kalerkantho

বুধবার । ১৫ আশ্বিন ১৪২৭ । ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১২ সফর ১৪৪২

করোনার টিকার আশা ও হার্ড ইমিউনিটি

ডা. উৎপল কুমার চন্দ   

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ১২:৫১ | পড়া যাবে ১৪ মিনিটে



করোনার টিকার আশা ও হার্ড ইমিউনিটি

পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষই তাদের জীবদ্দশায় কোনো না কোনো সময় করোনাভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। অনেকে আঁতকে উঠতে পারে। তবে ভয়ের কোনো কারণ নেই। কেননা করোনাভাইরাস মানে শুধু এখনকার কভিড-১৯ নয়। এর আরো প্রায় এক শ ভাই-বোন আছে। করোনা পরিবারের সদস্যরা বেশির ভাগই প্রাণীদের বিশেষ করে বাদুড়, মুরগি, উট এবং বিড়াল জাতীয় প্রাণীকে আক্রান্ত করে। তবে মাঝে তারা প্রাণী থেকে মানুষে আবার মানুষ থেকে প্রাণীতে প্রবাহিত হয়। সাত ধরনের করোনাভাইরাস মানুষকে আক্রান্ত করতে পারে বলে এখন পর্যন্ত জানা গেছে।

১৯৩০ সালে মুরগির শরীরে প্রথম করোনার উপস্থিতি পাওয়া যায়। ১৯৬০ সালে মানুষের শরীরে প্রথম করোনার শক্ত উপস্থিতি আবিষ্কৃত হয়। তার পর থেকে মানুষের শরীরে করোনার উপস্থিতির আর প্রমাণ পাওয়া যায়নি। 

প্রথম বিপত্তি ঘটে ২০০২ সালে, যখন মারাত্মক সার্স করোনাভাইরাস চীনের গুয়ানডং প্রদেশে মানুষের শরীরে নিউমোনিয়া নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। নভেম্বর ২০০২ থেকে জুলাই ২০০৩ পর্যন্ত এই ভাইরাস ছাব্বিশটি দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং আট হাজার ৪৩৯ জনকে আক্রান্ত করে। তাদের মধ্যে ৮১২ জন মারা যায়। ফলে এই ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত মানুষের মৃত্যুহার ছিল ৯.৬ শতাংশ। অর্থাত্ প্রতি ১০০ জনে প্রায় ১০ মারা যেত। এরপর প্রায় এক যুগ আর করোনাভাইরাসের কোনো দেখা মেলেনি। ২০১২ সালে মার্স নামক একটি করোনাভাইরাসের আবির্ভাব ঘটে। সাতাশটি দেশে ছড়িয়ে মার্স করোনাভাইরাস দুই হাজার ৫১৯ জনকে আক্রান্ত করে এবং তাদের মধ্যে ৮৬৬ জন মৃত্যুবরণ করে। মৃত্যুহার ছিল ৩৪.৩ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি তিনজনে একজন মারা গেছে। 

নভেম্বর ২০১৯-এ সার্স করোনাভাইরাস-২ (নভেল করোনাভাইরাস) পৃথিবীর মূর্তিমান আতঙ্ক হিসেবে দেখা দিয়েছে। যে রোগকে আমরা কভিড-১৯ রোগ বলছি। নভেল করোনাভাইরাস, সার্স ও মার্স করোনাভাইরাসের মতোই এক ধরনের রেসপিরেটরি ভাইরাস। জ্বর, সর্দি, কাশিসহ ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটায়। প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে এই কভিড-১৯ রোগ মৃদু লক্ষণ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে লক্ষণ ছাড়াই মানুষকে আক্রান্ত করছে ও তারা সেরে উঠছে। তবে প্রায় ১৫ শতাংশ রোগী মাঝারি থেকে মারাত্মক লক্ষণ প্রকাশ করছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য লক্ষণ হলো মারাত্মক নিউমোনিয়া। যাদের অক্সিজেনের প্রয়োজন হচ্ছে। আর এদের মধ্যে দুই থেকে তিন শতাংশ রোগীর জন্য ভেন্টিলেটর বা কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্রের মাধ্যমে শ্বাসকার্য পরিচালনার দরকার হচ্ছে। কভিড-১৯ কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম লক্ষণের প্রকাশ ঘটাচ্ছে, যেমন—অত্যধিক মাথা ব্যথা, ডায়রিয়া, ধমনি ও শিরায় রক্ত জমাট বাঁধা, স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক, স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতিসাধন ইত্যাদি, যা সার্স ও মার্স ভাইরাসের বেলায় অত প্রকট ছিল না।

