kalerkantho

সোমবার। ২৭ মে ২০১৯। ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২১ রমজান ১৪৪০

মধ্যপ্রাচ্য এ অপশক্তিকে কবে চিনবে

গাজীউল হাসান খান

৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



মধ্যপ্রাচ্য এ অপশক্তিকে কবে চিনবে

অন্যায়ভাবে যখন মানুষের অধিকার হরণ করা হয়, অন্যায্যভাবে যখন তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হতে দেওয়া হয় না, তখনই মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তাদের মুখের প্রতিবাদও যখন দিনের পর দিন ভূলুণ্ঠিত হতে থাকে, তখনই তাদের মধ্যে প্রতিরোধের আগুন জ্বলে ওঠে। ক্রমে ক্রমে প্রতিরোধের সেই অগ্নস্ফুিলিঙ্গ দাবানলের মতো সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায়। এবং তাতেও যদি মূল সমস্যা কিংবা অপরাধের ন্যায়সংগতভাবে কোনো সুরাহা না হয়, তখন তা সশস্ত্র রূপ লাভ করতেই পারে। তাকে কি সন্ত্রাসবাদ বলে অভিযুক্ত করা যাবে? ইসরায়েলের ইহুদিবাদী আগ্রাসী শক্তি এবং সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন প্রশাসন ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে যৌথভাবে এখন যা করছে, তা আরব বিশ্ব কিংবা বিশ্বের শান্তিকামী মানুষকে কোনদিকে ঠেলে দিচ্ছে? আন্তর্জাতিক আইন ও সম্প্রদায়কে উপেক্ষা করে ফিলিস্তিনের পবিত্র নগরী জেরুজালেমকে গত বছর দখলদার ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন বর্তমান ইহুদি প্রভাবাধীন ও মুসলিমবিদ্বেষী বলে পরিচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু সেখানেই থেমে থাকেননি ট্রাম্প, সিরিয়ার কাছ থেকে দখল করা গোলান মালভূমিকে ইসরায়েলের ভূখণ্ড বলেও স্বীকৃতি দিয়েছেন বর্তমান বেপরোয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এ অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে ফিলিস্তিনে বিরাজমান সমস্যার কি ন্যায়সংগত সমাধান করতে পারবে বিশ্বের অন্যতম প্রধান পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র? ইহুদি প্রভাবে প্রভাবান্বিত এবং দখলদারদের স্বার্থ সংরক্ষণে জড়িত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতা কে মেনে নেবে? যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যা সমাধানে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে মোটেও নিরপেক্ষ নয়। আগ্রাসন ও সম্প্রসারণবাদী ইসরায়েলকে একের পর এক অন্যায় সুযোগ-সুবিধা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান নীতি-নৈতিকতাহীন প্রশাসন নিজেদের আরব বিশ্বের সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

প্রথমে বিশ্বের তিনটি প্রধান ধর্মাবলম্বী মানুষের (ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলিম) পবিত্র নগরী জেরুজালেম এবং সর্বশেষ সিরিয়ার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ গোলান মালভূমিকে দখলদার ইসরায়েলিদের ভূখণ্ড বলে স্বীকৃতি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আসলে বিরাট ভুল করেছেন বলে গণমাধ্যম অভিযোগ করেছে। তাদের মতে, এর মাধ্যমে ট্রাম্প আসলে ইসরায়েলের ইহুদিবাদী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর হাতে একটি বিষের পেয়ালা তুলে দিলেন। গোলান মালভূমিসংক্রান্ত ঘোষণার মাধ্যমে একদিকে যেমন মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের নিরপেক্ষতাকে ধূলায় বিসর্জন দিয়েছে, অন্যদিকে তাদের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও অদূর ভবিষ্যতে এ বিষয়টি একটি বড় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে। মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে আগ্রাসনবাদী ইসরায়েল এবং সাম্রাজ্যবাদী যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে সিরিয়ার অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী শাসক বাশার আল আসাদ ক্ষমতায় আরো শক্তিশালী হয়ে বসার প্রয়াস পাবেন। কারণ বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে হিতাহিত জ্ঞানহীন ট্রাম্পের বিভিন্ন অপরিণামদর্শী ঘোষণা আসাদের প্রতি প্রতিবেশীদের মনোভাব বেশ কিছুটা নরম করে তুলবে বলে অনেকের ধারণা। তা ছাড়া আরববিশ্বে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ইহুদিবাদী ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ও ঘৃণা যতই ঘনীভূত হবে, সিরিয়া, ইরান ও রাশিয়ার বর্তমান অবস্থান কূটনৈতিকভাবে ততটাই যুক্তিগ্রাহ্য হবে বলে মনে হচ্ছে। ১৯৬৭ ও তার পরবর্তী সময়ে ফিলিস্তিন ও সিরিয়ার গোলান মালভূমির ওপর সম্প্রসারণবাদী ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া অসম যুদ্ধ ও অন্যায়ভাবে আরব ভূখণ্ড দখল করে সেখানে বসতি স্থাপন অব্যাহত রাখা আন্তর্জাতিক আইনে সম্পূর্ণ বেআইনি। এ ব্যাপারে জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার ও বলিষ্ঠ। জেরুজালেম ও গোলান মালভূমি নিয়ে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত বা ঘোষণা একজন প্রেসিডেন্টের পক্ষে চরম স্বেচ্ছাচারিতা ছাড়া আর কিছুই নয়। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মতে, ট্রাম্পের ঘোষণা কিংবা স্বীকৃতিতে গোলান মালভূমির মর্যাদায় কোনো পরিবর্তন হয়নি।

