চলতি বছরের জুন মাসে সারাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় দলীয় কোন্দল ও অন্তর্কোন্দলে ৯ জন নিহত এবং ৩৪৬ জনের অধিক বিভিন্ন দলের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ আহত হয়েছেন। আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ ও হামলা, দলীয় অন্তঃকোন্দল ও চাঁদাবাজি কেন্দ্রিক অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটে।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি-এইচআরএসএস’।
প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং এইচআরএসএসের সংগৃহীত তথ্য ও ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্টের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের জুন মাসের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে ৫৮টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৯ জন এবং আহত হয়েছেন ৩৪৬ জন। জুন মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় হতাহতের সংখ্যা মে মাসের তুলনায় বেড়েছে। গত মে মাসে ‘রাজনৈতিক সহিংসতায়’ নিহত হয়েছেন ৫ জন এবং আহত হয়েছেন ২৮৯ জন।
রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় এ মাসে ৫৮টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ২১টি ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১৪৬ জন ও নিহত ৩ জন। ৮টি বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষে নিহত ২ জন ও আহত হয়েছেন ৩৬ জন, ১৪টি বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষে নিহত ২ জন এবং আহত ১১৫ জন। ৫টি বিএনপি-এনসিপি মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১৮ জন, ৫টি বিএনপি-অন্যান্য দলের মধ্যে সংঘর্ষে ৯ জন আহত হয়েছেন। বিভিন্ন দলের মধ্যে ৫টি ঘটনায় নিহত ২ জন ও আহত ২২ জন। নিহত ৯ জনের মধ্যে বিএনপির ৪ জন, আওয়ামী লীগের ২ জন, শিবিরের ১ জন, ইউপিডিএফের ১ জন ও ১ জন চরমপন্থী দলের সদস্য।
এর পাশাপাশি দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের ওপর হামলার অন্তত ১২টি ঘটনায় কমপক্ষে ২২ জন আহত এবং ৯ নিহত হয়েছেন। ৯ জনের মধ্যে আওয়ামী লীগের ৩ জন, বিএনপির ৫ জন ও চরমপন্থী দলের সদস্য ১ জন রয়েছেন। এ ছাড়া অন্তত ১৫ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এ ছাড়াও এ মাসে সারাদেশে আধিপত্য বিস্তার, দখলদারিত্ব, রাজনৈতিক সহিংসতা ও চাঁদাবাজি কেন্দ্রীক ১৫টি ঘটনায় অন্তত ৪৫টি বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠা, দলীয় কার্যালয়ে সংঘর্ষ, হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
রাজনৈতিক মামলার বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মাসে বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নামে ২২টির অধিক মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৬২৭ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরো প্রায় ১ হাজার ২৬২ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।
এ ছাড়া, একই মাসে রাজনৈতিক ও অন্যান্য মিলিয়ে মোট ২৫৭টি ঘটনায় অন্তত ৪ হাজার ৭৭৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারদের মধ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অন্তত ১ হাজার ৫৫৯ জন নেতাকর্মী, বিএনপির ৩৫ জন, জামায়াতে ইসলামীর ২ জন রয়েছেন।
মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মাসে গণপিটুনি ও মব সহিংসতায় সারাদেশ চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাক-বিতন্ডা, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননাসহ নানা অভিযোগে ৬৩টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৩১ জন এবং আহত হয়েছেন ৬৯ জন।
এ ছাড়া এ মাসে ট্রাফিকের দায়িত্ব পালন, অভিযানে, আসামি ছিনতাই ও স্থানীয় জনগণের মব সহিংসতায় সারাদেশে অন্তত ২৯টি ঘটনায় ৬৬ জন আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্য আহত ও হামলার শিকার হয়েছেন।
জুন মাসে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনার তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, জুন মাসে ৩৯টি ঘটনায় ৪৭ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এ সকল ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্ততপক্ষে ২৮ জন, লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন ৫ জন, হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন ৯ জন সাংবাদিক। ৫ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া ৭টি মামলায় ১২ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
সভা সমাবেশ ও মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মাসে ৬টি সভা ও সমাবেশ আয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাধা প্রদান করে, এতে ১৭ জন আহত ও ৩৬ জনকে আটক করা হয়েছে।
এ ছাড়া এ মাসে মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ মাসে অন্তত ১১টি ঘটনায় ১১ জনকে আটক ও ৭টি মামলা দায়ের হয়েছে। এসব মামলায় অন্তত ১২ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমান ও ক্ষমতাসীন দল বিএনপির অন্যান্য নেতাকর্মীদের সমালোচনায় ৬ জন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও কটূক্তির অভিযোগে ৫ জন এবং অন্যান্য ইস্যুতে ১ জনকে আটক করা হয়েছে।
অন্যদিকে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫-এর বিভিন্ন ধারার অধীনে পৃথক ৪টি মামলায় ৯ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া এসব ঘটনায় ৪ জনকে আটক করা হয়েছে।
