kalerkantho

সোমবার। ২৭ মে ২০১৯। ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২১ রমজান ১৪৪০

দিল্লির চিঠি

ভারতের নির্বাচন ও ভোটব্যাংক রাজনীতি

জয়ন্ত ঘোষাল

১৬ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ভারতের নির্বাচন ও ভোটব্যাংক রাজনীতি

আমার মন খারাপ হয়ে যায়। তবু এটাই আমাদের ভারতের নির্বাচনী ব্যাধি। ভোটের সময় হলেই শুরু হয়ে যায় সাম্প্রদায়িকতার ভোটব্যাংক রাজনীতি। উত্তর প্রদেশ নামক রাজ্যটি, সেখানে অযোধ্যার রামমন্দির, যেখানে বাবরি মসজিদ ছিল, সে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ একদিকে, আরেক দিকে বহুজন সমাজ পার্টির নেত্রী মায়াবতী। মায়াবতী বললেন, ‘হে মুসলমান সমাজ, বিজেপি তোমাদের ভোট ভাঙার চেষ্টা করছে। এই ষড়যন্ত্রের শিকার হবে না। সব মুসলমান একযোগে ভোট দাও এ রাজ্যে মহাগঠবন্ধনকে।’ তার মানে অখিলেশ যাদবের সমাজবাদী পার্টি আর মায়াবতীর বহুজন সমাজ পার্টির বাক্সে। যোগী আদিত্যনাথ তখন কী করলেন? তিনি বললেন, ‘আলি আছে ওদের; কিন্তু আমাদের আছে বজরংবলী।’ বিজেপির আরেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মানেকা গান্ধী তাঁর নির্বাচনী কেন্দ্রে গিয়ে বলেছেন, ‘মুসলমানদের জন্য আমি প্রায় এক হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছি। তোমাদের উন্নয়নের জন্য টাকা খরচ করব আর তোমরা ভোট দেবে না? এবার হয় আমাকে ভোট দাও আর তা না হলে আমার কাছ থেকে আর সাহায্য চেয়ো না।’ বিরোধীরা মানেকা গান্ধীর বিরুদ্ধে নালিশ জানিয়েছে নির্বাচন কমিশনের কাছে। যোগীর বিরুদ্ধেও নালিশ গেছে। আবার মুসলিম তোষণের জন্য বিজেপি মায়াবতীর বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ এনেছে।

বাংলাদেশের পাঠক-পাঠিকারা বলবেন, এতে আপনার মন খারাপ করে লাভ কী? ঢাকার রাজনীতিতেও ধর্মনিরপেক্ষতা আর জামায়াতপন্থী কট্টরবাদ ভোটের সময় কি ইস্যু হয় না? এ এক প্রচলিত ধারণা। খালেদার বিএনপির জোট শরিক জামায়াত। আওয়ামী লীগের সাবেকি দর্শন গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতার কথায় বেশি অগ্রাধিকার দেয়। অন্যদিকে বিএনপি ব্যবসা ও সেনাবাহিনীর পাশাপাশি ইসলামিক সত্তার পরিসরকে বেশি গুরুত্ব দেয়। সত্যি কথা বলতে কি, শুধু ভারত-বাংলাদেশ নয়, যুক্তরাষ্ট্র, এমনকি ব্রিটেন থেকে ফ্রান্স—সর্বত্র উগ্র ধর্মীয় উন্মাদনা বা জাতিগত সংকীর্ণ পরিসর ভোটের ইস্যু হচ্ছে।

তবু আমার মন খারাপ হয়। এই যে মুসলিম জনসমাজকেও ভোটব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করা, এই প্রবণতাকে স্বাধীনতার ৭০ বছর পরও আমরা নির্বাচনের সময় দূরে সরিয়ে রাখতে পারলাম না। এটা কি দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা নয়? ভারতের বিশিষ্ট সমাজতাত্ত্বিক প্রয়াত এম এন শ্রীনিবাস ‘ভোটব্যাংক’ শব্দটির জনক। তাঁকে আমরা ভারতীয় সমাজতত্ত্বের অ্যারিস্টটল বলে অভিহিত করি। কিন্তু মুসলমান সমাজকে ভোটব্যাংক করার কাজ আজ হঠাৎ শুরু হয়েছে এমনও নয়, ভারতের রাজনীতিতে এর শিকড় অনেক অনেক গভীরে।

