বিশ্বকাপের নক আউট পর্বে কোনো ম্যাচই সহজ নয়। যার প্রমাণ আমরা এরই মধ্যে পেয়েছিও।
জার্মানি ও নেদারল্যান্ডস বিদায় নিয়েছে। ইংল্যান্ড ও ব্রাজিলকে জিততে হয়েছে অনেক ঘাম ঝরিয়ে। এখানে গ্রুপ পর্বের হিসাব-নিকাশের খুব একটা মূল্য থাকে না। একটি ভুল, একটি অসাধারণ মুহূর্ত কিংবা একজন বিশেষ খেলোয়াড়ই বদলে দিতে পারেন পুরো ম্যাচের ভাগ্য।
তাই বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা যতই শক্তিশালী হোক, কেপ ভার্দের বিপক্ষে তাদের সতর্ক থাকতেই হবে।
মেসিই দলকে শেষ ১৬-তে নিয়ে যাবেন এই বিশ্বকাপে কেপ ভার্দে আমাকে সত্যিই মুগ্ধ করেছে। তারা হয়তো তারকাসমৃদ্ধ দল নয়, কিন্তু দারুণ সুসংগঠিত। নিজেদের সীমাবদ্ধতা যেমন জানে, তেমনি শক্তির জায়গাগুলোও সর্বোচ্চভাবে কাজে লাগাতে পারে।
সবচেয়ে বড় বিষয়, তারা কোনো প্রতিপক্ষকেই ভয় পায় না। স্পেন ও উরুগুয়ের মতো দলের বিপক্ষে যেভাবে লড়েছে, তাতেই প্রমাণিত হয়েছে তারা শুধু বিশ্বকাপে অংশ নিতে আসেনি, এসেছে নতুন গল্প লিখতে। তবে আর্জেন্টিনা পুরোপুরি ভিন্ন ধরনের প্রতিপক্ষ। এই দলের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু লিওনেল মেসি নন, বরং পুরো দলের বোঝাপড়া ও ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা। কখন আক্রমণের গতি বাড়াতে হবে, কখন বলের দখল ধরে রেখে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে ফেলতে হবে, আবার কখন ছন্দ বদলে হঠাৎ আঘাত হানতে হবে—এসব তারা অসাধারণ দক্ষতায় করতে পারে। নক আউট পর্বে এই পরিণত মানসিকতাই বড় পার্থক্য গড়ে দেয়।
স্বাভাবিকভাবেই নজর থাকবে মেসির দিকে। বয়স বাড়লেও তার ফুটবল মস্তিষ্কের তীক্ষ্ণতা একটুও কমেনি। তিনি হয়তো আগের মতো পুরো ম্যাচে দৌড়ে বেড়ান না, কিন্তু কখন কোথায় অবস্থান নিতে হবে, কোন পাসটি ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে কিংবা ঠিক কোন মুহূর্তে নিজেই গোলের সুযোগ তৈরি করবেন—এসব বিষয়ে এখনো বিশ্বের সেরাদের একজন। এমন একজন খেলোয়াড়কে পুরো ৯০ মিনিট নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রায় অসম্ভব। আমার ধারণা, কেপ ভার্দে শুরু থেকেই নিচু ব্লকে রক্ষণ সাজিয়ে খেলবে। তারা ম্যাচের গতি কমিয়ে আনতে চাইবে এবং যতটা সম্ভব আর্জেন্টিনাকে হতাশ করার চেষ্টা করবে। স্কোরলাইন যতক্ষণ সমতায় থাকবে, তাদের আত্মবিশ্বাসও তত বাড়বে। কিন্তু আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, মাত্র এক মুহূর্তের মনোযোগের ঘাটতিও ম্যাচের ফল বদলে দিতে পারে।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় পরীক্ষাই হবে ধৈর্য ধরে খেলা। অযথা তাড়াহুড়া না করে যদি তারা নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দ বজায় রাখতে পারে, তাহলে সুযোগ অবশ্যই তৈরি হবে। কারণ এই দলটি জানে কিভাবে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করতে হয় এবং কোন মুহূর্তে আঘাত হানতে হয়। আমি কেপ ভার্দেকে মোটেও অবমূল্যায়ন করছি না। আমার বিশ্বাস, তারা আর্জেন্টিনাকে কঠিন লড়াই ছুড়ে দেবে এবং ম্যাচের একটা বড় সময় পর্যন্ত চাপে রাখতেও সক্ষম হবে। কিন্তু নক আউট পর্বে অভিজ্ঞতা বড় ভূমিকা রাখে। সেই অভিজ্ঞতা, স্কোয়াডের গভীরতা এবং চাপের মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতায় আর্জেন্টিনা অনেকটাই এগিয়ে।
বিশ্বকাপের নক আউট পর্ব এমন এক মঞ্চ, যেখানে কিংবদন্তিরা নিজেদের নতুন করে প্রমাণ করেন। আমার বিশ্বাস, এই ম্যাচেও আর্জেন্টিনার ভাগ্য গড়ে দেওয়ার সবচেয়ে বড় কারিগর হবেন লিওনেল মেসি। তার সৃজনশীলতা, নেতৃত্ব এবং বড় ম্যাচে পার্থক্য গড়ে দেওয়ার সহজাত ক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত কেপ ভার্দের প্রতিরোধ ভেঙে আর্জেন্টিনাকে শেষ ষোলোর টিকিট এনে দেবে।