kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ মে ২০১৯। ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৫ রমজান ১৪৪০

মনের কোণে হীরে-মুক্তো

যেনতেন মানদণ্ডে পুরস্কার, স্বীকৃতি বৃত্তি প্রদান সমীচীন নয়

ড. সা’দত হুসাইন

২০ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১০ মিনিটে



যেনতেন মানদণ্ডে পুরস্কার, স্বীকৃতি বৃত্তি প্রদান সমীচীন নয়

কৃতিত্বপূর্ণ অর্জনের জন্য এক বা একাধিক ব্যক্তি পুরস্কৃত হয়। পুরস্কারের ক্ষেত্র এবং মানদণ্ড (Criteria) কোনো অনমনীয় ফর্মুলার মাধ্যমে নির্ধারিত হয় না। যে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সংঘবদ্ধ গ্রুপ পুরস্কার দিয়ে থাকে, তারা নিজস্ব পদ্ধতিতে পুরস্কারের ক্ষেত্র এবং পুরস্কারের জন্য প্রার্থী বাছাইয়ের পদ্ধতি ও মানদণ্ড নির্ধারণ করে। সময়ান্তরে পদ্ধতি এবং মানদণ্ড পরিবর্তিত হয়, সাধারণভাবে পুরস্কারের ক্ষেত্রগুলো হচ্ছে মেধার প্রকাশ, শিল্প-সাহিত্যসহ বিভিন্ন সৃষ্টিধর্মী কর্ম; গবেষণা, খেলাধুলা, জনহিতৈষী কর্মকাণ্ড, সাড়া জাগানো আবিষ্কার ইত্যাদি। প্রতিটি ক্ষেত্রের আওতায় বহু উপক্ষেত্র রয়েছে। যেমন—শিল্প-সাহিত্যের মধ্যে কাব্য, উপন্যাস, গল্প, নাটক, প্রবন্ধের সঙ্গে রয়েছে চিত্রকলা, সংগীত, নৃত্য, অভিনয়, আবৃত্তি, ভাস্কর্য এবং স্থাপত্যের মতো কর্মকাণ্ড। খেলাধুলা এবং গবেষণারও রয়েছে নানাবিধ শাখা-প্রশাখা। পুরস্কারের আরো একটি ক্ষেত্র ব্যক্তির সারা জীবনের কৃতিত্ব তথা কর্মকাণ্ড, যাকে বলা হয় ‘লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট’। এভাবে নানা দিক, নানা কর্মকাণ্ডের বিবেচনায় একজন ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কৃত করা হয়।

ব্যক্তিক পর্যায়ে পুরস্কার পাওয়ার অভিজ্ঞতা খুব অল্প বয়সে, বলা যায় প্রারম্ভিক কৈশোরে শুরু হয়। শিশু বয়সে সুন্দর স্বাস্থ্যের জন্য শিশুকে দু-এক সময়ে পুরস্কার দেওয়া হয়। শিশু শিল্পীকেও পুরস্কার দেওয়া হয়। এগুলোকে কৃতিত্বসম্ভূত পুরস্কার, না উৎসাহব্যঞ্জক পুরস্কার বলা হবে সে নিয়ে বির্তক রয়েছে। কিশোর-কিশোরীরা কৃতিত্বের জন্য যে ক্ষেত্রে পুরস্কার পেয়ে থাকে সেগুলো হচ্ছে, পড়াশোনা, খেলাধুলা, সংগীত ও নৃত্যজাতীয় সুকুমার শিল্প। পড়াশোনার ক্ষেত্রে সাধারণত পরীক্ষার ফল প্রধান মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে রচনা প্রতিযোগিতা, বিষয়ভিত্তিক অলিম্পিয়াড, ‘স্পেলিং বীই’ ইত্যাদি প্রতিযোগিতায় কৃতিত্ব প্রদর্শনের জন্য উঁচু মানের সুখ্যাত পুরস্কার দেওয়া হয়, যা একজন কিশোর-কিশোরীকে সমাজে নজরকাড়া স্থানে সমাসীন করে। এদের কেউ কেউ রীতিমতো সম্মানীয় ব্যক্তিত্বে রূপান্তরিত হয়। তাদের চলন-বলন এবং জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আসাও বিচিত্র নয়। এ ধারা বজায় রেখে তাদের স্বল্প কয়েকজন পরবর্তীকালে আরো উচ্চতর পুরস্কারে ভূষিত হয়। আবার অনেকে তাদের কৃতিত্বের ধারা ধরে রাখতে পারে না, তারা সাধারণ মানের কিশোর-কিশোরী বা তরুণ-তরুণীতে পর্যবসিত হয়। একাডেমিক জগতের উঁচু স্তরে অসাধারণ অর্থাৎ পুরস্কার পাওয়ার উপযোগী কৃতিত্ব প্রদর্শন খুব সহজ ব্যাপার নয়।