সেই ইতিহাসে যাওয়ার আগে আমার মনে করাতে ইচ্ছা করছে এক ইতিহাসখ্যাত ব্যক্তিত্ব আব্দুর বাহাদুর রহমান খানের কথা। ১৯২৭ সালে ঢাকা শহরে মুসলিম সাহিত্য সমাজ (এমএসএস) গঠিত হয়। আব্দুর বাহাদুর রহমান খান ছিলেন এই সমাজ গঠনের প্রাণপুরুষ। ১৯২০ সাল থেকে ঢাকায় তিনি ধর্মীয় সংস্কারের কথা বলেন। মোগল আমলের বাংলা প্রদেশের একদা রাজধানী ঢাকায় ছিল অসংখ্য বিশিষ্ট সামাজিক ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। ১৯২৬ থেকে ১৯৩২ সালে ঢাকায় মুসলিম সাহিত্য সমাজের অবদান আমি আজ এত দিন পর কেন স্মরণ করতে চাইছি? হে পাঠকরা, ঢাকার মানুষ হিসেবে আপনাদের গর্ব করার যথেষ্ট কারণ আছে, আমি সেই গৌরবে গৌরবান্বিত বোধ করছি একজন বাঙালি হিসেবে। আর দুঃখ হচ্ছে এই মানসিকতা থেকে ভারতীয় রাজনীতিকরা সরে গেছেন বলে। আজ আলি আর বজরংবলীকে নিয়ে ভোট চাওয়া হচ্ছে। ঈদ আর দীপাবলি শ্মশান আর কবর দেখিয়ে ভোট নেওয়া হচ্ছে—এই অভিযোগ যাঁরা তুলছেন তাঁরাও আসলে এই মেরুকরণের রাজনীতিকেই উসকে দিচ্ছেন।

ঢাকায় মুসলিম সাহিত্য সমাজ যে উদার ইসলাম চর্চার সঙ্গে বাংলা ভাষা ও বাঙালির সমস্যার সমাধানে অগ্রণী হয়, সে আন্দোলনে কবি নজরুল ইসলামও ছিলেন। কিন্তু পরে পাকিস্তান নামক ভাবনার যে জন্ম হলো, তাতে বপন করা হলো উগ্র ধর্মীয় উন্মাদনার। বাঙালি প্রেক্ষাপটে ১৯২৬ থেকে ১৯৩৬ সালে ইসলাম ও মুসলিম সত্তার যে সংস্কার হয়, শিখা বা সওগাত নামের পত্রপত্রিকায় বারবার প্রশ্ন তোলা হয় ধর্মীয় কুসংস্কার নিয়ে, আবার মুসলিম বিদ্বৎসমাজের সেসব পত্রপত্রিকায় ভাষার রাজনীতি ও কৃষকদের সমস্যা নিয়েও অনেক লেখালেখি হয়। শেষ পর্যন্ত ১৯২০ সালের শেষের দিকে বাংলার আইনসভায়ও এই বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

আজ ২০১৯ সালে ভারতের লোকসভা ভোট প্রচারে হিন্দু ও মুসলিম ভোটব্যাংকের রাজনীতি দেখে মনে হচ্ছে ঢাকার সেই ঐতিহ্যকে দিল্লির শাহি রাজনৈতিক নেতাদের মনে করা দরকার। মনে করুন, কলকাতায় ১৯২৬ সালের এপ্রিল মাসে এক ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার পরিস্থিতি তৈরি হয়ে গিয়েছিল। তখন মহামাদি (Mohamadi) সুলতান (SOLTAN) ও আনন্দবাজার পত্রপত্রিকায় মুসলিম, হিন্দু দুই পক্ষের লিফলেট প্রকাশিত হতো। এক উর্দু পক্ষ লিখেছিল, হে মুসলমান সমাজ, সাবধান! হিন্দুরা তোমাদের খেয়ে নেবে। আর হিন্দুরা বলছে, ওহে, হিন্দুদের সঙ্গে সখ্য রাখলে তবেই হিন্দুস্তানে অন্যরা থাকতে পারবে। নিজেদের হাতে লাঠি রাখো এই বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য। এ ধরনের ভয়াবহ বিষ প্রচার যখন কলকাতা থেকে খড়গপুর (পশ্চিমে) থেকে পাবনা (পশ্চিম-কেন্দ্রীয় পূর্ববঙ্গ) পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল তখন ঢাকার মুসলিম বিদ্বৎসমাজ বলছে, এই বিদ্বেষ ভুলে অর্থনীতির উন্নতির প্রয়োজন। ‘রিকাস্টিং দ্য রিজিয়ন : ল্যাঙ্গুয়েজ, কালচার অ্যান্ড ইসলাম ইন কলোনিয়াল বেঙ্গল’ নামের বইটি পড়ছি। লেখক নীলেশ বোস মার্কিন মুলুকে নর্থ টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট অধ্যাপক। তাঁর লেখা থেকে জানতে পারছি কলকাতায় যখন এহেন পরিস্থিতি তৈরি হয় তখন নজরুল ইসলামের মতো ব্যক্তি বলছেন, মুসলমান সম্প্রদায়ের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সর্বত্রই খুব শোচনীয়। এই অবস্থার উন্নতি অগ্রাধিকার হওয়া প্রয়োজন। ১৯২৮ সালের নজরুলের কবিতা ‘নূতনের গান’—যেখানে তিনি মুসলিম সমাজকে বলছেন, এক নতুন দিবসকে স্বাগত জানানোর জন্য আজান শোনো।

