তিনি সব জিতেছেন, শুধু বিশ্বকাপ ছাড়া! কে জানে সেই অজেয় আকাঙ্ক্ষাই হয়তো তাঁকে নিত্য তাড়া করে বেড়ায়! না হলে এই ৪১ বছর বয়সেও আরেকটি বিশ্বকাপ খেলার মতো এতটা ঝরঝরে আর ফিট থাকেন কী করে ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো! অথচ আগের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নেওয়ার পর কান্নায় ভেঙে পড়া পর্তুগিজ মহাতারকাকে দেখে অনেকে এই উপসংহারেও পৌঁছে গিয়েছিলেন যে আক্ষেপ নিয়েই বিদায় নিচ্ছেন তিনি। টানেলের ভেতর তাঁর দুই চোখ কোনো বাধাই যেন মানছিল না।
অথচ সেই রোনালদোই চার বছর পর ঠিকই বিশ্বমঞ্চে ফিরেছেন। রেকর্ড ষষ্ঠ বিশ্বকাপেও নিজের ট্রফি উঁচিয়ে ধরার স্বপ্নকে তাড়া করবেন নিশ্চিতভাবেই। তবে আরেকটি স্বপ্নের কথাও সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন তিনি। অবশ্য সেই স্বপ্নপূরণে তাঁর নিজের তেমন কিছু করার নেই।
যা করার, করতে হবে রোনালদোর ছেলে ক্রিস্তিয়ানো জুনিয়রকেই। তার বাবার খেলা ছাড়ার সময় ঘনিয়ে আসছে। এদিকে ক্রিস্তিয়ানো জুনিয়রও বয়সভিত্তিক পর্যায়ে প্রতিভা আর যোগ্যতার জানান দিয়ে ক্রমাগত উত্থানের সিঁড়ি ভাঙছে। বাড়ন্ত এই ছেলের সতীর্থ হিসেবে একই দলের হয়ে মাঠে নামার স্বপ্নও যে বুনে চলেছেন সিআরসেভেন, সেই ইচ্ছার কথাও এর মধ্যে বহুবার বলা হয়ে গেছে।
নিজের বড় ছেলের সঙ্গে পেশাদার ফুটবলে একই ক্লাবের হয়ে খেলার স্বপ্নের কথা এভাবেই বলতে শোনা গেছে পাঁচবারের ব্যালন ডি’অর বিজয়ীকে, ‘ওর সঙ্গে খেলতে চাই আমি। যদিও চাওয়া পূরণের বিষয়টি আমার চেয়ে ওর হাতেই বেশি। কারণ সময় বয়ে যাচ্ছে, আমাকেও তো একদিন থামতে হবে।’
বাবার স্বপ্নপূরণে অবশ্য সঠিক পথেই আছে ক্রিস্তিয়ানো জুনিয়র। ১৫ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্টে বাবার মতোই ছাপ রেখে চলেছে। গতির মতোই ক্লিনিক্যাল ফিনিশিংয়েও দুর্দান্ত। লেফট উইঙ্গার হলেও ৬ ফুট ৩ ইঞ্চির ক্রিস্তিয়ানো জুনিয়র আক্রমণভাগের যেকোনো জায়গায় মানিয়ে নিতে সক্ষম। বয়সভিত্তিক পর্যায়ের ক্লাব ফুটবল থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক আঙিনা, সবখানেই প্রতিভার ছাপ রাখছে সে। ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পর্তুগালের অনূর্ধ্ব-১৫ ও অনূর্ধ্ব-১৬ দলের হয়ে তিনটি শিরোপা জিতেছে। এর মধ্যে ভ্লাতকো মাকোভিচ টুর্নামেন্টে অনূর্ধ্ব-১৫ দলের হয়ে ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোলও করে। এদিকে বাবার সৌদি প্রো লিগের দল আল নাসরের অনূর্ধ্ব-১৫ দলের হয়ে ২৭ ম্যাচে ৫৬ গোলও করা হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে আছে ১৫টি অ্যাসিস্টও। সম্প্রতি অনূর্ধ্ব-১৭ দলের হয়ে হ্যাটট্রিকের সঙ্গে নিয়মিত গোলও করে যাচ্ছে ক্রিস্তিয়ানো জুনিয়র।
