kalerkantho

শুক্রবার ।  ২৭ মে ২০২২ । ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ২৫ শাওয়াল ১৪৪

হৃদরোগ প্রতিরোধ সম্ভব, আপনার করণীয়

ডা. মাহবুবর রহমান, সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও সিসিইউ ইনচার্জ, ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতাল, ঢাকা

২৯ জানুয়ারি, ২০২২ ০৯:২৭ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



হৃদরোগ প্রতিরোধ সম্ভব, আপনার করণীয়

গত ২৩ মাসে করোনা মহামারিতে সারা বিশ্বে মারা গেছে প্রায় ৪৫ লাখ মানুষ। অন্যদিকে গত ২৩ মাসে হৃদরোগ ও রক্তনালির রোগে বিশ্বে মারা গেছে দুই কোটি ৮৯ লাখ মানুষ। কার্ডিওভাসকুলার রোগের নীরব এক মহামারি এটা। এসব পরিসংখ্যান দৃশ্যমান না হলেও এটা ঠিক যে এখন পর্যন্ত হৃদরোগ ও রক্তনালির জটিলতায় সবচেয়ে বেশি (সব মৃত্যুর ৩১ শতাংশ) মানুষ মারা যায়।

বিজ্ঞাপন

প্রতিবছর সারা বিশ্বে ৫২ কোটি মানুষ এই জটিলতায় ভুগছে। গত এক বছরে বাংলাদেশে এক লাখ ১৯ হাজার মৃত্যুর ৪৫ হাজারই মারা গেছে হৃদরোগ ও রক্তনালির জটিলতায়। সুতরাং একে গুরুত্ব দিতেই হবে।

৮০ শতাংশ প্রতিরোধ সম্ভব
এ কথা জোরের সঙ্গেই বলা যায়, ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে হৃদরোগসংক্রান্ত জটিলতা প্রতিরোধ সম্ভব। বাকি ২০ শতাংশ চিকিৎসাযোগ্য, তবে ব্যয়বহুল। কেউ হৃদরোগে আক্রান্ত হলে কর্মক্ষমতা, শরীরের উৎপাদনক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়। সুতরাং ওই প্রতিরোধযোগ্য ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে মনোযোগ দিতে হবে সবার আগে। এ জন্য কিছু করণীয় রয়েছে।

প্রথমেই নিন দৃঢ় সংকল্প
সবার আগে ঠাণ্ডা মাথায় ভাবুন, হৃদরোগকে প্রতিরোধ করতে চান কি না? যদি সত্যিই চান তাহলে মাইন্ডসেট পরিবর্তন করুন। দায়সারা গোছের সিদ্ধান্ত নিলে চলবে না। নিতে হবে দৃঢ় সংকল্প। সেটা আগামীকাল থেকে নয়, আজকে থেকেও নয়—এখন থেকে শুরু করতে হবে। যদি মনে করেন আপনি প্রস্তুত, তাহলে বলা যায় ৫০ শতাংশ কাজ হয়ে গেল। এবার বাকি ৩০ শতাংশ অর্জনের জন্য যা যা করতে হবে তা হলো :

ওজন কমান, ব্যায়াম করুন
শরীরে অতিরিক্ত ওজন থাকলে কমিয়ে ফেলুন। গুগল সার্চ করে জেনে নিন উচ্চতা হিসেবে দৈহিক আদর্শ ওজন কত হওয়া উচিত। উচ্চতা আর ওজনের অনুপাত করে Body Mass Index (BMI) বের করে নিন। গুগলে BMI Calculator লিখে সার্চ দিন।

মনে রাখবেন, মানুষের আদর্শ বিএমআই হলো ১৯ থেকে ২৪.৯। এর নিচে হলে কম ওজন আর ২৫ থেকে ৩০ পর্যন্ত স্থূলতা বা ওবেসিটি। ৩০-এর বেশি হলে তা মারাত্মক স্থূলতা। ওজন বাড়ানো কঠিন কাজ নয়। কোনো রোগ না থাকলে খাদ্য গ্রহণ বাড়ালেই দেহের ওজন বেড়ে যাবে। স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে ওজন কমানোটাই কঠিন কাজ।

