kalerkantho

মঙ্গলবার । ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৪ নভেম্বর ২০২০। ৮ রবিউস সানি ১৪৪২

গায়েবি মামলার সিন্ডিকেট

এস এম আজাদ   

২৬ অক্টোবর, ২০২০ ০২:৩৩ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



গায়েবি মামলার সিন্ডিকেট

রাজধানীর শাহজাহানপুরের শান্তিবাগের প্রয়াত ডাক্তার আনোয়ার উল্লাহর ছেলে একরামুল আহসান কাঞ্চনের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন জেলায় দায়ের হয়েছে ৪৮টি মামলা। হত্যা, ধর্ষণ, চুরি, ছিনতাই, মানবপাচার, বিস্ফোরক, দস্যতা এমনকি এসিড নিক্ষেপ মামলারও আসামি কাঞ্চন। জেল খেটেছেন কয়েকবার। এক মামলায় জামিনে মুক্ত হলেই গ্রেপ্তার হয়েছেন আরেক মামলায়। অথচ কাঞ্চনের নাম নেই পুলিশের অপরাধীর তালিকায়। এরই মধ্যে ৩৮টি মামলা আদালতে সাজানো প্রমাণিত হওয়ায় খালাসও পেয়েছেন তিনি।

এখনো ১০ মামলায় অভিযুক্ত আসামি কাঞ্চন জানান, রাজারবাগের কথিত পীর দিল্লুর রহমানের মুরিদ হয়ে তাঁর মা ও ভাইরা বাড়ি লিখে দিয়েছেন। তিনি নিজের অংশ লিখে না নেওয়ার কারণেই গত ১০ বছরে তাঁর নামে দেশের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক মামলা করেছে পীরের মুরিদ, ভক্ত ও নিজস্ব আইনজীবী সমন্বয়ে গঠিত সিন্ডিকেট। কাঞ্চনের অভিযোগ, মামলায় ফাঁসিয়ে আপস-মীমাংসার নামে চক্রটি শান্তিবাগের ১০৭ নম্বরের তাঁর একটি বাড়ি লিখে নিয়েছে। নারায়ণগঞ্জের পিলকুনীতে তাঁর কিছু জমি আর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান লিখে না দেওয়ায় এখনো নতুন মামলা দায়ের করা হচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু কাঞ্চন নন, দেড় শতাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক মামলা করেছে এই মামলাবাজ সিন্ডিকেট। রাজধানীর রাজারবাগের মোহাম্মদিয়া জামিয়া শরিফ বা সাইয়্যিদুল আইয়াদ শরিফের কথিত পীর দিল্লুর রহমান এ চক্রের হোতা। তাঁর জামাতা মফিজুল ইসলাম, সহযোগী আনিস হুজুর ওরফে লাদেন মৌলভি, ‘বাদী সরবরাহকারী’ শাকেরুল কবির ওরফে ইকবাল, মিডিয়া উপদেষ্টা মাহবুবুল আলম আরিফ, শাহ আলম, অনুসারী আকতার-ই-কামাল, তাঁর ছেলে ভুয়া বাদী হাবিবুল্লাহ সৌমিক, ভুয়া বাদী নাহিদা আক্তার রত্না ওরফে নাহিদা, সহযোগী কামাল মিয়াসহ মুরিদ ও ভক্তদের দিয়ে এসব মামলা করেছেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগের ভিত্তিতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন তদন্ত করে ভয়াবহ তথ্য পেয়েছে।

ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কক্সবাজার, যশোর, খুলনা, বান্দরবান, সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় হত্যা, ধর্ষণ, চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও মানবপাচারের মতো অভিযোগে সাজানো মামলায় ১৪৭ পরিবার এখন অসহায়। একজনের বিরুদ্ধে ৬০টি পর্যন্ত মামলা হয়েছে; যার নামে আগে কোনো অপরাধের তথ্য নেই পুলিশের খাতায়।