বড় খবর হলো, ওর এমন পারফরম্যান্সে চোখ রাখছে ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোও। এর মধ্যে আছে বাবার সাবেক ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদও। ইউরোপের সংবাদমাধ্যমের দাবি, লস ব্ল্যাংকোসরা ক্রিস্তিয়ানো জুনিয়রের সঙ্গে চুক্তিও করতে পারে। ২০২৬ সালের মার্চে রিয়াল মাদ্রিদের অনূর্ধ্ব-১৬ দলের একাডেমিতে অনুশীলনও করে এসেছে সে। সেই সঙ্গে তার ওপর বাবার বর্তমান ক্লাব আল নাসরের নজর তো রয়েছেই। সম্প্রতি সৌদি আরবের সংবাদমাধ্যম ‘আল উইয়াম’ জানিয়েছে, রোনালদোর বড় ছেলেকে ২০২৬-২৭ মৌসুমে মূল দলের অনুশীলনে যুক্ত করতে পারে আল নাসর। সংবাদ সত্যি হলে ছেলের সঙ্গে নিজের ট্রেডমার্ক উদযাপন ‘সিউউউ’ হয়তো হাতছোঁয়া দূরত্বেই থাকবে। সৌদি ক্লাবের সঙ্গে নতুন করে চুক্তিও করেছেন রোনালদো। ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত থাকছেন পর্তুগিজ অধিনায়ক। বাবা-ছেলের জুটি দেখার সময় তাই আছেই।
একসঙ্গে বাবা-ছেলের মাঠ মাতানোর নজির অবশ্য অনেকই আছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন ব্রাজিলের ২০০২ বিশ্বকাপজয়ী মিডফিল্ডার রিভালদো এবং তাঁর ছেলে রিভালদিনহোর জুটি। এমনকি ২০১৫ মৌসুমে ব্রাজিলের ক্লাব মোগি মিরিমের হয়ে গোলও করেছেন বাবা-ছেলে। অন্যদিকে ইংল্যান্ডের হয়ে ১৯৬৬ বিশ্বকাপজয়ী জর্জ ইস্টহ্যাম তো তাঁর বাবা জর্জ ইস্টহ্যাম সিনিয়রের সঙ্গে শিরোপাও জিতেছেন। ১৯৫৪ সালে উত্তর আয়ারল্যান্ডের গোল্ডকাপে আর্ডস ক্লাবের হয়ে ট্রফি জেতেন তাঁরা। সুইডেনের হেনরিক লারসন-জর্দান লারসনের বাবা-ছেলের জুটি নিয়েও ফুটবলজগতে কম আলোচনা হয়নি।
অবশ্য শুধু ফুটবলেই নয়, অন্য খেলায়ও বাবা-ছেলের একসঙ্গে খেলার উদাহরণ রয়েছে। ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি আসর বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগেও (বিপিএল) নোয়াখালী এক্সপ্রেসের হয়ে একসঙ্গে জুটি বেঁধেছিলেন আফগানিস্তানের মোহাম্মদ নবী-হাসান ইসাখিল। গায়ানার হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট মাতিয়েছেন শিবনারায়ণ চন্দরপল-তেজনারায়ণ চন্দরপল। এই তালিকায় বাংলাদেশের হয়ে আছেন রকিবুল হাসান-সাজিদুল হাসান। ১৯৯০-৯১ সালের ঢাকা লিগে ভিক্টোরিয়ার হয়ে খেলেছেন পিতা-পুত্র জুটি। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কিংবদন্তি লেব্রন জেমস বাস্কেটবলের কোর্টে সতীর্থ হিসেবে পেয়েছেন ছেলে ব্রনি জেমসকে।
রোনালদো আর ক্রিস্তিয়ানো জুনিয়রের জুটি এখন সত্যি হওয়ার পথে। সেই স্বপ্ন পূরণ না হলে অন্য কোথাও জুটি গড়ার পরিকল্পনা কি করবেন রোনালদো? পর্তুগালের কোচ হয়ে ছেলের হাতে বিশ্বকাপ ট্রফি দেখা? যদিও কোচ হওয়ার ইচ্ছা কখনোই পোষণ করেননি তিনি। তবে রোনালদোর মত ঘুরে যেতে কতক্ষণ!