ভারতের ভোটের সময় এই নতুন দিনের আজানের সুর শুনতে পাচ্ছি কই। আবার হিন্দু-মুসলমান দুই পক্ষের এই ভোটব্যাংকের রাজনীতিতে কে প্রকৃত কারণ বা উৎস আর কে প্রতিক্রিয়া তা নিয়ে বিতর্ক তো আজ আকস্মিক নয়। ১৯৩৭ সালে ভারতের প্রথম নির্বাচন, তখন তো অবিভক্ত বাংলা, সে সময় গোটা দেশে ভোট না পেলেও বাংলা প্রদেশে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে মুসলিম লীগ। কার্জন বঙ্গভঙ্গ করলেও (১৯০৫) পরে তা ১৯১১ সালে রদ করতে হয় বটে; কিন্তু হিন্দু-মুসলমান fault line থেকেই যায়। ঢাকার নবাব কার্জনের পর ভাইসরয় মর্লোর কাছে এসে বলেছিলেন, মুসলমান সমাজকে সুরক্ষা দেওয়া প্রয়োজন। অনেক পণ্ডিত বলেছেন যে হিন্দু রাজা আর গরিব মুসলিম কৃষক প্রজা অথবা মুসলিম নবাব আর হিন্দু কৃষক প্রজার দারিদ্র্য এই সাম্প্রদায়িকতা বৃদ্ধির কারণ হয়ে ওঠে। শাসক-শাসিতের সংঘাত সাম্প্রদায়িকতার রূপ পায়। সুমিত সরকারের মতো বামপন্থী ঐতিহাসিকরা বলেন, হিন্দু সৌভিনিজম মুসলিম বিচ্ছিন্নতাবাদের জন্ম দেয়। মানে স্বাধীনতা সংগ্রাম করার জন্য যদি সংগঠনের নাম হয় হিন্দু মহাসভা, আর ভারতমাতা যদি হয় মা দুর্গার রূপ, তবে মুসলমান সমাজে separatism অস্বাভাবিক নয়। আবার জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিকরা বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ ভাবনায় ভারতমাতা হিন্দু দেবীর রূপে এলেও তা আসলে সংখ্যালঘুবিরোধী ছিল না। জিন্নাহর মতো ব্যক্তিত্ব, যাঁর মুসলিম সংস্কার বিল রচনা আজ ভারতীয় সংবিধানেরও অঙ্গ, সেই জিন্নাহই পরবর্তীকালে রাজনৈতিক ক্ষমতার জন্য উগ্র পথ নেন, যা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে দেয়।

এত বিতর্কের মধ্যে যেতে চাই না। কারণ অনেকে আবার গান্ধী-নেহরুকে দায়ী করে জিন্নাহর মতো এক উদার মানুষকে এত উগ্র করে দেওয়ার জন্য। মার্কিন ভারততত্ত্ববিদ স্ট্যানলে ওলপার্টের লেখা ‘জিন্নাহ অব পাকিস্তান’ (১৯৮৪) বইতে এই উদার জিন্নাহর কট্টর জিন্নাগ হয়ে ওঠার বিবর্তন কাহিনি বিরচিত।

আমি সাংবাদিক; পণ্ডিত, অধ্যাপক নই। তাই নানা মুনির নানা মত আজ আপনাদের সামনে তুলে ধরলাম। কিন্তু মন খারাপ কমছে না, যেভাবে ভারতে ভোট প্রচার চলছে, তা দেখে মন খারাপ বাড়ছে। মোদি বলছেন, বিকাশ, বিকাশ এবং বিকাশ। দেশের উন্নয়ন পহেলা নম্বর অগ্রাধিকার। কিন্তু বাস্তবে রাজনৈতিক দলের প্রচারে ইস্যু কিন্তু উন্নয়ন হচ্ছে না। দুর্ভাগ্য আমাদের।

লেখক : বিশেষ প্রতিনিধি, কালের কণ্ঠ, নয়াদিল্লি

মন্তব্য