সরকার অনুমোদিত চার বছর মেয়াদি ডেন্টাল ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেও প্রায় ২০ হাজার প্রশিক্ষিত জনবল বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) পেশাগত নিবন্ধন থেকে বঞ্চিত রয়েছেন বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ ডেন্টাল পরিষদ। দীর্ঘদিনের এ জটিলতার অবসান এবং পেশাগত স্বীকৃতির দাবিতে তিন দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে সংগঠনটি।
রবিবার (৫ জুলাই) জাতীয় প্রেস ক্লাবের মাওলানা আকরাম খাঁ হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ডেন্টাল পরিষদের মহাসচিব লায়ন মুহাম্মদ কামাল হোসেন এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, এটি শুধু একটি পেশাজীবী গোষ্ঠীর অধিকার বঞ্চনার বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্রের অর্থায়নে গড়ে ওঠা দক্ষ মানবসম্পদের যথাযথ ব্যবহার, নিরাপদ দন্তসেবা নিশ্চিতকরণ এবং জনস্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিচালিত চার বছর মেয়াদি ডেন্টাল ডিপ্লোমা কোর্স সম্পন্নকারী প্রায় ২০ হাজার ডিপ্লোমাধারী বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদের সনদ অর্জন করলেও এখন পর্যন্ত বিএমডিসির পেশাগত নিবন্ধন পাচ্ছেন না। ফলে সরকার অনুমোদিত শিক্ষা, স্বাস্থ্যশিক্ষা ও ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেও তারা পেশাগত স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
বাংলাদেশ ডেন্টাল পরিষদের মহাসচিব বলেন, স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের অধীন পরিচালিত ২৩টি সরকারি ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি (আইএইচটি) এবং ৫০টির বেশি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন মেডিকেল টেকনোলজি (ডেন্টাল) কোর্স সম্পন্নকারীদের সনদ প্রদান করে বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদ। প্রতি বছর আরও সহস্রাধিক শিক্ষার্থী এ পেশায় যুক্ত হলেও বিএমডিসির নিবন্ধনের অভাবে তাদের পেশাগত কার্যক্রম পরিচালনায় বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতা ও হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল আইন, ২০১০ অনুযায়ী সমপর্যায়ের স্বাস্থ্য পেশাজীবী মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্টরা বিএমডিসি থেকে পেশাগত নিবন্ধন ও সীমিত পরিসরে প্র্যাকটিসের সুযোগ ভোগ করছেন। এ ছাড়া ১৯৮০ সালের বিএমডিসি আইনের ১৫(৩) ধারার অধীনে প্রাতিষ্ঠানিক একাডেমিক যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও জীবিকা নির্বাহের তাগিদে একটি জনগোষ্ঠীকে নিবন্ধন দেওয়া হয়েছিল, যা এখনো নবায়ন করা হচ্ছে। অথচ সরকার অনুমোদিত চার বছর মেয়াদি স্বাস্থ্যশিক্ষা ও ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডেন্টাল ডিপ্লোমাধারীরা আজও পেশাগত নিবন্ধন থেকে বঞ্চিত।
সংগঠনের নেতারা বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ইতোমধ্যে তাদের স্কোপ অব প্র্যাকটিস (Scope of Practice) নির্ধারণ করেছে এবং সীমিত পরিসরে প্রাইভেট প্র্যাকটিসের সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ও মতামত দিয়েছে যে, প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এ সুযোগ প্রদানে কোনো আইনগত বাধা নেই। ফলে বিষয়টি এখন আর আইনগত নয়, বরং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয়।
সংগঠনের মহাসচিব দাবি করেন, ১৯৮৩ সালের ১ জুন বিএমডিসির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম কার্যনির্বাহী কমিটি ডেন্টাল ডিপ্লোমাধারীদের পেশাগত নিবন্ধনের বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেও চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়নি।
তিনি বলেন, দেশের গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এখনো নিরাপদ ও মানসম্মত প্রাথমিক দন্তসেবা থেকে বঞ্চিত। এ সুযোগে অনেক ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ ও ডিগ্রিবিহীন ব্যক্তিরা দন্তসেবা প্রদান করছেন, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। অন্যদিকে সরকার অনুমোদিত চার বছর মেয়াদি ডেন্টাল ডিপ্লোমাধারীরা আইনগত স্বীকৃতির অভাবে জনগণের সেবায় তাদের দক্ষতা পূর্ণাঙ্গভাবে কাজে লাগাতে পারছেন না।
সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল আইন, ২০১০-এর ১৫ ধারা ও পঞ্চম তফসিলে চার বছর মেয়াদি ডেন্টাল ডিপ্লোমা ডিগ্রিকে অন্তর্ভুক্ত করে আইনটির ৩৫ ধারা অনুযায়ী গেজেট বিজ্ঞপ্তি জারি এবং বিএমডিসি থেকে পেশাগত নিবন্ধন কার্যকর করতে হবে। একইসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক নির্ধারিত কাজের পরিধি অনুযায়ী সীমিত পরিসরে প্রাইভেট প্র্যাকটিসের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলন থেকে তিন দফা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে– আগামী ৭ জুলাই জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর বরাবর স্মারকলিপি প্রদান, ১১ জুলাই জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন এবং ১৫ জুলাই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে জাতীয় মহাসমাবেশ শেষে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে শান্তিপূর্ণ পদযাত্রা।
সংবাদ সম্মেলনে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে লায়ন মুহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, রাষ্ট্রের নিজস্ব অনুমোদিত শিক্ষাব্যবস্থায় গড়ে ওঠা দক্ষ জনশক্তির ন্যায্য পেশাগত স্বীকৃতি নিশ্চিত করে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতার দ্রুত, ন্যায়সংগত ও স্থায়ী সমাধান করা হোক।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ডেন্টাল পরিষদের অন্যান্য নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।