<p>বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কারের ইতিহাসে কিছু সিদ্ধান্ত সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গৃহীত মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) প্রবর্তন ছিল তেমনই এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। সেই সময়ের অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান দেশের করব্যবস্থাকে আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার লক্ষ্যেই ভ্যাট চালু করেন। শুরুতে এই উদ্যোগের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মহল, বিশেষ করে কর ফাঁকিতে অভ্যস্ত কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও গণমাধ্যমের একটি অংশ থেকে তীব্র আপত্তি উঠেছিল। কিন্তু সময় প্রমাণ করেছে— সেই সিদ্ধান্ত দেশের রাজস্ব ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছে, করের আওতা বিস্তৃত করেছে এবং কর ফাঁকি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।</p> <p>আজ আবার বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক মোড়ে দাঁড়িয়ে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর প্রস্তাবিত উত্তরাধিকার কর (Inheritance Tax) নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি, তবে অর্থনীতির গতিশীলতা বাড়াতে এবং বৈষম্য কমাতে এটি একটি সম্ভাবনাময় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এই কর চালু হলে প্রথম বছরে প্রায় ১৩ হাজার থেকে ৪২ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত রাজস্ব অর্জন সম্ভব হতে পারে, যা দেশের অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিক গতি সঞ্চার করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পরবর্তী বছরগুলোতেও এই রাজস্ব প্রবাহ অব্যাহত থাকবে, যদিও হার কিছুটা কম হতে পারে।</p> <p>এই প্রস্তাবিত করের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো— এটি সাধারণ জনগণ, বিশেষ করে নিম্নবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে না। বরং এটি মূলত উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে তৈরি করা হচ্ছে, যেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অযৌক্তিকভাবে সম্পদের কেন্দ্রীকরণ কমানো যায়। দীর্ঘদিন ধরে যে বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে— ‘গরিব আরো গরিব, ধনী আরো ধনী’— এই প্রবণতা ভাঙার ক্ষেত্রে উত্তরাধিকার কর কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।</p> <p>বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে উত্তরাধিকার কর একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ও কার্যকর ব্যবস্থা। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্সসহ বহু পশ্চিমা দেশে এই কর বহু বছর ধরে চালু রয়েছে। এসব দেশে নাগরিকরা তুলনামূলকভাবে বেশি কর প্রদান করলেও এর বিপরীতে তারা উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, অবকাঠামো এবং সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা পেয়ে থাকেন। ফলে করব্যবস্থা সেখানে শুধু রাজস্ব সংগ্রহের মাধ্যম নয়, বরং সামাজিক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার একটি হাতিয়ার হিসেবেও কাজ করে।</p> <p>বাংলাদেশেও যদি এই কর সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে এটি শুধু রাজস্ব বৃদ্ধিই করবে না, বরং সামাজিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। বিশেষ করে বড় বড় সম্পদ ও উচ্চমূল্যের সম্পত্তির ওপর নজর দিয়ে কর আরোপ করলে এটি কার্যকরভাবে সম্পদের পুনর্বণ্টন নিশ্চিত করতে পারে।</p> <p>উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রেক্ষাপটে এটি একটি অগ্রগামী ও পথপ্রদর্শক পদক্ষেপ হতে পারে। যেমন ভ্যাট চালুর মাধ্যমে বাংলাদেশ একসময় কর সংস্কারে পথিকৃত ভূমিকা পালন করেছিল, তেমনি উত্তরাধিকার কর চালুর ক্ষেত্রেও দেশটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। এটি কেবল অর্থনৈতিক সংস্কার নয়, বরং একটি সামাজিক সংস্কার হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।</p> <p>তবে যেকোনো নতুন করব্যবস্থা চালুর ক্ষেত্রে জনসচেতনতা ও স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের আস্থা অর্জন করতে হলে সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যে, সংগৃহীত কর সঠিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং এর সুফল জনগণের কাছে পৌঁছাচ্ছে। যখন মানুষ দেখবে যে তাদের প্রদত্ত করের মাধ্যমে উন্নত সড়ক, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, তখন তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই কর প্রদানে আগ্রহী হবে।</p> <p>বাংলাদেশের সম্মানিত নাগরিকরা এরই মধ্যেই প্রমাণ করেছেন যে, তারা দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে প্রস্তুত। সঠিক নীতিমালা ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই সম্ভাবনাকে আরো বিস্তৃত করা সম্ভব। উত্তরাধিকার কর সেই পথেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।</p> <p>অতীতের সফলতা থেকে শিক্ষা নিয়ে, বর্তমানের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে এবং ভবিষ্যতের লক্ষ্য নির্ধারণ করে— বাংলাদেশ যদি এই ধরনের সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে, তবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সামাজিক ন্যায্যতার পথে দেশ আরো একধাপ এগিয়ে যাবে।</p> <p><em><strong>ড. মোহাম্মদ ফয়েজ উদ্দিন, এমবিই<br /> চেয়ারম্যান, নিউ হোপ গ্লোবাল<br /> আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠক, লেখক, রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষক<br /> বার্মিংহাম, যুক্তরাজ্য।</strong></em></p>