সার্স ও মার্স করোনাভাইরাস কভিড-১৯ এর চেয়ে বেশি দ্রুত ছড়িয়েছিল এবং আক্রান্তের তুলনায় মৃত্যুহার অনেক বেশি ছিল। তবে সার্স এবং মার্স ভাইরাস শুধু ২৬টি দেশে সীমাবদ্ধ ছিল এবং তাদের কোয়ারেন্টাইন ও আইসোলেশনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু নভেল করোনাভাইরাস পৃথিবীর ২১৩টি দেশে ছড়িয়েছে এবং কোয়ারেন্টিন ও আইসোলেশনের মাধ্যমে কার্যকরভাবে এই ভাইরাসের সংক্রমণ রোধ করা সম্ভব হয়নি। তার বেশ কিছু কারণ রয়েছে— 

প্রথমত, কভিড-১৯-এ আক্রান্ত অনেক রোগীই লক্ষণ প্রকাশ করে না, কিন্তু তারা অন্যকে আক্রান্ত করতে পারে। ফলে তাদের শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলশ্রুতিতে তারা সমাজে মিশে সামাজিক সংক্রমণ ঘটাচ্ছে। 

দ্বিতীয়ত, ২০০২ থেকে ২০২০, প্রায় কুড়ি বছর পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের মধ্যে যোগাযোগ অনেক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। যদি বাংলাদেশের কথাই ধরা হয়; পৃথিবীর ১৬৯টি দেশে এক কোটি ২৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত আছেন। স্থলপথ, জলপথ ও আকাশপথে ২০০২ সালের তুলনায় ২০২০ সালে যোগাযোগ অনেক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সুতরাং বিশ্বায়নের ফলে সমগ্র পৃথিবীর দেশগুলোর মধ্যে মানুষের চলাচল ব্যাপক বৃদ্ধির ফলে ২০০২-এর সার্স যেখানে ২৬টি দেশে ছড়িয়েছিল, সেখানে ২০২০-এ কভিড-১৯ পৃথিবীর ২১৩টি দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে।

তৃতীয়ত, জনসংখ্যার ঘনত্ব গত কুড়ি বছরে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ফলে কভিড-১৯ দ্রুতই ছড়িয়েছে।

চতুর্থত, নগরায়ণ ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির ফলে শহরাঞ্চলে মানুষের সংখ্যা যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি বিশ্বের বিভিন্ন বড় শহরে বাইরে থেকে আসা জনসংখ্যার পরিমাণও আগের চেয়ে অনেক বেশি। ফলে তারা শহরাঞ্চল থেকে জীবাণু বহন করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়েছে। সুতরাং ওপরের আলোচনা থেকে বোঝা যায় কেন কভিড-১৯কে কোয়ারেন্টিন বা আইসোলেশনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না। 
মুক্তবাজার অর্থনীতির এই পৃথিবীতে বেশিদিন মানুষকে ঘরে আবদ্ধ করে রাখা সম্ভব নয়। পৃথিবীর কোনো দেশই অনির্দিষ্টকালের জন্য তাদের বিমানবন্দর, স্থলবন্দর, পোর্ট, জনশক্তি রপ্তানি অথবা যেকোনো ধরনের আমদানি-রপ্তানি বন্ধ করে টিকে থাকতে পারবে না। সুতরা স্থায়ী সমাধান হলো টিকা অথবা হার্ড ইমিউনিটি অথবা অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ আবিষ্কার করা।

হার্ড ইমিউনিটি হলো, যখন কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ কোনো ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়, তখন জনগোষ্ঠীর বাকি অংশও ওই ভাইরাসের বিপরীতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করে। এটিই হলো হার্ড ইমিউনিটি (Herd Immunity), যেমন—বাংলাদেশ পোলিও রোগের বিরুদ্ধে হার্ড ইমিউনিটি অর্জন করেছে এবং বাংলাদেশ থেকে পোলিও নির্মূল হয়েছে। পালিয়ে বেড়ালে পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হবে। প্রকৃতিতে যেহেতু এই ভাইরাস থেকে যেতে পারে, সেহেতু হার্ড ইমিউনিটি অর্জিত হলে এই একই ধরনের ভাইরাস দ্বারা পুনরায় সংক্রমণের সম্ভাবনা কমে যাবে। অতীতে পোলিও, হাম, জার্মান মিজেলস ইত্যাদির বিপরীতে আমরা হার্ড ইমিউনিটি পেয়েছি। 

একটি ভালো বিষয় হলো, যারা একবার কভিড-১৯ দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে, তাদের পুনরায় আক্রান্ত হওয়ার শক্ত প্রমাণ এখনো মেলেনি। অর্থাত্ আক্রান্তদের শরীরে রোগ প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি তৈরি হচ্ছে। যদিও গবেষকরা বলেছেন, এই অ্যান্টিবডির পরিমাণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শরীরে কমে যাচ্ছে। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে এই অ্যান্টিবডি রোগ প্রতিরোধ করবে কি না তা নিয়ে অনেকে সংশয় প্রকাশ করেছেন। যদি নভেম্বর ২০১৯ থেকে জুলাই ২০২০ পর্যন্ত পুনঃসংক্রমণের প্রমান না থাকে, তাহলে ধরে নেওয়া যায় নভেম্বর ২০১৯-এ যারা আক্রান্ত হয়েছিল, তারা গত আট মাস ধরে পুনঃসংক্রমিত হয়নি। অর্থাত্ অ্যান্টিবডির পরিমাণ কম থাকলেও তা রোগ প্রতিরোধ করতে পারছে। সুতরাং বিশ্বায়নের এই যুগে জীবন ও জীবিকার পথ রুদ্ধ করে নয়, বরং অথনীতিকে সচল রেখেই এই অদৃশ্য শত্রুর মোকাবেলা করাই হবে বাস্তবসম্মত। এর সঙ্গে লুকোচুরি করে কোনো সমাধান দেবে না। 

তবে লকডাউন বা বিধি-নিষেধ তুলে দিয়ে, করোনাকে আলিঙ্গন করলেই হার্ড ইমিউনিটি পাওয়া সম্ভব নয়। এর জন্য প্রস্তুতির প্রয়োজন। কারণ ধারণা করা হচ্ছে, ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ আক্রান্ত হলেই হার্ড ইমিউনিটি পাওয়া সম্ভব। বিশ্বের কোনো দেশেরই সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে প্রায় ২৫ শতাংশ মানুষ এরই মধ্যে আক্রান্ত হয়েছে বলে গবেষণায় পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের মতো অধিক জনসংখ্যা ও ঘনত্বের দেশগুলোতে এ সংখ্যা আরো বেশি হবে—এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সঠিক গবেষণা না থাকলেও বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৩৫ শতাংশের বেশি এরই মধ্যে লক্ষণসহ ও লক্ষণ ছাড়া আক্রান্ত হয়েছে বলে গবেষকরা ধারণা করছেন।