একই মামলায় আসামি হওয়ার সূত্রে পরিচিত হয়ে ভুক্তভোগীরা এক বছর ধরে মানবাধিকার কমিশন, পুলিশ সদর দপ্তরসহ বিভিন্ন স্থানে চক্রটির বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন। তাঁদের অভিযোগ তদন্তে বেরিয়ে এসেছে পাহাড়ি এলাকায় জায়গা দখল করে আস্তানা তৈরি করতে, অন্যের সম্পদ লিখে নিতে, টাকা আদায় করতে এবং ব্যক্তিগত বিরোধে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে মামলা করে পীরের সিন্ডিকেট। মামলাগুলোতে ঘুরেফিরে বাদী ও সাক্ষী একই নারী ও পুরুষ। পীর সিন্ডিকেটের চাপে কয়েকজন বাদী হয়েছেন বলে আদালতে স্বীকারও করেছেন। রাজারবাগ দরবার শরিফ থেকে পরিচালিত সংগঠন ‘উলামা আঞ্জুমান আল বাইয়্যিনাত’ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিষিদ্ধের জন্য বিবেচনাধীন কালো তালিকাভুক্ত আটটি জঙ্গি সংগঠনের একটি। এত কিছুর পরও প্রভাবশালী মুরিদ বা অনুসারী দিয়ে তদবির করে বহাল তবিয়তে আছে পীরের সিন্ডিকেট।

জানতে চাইলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নাসিমা বেগম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পেয়েছি। বহু মানুষ সাজানো মামলায় হয়রানির শিকার হয়েছেন। তদন্তের আলোকে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমরা সুপারিশ করেছি।’

পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি মিডিয়া) সোহেল রানা বলেন, ‘আমার জানা মতে চক্রটির সাজানো মামলায় হয়রানির শিকার অনেকে পুলিশের কাছেও অভিযোগ করেছেন। এখানে আসলে পুলিশের তেমন ভূমিকা নেই। এর পরও বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত হচ্ছে বলে জানি।’

তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে রাজারবাগ দরবার শরিফের মুখপাত্র আল্লামা মুহাম্মদ মাহবুব আলম বলেন, ‘এর সবই সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভুয়া। রাজারবাগ দরবার শরিফের পীর সাহেবের বিদ্বেষী কিছু লোক আছেন, তাঁরা এসব ঘটনা সাজিয়ে পীর সাহেবকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করছেন।’

চলতি বছরের ২৭ ও ২৮ জানুয়ারি মামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো কারওয়ান বাজারে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সামনে মানববন্ধন করে মামলাবাজ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। ২ ফেব্রুয়ারি কমিশনের সভায় অবৈতনিক সদস্য মিজানুর রহমান খানকে আহ্বায়ক এবং পরিচালক (অভিযোগ ও তদন্ত) আল-মাহমুদ ফায়জুল কবিরকে সদস্যসচিব করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি গত ২৪ আগস্ট সাত দফা সুপারিশসহ রিপোর্ট কমিশনে জমা দিয়েছে। সুপারিশগুলো হচ্ছে—এসব ভুয়া মামলার তদন্ত করে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৪ ধারা মতে প্রত্যাহারের ব্যবস্থা গ্রহণ, কথিত পীর দিল্লুর রহমান ও তাঁর অনুসারীদের আইনের আওতায় আনা, মিথ্যা মামলার বাদী ও সাক্ষীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে মামলা দায়ের, বিভিন্ন থানায় এসব ভুয়া মামলা দায়ের ও তদন্তে যেসব পুলিশ কর্মকর্তা সহায়তা করেছের তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ, কথিত পীরের সব সম্পদের হিসাব, আয়ের উৎস এবং রাজস্ব প্রদানের ব্যাপারে তদন্ত।

