স্বপ্নের মতো বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করেছে আর্জেন্টিনা। আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে ৩-০ ব্যবধানে জয়ের ম্যাচে হ্যাটট্রিক করে আবারও খবরের শিরোনামে উঠে এসেছেন লিওনেল মেসি। এই কীর্তির সুবাদে বিশ্বকাপে সর্বাধিক গোলের রেকর্ডেও ভাগ বসিয়েছেন তিনি। তবে ম্যাচ শেষে নিজের রেকর্ড বা ব্যক্তিগত সাফল্য নিয়ে নয় বরং খেলার প্রতি ভালোবাসা, দলের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং নিজের অনুপ্রেরণার উৎস নিয়েই বেশি কথা বলেন এলএম টেন। আর সেই প্রসঙ্গেই উঠে এলো টেনিস কিংবদন্তি রাফায়েল নাদালের নাম।
আগামী সপ্তাহেই ৩৯ বছরে পা দেবেন মেসি। কিন্তু তাঁর খেলায় বয়সের কোনো ছাপই দেখা যাচ্ছে না। আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে দুর্দান্ত হ্যাটট্রিকের টেনিশ তারকা নাদালের মানসিকতাকে অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখেন উল্লেখ করে মেসি বলেন, ‘এখনো ফুটবলকে ঠিক ছোটবেলার মতোই ভালোবাসি। আমি এই সময়টা ভীষণ উপভোগ করছি। মাঠে নামলে খুব ভালো লাগে, খুব আনন্দ পাই। ছোটবেলা থেকেই ফুটবল আমার সবচেয়ে বড় ভালোবাসা। তাই আজও আমি নিজের সবটুকু দেওয়ার চেষ্টা করি। আমরা এখন রাফায়েল নাদালকে নিয়ে একটি ধারাবাহিক দেখছি। ওর একটা বিষয় আমাকে খুব অনুপ্রাণিত করে— ও সব সময় নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দেয় এবং যা করে, তা মন থেকে উপভোগ করে। আমিও ঠিক সেই ভাবনাতেই খেলতে চাই।’
দুর্দান্ত হ্যাটট্রিকে বিশ্বকাপে সর্বাধিক গোলদাতাদের তালিকায় জার্মানির কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসার পাশে নাম লেখালেন মেসি। রেকর্ড নিয়ে মাথা ঘামাতে নারাজ মেসি আরো বলেন, ‘আমি গোল বা রেকর্ড নিয়ে খুব একটা ভাবি না। ক্লোজ়ের পাশে নিজের নাম দেখতে পারা অবশ্যই সম্মানের। রোনালদোও রয়েছেন, কিলিয়ান এমবাপ্পে আজ দু’টি গোল করেছে।’
কিন্তু এগুলো শেষ পর্যন্ত পরিসংখ্যানই। রোনালদো আমার দেখা অন্যতম সেরা ফুটবলার, অথচ ও কিন্তু সবার উপরে নেই। তাই এসব নিয়ে না ভেবে আমি শুধু নিজের কাজটা করে যেতে চাই। ম্যাচের গোলগুলো এখনো দেখিনি। পরিবারের সদস্য এবং সতীর্থদের সঙ্গে সেই মুহূর্তগুলো উপভোগ করছিলাম। পরে সময় নিয়ে দেখব।’ বলে যোগ করেন তিনি।
৩-০ ব্যবধানের জয়ে ম্যাচটি সহজ ছিল জানিয়ে অষ্টমবার ব্যালন ডি'অর জয়ী এই তারকা বলেন, ‘বাস্তবে লড়াইটা অনেক কঠিন ছিল। আলজেরিয়ার দলে বেশ কিছু ভালো ফুটবলার রয়েছে। ওরা খুব দ্রুত খেলছিল এবং আমাদের চাপে রাখার চেষ্টা করছিল। আমরা খেলার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে চেয়েছিলাম, কিন্তু বিশেষ করে প্রথমার্ধে বলের দখল ধরে রাখতে বেশ সমস্যা হয়েছে। এই বিশ্বকাপে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, সব দলই দারুণ প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে। এখানে কোনো দল কাউকে বিনা লড়াইয়ে কিছু ছেড়ে দেয় না।’
জাতীয় দলের হয়ে দীর্ঘ পথচলার স্মৃতি মনে করতে গিয়ে পুরনো কষ্টের কথাও বলেছেন মেসি। তিনি বলেন, ‘জাতীয় দলের সঙ্গে অনেক সুন্দর সময় কাটিয়েছি, আবার অনেক কঠিন সময়ও দেখেছি। সত্যি বলতে, খারাপ সময়ের সংখ্যাও কম ছিল না। তবে পরে সব কিছু বদলে যায়। এখন জাতীয় দলের সঙ্গে সময়টা অন্যভাবে উপভোগ করতে পারি। আমরা এমন একটি দেশ, যেখানে ফলাফলই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। টানা তিনটি ফাইনাল হারার কারণে সেই দলটাকে অনেকেই শুধুই ব্যর্থতার চোখে দেখত। কিন্তু বিশ্বকাপ এবং দু’টি কোপা আমেরিকা জেতার পর মানুষ আমাদের সাফল্যগুলোকেও যথাযথ মর্যাদা দিতে শুরু করেছে।’
পাশাপাশি সমর্থকদের উদ্দেশে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক বলেন, ‘আর্জেন্টিনার মানুষকে ধন্যবাদ। তারা এখানে এসে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে, ঠিক যেমন কাতারে দাঁড়িয়েছিল। তাদের সমর্থন সব সময় আমাদের শক্তি জোগায়।’
এটা মেসির ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। এত বছর পরও তাঁর জয়ের খিদে, লড়াই করার মানসিকতা এবং সেরাটা দেওয়ার ইচ্ছা একটুও কমেনি। ২০৩০ সালের বিশ্বকাপে খেলার সম্ভাবনা নিয়ে হাসি-মজা করলেও তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, এখনো নিজেকে প্রতিদিন নতুন করে চ্যালেঞ্জ জানাতে চান।
মেসি বলেন, ‘আমি শারীরিকভাবে নিজেকে যতটা সম্ভব প্রস্তুত করেছি, যাতে সতীর্থদের সঙ্গে সমান তালে খেলতে পারি। এখন সামনে যা আসবে, তা উপভোগ করতে চাই। আমি এখনো প্রতিযোগিতা করতে ভালোবাসি। নিজেকে আরো উন্নত করার চেষ্টা কখনো বন্ধ করিনি। সব সময় আরো ভালো হওয়ার লক্ষ্য ছিল। মানসিক এবং শারীরিকভাবে ভালো থাকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা জানি টানা দু’বার বিশ্বকাপ জেতা কতটা কঠিন। কিন্তু আমাদের এভাবেই এগিয়ে যেতে হবে, দলের জন্য সব কিছু উজাড় করে দিতে হবে। তার পর দেখা যাবে ভবিষ্যৎ আমাদের কোথায় নিয়ে যায়।’