খেলাধুলার ক্ষেত্রে কিশোর বয়সেই একজন খেলোয়াড় বা ক্রীড়াবিদের প্রতিষ্ঠার ভিত্তি রচিত হয়। বস্তুত কিশোর এবং তরুণ বয়স হচ্ছে খেলোয়াড়ের কৃতিত্ব প্রদর্শনের প্রকৃষ্ট সময়কাল। খেলোয়াড় এবং ক্রীড়াবিদ যাঁরা খেলার মাঠে বা ক্রীড়াক্ষেত্রে অসামান্য কৃতিত্ব প্রদর্শন করে বিশ্ববিখ্যাত হয়েছেন, তাঁদের শ্রেষ্ঠ পারফরম্যান্সের সময় ছিল কৈশোর অথবা তরুণ বয়স। তারুণ্যের অবসানের প্রাক্কালে অথবা অব্যবহিত পরে তাঁদের ‘ফরম’ পড়ে যায়। তাঁরা আগের মতো উচ্চমার্গে কৃতিত্ব দেখাতে পারেন না। খেলোয়াড় বা ক্রীড়াবিদের পুরস্কার ও স্বীকৃতি পাওয়ার মূল মানদণ্ড হচ্ছে মাঠে-ময়দানে তাঁর পারফরম্যান্স, যা সাধারণভাবে দৃশ্যমান হয়ে থাকে এবং কাগজে-কলমে যার রেকর্ড রাখা হয়। উচ্চ মানের পারফরম্যান্সের বদৌলতে তাঁরা পুরস্কার, মেডেল, ট্রফি পান, যা নিজ বাসগৃহে, অফিসে বা ক্লাবে চোখে পড়ার মতো করে সাজিয়ে রাখেন। যে কজন ক্ষণজন্মা খেলোয়াড় বা ক্রীড়াবিদ বিশ্ব বিখ্যাতদের মধ্যে শীর্ষ স্থানে অবস্থান করেন মাঠ থেকে অবসর নেওয়ার পরও, তাঁরা ‘সেলিব্রিটি’ হিসেবে নানারূপ সম্মাননা এবং স্বীকৃতির মুকুটে শোভিত হতে থাকেন। এরূপ স্বীকৃতির পালা বিভিন্ন নামে আজীবন চলতে থাকে। দৃষ্টান্ত হিসেবে আমরা মোহাম্মদ আলী, রবার্ট ওয়েন, ব্র্যাডম্যান, হানিফ মোহাম্মদ, সুনীল গাভাস্কার, শচীন টেন্ডুলকার, পেলে, ম্যারাডোনা, জিদান, ডেভিড বেকহাম, ওসাইন বোল্ট, আবিবি বিকিলা, রিয়ন বোর্গ, মার্টিনা হিঙ্গিস, শারাপোভার নাম উল্লেখ করতে পারি। মাঠের বাইরে থাকলেও অসাধারণ কৃতিত্বের জন্য সারা পৃথিবীর লোক বিনম্রচিত্তে এঁদের শ্রদ্ধা জানায়। কোনো কারণে একবার এঁদের দেখা পেলে নিজেদের ধন্য মনে করে।

শিল্প-সাহিত্যে পুরস্কার ও স্বীকৃতি পেতে একটু সময় লাগে। শিশু-কিশোরদের জন্য সীমিত পরিসরে এলাকাভিত্তিক আয়োজিত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কিছু পুরস্কার প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়। এ পুরস্কারের খ্যাতি এবং স্থায়িত্ব ব্যাপ্ত পরিসরে প্রসারিত হয় না। দেশ বা বিশ্বব্যাপী খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠা তাঁরাই পেয়ে থাকেন, যাঁদের বহুসংখ্যক শিল্পকর্ম রয়েছে। অবশ্য বিশ্বব্যাপী সাড়া জাগানো স্বল্পসংখ্যক কর্মও কোনো শিল্পী-সাহিত্যিককে খ্যাতির শীর্ষে সমাসীন করতে পারে। শিল্পীর সঙ্গে জীবন, কর্মকাণ্ড ও কৃতিত্বগুলোকে বোদ্ধা মানুষ বিবেচনায় রাখে। গণমানুষ ও বোদ্ধাজনের স্বীকৃতি এক দিনে আসে না। দীর্ঘ সময়ের সাধনা ও সৃষ্টি ধীরে ধীরে শিল্পীকে সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় সিক্ত করে। জনমনে তিনি অভিষিক্ত হন নিজ গৌরবে। স্বীকৃতি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ধরা দেয় তাঁর কাছে।

