kalerkantho

শুক্রবার । ২ আশ্বিন ১৪২৮। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১। ৯ সফর ১৪৪৩

বাংলাদেশের নারীর অধিকার এবং ক্ষমতায়ন

আয়েশা সিদ্দিকা শেলী   

২৮ জুলাই, ২০২১ ১৬:০৪ | পড়া যাবে ১৩ মিনিটে



বাংলাদেশের নারীর অধিকার এবং ক্ষমতায়ন

বাঙালি নারীর অধিকার আর মানবাধিকার পৃথিবীর অন্য সব নারী থেকে আলাদা নয়। তার পরও আর্থ-সামাজিক, ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা হলে দেখা যায় বিভিন্ন দেশের নারীদের সামগ্রিক সংকটের নাম নির্যাতন, শোষণ ও বঞ্চনা হলেও এগুলোর ফলিত প্রয়োগের ক্ষেত্রে দেশভেদে ভিন্নতা দেখা যায়। নারীর অর্থনৈতিক অধিকারের বিষয়টি এখন সর্বাগ্রে বিবেচনা করা হচ্ছে। নারী যেদিন থেকে তার অর্থনীতির চাবিটাকে পুরুষের হাতে তুলে দিয়েছে, সেদিন থেকেই শুরু হয়েছে তার শৃঙ্খল ভোগের ইতিহাস। নারীর অর্থনৈতিক অধিকারের কথা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে এসেছে। অর্থনৈতিক বিবেচনায় বাংলাদেশের নারীদের চার ভাগে শ্রেণিবিভাগ করা যায়। (১) উচ্চবিত্ত, (২) মধ্যবিত্ত, (৩ নিম্নমধ্যবিত্ত, (৪) নিম্নবিত্ত।

উপরোক্ত শ্রেণিবিভাগ থাকলেও সব শ্রেণির নারীদের শোষণের প্রক্রিয়া কিন্তু অভিন্ন। আজকে শ্রেণি, সমাজ, গ্রাম-শহর-নির্বিশেষে নারীর প্রতি অত্যাচার আর নির্যাতনের মাত্রা, ধরন আর তীব্রতা এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। ব্যক্তিগত অথবা পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দ্বন্দ্বের তীব্রতা এত বৃদ্ধি পেয়েছে যে, নারীর নিজের ঘরই হয়ে উঠেছে তার জন্য সবচেয়ে অনিরাপদ স্থান। আত্মীয়তা, প্রেম, বিবাহ কোনো কিছু দিয়েই তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, মুক্তবাজার অর্থনীতির অনিয়ন্ত্রিত প্রসার, সম্পদের বিতরণে বৈষম্য সব কিছু নারীকেই আঘাত করে সর্বপ্রথম। তাই নারী হয়ে ওঠে সামাজিক সহিংসতার সর্বপ্রথম টার্গেট।

বাংলাদেশের নারীরা কোনো সময়ই মসৃণপথ অতিক্রম করেনি। আজকাল বাংলাদেশের নারীদের জীবনে শুরু হয়েছে আরেক পারিবারিক দুর্যোগ বা অভিশাপ। বিয়ে শুভ না হওয়া, স্বামীর হাতে নিগৃহীত হওয়া, গালিগালাজ, অপমান, যত রকম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা যায় তা বাঙালি নারীরা অনেক আগে থেকেই ভোগ করে আসছে। অপমানিত, আর নির্যাতিত হতে প্রায় অভ্যস্ত নারীরা দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে যায় এক জীবনের কান্না শুধু সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য। সন্তানরা পরিবারের আবহে বড় হবে। নারী তো আর্থিকভাবেও স্বাবলম্বী নয়। তাই সংসার ধরে রাখার দায়িত্ব তো তারই, যতই অত্যাচার আর অবহেলা হোক না কেন। তা ছাড়া এই সমাজ আর রাষ্ট্র পুরুষের মতো তাকে স্বামীর অনুমতি সাপেক্ষে চারখানা বিবাহ করার স্বাধীনতা দেয়নি। তাই তাকে সবই সহ্য করতে হবে। এখন যোগ হয়েছে স্বামীদের অবাধ পরকীয়া। বাংলাদেশের উচ্চবিত্ত, নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে পরকীয়া সম্পর্ক এক মহামারির রূপ ধারণ করেছে। এই সমাজের মন্ত্রী, আমলা, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং তাদের পুত্ররাসহ সাধারণ পুরুষ- সবাই পরকীয়ায় মেতে উঠেছে। শুরু হয়েছে বাংলাদেশের মাঝবয়সী অর্থাৎ চল্লিশ-উত্তীর্ণ মহিলাদের জীবনে পারিবারিক সংকট। আর এই সংকট যে আগে ছিল না তা নয়, তবে আজকের এই অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগে এই পরকীয়ার প্রক্রিয়াটাও অনেক সহজসাধ্য হয়েছে। অনেকেই বলবেন, এই প্রক্রিয়ায় তো মেয়েরাও জড়িত। নারীর ক্ষতি বা সর্বনাশের জন্য নারীরাই দায়ী। তা কিন্তু নয়, এখানেও বিষয়টা অর্থনৈতিক সমস্যার অন্তর্ভুক্ত। নারীর অর্থনৈতিক সংকটের আবর্তের সঙ্গে এটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