ওজন কমানোর উপায় : ওজন কমানোর দুটি উপায় আছে। প্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো, শর্করা জাতীয় খাবার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এ জন্য ভাত, রুটি, আলু, চিনি, মিষ্টি, মিষ্টান্ন, চাল, গম দিয়ে তৈরি যাবতীয় খাবার কমিয়ে দিন। প্রত্যহ পরিমাণমতো চর্বি, পর্যাপ্ত মাছ, সাদা মাংস (মুরগি), কুসুমসহ একটি ডিম, ইচ্ছামতো শাক-সবজি, সালাদ, পরিমিত তাজা ফল এবং কমপক্ষে দুই লিটার পানি পান করুন। যদি ক্যালরি মেপে খেতে চান তাহলে প্রতিদিন ১০০০ কিলো ক্যালরির বেশি খাবার গ্রহণ করবেন না।

ওজন কমানোর দ্বিতীয় কিন্তু কম কার্যকর পদ্ধতি হলো, নিয়মিত ব্যায়াম করা। খোলা জায়গায় সপ্তাহে কমপক্ষে ৫ দিন ৩০ থেকে ৪০ মিনিট জোরে জোরে হাঁটুন, যাতে শরীরের ঘাম ঝরে পড়ে এবং হার্টিবিট ১২০ পর্যন্ত ওঠে। শুধু হাঁটাচলা বা ব্যায়ামে ওজন তেমন একটা না কমলেও তা হৃৎপিণ্ড ও রক্তনালিকে সতেজ রাখে, ব্লকমুক্ত রাখে, রক্তচাপ কমায়, ডায়াবেটিস কমায়, কোলেস্টেরল কমায়, শরীরের গঠন ঠিক রাখে, কর্মক্ষমতা বাড়ায়, ফুসফুসের কর্মক্ষমতা বাড়ায় এবং মনকে সতেজ রাখে।

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করুন
উচ্চ রক্তচাপ হলো নীরব ঘাতক। নীরব এ জন্য যে ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে এর কোনো উপসর্গই প্রকাশ পায় না বা কাউকে কষ্টও দেয় না। অনেক রোগী ২০০-১০০ মিমি রক্তচাপ নিয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। যেহেতু কোনো কষ্ট হচ্ছে না, তাই চিকিৎসকের শরণাপন্নও হচ্ছেন না তাঁরা। অন্য কোনো কারণে পরীক্ষা করতে গিয়ে ধরা পড়ে যে তিনি উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। এর পরও দেখা যায়, অনেকে সেটাকে তত গুরুত্বসহকারে নেন না। অনেকে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ শুরু করলে নিয়মিত সেবন করেন না। কারণ হাইপ্রেসারে তাঁর তো কোনো অসুবিধা হচ্ছে না!

মনে রাখতে হবে, উচ্চ রক্তচাপ ক্রমাগত বহাল থাকলে হার্ট, কিডনি, মস্তিষ্ক, চোখের রেটিনা, পায়ের রক্তনালিসহ সারা শরীরের ব্যাপক ক্ষতি করবে। যখন উপসর্গ দেখা দেবে তখন দেখা যাবে, ওসব অঙ্গ এরই মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেছে। তাই উপসর্গের অপেক্ষায় না থেকে উচ্চ রক্তচাপের সুচিকিৎসা নিন। ওষুধে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করুন। কিন্তু নিজে নিজে কখনো ওষুধ বন্ধ করবেন না।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করুন
বয়স ত্রিশ হলেই ডায়াবেটিস চেক করুন। বছরে অন্তত একবার হলেও চেক করুন। একটা ব্লাড স্যাম্পলে অনেক সময় প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায় না। তাই কমপক্ষে দুটি স্যাম্পল (যেমন নাশতার দুই ঘণ্টা পরের সুগার এবং তিন মাসের গড় সুগার জানতে (HbA1C) পরীক্ষা করুন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এই পরীক্ষাই যথেষ্ট। তবে যখন সন্দেহজনক বর্ডারলাইন রেজাল্ট আসবে তখন OGTT পরীক্ষাটাও করান। বছরে একবার Lipid profile, TSH, S. Creatinine, CBC পরীক্ষা করান।