শিল্পী-সাহিত্যিকদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি ভিন্নতর ব্যাপার। এখানে পাঠক-দর্শকদের ভূমিকা নিতান্তই গৌণ। যেসব প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষ শিল্পী-সাহিত্যিক ও কৃতিত্ববান ব্যক্তি বা সংগঠনকে পুরস্কার প্রদান করে, তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব প্রক্রিয়া-পদ্ধতি রয়েছে। সে পদ্ধতি-প্রক্রিয়ার পরিপন্থী হলে কাউকে পুরস্কার দেওয়া হয় না। সাহিত্য, নির্বাচিত একাডেমিক বিষয় এবং মানবকল্যাণধর্মী কর্মকাণ্ডের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সর্বোচ্চ পুরস্কার হচ্ছে নোবেল পুরস্কার, যা শুধু জীবিত ব্যক্তিকে দেওয়া হয়। চলচ্চিত্র শিল্প সম্পৃক্ত বিষয়ের জন্য সর্বোচ্চ পুরস্কার হচ্ছে একাডেমি অ্যাওয়ার্ড (অস্কার), মহিলাদের সৌন্দর্যের জন্য সর্বোচ্চ পুরস্কার হচ্ছে ‘মিস ইউনিভার্স’ ও ‘মিস ওয়ার্ল্ড’ মুকুট। এ ছাড়া বুকার প্রাইজ, গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড, ম্যাগসেসাই অ্যাওয়ার্ড ইত্যাদি উচ্চ মানের পুরস্কার বা স্বীকৃতি রয়েছে। পেশাভিত্তিক আরো কিছু উচ্চ মানের পুরস্কার রয়েছে। যেমন—পুলিত্জার প্রাইজ, এএমএ সায়েন্টিফিক অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড, পামডিঅর (কানস্ ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড), পাফিন প্রাইজ ফর ক্রিয়েটিভ সিটিজেনস, আলবানী মেডিক্যাল সেন্টার প্রাইজ ইত্যাদি।

কিছু সম্মাননা, স্বীকৃতি রয়েছে, যা ব্যক্তির সারা জীবনের কর্মকাণ্ড ও কৃতিত্বের মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রদান করা হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বা মানদণ্ড নেই। সম্মাননাকারী কর্তৃপক্ষ নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে তাদের পছন্দমতো ব্যক্তিকে সম্মাননার জন্য বাছাই করে। অনেক দেশে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার রয়েছে। এই শ্রেণিতে রয়েছে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় খেতাব, যেমন—যুক্তরাজ্যের ওবিই, নাইটহুড, ভারতের পদ্মভূষণ, পদ্মশ্রী, পাকিস্তানে নিশানে পাকিস্তান, ফ্রান্সের ন্যাশনাল অর্ডার অব দি লিজিয়ন অব অনার ইত্যাদি। সাড়া জাগানো কোনো আবিষ্কার বা অনন্যসাধারণ কোনো কাজের জন্য গৌরবান্বিত ব্যক্তিকে রাষ্ট্র কিংবা বিভিন্ন সুপ্রতিষ্ঠিত সংগঠন স্বীকৃতি-সম্মাননা দেয়। মহাকাশ বিজয়ী নভোচারী, চিকিৎসাক্ষেত্রে উদ্ভাবনীমূলক অসাধারণ কাজ অথবা গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার কিংবা জনহিতৈষী অসাধারণ কর্মসূচির জন্য ক্ষণজন্মা ব্যক্তিদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। রোটারি ফাউন্ডেশন, লায়ন ফাউন্ডেশন, বিশ্ব স্কাউট সংস্থা এ ধরনের স্বীকৃতি প্রদান করে; ব্যক্তিদের তাঁদের আজীবন কর্মকাণ্ডের জন্য সম্মাননা প্রদান করে। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোয় রাষ্ট্রীয় তকমা দেওয়ার রেওয়াজ রয়েছে।