বাংলাদেশের অনেক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্তের বিত্ত-বৈভব বেড়েছে। কিছু মানুষ অবৈধ টাকার পাহাড় গড়ে তুলেছে। অবৈধ কালো টাকার বিনিময়ে নারীদেরও কেনা-বেচার সামগ্রী করে ফেলেছে। স্ত্রীকে সন্তান-সংসার নামক চাকায় বেঁধে রেখেছে খাওয়া পরার বিনিময়ে। সারা দিন গৃহকর্ম আর সন্তান লালন-পালন করা বিপর্যস্ত নারীর গৃহ শ্রমের মূল্যায়ন পরিবার কিংবা
রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতে কখনো সম্পৃক্ত করা হয় না। এই মনোসামাজিক জটিলতা এই সামাজিক ব্যাধির কবলে আমরা সবাই। আমাদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজনেরা বিধ্বস্ত-বিপর্যস্ত; কিন্তু তার পরও আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুলি না আমাদের সম্মান হারানোর ভয়ে, মাথার ওপরের ছাদটুকু হারানোর ভয়ে। বাংলাদেশের নারীদের এই ফিরিস্তি সহজে শেষ হবার নয়। অগণিত নারী- যারা ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, কর্মজীবন সব ক্ষেত্রেই আজ আক্রান্ত পুরুষতন্ত্রের শোষণের অবকাঠামোয়। কিন্তু নারীরা জানে না এর থেকে উত্তরণের উপায়। জানে না সঠিকভাবে প্রতিবাদ করার প্রক্রিয়া কিংবা ভাষা।

নারীর অর্থনৈতিক অধিকারের বিষয়টি বিভিন্ন সময়ের প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে আলোচ্য বিষয়। ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসের সেই ঘটনা, যেখানে ১৮৫৭ সালে নিউ ইয়র্কের সুচ কারখানায় সমান শ্রমের জন্য সমান মজুরি আর নির্দিষ্ট কর্মসময় দাবি করে যারা আন্দোলনে নেমেছিল তারা সমাজের নিম্নবিত্ত শ্রমজীবী নারী। কোনো উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্ত নারী সেদিন প্রতিবাদ করেনি। সেই
প্রতিবাদ তিলে তিলে নারীর শ্রমের চেতনা ও মূল্যায়নে এমন প্রভাব ফেলেছিল যে ১৯১০ সালের ৮ মার্চকে ঘোষণা করা হয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস। ৮ মার্চ নানা পরিক্রমায় আজ আর শুধু নারী শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার চিহ্ন হিসেবে নয়, বরং বিশ্বব্যাপী নারী মুক্তির, নারী স্বাধীনতার, নারীর সমানাধিকারের স্বীকৃতির পরিচয় ধারণ করে থাকে। এই দিবসে যার নাম না বললেই নয় সে হচ্ছে দূরদর্শী নারীনেত্রী ক্লারা জেটকিন, যার উদ্যোগে এটি বাস্তবে পরিণত হয়েছিল। নারীরা আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হওয়ার ভিত্তি পেয়েছিল। বিশ্ব নারী দিবসে তাই শ্রমজীবী নারীদের মুখগুলো উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। এত প্রাচুর্যের, এত সমৃদ্বির এত উন্নয়নের পৃথিবীতে দিন-রাত্রি ঘাম ঝরানো অভাবক্লিষ্ঠ; নিপীড়িত নারীদের কারণেই নারীরা তাদের অধিকারের বিষয়ে সচেতন হয়েছে। যদিও বাস্তবায়নের সুযোগ পেয়েছে খুব কম।

