গ্রামীণ এলাকায় মা ও শিশুস্বাস্থ্য সেবায় উল্লেখযোগ্য সাফল্যের প্রমাণ তুলে ধরে জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থায় কমিউনিটি প্যারামেডিকদের (সিপি) আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও অন্তর্ভুক্তির আহ্বান জানিয়েছেন সরকারের কর্মকর্তা, গবেষক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, দেশে দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি মোকাবিলায় ইতোমধ্যে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ১০ হাজারের বেশি কমিউনিটি প্যারামেডিক কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) রাজধানীর ফার্স হোটেলে সুইসকন্ট্যাক্ট বাংলাদেশের ‘আস্থা’ প্রকল্পের উদ্যোগে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এ আহ্বান জানানো হয়। অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করে ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ।
সভায় উপস্থাপিত ব্র্যাকের এক গবেষণায় দেখা যায়, গর্ভস্থ শিশুর হৃদস্পন্দন শনাক্তকরণে কমিউনিটি প্যারামেডিকদের সাফল্যের হার ৭৩ শতাংশ, যেখানে সাধারণ সেবাদাতাদের ক্ষেত্রে তা মাত্র ৩৬ শতাংশ। গর্ভধারণ পরীক্ষায় এ হার যথাক্রমে ৮১ ও ৪৬ শতাংশ, রক্ত পরীক্ষায় ৫৭ ও ৩৩ শতাংশ। এছাড়া জটিল রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে রেফার করার ক্ষেত্রে কমিউনিটি প্যারামেডিকদের সাফল্যের হার ৯৪ শতাংশ।
গবেষণায় আরো দেখা যায়, কমিউনিটি প্যারামেডিকদের কাছে আসা অর্ধেকের বেশি মানুষ আগে গ্রাম্য চিকিৎসক বা ওষুধের দোকানের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। বর্তমানে তারা প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছ থেকে সেবা নিচ্ছেন, যা এ খাতে মানুষের আস্থা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। এর ফলে চিকিৎসা ব্যয় কমছে এবং সময়মতো প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া সম্ভব হচ্ছে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে ‘আস্থা’ প্রকল্পের টিম লিডার আবদুল আওয়াল বলেন, ‘বাংলাদেশ গত ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে কমিউনিটি প্যারামেডিক তৈরিতে কাজ করছে। এখন সময় এসেছে তাদের সরকারি স্বীকৃতি দিয়ে একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর আওতায় আনার।’
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের (ডিজিএফপি) সহকারী পরিচালক (এমসিএইচ) মনজুর হোসাইন বলেন, ‘দেশে দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। এ ঘাটতি পূরণে কমিউনিটি প্যারামেডিকরা কার্যকর বিকল্প হতে পারেন। তাদের কাজের পরিধি আরও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।’
কমিউনিটি ক্লিনিক হেলথ সাপোর্ট ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ডা. আবু মুহাম্মদ জাকির হুসাইন বলেন, ‘গ্রামীণ জনগণের সঙ্গে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছেন কমিউনিটি প্যারামেডিকরা। তাদের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে আরও সরাসরি সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।’
ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের অধ্যাপক ডা. কাওসার আফসানা বলেন, ‘গবেষণায় প্রমাণ হয়েছে, যথাযথ প্রশিক্ষণ ও তদারকি নিশ্চিত করা গেলে কমিউনিটি প্যারামেডিকরা উচ্চমানের স্বাস্থ্যসেবা দিতে সক্ষম। সরকার নতুন করে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা করলে সেখানে বিদ্যমান ১০ হাজার প্রশিক্ষিত সিপিকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।’
আইসিডিডিআর,বির গবেষক ডা. সোহানা শফিক বলেন, ‘শুধু গ্রাম নয়, শহরাঞ্চলেও স্বাস্থ্যসেবার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তাই কমিউনিটি প্যারামেডিক মডেলটি শহরেও প্রয়োগ করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে ভাবা প্রয়োজন।’
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ নূর আলম সিদ্দিকী বলেন, ‘২০১৩ সালের কমিউনিটি প্যারামেডিক নীতিমালা সংস্কার, কারিকুলামের মানোন্নয়ন এবং প্রশিক্ষণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমের তদারকি জরুরি। এ বিষয়ে সুইসকন্ট্যাক্টের ‘আস্থা’ প্রকল্প ও বাংলাদেশ নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের (বিএনএমসি) সঙ্গে ভবিষ্যতে আরও কাজ করার সুযোগ রয়েছে।’
সমাপনী বক্তব্যে সুইসকন্ট্যাক্ট বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর হেলাল হুসাইন বলেন, ‘সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে নতুন মডেল খুঁজতে হবে না। আমাদের কাছে ইতোমধ্যে ১০ হাজারের বেশি প্রশিক্ষিত কমিউনিটি প্যারামেডিক রয়েছে। এখন প্রয়োজন তাদের কাজের স্থায়ী স্বীকৃতি ও কার্যকর সংযুক্তি।’
অনুষ্ঠানে সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্বাস্থ্যখাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী ও জনবান্ধব করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে সভার সমাপ্তি হয়।
উল্লেখ্য, ‘আস্থা’ প্রকল্পটি নোভারটিস, হ্যাপেল ফাউন্ডেশন, লাগুনা ফাউন্ডেশন এবং সুইস এজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কো-অপারেশনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে।