শিল্প-সাহিত্যের অঙ্গনে এবং আজীবন অর্জনের জন্য যে সম্মাননা দেওয়া হয় তার প্রার্থী বাছাইয়ের লক্ষ্যে পরিমাপযোগ্য কোনো মানদণ্ড নেই। বাছাই কমিটির চেয়ারম্যান ও সদস্যের পছন্দ-অপছন্দই এখানে প্রাধান্য পায়। কমিটির ওপর প্রকৃত ক্ষমতাধর শক্তির প্রভাব অনেক সময় কার্যকর ভূমিকা পালন করে। ফলে নোবেল পুরস্কারের মতো মর্যাদাবান স্বীকৃতিও বিতর্কিত হচ্ছে। এমন ব্যক্তিকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে, যাঁর কর্মজীবন প্রকৃতপক্ষে শুরুই হয়নি। তিনি হয়তো অত্যাচারী শাসক গোষ্ঠী অথবা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর মারাত্মক আক্রমণের শিকার হয়েছেন। এ অজুহাতে তাঁকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি সন্ত্রাসী বাহিনী কর্তৃক নৃশংস আক্রমণের শিকার হয়ে থাকলে তার জন্য বিপুল সহানুভূতি জ্ঞাপন করা যেতে পারে। কিন্তু এ কারণে নোবেল পুরস্কার প্রদান যুক্তিযুক্ত হতে পারে না। সন্ত্রাসীদের আক্রমণ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক নিপীড়ন যদি নোবেল পুরস্কার পাওয়ার মানদণ্ড হয়, তবে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বহু দেশের হাজার হাজার ব্যক্তি এ পুরস্কার পাওয়ার জন্য উপযুক্ত প্রার্থী হিসেবে যৌক্তিকভাবে বিবেচিত হতে পারে। আবার দেখা গেছে, কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্রের সদ্য নির্বাচিত প্রধান নির্বাহী (রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী) যিনি স্বাভাবিক পদ্ধতিতে ওই পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন, তিনি চূড়ান্তভাবে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছেন, যদিও এ মানদণ্ডে ডজন ডজন ব্যক্তি পুরস্কার পাওয়ার উপযুক্ত বলে দাবি করতে পারেন।

সাহিত্য, অর্থনীতি, শান্তিতে এমন বেশ কিছু ব্যক্তি পুরস্কার পেয়েছেন, যাঁদের কৃতিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা মোটেই অযৌক্তিক হবে না। অর্থনীতিতে নোবেলপ্রাপ্তদের সম্পর্কে এর আগে আমি পূর্ণাঙ্গ কলামে বিশদভাবে লিখেছি। আমি বলেছি, এ বিষয়ে গত কয়েক বছরে এমন কয়েকজন ব্যক্তি পুরস্কৃত হয়েছেন, যাঁরা অর্থনীতিবিদ হিসেবে সুপরিচিত নন। তাঁদের কর্মবৃত্তান্তও তেমন আকর্ষণীয় নয়। দু-এক ক্ষেত্রে তাঁদের কাজ অর্থনীতির পরিসীমায় পড়ে কি না তা নিয়েও বিতর্ক থাকতে পারে। শান্তি পুরস্কারও এমন ব্যক্তিকে দেওয়া হয়েছে যাঁর কার্যকলাপ শান্তি প্রতিষ্ঠার পক্ষে ছিল কি না সে নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। সাহিত্যে এমন ব্যক্তিরা পুরস্কৃত হয়েছেন, যাঁরা তাঁদের এলাকায় অবিসংবাদিতভাবে শ্রেষ্ঠ ছিলেন এমন কথা জোর করে বলা যাবে না। আবার অনেক উপযুক্ত লোক ভিন্নমত পোষণের কারণে তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন। বাছাই কর্তৃপক্ষ বৃহৎ শক্তি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল।