বিখ্যাত নারীবাদী লেখিকা মার্গারিটা তার “Whose Human Rights” গ্রন্থে লিখেছেন “Reflects first of all the extent to which women were conceived of as non-persons...”  অর্থাৎ নারীর অধিকার এর সংগ্রামগুলো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। মূলত এ কারণে যে প্রায় প্রতিটি আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নারীর যে রূপকে প্রতিবিম্বিত করা হয়, তাতেই প্রতীয়মান হয় যে নারী কোনো ব্যক্তি নয়- সে এমন একজন, যার ব্যক্তিপরিচয়ে যাকে অস্বীকার করা হয়। বাংলাদেশের নারীদেরও চলার পথ সংগ্রামমুখর। বাংলাদেশের সংবিধানে নারীদের সম-অধিকার নিশ্চিত করলেও ব্যক্তিগত জীবনে নারীরা আইনগত বৈষম্যের মধ্যে বাস করতে বাধ্য হয়। সব ধরনের আইনই নারীকে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করতে বাধ্য করে। জীবিকার তাগিদে কন্যাশিশু, কিশোরী, তরুণী ও নারীদের কর্মসংস্থান বেড়েছে। নারীরা এখন বিদেশেও যাচ্ছে- যার প্রতিফলন আমরা শ্রমবাজারে দেখতে পাই। পোশাকশিল্পে নারী শ্রমিকের শ্রম ৮৫%, যা ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হলেও পোশাকশিল্পের মালিকদের শ্রম শোষণের প্রক্রিয়ার বলি হচ্ছে তারা। নারী শ্রমিককে কম বেতন দিয়ে অধিক মুনাফা অর্জন করে বিদেশে টাকা পাচার করা হচ্ছে অবিরাম, যা পত্রপত্রিকায় নানাভাবে উঠে আসে। বলা হয়ে থাকে, বাংলাদেশের নারীরা অনেক এগিয়ে গেছে। প্রতিবেশী ভারত কিংবা পাকিস্তানের নারীদের চেয়েও আমাদের অধিকার সচেতনতা বেশি। কিন্তু এটিও প্রশ্নসাপেক্ষ। আমাদের শিক্ষিত সফল নারীদের অধিকাংশেরই অর্জনগুলো পুরুষ সহায়ক কিংবা পুরুষের দয়ায় প্রাপ্ত। বর্তমানে অধিকাংশ সফল নারীরাই বাবা কিংবা স্বামীর ওপর
নির্ভর করে তথাকথিত সফল হিসেবে বিবেচিত। আমরা সবাই জানি, তারা কেউ কেউ সফল লম্পট ব্যবসায়ীদের কিংবা আমলাদের অথবা রাজনীতিবিদদের স্ত্রী যেসব পুরুষের কাছে সব নারী এবং নারী শ্রমিকরা যৌন নির্যাতনের শিকার, এমনকি তার বাসার কাজের মেয়েটাও তাদের যৌন লালসার শিকার হয়, প্রতিনিয়ত। স্ত্রীরা সব জানে- জেনে-বুঝে চুপ করে থাকে। সফল উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য, বাহবা পাবার জন্য কিংবা সফল নারী হওয়ার জন্য। রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ যতই উন্নতি করুক না কেন, প্রতিটি নারীর জীবনের অধস্তনতা, অধিকারহীনতার শৃঙ্খলগুলো আজও ভাঙা হয়নি। বাংলাদেশের নারীবাদী সংগঠনগুলোকেও কখনো এককভাবে সোচ্চার দেখা যায়নি। তারা হয়তো কোনো রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করে কিংবা কোনো সংগঠনের স্বার্থে কাজ করে। গৃহস্থালি কাজের সম্পূর্ণ দায়দায়িত্ব পালন করে কারো কারো জন্য পেশাগত দক্ষতা অর্জন ও প্রদর্শন সম্ভব নয়। সমাজে, কর্মস্থলে, শিক্ষাক্ষেত্রে অবাধে চলাফেরার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ও শঙ্কা নারীদের সার্বক্ষণিকভাবে বিচলিত করে রাখে। ভীতসন্ত্রস্ত এই নারীজাতির মুক্তি কিভাবে মিলবে। তার কোনো হিসাব মেলানো যায় না।