সাজানো মামলায় শাস্তির ব্যাপারে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেন, ‘মিথ্যা মামলা আদালতে প্রমাণিত হলে আদালত যদি মনে করেন তাহলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ক্রিমিনাল প্রসিডিউর বা নিয়মিত মামলা দায়ের করে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিতে পারেন। নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মিথ্যা মামলা দায়েরের কারণে বাদীর শাস্তির বিধান আছে। অন্য আইনে এমনটি নেই। নিয়মিত মামলা করার নির্দেশ আদালত দিতে পারেন, তবে এর নজির কম।’ তিনি আরো বলেন, ‘আরেকটি প্রতিকার হতে পারে—আসামি যাঁরা খালাস পেয়েছেন, তাঁরা যদি ক্ষতিপূরণের মামলা দায়ের করেন।’

দুজনের বিরুদ্ধে শতাধিক মামলা

ভুক্তভোগী একরামুল আহসান কাঞ্চন বলেন, ‘আমার মা ও ভাই কথিত এই পীরের মুরিদ হওয়ায় ২০০৯ সালে কৌশলে আমাদের শান্তিবাগের ৮০ শতাংশ জমি দরবারের নামে লিখে নেওয়া হয়। আমি ও আমার ছোট ভাই ডা. কামরুল আহসান বাদল তাদের কথামতো জমি লিখে না দেওয়ার পর থেকেই আমাদের বিরুদ্ধে মামলা হতে থাকে। আপস-মীমাংসার জন্য পীরের জামাতা মফিজুলের নামে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার ২০ শতাংশ জমি লিখে দিতে বাধ্য হই আমি। এর পরও আমার ‘আনোয়ার ডায়িং অ্যান্ড প্রিন্টিং মিল’ এবং শান্তিবাগের বাড়ির অংশ লিখে দিতে চাপ দেয় সিন্ডিকেট। একে একে ৩৮টি মামলা আদালতে ভুয়া প্রমাণিত হলে খালাস পেয়েছি আমি। সর্বশেষ গত ১ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জের আদালতে মিলের জমির মালিকানা দাবি করে আমার এবং তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন মফিজুল।’ কাঞ্চন বলেন, ‘জানি না এদের কি অসীম ক্ষমতা! এরা এখনো বহাল তবিয়তে।’

টিকাটুলীর বাসিন্দা প্রকৌশলী এম সাইফুল্লাহর বিরুদ্ধে এমন মামলা ৬০টি। সর্বশেষ কাফরুলের আলমগীর হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতে তাঁর যাবজ্জীবন সাজাও হয়ে গেছে। চিরকুমার সাইফুল্লাহ প্রায় এক বছর কারান্তরীণ। তাঁর বিরুদ্ধে একটি ধর্ষণ মামলার বাদী লাকি আক্তার আদালতে হলফনামা দিয়ে জানান, কথিত পীর দিল্লুর রহমান ও তাঁর সহযোগীদের কথায় তিনি মিথ্যা মামলা দায়ের করেন। শেষে ওই মামলায় খালাস পান সাইফুল্লাহ।

তাঁর আইনজীবী মহিউদ্দিন আহমেদ কাজল বলেন, ‘রিকশার গ্যারেজে বিরোধের জেরে আলমগীরকে হত্যার কথা আসামি কামরুল ১৬৪ ধারায় জবাবন্দিতে বলেছেন। একটি চক্র সাইফুল্লাহর নাম ঢুকিয়ে দেয়। তদন্তে ৩৫ বছরের একজন সাইফুলের নাম এলেও আমার মক্কেলের বয়স অনেক বেশি। আমরা আপিল করেছি।’ আইনজীবী কাজল আরো জানান, ওই হত্যা মামলায় ব্রাক্ষণবাড়িয়ার রেলস্টেশনের কুলির সর্দার কামিন শাহরও সাজা হয়েছে।