বিচার বহির্ভূত হত্যা, থানা ও কারাগারে মৃত্যুর বিষয়ে সংস্থাটির পক্ষ থেকে উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, জুন মাসে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে, হেফাজতে ও নির্যাতনে কমপক্ষে ৩ জন নিহত হয়েছে। যাদের মধ্যে ২ জন কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে ও ১ জন ডিবি হেফাজতে নির্যাতনে নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর ধাওয়া খেয়ে গ্রেপ্তার এড়াতে পালাতে গিয়ে ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এ ছাড়া, এ মাসে সারাদেশে কারাগারে কমপক্ষে ৭ জন আসামি মারা গিয়েছেন। এর মধ্যে ৪ জন জন কয়েদি ও ৩ জন হাজতি। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের একজন, বিএনপির একজন ও ৫ জন জন্য সাধারণ কয়েদি মারা গেছেন।
সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনার উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ মাসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর ১২টি হামলার ঘটনায় ৭ জন আহত হয়েছে। এ ছাড়া ১২টি মন্দির, ১১টি প্রতিমা ও ৭টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এক নারী সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।
সীমান্তে হতাহত ও আটকের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে বলা হয়, জুন মাসে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ৫টি হামলার ঘটনায় ২ জন নিহত ও ২ জন আহত হয়েছে। ৪ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন এবং বিএসএফ কর্তৃক ১ জনকে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া, ৭ জনকে পুশইন করা হয়েছে এবং ৪ শতাধিক নারী, পুরুষ ও শিশুকে পুশইনের চেষ্টা করা হয়েছে।
অপরদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে পুঁতে রাখা স্থলমাইন বিস্ফোরণের পৃথক ৩টি ঘটনায় একজন রোহিঙ্গা যুবকসহ ৩ জন নিহত হয়েছে। এ ছাড়া ৩টি ঘটনায় ১২ জনকে আটক করেছেন আরাকান আর্মি।
শ্রমিক নির্যাতনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুন মাসে ৫৫টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১১ জন এবং আহত হয়েছেন ১৮৪ জন। এ ছাড়া অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং শ্রমিকদের সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের অভাবে দুর্ঘটনায় ৩৯ জন শ্রমিক তাদের কর্মক্ষেত্রে মারা গেছেন। এ ছাড়া বেতন ভাতার দাবিতে আন্দোলনের সময়ে ২৬ জন গার্মেন্টস শ্রমিককে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া এ মাসে দুইজন গৃহকর্মীর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে এবং একজন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
এ মাসে ৩৫২ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, জুনে মাসে ১০৬ জন নারী, শিশু ও কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৭৫ (৭১%) জন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী। ১৯ জন নারী ও কন্যা শিশু সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং ধর্ষণেরর পর ২ জন কন্যা শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। অন্যদিকে ৯৪ জন নারী ও কন্যা শিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, তন্মধ্যে শিশু ৪৯ জন। যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় নিহত ৪, আহত ৪, এবং আত্মহত্যা করেছেন ২ জন নারী। পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ৫৭ জন, আহত হয়েছেন ৪৮ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ৩৬ জন নারী। এ ছাড়া, অ্যাসিড নিক্ষেপের ঘটনায় আহত হয়েছেন ১ জন নারী।
অন্যদিকে, এটি উদ্বেগজনক যে, এ মাসে ২৯১ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন যাদের মধ্যে ৫৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ২৩৭ জন শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
সার্বিক বিষয়ে এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, এ মাসে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি একটি সংবেদনশীল ও পরিবর্তনশীল পর্যায় অতিক্রম করেছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা, জাতীয় সংসদকে ঘিরে বিতর্ক এবং জননিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে সার্বিক পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক রূপ ধারণ করেছে।
তিনি আরো বলেন, মাসজুড়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, গণপিটুনি ও মব সহিংসতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সাংবাদিক নির্যাতন, নারী ও শিশু নির্যাতন, সীমান্তে সহিংসতা, শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনার ধারাবাহিকতা রয়েছে। তবে এ মাসে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মতামত প্রকাশকে কেন্দ্র করে গ্রেফতার, হয়রানি ও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এসব বিষয় সমাধান করা না হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।
এসময় সরকারের প্রতি মানবাধিকার রক্ষায় আরো জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি সকল নাগরিক, গণমাধ্যমকর্মী, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতি এইচআরএসএসের পক্ষ থেকে অধিক সোচ্চার ও সক্রিয় ভূমিকা পালনের অনুরোধ জানান তিনি।