হার্ড ইমিউনিটির জন্য আমাদের অনেক কিছুই করতে হবে। তার মধ্যে প্রথম হলো জনসচেতনতা। সামাজিক দূরত্ব নয়, বরং ফিজিক্যাল বা শারীরিক দূরত্ব মেনে চলতে হবে। মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। হ্যান্ড হাইজিন বা হাত ধৌত করণসহ সব নিয়ম মেনে চলতে হবে। শুধু লকডাউন তুলে সব ভুলে করোনাকে আলিঙ্গন করলেই হার্ড ইমিউনিটি পাওয়া যাবে না। 

পরিসংখ্যান থেকে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, তরুণদের চেয়ে এই রোগটি ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সের মানুষের জন্য বেশি বিপদজনক। সুতরাং বয়স্কদের প্রতি বেশি নজর দিতে হবে। যাতে তাদের বাঁচানো যায়। তরুণরা করোনার সঙ্গে যুদ্ধ করবে আর বয়স্করা আড়ালে থাকবে। তরুণরাই নিয়ম মেনে বাইরে যাবে, চাকরি করবে, ব্যবসা করবে, সংসারের দায়িত্ব পালন করবে; আর বয়স্করা বাড়িতে থাকবে। শুধু বাড়িতে থাকলে হবে না, আলাদা থাকতে হবে, মাস্ক ব্যবহার করবে এবং অতীব প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির বাহিরে যাবে না। অর্থাত্ তরুণরা করোনার সঙ্গে যুদ্ধ করে হার্ড ইমিউনিটি আনবে, আর বয়স্করা তার সুফল পাবে। তার পরও কিছু মানুষ হয়তো মৃত্যুবরণ করবে। আমরা জানি প্রতিবছর সিজনাল ফ্লুতে অনেক বয়স্ক ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করে। এবার তারা হয়তো কভিড নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। দুঃখজনক হলেও সত্য, কিছু মানুষের অকাল, অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুও হতে পারে। আমাদের সচেতনতা ও গৃহীত পদক্ষেপ এই মৃত্যুহার কমাতে পারে। 

কয়েকটি বিষয় বাংলাদেশের জন্য সুখকর। আমাদের জনগোষ্ঠীর ৮০ শতাংশের বয়স পঞ্চাশের নিচে এবং তারা কর্মক্ষম। বিভিন্ন ধরনের টিকা প্রদানেও আমরা সফল। তা ছাড়া আমাদের সাধারণ মানুষের ইমিউনিটি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো। লক্ষ্য করা যাচ্ছে, ঢাকা শহরের ঘনবসতিপূর্ণ নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে করোনা সংক্রমণ কম। ইমিউনিটি তাদের রক্ষা করছে বলে মনে করা হচ্ছে। কভিড-১৯-এর কাছাকাছি প্রজাতির অন্যান্য করোনাভাইরাস দ্বারা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার মানুষ বিভিন্ন সময়ে আক্রান্ত হওয়ার ফলে এক ধরনের অ্যান্টিবডির সুবিধা তারা পাচ্ছে বলে গবেষণায় পাওয়া যাচ্ছে। 