আবারও উল্লেখ করা প্রয়োজন যে পুরুষের পরকীয়া আর রক্ষিতা রাখার বিষয়টি পূর্বেও ছিল এবং এখনো বিদ্যমান। বর্তমানে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে বিষয়টি ভিন্নমাত্রা নিয়েছে। এটি একটি মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি হিসেবে ব্যাপ্তি লাভ করেছে। এই সামাজিক মারণব্যাধি থেকে নারী-পুরুষ সবাইকেই বেরিয়ে আসতে হবে। কারণ রাষ্ট্র যদি একটি বৃহৎ ইউনিট হয়, প্রতিটি পরিবার তার ক্ষুদ্র ইউনিট। এই ক্ষুদ্র ইউনিটের বাঁধন ভেঙে গেলে এটি রাষ্ট্রব্যবস্থাকেই আঘাত করবে। পাশ্চাত্যের মতো আমাদের দেশের রাষ্ট্র শিশুদের দায়দায়িত্ব নেয়নি। শিশুর সব দায়িত্ব পরিবারকেই নিতে হয়। তাই পরিবার হচ্ছে প্রতিটি শিশুর নিরাপদ আশ্রয়স্থল। এই আশ্রয়স্থল বিপর্যস্ত হলে বাংলাদেশে কোনো ভবিষ্যৎ সুনাগরিক তৈরি হবে না। এ বিষয়ে গণসচেতনতা ও গণজাগরণ তৈরি করা জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ আর্থিক স্বাধীনতার কারণে পুরুষরা কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, ক্ষতিগ্রস্ত হয় নারীরাই। বাংলাদেশের বিবাহ আইন নারীর জন্য শুভংকরের ফাঁকিরূপে একটি ধর্মীয় সামাজিক দাসখত। এর ফলে বাঙালি নারী মূলত কিছুই পায় না। উন্নত দেশের মতো বাংলাদেশের নারীদের জন্য বিবাহবিচ্ছেদ, সম্পদের অধিকার, সন্তানের অধিকার থাকতে হবে। এ ছাড়া  পারিবারিক আইন অর্থাৎ ছেলে-মেয়ে, বাবা-মার সম্পত্তিতে সমানাধিকার থাকতে হবে। তাহলে নারীরা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হবে। অর্থাৎ আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হলেই বাঙালি নারী মাথা উচুঁ করে দাঁড়াতে পারবে।

অত্যাচার-অপমান তাদের- অর্থাৎ নারীদের জীবনের নিত্যসঙ্গী হলেও তারা- অর্থাৎ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লুকিয়ে রাখতেই অভ্যস্ত। কারণ উচ্চবিত্ত আর মধ্যবিত্ত নারীরা তাদের মিসেস অমুক, মিসেস তমুক ইত্যাদি উপাধি হারাবে, সেই সাথে বিলাসবহুল ভোগবাদী জীবনও পাবে না। তাদেরকেও দাঁড়াতে হবে শ্রমজীবী নারীদের কাতারে, যারা নিজের নামেই নিজেদের পরিচয় দিয়ে থাকে। শ্রমজীবী নারীদের কাতারে দাঁড়াতে হবে, যা এসব লম্পট পুরুষের সুবিধাভোগী নারীদের সংকীর্ণ স্বার্থে আঘাত হানে। তাই তাদের সমস্যাগুলো সমাজে কখনো উচ্চৈঃস্বরে উচ্চারিত হয় না। পারিবারিক পরিমণ্ডলেই সীমাবদ্ধ থাকে কিংবা অনেক সময় এটি কখনো বিস্ফোরিত হয়, কিন্তু কোনো আন্দোলনে রূপ নেয় না। তাই সব শ্রেণির নারীর হীন-অবস্থার জন্য নারীকেই দায়ী করা হয়। তারা যে এক তীব্র অন্ধকারের মধ্যে আছে সেটি বুঝবার ক্ষমতাও তারা হারিয়ে ফেলেছে। নিজের সম্মান, অধিকার হারিয়ে তারা ক্রীতদাসের চেয়ে নিম্নমানের জীবনযাপন করে। অত্যন্ত অপমানকর জীবনযাপন করে, তাই তারা বুঝতে পারে না তাদের মানবজন্মের সার্থকতা।