সর্বোচ্চ পুরস্কারের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব কিভাবে কাজ করে। দেখেছি সর্বোচ্চ বাছাই কমিটির চেয়ারম্যান নির্দ্বিধায় কিভাবে পুরস্কারের জন্য নিজেকে বাছাই করে বসেন, তাঁর সহকর্মী সদস্যরা অনুগতভাবে চুপ করে থাকেন। আনুগত্য এবং পারস্পরিক পিঠ চুলকানো এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করে। সর্বোচ্চ স্বীকৃতি, রাষ্ট্রীয় পুরস্কার এমন ব্যক্তিকে দেওয়া হয়েছে, যাঁর জীবনবৃত্তান্ত বা কর্মবৃত্তান্তে উল্লেখযোগ্য তেমন কিছু নেই। কোথা থেকে কার প্রভাবে এসব নাম এসে গেল তা বুঝে ওঠা মুশকিল। নিশ্চয় তাঁদের পেছনে সে রকম কিছু শক্তি কাজ করেছে।

আজকাল বিভিন্ন সংগঠন পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে ‘মেধাবী’ শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান করে। বৃত্তিপ্রাপ্তদের সংখ্যা বেশ বড়। সেদিন পত্রিকায় দেখলাম, একটি ব্যাংক প্রায় এক লাখ (প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ৮২ হাজার) ‘মেধাবী’ শিক্ষার্থীকে পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করার জন্য বৃত্তি দিয়েছে। অন্যান্য ব্যাংকও একইভাবে বিপুলসংখ্যক ‘মেধাবী’ শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দিয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে যে শিক্ষার্থী ৮১৯৫০তম স্থানে অবস্থান করেছে, সে-ও কি প্রকৃতই ‘মেধাবী’? অনন্যসাধারণ কৃতিত্বের অধিকারী? যদি উপর্যুক্ত শিক্ষার্থী ‘মেধাবী’ হিসেবে পরিগণিত হয়, তবে আমাদের এই বলে প্রার্থনা করার সময় এসেছে, ‘হে আল্লাহ, প্রকৃত মেধাবীদের রক্ষা করো, এরা বৃত্তিপ্রাপ্তদের চাপে দলিত-মথিত হয়ে যাচ্ছে।’ এরূপ লোকরঞ্জনমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা পুরস্কারের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে ফেলেছি। পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে ‘খেলো’ করেছি। একইভাবে ডজন ডজন সংগঠন যাঁকে-তাঁকে সম্মাননা বা স্বীকৃতি দিয়ে পুরো ব্যাপারটিকে ভাঁড়ামিতে পরিণত করেছে। এমনও শোনা যায়, সম্মাননাপ্রাপ্তদের মধ্যে কোনো ব্যক্তি পুরো কর্মসূচির ব্যয় নির্বাহ করেছেন। একে একধরনের ভদ্রোচিত চাঁদাবাজিও বলা যেতে পারে।

স্বীকৃতি বা পুরস্কার প্রদানের ক্ষেত্রে আমাদের আরো ‘সিরিয়াস’ হতে হবে। কী উদ্দেশ্যে পুরস্কার দেওয়া হবে তা সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যায়িত হওয়া দরকার। পুরস্কারপ্রাপ্তদের যোগ্যতা প্রগাঢ় আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে। বাছাইয়ের মানদণ্ড যত দূর সম্ভব পরিমাপযোগ্য হতে হবে। তা সম্ভব না হলে অন্ততপক্ষে পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তির জীবনবৃত্তান্ত এবং কর্মবৃত্তান্ত এমন হতে হবে যেন একনজরেই তাঁকে অসাধারণ প্রতীয়মান হয়। বিশেষ করে তাঁর সুখ্যাতি এমন ব্যাপ্ত হতে হবে যে শিক্ষিত লোকজন যেন এক ডাকেই তাঁকে চিনতে পারেন। যদি সত্যিকারার্থে অনন্যসাধারণ ব্যক্তি না পাওয়া যায়, তবে সে বছর পুরস্কার প্রদান বন্ধ রাখা হবে। জাতীয় কিংবা আঞ্চলিক পুরস্কারকে আমরা যেন GPA 5 গ্রেডের মতো হাস্যাস্পদ করে না ফেলি, সেদিকে কঠোর দৃষ্টি রাখতে হবে। পুরস্কার ও স্বীকৃতি দয়া-দাক্ষিণ্যের বিষয় নয়। এর সুদূরপ্রসারী সংশ্লেষ রয়েছে, আমরা যেন সেদিকটি সম্পর্কে বিস্মৃত না হই।

 

লেখক : সাবেক মন্ত্রিপরিষদসচিব ও পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান

মন্তব্য