ডায়াবেটিস হলে কী করবেন?
ডায়াবেটিস একটি মেটাবলিক কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ। অর্থ হলো এটি শুধু মেটাবলিক বা হরমোনাল সমস্যা নয়। এটি শরীরের সব রক্তনালিকে আক্রান্ত করে। হার্টের সঙ্গে এটি সরাসরি যুক্ত। এর গুরুত্ব তাই অনেক বেশি। ডায়াবেটিসের মাত্রার ওপর নির্ভর করে চিকিৎসার ধরন। তবে প্রথম ধাপ হলো পুষ্টি ও ব্যায়াম। এই পদ্ধতিতে সুগার নিয়ন্ত্রণ না হলে ওষুধের প্রয়োজন হয়। প্রথমে খাবার ট্যাবলেট, এরপর ইনসুলিন।

সুগার কত রাখবেন? খালি পেটে ৬ থেকে ৭ এবং খাবার দুই ঘণ্টা পর ৭ থেকে ৯। তবে কোনোভাবে ১০-এর ওপরে নয়। তিন মাসের গড় HbA1C অবশ্যই ৭-এর মধ্যে রাখার চেষ্টা করতে হবে।

ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য নয়
যেকোনো প্রকার তামাক, জর্দা, গুল, বিড়ি, সিগারেট অবিলম্বে বর্জন করুন। তামাক শুধু হৃদরোগ, স্ট্রোক সৃষ্টি করে না; নানা ধরনের ক্যান্সার, ব্রংকাইটিস ইত্যাদির কারণও সে। মনকে স্থির করুন। সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে এখন থেকেই এসব নেশাদ্রব্য ছেড়ে দিন। এর পাশাপাশি অ্যালকোহল বর্জন করুন। কেননা অ্যালকোহল রক্তচাপ বাড়ায়। চর্বি ট্রাইগ্লিসারাইড বৃদ্ধি করে হার্ট অ্যাটাক, লিভার সিরোসিস, প্যানক্রিয়াটাইটিসসহ নানা দুর্ঘটনা ঘটায়।

কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করুন
অনেকে আছেন, যাঁরা হাই কোলেস্টেরলের ওষুধ শুরু করে কিছুদিন পর নিজে নিজে বন্ধ করে দেন। এটি মারাত্মক একটি ভুল। হাই কোলেস্টেরল নিজেই ডায়াবেটিসের মতো একটি দীর্ঘস্থায়ী, সম্ভবত আজীবন সঙ্গী একটি সমস্যা। রক্তনালিতে ব্লক তৈরির মূল উপাদান হলো চর্বি। তাই সুগার কন্ট্রোল করার মতো চর্বিও সারা জীবন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

দুটি ওষুধ কখনো বন্ধ নয়
যাঁদের একবার হৃদরোগ, রক্তনালিতে ব্লক ধরা পড়েছে, হার্ট অ্যাটাক হয়েছে, ব্রেন স্ট্রোক করেছে—তাঁরা দুটি ওষুধ সারা জীবন খেয়ে যাবেন। একটি হলো কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ (statin), আর দ্বিতীয়টি হলো রক্ত পাতলা করার ওষুধ (যেমন Aspirin, clopidogrel)। শুধু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শক্রমে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে সাময়িককালের জন্য স্থগিত রাখা যেতে পারে।

ডায়াবেটিসে কোলেস্টেরল ওষুধ
যাঁদের একবার ডায়াবেটিস ধরা পড়েছে তাঁদের বয়স চল্লিশ বা বেশি হলে সারা জীবন কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ (statin) কমবেশি খেয়ে যেতে হবে। এমনকি রক্তে (lipid profile) কোলেস্টেরলের মাত্রা যাই থাকুক না কেন অনির্দিষ্টকালের মতো স্ট্যাটিন খেতে হবে।

মোটা দাগে এই হলো ৮০ শতাংশ প্রতিরোধের কথা।

সরাসরি চিকিৎসার অংশ ২০ শতাংশ
প্রতিরোধের পালা শেষ হলে বা আগেই আক্রান্ত হয়ে পড়লে যথাযথ চিকিৎসা তো শুরু করতে হবে। সেখানে ইসিজি, ইটিটি, ইকোকার্ডিওগ্রাম, এনজিওগ্রাম, রিং বা এনজিওপ্লাস্টি, ওপেনহার্ট বা বাইপাস সার্জারিসহ নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং চিকিৎসা পদ্ধতির বিষয় চলে আসবে।



সাতদিনের সেরা