আমাদের নারীরা যারা শুধু গৃহকেন্দ্রিক কাজকর্ম করে; যার কোনো উপার্জনগত মূল্যমান কখনোই স্বীকৃত নয়, তাতে নিজেকে আবদ্ধ না করে উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত হতে হবে। তা না হলে কখনোই “নারীর অধিকার মানবাধিকার” হিসেবে স্বীকৃত হবে না। একজন নারী যেন শুধু নারী বলে পরনির্ভরশীল জীবনযাপনে বাধ্য না হয়, সে জন্য পারিবারিক আইনে সমঅধিকার আসতে হবে। ব্যক্তিগত জীবনে অসম অধিকার ও অধস্তন মর্যাদায় আটকিয়ে রেখে নারীকে কখনোই একজন ব্যক্তির বা নাগরিকের পূর্ণ মর্যাদা দেওয়া যায় না। পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ আইন ও সচেতনতা বৃদ্ধি এবং এই আলোকে আইন-কানুন বিধিমালা তৈরি জরুরি হয়ে পড়েছে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সব নারীর অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। বিত্তশালী নারীদের ভোগবিলাসের জীবন ত্যাগ করে মর্যাদাপূর্ণ স্বাধীন জীবনযাপনে এগিয়ে আসতে হবে এবং সুবিধাবঞ্চিত নারীদের সহায়তা করতে হবে।
আরেকটি বিষয় “নারী” নারী বলেই যখন তার কিছু কিছু অধিকারের স্বীকৃতি থাকে না সেখানেও মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটে। অর্থাৎ কোনো একটা কিছুর কারণে কারো অধিকার খর্ব করা হলে বলা হয় সেটিও মানবাধিকার লঙ্ঘন। কিন্তু যখন নারীকে বলা হয় তুমি নারী বলে সমান উত্তরাধিকার পাবে না, কিংবা তোমার নিজের ইচ্ছামতো স্বামীকে তালাক দিতে পারবে না; কিংবা তোমাকে এই অধিকারটা দেওয়া হবে না। কারণ তুমি নারী, সেগুলো তো মানবাধিকার লঙ্ঘনের পর্যায়েই পড়ে। বাংলাদেশের নারীর জীবনে এই অধিকারগুলি স্বীকৃত নয়, তাই নারীরা বৈষম্যের শিকার হন, যৌন নির্যাতিত হয়ে বিচার চাইতে গেলে নানা ধরনের বাধার সম্মুখীন হতে হয়। যা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। যতক্ষণ পর্যন্ত সম্পদে নারীর সমঅধিকার, সমমর্যাদা বাস্তবিক অর্থে স্বীকৃত হবে না, এবং সব ক্ষেত্রে সমমর্যাদা বাস্তবিক অর্থে বাস্তবায়ন করা হবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত বাংলাদেশের নারীদের কোনো মানবাধিকার আছে বলে
মনে করা যায় না।

নারীর ক্ষমতায়ন শুধু নারীমুক্তি আন্দোলনের পরিভাষা নয়। এটি ছাড়া নারীর অধিকার মূল্যহীন। নারীর অধিকার থাকাই যথেষ্ট নয়, সেটি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে নারীর নিজের জন্য। নারীর এককভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার লাভের জন্য নারীর অধিকারকে মানবাধিকারে উন্নীত করার জন্য।