ইসরায়েল অধিকৃত গোলান মালভূমিকে ইসরায়েলের ভূখণ্ড হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ট্রাম্প আসলে সম্প্রসারণবাদী নেতানিয়াহুর হাতে একটি বিষের পেয়ালা তুলে দিয়েছেন বলে রাজনীতিবিষয়ক পত্রিকা ‘দ্য হিল’ যে মন্তব্য করেছে তা অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য। পত্রিকাটি বলেছে, এর ফলে শুধু আসাদ নয়, সিরিয়ার কোনো সরকারের পক্ষেই ইসরায়েলের সঙ্গে ভবিষ্যতে কোনো ধরনের শান্তিচুক্তি করা সম্ভব হবে না। কারণ অধিকৃত জেরুজালেম কিংবা গোলান মালভূমি নিয়ে যা ঘটছে তাতে শুধু ইহুদিবাদী ইসরায়েলই নয়, যুক্তরাষ্ট্রও আরববিশ্বের সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এ মন্তব্য সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। তা ছাড়া প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কিংবা মার্কিন প্রশাসনের গোলান মালভূমিবিষয়ক সিদ্ধান্তকে সৌদি আরব জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। নিন্দা জানিয়েছে ইসলামিক দেশগুলোর কেন্দ্রীয় সংস্থা ‘ওআইসি’। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী কিংবা আগ্রাসনবাদীরা তাদের চরিত্রগতভাবে নিজ স্বার্থে কোনো অঞ্চলে সংকট এবং অস্থিরতা সৃষ্টি করাকে তাদের ভাষায় অনৈতিক বা অন্যায্য মনে করে না। জেরুজালেমকে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলের রাজধানী কিংবা গোলান মালভূমিকে ইসরায়েলের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ের পর সম্প্রসারণবাদী কিংবা আগ্রাসনবাদীদের অন্যায্য কিংবা আন্তর্জাতিক আইনে বেআইনি কার্যকলাপ আরো বাড়িয়ে দিতে পারে। কারণ ট্রাম্প কিংবা ইহুদিবাদী নেতানিয়াহু সমগ্র বিশ্ব ব্যবস্থাকে ভেঙে দিয়ে তাঁদের আধিপত্য বিস্তার করতে চাচ্ছেন।

ফিলিস্তিনসহ আরবদের ওপর ১৯৬৭ সালে চাপিয়ে দেওয়া একতরফা যুদ্ধে ইসরায়েল সরকার প্রস্তাবিত ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের জন্য জাতিসংঘ নির্ধারিত ৬০ লাখ ডানাম ভূখণ্ডের (১০ ডানামে এক হেক্টর) মধ্যে সাত লাখ ৩০ হাজার ২১৪ ডানাম ভূখণ্ড আত্মসাৎ করেছে বিভিন্ন অজুহাতে। ১৯৪৭ সালে সমগ্র ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে (বর্তমান ইসরায়েল রাষ্ট্রসহ) আরব জনসংখ্যা ছিল ১৩ লাখ ১০ হাজার আর ইহুদি জনসংখ্যা ছিল মাত্র ছয় লাখ ৩০ হাজার। গত ৭২ বছরে ইহুদিদের সেই জনসংখ্যার পরিমাণ ও আর্থ-সামাজিক দৃশ্যপট অস্বাভাবিকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। তা ছাড়া ইহুদিদের অন্যায় বসতি স্থাপন ও আক্রমণের মুখে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে গাজার হামাস ও ইসলামী জিহাদসহ কিছু সংগঠনের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের অভিযোগে ২০০৫ সাল থেকে ইহুদি সেনারা গাজা অবরোধ করে রেখেছে।