এ রকম মামলার শিকার রাষ্ট্রপতি স্বর্ণপদক পাওয়া মেরিন ইঞ্জিনিয়ার সোহেল চৌধুরী কালের কণ্ঠকে জানান, পীর সিন্ডিকেটের সদস্য কামাল মিয়ার মেয়ে মিথিলার সঙ্গে বিয়েবিচ্ছেদকে কেন্দ্র করে তাঁর ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে মানবপাচারসহ পাঁচটি মামলা হয়েছে। কিছু বোঝার আগেই ৯ মাস জেল খেটেছেন তিনি। মিথিলার প্রথম স্বামী ছিলেন কামিন শাহর ছেলে হিরো জুম্মন। আগে তাঁদের সঙ্গে বিরোধ হলে এই সাজানো মামলা দেওয়া হয়।

কক্সবাজারের রামু উপজেলার চাকমারপুলের রিজিয়া বেগম জানান, সাত সন্তান রেখে স্বামী মারা যাওয়ার বছর না পেরোতেই তাঁদের ভিটামাটি থেকে উচ্ছেদের ষড়যন্ত্র শুরু করে পীরের সিন্ডিকেট। মাদরাসায় চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ুয়া ১২ বছর বয়সী ছেলে আলাউদ্দিনের বিরুদ্ধে মানবপাচার মামলা দেওয়া হয়। গত বছরের ১২ অক্টোবর হাইকোর্ট থেকে জামিন পায় সে।

এই মামলাবাজি শুরু হয়েছে কথিত পীর দিল্লুর রহমানের পারিবারিক বিরোধ থেকেই। রাজারবাগে তাঁর তিন ভাই হাফিজুর রহমান হারুন, আনিসুর রহমান ফিরোজ ও জিল্লুর রহমান তরুণের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে ২২টি। জিল্লুর বলেন, ‘জমিজমা দখল ও পারিবারিক বিরোধে মামলাবাজ ভাই পীর দিল্লুর রহমান ও তাঁর মুরিদরা এগুলো করেছে।’

বাদী-সাক্ষীদের যোগসূত্র

নথিপত্র সূত্রে দেখা গেছে, বেশির ভাগ মামলার বাদী ও সাক্ষী ঘুরেফিরে ৩৭ জন। হামিদা বেগম নামের এক নারী আশুলিয়া, সাতক্ষীরা ও নারায়ণগঞ্জের মানবপাচার মামলার বাদী। তিনি সাক্ষী হয়েছেন ফতুল্লা থানার আরেকটি মামলায়। হামিদার প্রকৃত বাড়ি কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে। তাঁর স্বামী আহম্মদ আলী ও মেয়ে সোনিয়া আক্তারও সিন্ডিকেটে বাদী ও সাক্ষী সেজে কাজ করছেন। আহম্মদ আলী তিন মামলায় সাক্ষী, এক মামলার বাদী। সোনিয়া দুই মামলার ভিকটিম, আবার এক মামলায় সাক্ষী।

মিনু বেগম নামের একজন দুই মামলায় বাদী, শাহিদা আক্তার রত্না ওরফে নাহিদা আক্তার রত্না খুলনা, সাতক্ষীরা ও ব্রাক্ষণবাড়িয়ায় তিনটি মানবপাচার মামলা করেন। তাঁর মা সাবিনা ইয়াসমিনও দুই জেলায় দুটি মামলায় সাক্ষী হন। লাকী আক্তার নামের এক নারী ও তাঁর স্বামী নূরুদ্দিন ও মেয়ে নূরে জান্নাত নূপুর সাতক্ষীরায় একটি মামলার বাদী ও চট্টগ্রামে দুটি মামলার সাক্ষী হন। সিন্ডিকেটের আইনজীবী মুহাম্মদ মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী সুমনও একটি মামলার বাদী ও দুই মামলায় সাক্ষী হয়েছেন। সদস্য শাকেরুল কবির ওরফে ইকবাল বিভিন্ন স্থানে এক মামলায় বাদী ও তিন মামলায় সাক্ষী। কলারোয়ার নারী পাচারের সাজানো মামলা করতে গিয়ে ২০১৭ সালে তিনি উল্টো গ্রেপ্তার হন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা