kalerkantho

সোমবার । ২৪ জুন ২০১৯। ১০ আষাঢ় ১৪২৬। ২০ শাওয়াল ১৪৪০

যুক্তরাষ্ট্রের নজর এখন ইরানের ওপর

জন ওয়েট

১২ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ইরানের ওপর নতুন করে আঘাত হানার প্রস্তুতি চলছে। বিষয়টি নৈতিকতাবিরোধী শঠতার শামিল। কয়েক বছরের মধ্যে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের সবচেয়ে নগ্ন রূপ এটি। যুদ্ধ ও শান্তির ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত মিথ্যাচারের মাধ্যমে আলোচনার অযোগ্য পরিস্থিতি তৈরি করা সাম্র্রাজ্যবাদীদের স্বভাব। আগ্রাসন ও হামলা চালানোর জন্য বিশ্বাসযোগ্য গল্প তৈরি করা তাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈশিষ্ট্য। সম্প্রতি যুদ্ধবাজদের মতো শব্দচয়ন, হুমকি ও ইরান ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে নানামুখী ব্যবস্থা গ্রহণ করে যুক্তরাষ্ট্র সেই কাজটি করে চলেছে।

সৌদি আরব ও ইসরায়েলের সঙ্গে নোংরা একটি জোট গঠন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে প্রবেশের দুই বছর পার হয়ে গেছে। এরই মধ্যে তাঁর অন্তহীন লড়াইগুলোর ইতি টানার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তাঁর প্রশাসন। যেন ওয়াশিংটনের পুনর্জন্মের কাজ শুরু করেছেন তাঁরা। ভেনিজুয়েলায় ব্যর্থ হওয়ার পর এখন ট্রাম্প প্রশাসন পাগলা কুকুরের মতো ইরানের পেছনে লেগেছে।

এ ক্ষেত্রে জন বোল্টন ও মাইক পম্পেও ট্রাম্প প্রশাসনকে শিগগিরই নিজেদের খোঁড়া নরকের সঙ্গে তুলনীয় খাদের কিনারায় নিয়ে যাবেন। আর সেখানেই ট্রাম্পের সঙ্গে এই পাগলামিতে যোগ দেবেন তাঁর দুই ঘনিষ্ঠ সহযোগী—বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও বিন সালমান।

মনে রাখা ভালো, ওয়াশিংটন কখনোই ভুলে যায়নি যে তাদের পছন্দনীয় রাজা মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে ইরান ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। ১৯৭৯ সালে এক স্বতঃস্ফূর্ত গণ-অভ্যুত্থানে তাঁর পতন ঘটে। তার পর থেকে ইরান এক দিনের জন্যও যুক্তরাষ্ট্রের নব্য উপনিবেশে পরিণত হয়নি।

২০১৫ সালে ওবামার মধ্যস্থতায় জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) বা ইরান পরমাণু চুক্তি স্বাক্ষর হয়। এই উদ্যোগের মূল চেহারা ওবামার হলেও এই পুরো পরিকল্পনাটি যুক্তরাষ্ট্রের ৪৪তম প্রেসিডেন্টের একক প্রচেষ্টা ছিল না। বরং মাত্র ছয় বছর আগে ওই অঞ্চলে ইরাক যুদ্ধে যে লজ্জাজনক পরাজয় স্বীকার করতে যুক্তরাষ্ট্র বাধ্য হয়েছিল তার একধরনের স্বীকারোক্তি ছিল ওই চুক্তি। একটি দেশকে পঙ্গু করে দেওয়ার মতো নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রাখার পরও ওই দেশের সঙ্গে লড়তে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

ওই যুদ্ধের পরিণতি হিসেবে ইরাক পেয়েছে জাতিগোষ্ঠীগত রক্তপাত, টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়া দেশ ও সমাজ। আর বাজেভাবে সবার সামনে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী সেনাবাহিনীর কাদায় আটকে যাওয়া পা।   

রাশিয়া, জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও চীনকে নিয়ে ইরানের জেসিপিওএ চুক্তি আরেকটি বিষয়কেও স্বীকৃতি দেয়। তা হলো, তেহরান সরকার ও জনগণের পশ্চিমাদের অর্থনৈতিক যুদ্ধ, স্বেচ্ছাচারিতার জবাবে সার্বভৌম দেশ হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকার দৃঢ় প্রত্যয়।

এসব কিছুর ফল ছিল ওমাবার পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বিজয়। যদিও ইসরায়েল ও সৌদি আরব এই চুক্তি যেন সই না হয় তা নিশ্চিত করতে বহু চেষ্টা চালিয়েছে।

সচরাচর প্রত্যেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাঁর পূর্বসূরির নেওয়া সিদ্ধান্ত মেনে চলেন। এটি প্রথা। কিন্তু ট্রাম্প ওবামা নন। তার ওপর দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্টের নাক অত্যন্ত উঁচু। এরই মধ্যে তাঁর স্বভাব চরিত্রের ভিন্নতা দেশ-বিদেশে তার অভিরুচির স্বাক্ষর রেখেছে।

ইরান একটি প্রাচীন সভ্যতার দেশ। যারা ইতিহাসের নানা মোড়ে নানা দুর্যোগের মোকাবেলা করে এসেছে। আট কোটি মানুষের দেশ ইরানে পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষের হাতে অস্ত্র আছে। এই দেশের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে বড় ধরনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটবে—সুনিশ্চিতভাবেই বিষয়টি বলে দেওয়া যায়।

বহু বছরের সামরিক চেষ্টার পরও ফিলিস্তিনিদের মনোবল ভেঙে দিতে পারেনি ইসরায়েল। ইহুদি রাষ্ট্রটির জন্মলগ্ন থেকে এখন পর্যন্ত তারা শুধু একবারই পরাজয়ের স্বাদ গ্রহণ করেছে। সেটা লেবাননের হিজবুল্লাহ গোষ্ঠীর কাছে। এদের সঙ্গে তেহরানের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। হিজবুল্লাহ গোষ্ঠীর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সামরিক বাহিনী রয়েছে। ধারণা করা হয়, এই বাহিনীর কাছে ইসরায়েলের যেকোনো স্থানে হামলা চালানোর মতো ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে।

ইরানের সামনে এখন নিজেদের প্রতিরক্ষা সুনিশ্চিত করার জন্য প্রস্তুত হওয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই। আশা করব, আমেরিকার জনগণ যুক্তরাষ্ট্রকে যথাযথ দিশা দেখাতে পারবে। নয়তো দেশটির ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্টদের ভাষণ শেষ করার সময় ‘ঈশ্বর যুক্তরাষ্ট্রের সহায় হোন’ না বলে বলতে হবে ‘ঈশ্বর যুক্তরাষ্ট্রকে দয়া করুন’।    

লেখক : দি ইনডিপেনডেন্ট, মর্নিং পোস্ট, হফিংটন পোস্টসহ বহু পত্রিকার কলাম লেখক

সূত্র : আরটি

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ

মন্তব্য