তাই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সংক্রমণের সুযোগ নেওয়া যেতেই পারে। তবে ঝুঁকি আসবে এবং তা মোকাবেলা করতে হবে। যে মানুষেরা আক্রান্ত হবে তাদের ৮০-৯০ শতাংশ সাধারণ চিকিত্সায় ভালো হবে এবং তারা বাড়িতে থেকে চিকিত্সা নিতে পারবে। তবে কিছুসংখ্যক মৃদু লক্ষণযুক্ত রোগীকেও ভর্তি রাখার জন্য আলাদা প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেশনের ব্যবস্থা প্রয়োজন হতে পারে। আর যারা বাড়িতে থাকবে তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের ব্যবস্থা থাকতে হবে। যাতে তাদের প্রয়োজনে দ্রুতই হাসপাতালে আনা যায়। কভিড হাসপাতালগুলো অনেক ক্ষেত্রেই মৃদু লক্ষণযুক্ত রোগী ভর্তি করছে। যার ফলে সেখানে মাঝারি লক্ষণযুক্ত বা মুমূর্ষু রোগীদের ভর্তি হতে সমস্যা হচ্ছে। কভিড হাসপাতালগুলোতে মুমূর্ষু ১০-২০ শতাংশ রোগীই শুধু ভর্তি করতে হবে। তাদের জন্য সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা গেলে বর্তমানে বাংলাদেশে ১.৩ শতাংশ যে মৃত্যুহার তা আরো কমানো সম্ভব। যারা লক্ষণ নিয়ে আসবে, তাদের কভিড শনাক্তকরণ পরীক্ষা দ্রুত করতে পারলে মৃত্যুহার কমাতে যেমন সাহায্য করবে, তেমনি হাসপাতালে ভর্তি থাকার সময়ও কমে আসবে।
এরই মধ্যে বাংলাদেশে সংক্রমণ কমার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। আগে একজন আক্রান্ত ব্যক্তি দুই থেকে তিনজন ব্যক্তিকে আক্রান্ত করতে পারত, এখন একজন আক্রান্ত ব্যক্তি একজনকে আক্রান্ত করছে। অর্থাৎ ভাইরাসটি খুব বেশি বৃদ্ধি পাচ্ছে না। এর আক্রান্ত করার ক্ষমতা ও তীব্র রোগ সৃষ্টির ক্ষমতাও কমছে। তাই বলে আত্মতৃপ্তিতে ভোগার কোনো কারণ নেই। একটি কথা বলে রাখা ভালো, এই কভিড-১৯ ভাইরাসটির আচরণ এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেননি। কভিড-১৯ রোগের কিছু কিছু লক্ষণ অন্যান্য ভাইরাসজনিত রোগের লক্ষণ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং নতুন ধরনের। এ জন্য আমাদের আরো বেশি সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। এই ভাইরাসের প্রতিরোধে যেসব ব্যক্তিসচেতনতা প্রয়োজন, তা বেশি বেশি গ্রহণ করতে হবে। এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে এলেও দ্বিতীয়বার প্রাদুর্ভাব ঘটতেই পারে। এক শ সদস্যের করোনা পরিবার পৃথিবী থেকে নির্মূল হবে না। সুতরাং শুধু করোনা নয়, অন্যান্য জীবাণুর প্রাদুর্ভাব থেকে রক্ষা পেতে সদা সর্বদা তীক্ষ দৃষ্টি রেখে সাবধান থাকতে হবে।  

করোনা এমন এক আততায়ী, যার সম্বন্ধে আগে থেকেই ধারণা করা কঠিন ছিল। আর এর প্রাদুর্ভাবে বিশ্বের দেশগুলোর স্বাস্থ্যব্যবস্থার কিছু দুর্বল দিক উন্মোচিত হয়েছে। বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলো অস্ত্র নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। আধিপত্য বিস্তারে হেন কৌশল নেই যা তারা গ্রহণ করছে না। চাঁদ, সূর্য, মঙ্গলগ্রহসহ বহির্বিশ্বের এলিয়েন নিয়ে ব্যাপক গবেষণা চলছে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, পৃথিবীর সভ্যতা আধাকোষী করোনা নামক এক অদৃশ্য জীবাণুর কাছে ধরাশায়ী। 

