আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে জিপিএ ৫ প্রাপ্তি লাখের নিচে নেমে গেছে।  চতুর্থ বিষয়ের নম্বর এবার যোগ না হওয়ায় অনেকেই কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি। গতবারের চেয়ে পাসের হার বেড়েছে সাড়ে ৪ শতাংশ, তবে জিপিএ ৫ প্রাপ্তিতে ধস নেমেছে। সারা দেশে জিপিএ ৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থী কমেছে পাঁচ হাজার ৩৫ জন।

অনেক শিক্ষক ও বোর্ড চেয়ারম্যানরা বলেছেন যে ইংরেজি প্রশ্ন এবার ভালো হওয়ায় সারা দেশেই এ বিষয়ের ফল ইতিবাচক হয়েছে। সব  বোর্ডেই ইংরেজিতে পাসের হার ৯০ শতাংশের বেশি। পাসের হারে দেশের শীর্ষে থাকা রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ৯৮.১৬ শতাংশ। এর অর্থ হচ্ছে রাজশাহী বোর্ডের এসএসসি পাস করা শিক্ষার্থীরা প্রায় শতভাগই ইংরেজিতে দক্ষ। তারা ইংরেজি শুনে বুঝতে পারে, ইংরেজিতে সহজেই ভাব আদান-প্রদান করতে পারে, তারা ইংরেজিতে লেখা তাদের শ্রেণি অনুযায়ী যেকোনো লেখা পড়ে তার মর্মোদ্ধার করতে পারে এবং তাদের পরিচিত যেকোনো বিষয়ের ওপর শুদ্ধ ইংরেজিতে কোনো প্রবন্ধ বা রচনা লিখতে পারে। তাদের ক্ষেত্রে আসলে ঘটনা কি তাই? একইভাবে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ৯৭.৩৫ শতাংশ আর কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে তা ৯৬.৯৩ শতাংশ। ইংরেজির এই নম্বর সিরিয়াসলি গবেষণার দাবি রাখে। আমি প্রায় প্রতি মাসেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে বেড়াই, বিদ্যালয়ে যাই, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলি। তাদের ইংরেজির যে অবস্থা তাতে বিশাল প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে যে ইংরেজিতে তারা এত নম্বর কিভাবে পায়? দশম শ্রেণির একটি ক্লাসে এক শ বা এক শর কাছাকাছি শিক্ষার্থী কেউই যখন ইংরেজিতে বলতে পারে না’ আমি দশম শ্রেণিতে পড়ি/আমরা দশম শ্রেণিতে এক শ ছাত্র-ছাত্রী আছি/আমি প্রতিদিন স্কুলে আসি/আমি গতকাল স্কুলে আসিনি’—তাহলে আমরা তাদের কিভাবে মূল্যায়ন করলাম? এসব প্রশ্ন অতি সম্প্রতি আমি শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞেস করেছিলাম। কেউই উত্তর দিতে পারেনি। ইংরেজি শেখানোর যে উদ্দেশ্য, যে শিখনফল শিক্ষার্থীদের অর্জন করার কথা তা যখন করতে পারছে না,  তাহলে আমরা কিসের ওপর ভিত্তি করে এ ধরনের গ্রেডিং করছি? কেন এটি করছি?

পাসের হারের এই চিত্র প্রাথমিকভাবে আমাদের তো আনন্দিত করেই। কিন্তু এর পেছনে বা গভীরের সত্যও কি তাই? এবার এসএসসি পরীক্ষায় (২০১৯) আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের পাসের হার ৮২.৮০ শতাংশ। জিপিএ ৫ পেয়েছে ৯৪ হাজার ৫৫৬ জন শিক্ষার্থী। আটটি সাধারণ বোর্ড, মাদরাসা ও কারিগরি বোর্ড মিলিয়ে পাসের হার ৮২.২০ শতাংশ। ২০১৮ সালে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ১০ শিক্ষা বোর্ডের গড় পাসের হার ছিল ৭৭.৭৭ শতাংশ। ১০ বোর্ডে পাস করেছিল ১৫ লাখ ৭৬ হাজার ১০৪ জন। গত বছরের তুলনায় এ বছর পাসের হার বেড়েছে ৪.৪৩ শতাংশ। তবে জিপিএ ৫ কমেছে। এবার জিপিএ ৫ পেয়েছে এক লাখ পাঁচ হাজার ৫৯৪ জন, যা গত বছর ছিল এক লাখ ১০ হাজার ৬২৯ জন। মাদরাসা বোর্ডের অধীনে দাখিল পরীক্ষায় পাসের হার ৮৩.০৩ শতাংশ। গত বছর ছিল ৭০.৮৯ শতাংশ, অর্থাৎ বেড়েছে ১২.১৪ শতাংশ। কারিগরিতে পাসের হার ৭২.২৪ শতাংশ। গত বছর ছিল ৭১.৯৬ শতাংশ। পাসের হার বেড়েছে ০.২৮ শতাংশ। জিপিএ ৫ পেয়েছে চার হাজার ৭৫১ জন।

ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ৭৯.৬২ শতাংশ। রাজশাহী বোর্ডে পাসের হার ৯১.৬৪ শতাংশ। কুমিল্লা বোর্ডে পাসের হার ৮৭.১৬ শতাংশ। যশোর বোর্ডে পাসের হার ৯০.৮৮ শতাংশ। চট্টগ্রাম বোর্ডে পাসের হার ৭৮.১১ শতাংশ। বরিশাল বোর্ডে পাসের হার ৭৭.৪১ শতাংশ।  সিলেট বোর্ডে পাসের হার ৭০.৮৩ শতাংশ। দিনাজপুর বোর্ডে পাসের হার ৮৪.৪১ শতাংশ। এ বছর মোট পরীক্ষার্থী ছিল ২১ লাখ ৩৯ হাজার ৫৬৪ জন। এর মধ্যে মেয়ে পরীক্ষার্থী ১০ লাখ ৬৬ হাজার ২৭৫ জন এবং ছেলে ১০ লাখ ৭৩ হাজার ২৮৯ জন। অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ২১ লাখ ২৭ হাজার ৮১৫ জন; তার মধ্যে ছাত্র ১০ লাখ ৬৮ হাজার ৫২৭ জন এবং ছাত্রী ১০ লাখ ৫৯ হাজার ২৮৮ জন। পরীক্ষায় অনুপস্থিত ছিল ১১ হাজার ৭৪৯ জন। তার মধ্যে ছাত্র চার হাজার ৭৬২ এবং ছাত্রী ছয় হাজার ৯৮৭ জন। উত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ১৭ লাখ ৪৯ হাজার ১৬৫ জন। এর মধ্যে ছাত্র আট লাখ ৬৬ হাজার ৯৪১ এবং ছাত্রী আট লাখ ৮২ হাজার ২২৪ জন। অকৃতকার্য পরীক্ষার্থীর সংখ্যা তিন লাখ ৭৮ হাজার ৬৫০ জন। এর মধ্যে ছাত্র দুই লাখ এক হাজার ৫৮৬ জন এবং ছাত্রী এক লাখ ৭৭ হাজার ৬৪ জন। যশোর বোর্ডে গত বছর পাসের হার ছিল ৭৬.৬৪ শতাংশ, যা এবার হয়েছে ৯০.৮৮ শতাংশ। এই পাসের হার আন্তর্জাতিক পরীক্ষা পদ্ধতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ তা কি আমরা ভেবে দেখেছি? প্রগ্রাম ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট অ্যাসেসমেন্ট বা পিসার মানদণ্ডে আমরা কোথায় অবস্থান করছি।

দুই বছর ধরে উত্তরপত্র মূল্যায়নে পরিবর্তন এনেছে শিক্ষা বোর্ডগুলো। পরীক্ষকদের খাতা দেওয়ার আগে প্রশিক্ষণ জোরদার করা হয়েছে। সেখানে তাদের একটি করে মডেল উত্তরপত্রও সরবরাহ করা হয়, যাতে সবাই কাছাকাছি নম্বর দিতে পারেন। এগুলো নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ। পরীক্ষা উন্নয়ন ইউনিট উত্তরপত্র মূল্যায়ন যাতে সঠিকভাবে হয়, সেই উদ্দেশ্যে কাজ করে যাচ্ছে। এটি ভালো উদ্যোগ। কিন্তু আমাদের দেশের কত শতাংশ শিক্ষক এখনো টেস্টিং ইলিটারেসিতে ভুগছেন সেটি কিভাবে দেখা হবে বা হচ্ছে। এ বিষয়টি মিনিমাইজ হবে কবে?

লেখক : ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত সাবেক ক্যাডেট কলেজ ও রাজউক কলেজ শিক্ষক

[email protected]

 

মন্তব্য