ফিলিস্তিনসহ পার্শ্ববর্তী কয়েকটি আরব অঞ্চলে ১৯৬৭ সালে এক অসম ও ঝটিকা যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিল ইসরায়েলের আগ্রাসী বাহিনী। তাতে ফিলিস্তিনের বাইরে তারা আক্রমণ চালায় সিরিয়ার গোলান মালভূমির ওপর। সেই আক্রমণ ছিল সম্পূর্ণ সামরিক কৌশলগত কারণে। সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক থেকে ৬০ কিলোমিটার দক্ষিণে গোলান মালভূমি অবস্থিত। গোলানের মোট আয়তন প্রায় এক হাজার ৮০০ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে উল্লিখিত ঝটিকা আক্রমণে ইসরায়েলি বিমান ও স্থল বাহিনী গোলানের প্রায় এক হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার দখল করে নেয়। তারপর নিজেদের অবস্থান মজবুত করে ১৯৮১ সালে বেআইনিভাবে সেই সিরীয় ভূখণ্ডকে নিজেদের বলে ঘোষণা করে ইসরায়েল সরকার। বাদবাকি ৬০০ বর্গকিলোমিটার সিরিয়ার অধীনে রয়ে গেছে। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখনো ইসরায়েলি অধিকৃত এলাকাটিকে তাদের ভূখণ্ড বলে স্বীকৃতি দেয়নি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও এত দিন গোলানকে ইসরায়েলি ভূখণ্ড হিসেবে কোনো স্বীকৃতি দেওয়া থেকে বিরত ছিল। কিন্তু মুসলিমবিদ্বেষী ও পারিবারিক দিক থেকে ইহুদি প্রভাবাধীন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবার সেই অসমর্থনযোগ্য কাজটিই আবার করে বসলেন। ট্রাম্পের ধারণা, এ স্বীকৃতি ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনে নেতানিয়াহুর জন্য বিজয় এনে দেবে। যা বহু কারণেই এবার বিজয়ী হওয়া প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য ছিল কঠিন। শুধু তা-ই নয়, আগামী বছর নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠেয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এ স্বীকৃতি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে স্থানীয় (মার্কিন) ইহুদি সম্প্রদায়ের সমর্থন ও সহযোগিতা পেতে সাহায্য করবে বলেও তাঁর বিশ্বাস।

নিজেদের অধিকার আদায় ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার লক্ষ্যে সংগ্রামরত আরব ও অনারবরা বর্তমানে আবার ইহুদি আগ্রাসনবাদী ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী যৌথ চক্রান্তের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। এখন ইসলামী সন্ত্রাস বা জঙ্গিবাদী বলে তাদের আখ্যায়িত করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। কারণ বিশ্ববাসীর কাছে এখন আগ্রাসনবাদী ও সাম্রাজ্যবাদীদের মুখোশ খুলে গেছে। এ অবস্থায় ইরান, তুরস্ক ও রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে তাদের অবস্থান শক্তিশালী করতে যেমন সচেষ্ট হবে, তেমনি সৌদি আরব কিংবা জিসিসি (গালফ কো-অপারেশনভুক্ত দেশগুলো) সদস্য দেশগুলোও নিজেদের স্বার্থে সজাগ হয়ে উঠবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ অবস্থায়ও ইহুদিবাদী ইসরায়েল চায় যুক্তরাষ্ট্র যেন ইরান আক্রমণ করে ইরাকের অসিরাক আণবিক প্রকল্পের মতো ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো গুঁড়িয়ে দেয়। তার কারণ ইরান ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এবং ফিলিস্তিনসহ মধ্যপ্রাচ্যের সব মুক্তি আন্দোলনের পক্ষে। শিয়া-সুন্নি বিভেদ ভুলে গিয়ে সৌদি আরবসহ সব মুসলিম দেশকে আগ্রাসনবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ষড়যন্ত্রকে রুখে দাঁড়াতে হবে। নতুবা মধ্যপ্রাচ্যকে ইহুদিবাদী ইসরায়েল ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ষড়যন্ত্র থেকে মুক্ত করা যাবে না। জেরুজালেম এবং গোলান মালভূমির ঘটনায় আরবসহ মুসলিম বিশ্ব সেই কথিত চক্রের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে এখন একটি সম্যক ধারণা পেয়েছে। সুতরাং এখনই সেই অপশক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে নিজেদের স্বার্থ সংরক্ষণে রুখে দাঁড়াতে হবে।

লেখক : বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক

[email protected]

 

মন্তব্য