সেই যে ১৮৫৭ সালে সমান কাজের সমান মজুরির দাবিতে বিপ্লব ঘটেছিল, এখনো নারীদের সে জন্য আন্দোলন করতে হবে। নারী অধিকার ও মর্যাদার যে মাহাত্ম্য এবং বঞ্চনা ও বৈষম্যের যে দুঃখ ও অপমান, সেই অভিজ্ঞতার আলোকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। যদিও এখনো প্রতিক্রিয়াশীল মৌলবাদী ও জঙ্গিবাদীদের প্রভাবে পরিবার, সমাজে, রাষ্ট্রে নারীর সম-অধিকার ও সমান তালে চলা গুরুতর চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। আজও নারী নির্যাতনের ব্যাপকতা বাংলাদেশে এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। এমতাবস্থায় সব পর্যায়ের নারীদেরই এগিয়ে আসতে হবে। ইতিহাসের প্রক্রিয়া কখনো কারো মুখ চেয়ে থাকে না। ভীরুর হাতে কখনোই ভুবনের ভার ন্যস্ত হতে পারে না। সব দীনতা, ভীরুতা ও হীনতার ঊর্ধ্বে যে নারী, সেই নারীরাই এগিয়ে নেবে নারীর অগ্রযাত্রাকে। প্রতিটি নারীর হৃদয়ে জাগিয়ে দেবে মুক্তির চেতনা। নারীকে দেখে সবাই শিখবে, বুঝবে মনুষ্যত্বকে কিভাবে সম্মান করতে হয়, মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হয়। যে সব নারী নিজেদের শক্তি, সাহস, বুদ্ধি, বিবেচনা দেখাবার সুযোগ পেয়েছে তারা যেন তাদের ক্ষমতায় অন্য নারীর জীবন থেকে অন্ধকার দূর করার ব্রত নেয়। হাতে হাত ধরে এগিয়ে যেতে হবে নারীকেই। কারণ এ যুগে কোনো রাম মোহন, রবীন্দ্রনাথ কিংবা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নাই, যারা নারীকে অন্ধকার জগৎ থেকে মুক্ত করবে, হাত ধরে এগিয়ে নেবে, পথ দেখাবে।
নারীর পথ নারীকেই চিনে নিতে হবে। প্রতিটি বাঙালি কন্যাশিশু জন্মগ্রহণ করুক বেগম রোকেয়ার প্রত্যয়, স্বপ্ন ও কর্মের প্রেরণায়; যিনি উজ্জীবিত করে গেছেন মুক্তিকামী নারীদের, মানুষদের। প্রতিটি নারী তার নিজ পরিচয়ে, নিজ শক্তিতে, নিজ অধিকারে আর মর্যাদার মাঝে খুঁজে পাবে স্বাধীন মানুষ হিসেবে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে জীবনযাপনের সুযোগ। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পথচলা সহজ ও সাবলীল হোক। স্মরণ করি বেগম রোকেয়ার সেই মহান বাণী “ভগ্নীগণ বুক ঠুকিয়া বল আমরাও মানুষ”, “কন্যাগুলিকে শিক্ষিত করিয়া ছাড়িয়া দাও নিজের ভাত কাপড় নিজে জোগাড় করিবে।”

প্রতিটি নারীর ক্ষমতায়ন হোক, নারীর অধিকার মানবাধিকারের স্বীকৃতি পাক।

অনেক প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির বাংলাদেশের নারীরা একদিন পৌঁছবে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নের কাছে। প্রতিটি নারী নিজ পরিচয়ে, নিজ শক্তিতে, নিজ অধিকারে আর মর্যাদায় খুঁজে পাবে স্বাধীন নাগরিক হিসেবে মনুষ্য জীবনযাপনের পূর্ণ সুযোগ। জয় হোক নারীর সমানাধিকারের, মানবাধিকারের আর স্বাধীনতার, যার সাথে মিশে আছে প্রকৃত ক্ষমতায়ন।। নারী হয়ে উঠুক অধিকার সচেতন, আসুক নারীর প্রকৃত মুক্তি।

(লেখক : অতিরিক্ত কর কমিশনার ও প্রধান উপদেষ্টা দি ব্লু স্কাই চ্যারিট্যাবল ফাউন্ডেশন)



সাতদিনের সেরা