হার্ড ইমিউনিটি অর্জন করতে হলে যে সমস্যাগুলো তৈরি হবে, তা মোকাবেলা করতে হলে চিকিত্সাব্যবস্থার ঘাড়েই বেশির ভাগ দায়িত্ব বর্তাবে। বিদ্যমান ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে চিকিত্সক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট দূর করে; অবকাঠামো ও চিকিত্সা সরঞ্জামের যথাযথ ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে চিকিত্সক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তাসামগ্রী (পিপিই) সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যে পরিকাঠামো রয়েছে তার পরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। কবে নাগাদ টিকা আবিষ্কার হবে তা নিশ্চিত নয়। টিকা আবিষ্কার অচিরেই সফল হবে বলে অনেকেই দাবি করছেন। তবে টিকা আবিষ্কার হলেও আমাদের হাতে পৌঁছাতে কিছুদিন সময় লাগতে পারে। টিকার জন্য হা-হুতাশ না করে আমাদের সামর্থ্যকে কাজে লাগিয়েই এই ধরনের দুর্যোগ মোকাবেলা করতে হবে। করোনার বিরুদ্ধে সবাইকে সচেতন ও সজাগ হতে হবে।
শুধু কভিড-১৯ নয়, ভবিষ্যতে এ ধরনের যেকোনো দুর্যোগ মোকাবেলায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মহোদয়কে প্রধান করে একটি শক্তিশালী ‘জাতীয় জরুরি সংক্রমণ প্রতিরোধ ও মোকাবেলা কমিটি’ গঠন করা প্রয়োজন। এবারের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে  ভবিষ্যতের জন্য একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা যেতে পারে। 
করোনার প্রাদুর্ভাবের প্রারম্ভেই বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মহোদয় ধারাবাহিকভাবে ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে চলেছেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কভিড-১৯ ও দুর্যোগ মোকাবেলায় তাঁর পারদর্শিতা আরেকবার প্রমাণিত হয়েছে। বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে জনসংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান অষ্টম এবং ঘনত্বের দিক থেকে ১১তম। এই সবকিছু বিবেচনায় বিশ্বের বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন যে বাংলাদেশে অনেক লোক মৃত্যুবরণ করতে পারে। তবে আমেরিকা, ব্রিটেন, রাশিয়া, ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন, ব্রাজিলসহ বিভিন্ন উন্নত দেশের তুলনায় বাংলাদেশে আক্রান্তের সংখ্যা যেমন কম, তেমনি মৃত্যুর হারও অনেক কম। সুতরাং বলা যায়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মহোদয় যে পদক্ষেপ নিয়েছেন এবং তাঁর সক্রিয় নির্দেশনায় বাংলাদেশ যেভাবে কভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাব মোকাবেলা করছে, তা সমগ্র বিশ্বেই বিস্ময় সৃষ্টি করেছে এবং প্রশংসিত হচ্ছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মহোদয় করোনা মোকাবেলায় গত ৯ এপ্রিল যে ৩১ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন, তা একটি পূর্ণাঙ্গ যুগান্তকারী দলিল। এই ৩১ দফায় চিকিৎসাব্যবস্থা কিভাবে পরিচালিত হবে এবং তাতে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মীসহ অন্যদের কী ভূমিকা হবে তার এক অভূতপূর্ব দিকনির্দেশনা রয়েছে। অর্থনীতি ও জীবন-জীবিকা স্বাভাবিক রেখে সর্বগ্রাসী করোনা মোকাবেলা করার জন্য ৩১ দফা দারুণ সহায়ক হবে। রাষ্ট্র পরিচালনা ও সংকট মোকাবেলায় তিনি এখন বিশ্বে রোল মডেল। এই দফাগুলো শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, সমগ্র বিশ্বের জন্য গাইডলাইন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তাই এই দফাগুলো অনেক বেশি করে দেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরা প্রয়োজন। এই দলিল যেকোনো সংকট মোকাবেলায় একটি রেফারেন্স হতে পারে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর দূরদৃষ্টি, বিচক্ষণতা, প্রজ্ঞা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতায় সমগ্র বিশ্বে বিরল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে স্বীকৃত। তিনি রাজনীতি, অর্থনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যাপক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। সুতরাং ভয় না পেয়ে, করোনার সঙ্গে লুকোচুরি না করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে সামনে রেখে, ৩১ দফাকে মূল ভিত্তি করে এগিয়ে গেলে বাংলাদেশ তার উন্নয়ন ও অগ্রগতিকে অব্যাহত রেখে অচিরেই করোনার এই প্রাদুর্ভাব থেকে মুক্ত হবে বলে আশা করা যায়। 

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, খুলনা মেডিক্যাল কলেজ 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা