টাকায়াসু আর্টেরাইটিস বিরল হলেও এমন এক প্রদাহজনিত রোগ, যা মূলত দীর্ঘসময় ধরে শরীরের বড় রক্তনালী, বিশেষ করে মহাধমনী ও এর প্রধান শাখাগুলোকে নীরবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে থাকে। তাই একে ‘পালসলেস ডিজিজ’ও বলা হয়। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে এই রোগ শনাক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সাধারণত ১৫ থেকে ৪০ বছর বয়সী তরুণীদের মধ্যে টাকায়াসু আর্টেরাইটিস বেশি দেখা যায়। তবে পুরুষরাও ঝুঁকির বাইরে নয়। এটি তুলনামূলকভাবে বিরল হলেও এশিয়ায়, বিশেষ করে বাংলাদেশ ও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে প্রাদুর্ভাব বেশি লক্ষ্য করা যায়। রোগের শুরুতে সাধারণত অস্পষ্ট কিছু উপসর্গ দেখা যায়, যেমন—জ্বর, ক্লান্তি, ওজন কমে যাওয়া, পেশিতে ব্যথা ইত্যাদি। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রক্তনালীগুলো সরু হয়ে রক্তপ্রবাহ কমে যেতে পারে এবং মাথা ঘোরা, মাথাব্যথা, দৃষ্টিজনিত সমস্যা, বুকে ব্যথা বা হাত নাড়াতে অসুবিধা ইত্যাদি সমস্যা দেখা দিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে কব্জিতে নাড়ির স্পন্দন দুর্বল বা অনুপস্থিত থাকতে পারে। আর এই কারণে এই রোগকে ‘পালসলেস ডিজিজ’ বলা হয়।
টাকায়াসু আর্টেরাইটিসের নির্দিষ্ট ও সঠিক কারণ এখনো জানা যায়নি। তবে টাকায়াসু আর্টেরাইটিসকে একটি অটোইমিউন রোগ হিসেবে ধরা হয়, যেখানে শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলবশত রক্তনালীর দেয়ালে আক্রমণ করে। ফলস্বরূপ প্রদাহ ও শরীরে দাগ তৈরি হয়। বংশগত ও পরিবেশগত কারণেও এটি হয়ে থাকতে পারে।
প্রাথমিক উপসর্গগুলো অন্যান্য রোগের মতো হওয়ায় অনেকসময় সঠিকভাবে রোগ নির্ণয়ে দেরি হয়। চিকিৎসকরা শারীরিক পরীক্ষা, রক্ত পরীক্ষা এবং সিটি ও এমআর এঞ্জিওগ্রাফি’র মতো ইমেজিং পরীক্ষার মাধ্যমে রক্তনালীর সংকোচন বা অ্যানিউরিজম শনাক্ত করে চিকিৎসা ও পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এর প্রধান চিকিৎসা হলো কর্টিকোস্টেরয়েড, যা প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।
অনেক ক্ষেত্রে রোগ নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত ইমিউনোসাপ্রেসিভ ওষুধের প্রয়োজন হয়। যদি রক্তনালী গুরুতরভাবে সংকুচিত হয়ে যায়, তাহলে ভাস্কুলার সার্জারি বা স্টেন্ট বসানোর প্রয়োজন হতে পারে। সুস্থতার পরও রোগটি পুনরায় সক্রিয় হতে পারে, তাই নিয়মিত পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত জরুরি।
যদিও এটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ, তবে সঠিক চিকিৎসা ও নিয়মমাফিক চলাফেরা রোগীদের স্বাভাবিক জীবনযাপনে সাহায্য করতে পারে। দ্রুত রোগ নির্ণয়, নিয়মিত ফলো-আপ এবং লাইফস্টাইলে পরিবর্তন, যেমন; রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান পরিহার, সঠিক খ্যাদাভ্যাস ইত্যাদি স্ট্রোক বা হৃদযন্ত্রের জটিলতার মতো গুরুতর সমস্যা প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে।
টাকায়াসু আর্টেরাইটিস বিরল হলেও সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি কোন তরুণ/তরুণী অজানা কারণে অতিরিক্ত ক্লান্তি, নাড়ির স্পন্দন না পাওয়া বা দুই হাতে রক্তচাপের অস্বাভাবিক পার্থক্য অনুভব করেন, তাহলে দ্রুত অভিজ্ঞ রিউমাটোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সময়মতো শনাক্তকরণ ও সঠিক চিকিৎসাই পারে জীবন রক্ষা করতে।
লেখক :
কনসালট্যান্ট, রিউমাটোলজি,
এভারকেয়ার হসপিটাল, ঢাকা।





