সাংবাদিকদের ওপর দমন-পীড়নের চক্র ভেঙে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)। মঙ্গলবার (২ জুন) সিপিজের ওয়েবসাইটে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়।
এতে বলা হয়েছে, দুই বছরে বাংলাদেশ তিনটি সরকার পেয়েছে। দীর্ঘদিন টিকে থাকা শেখ হাসিনার সরকার ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হয়। এরপর নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসে। আর সর্বশেষ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় বসে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সরকার। প্রধানমন্ত্রী হন তারেক রহমান।
সিপিজে বলেছে, প্রতিটি পালাবদলের সময় সাংবাদিকেরা আটক, বিচার, নজরদারি, আক্রমণ ও অপবাদের শিকার হয়েছেন। বিশেষ করে আগের সরকারের সঙ্গে তাদের কথিত আনুগত্যের কারণ দেখিয়ে এসব করা হয়েছে। সম্প্রতি ডেইলি স্টার একটি উদ্বেগজনক প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছে, পুলিশ দেশজুড়ে সাংবাদিকদের অতীত রেকর্ড যাচাই করছে, তাদের প্রোফাইল তৈরি করছে।
সিপিজের এশিয়া-প্যাসিফিক প্রোগ্রামের সমন্বয়কারী কুনাল মজুমদার বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রতিটি নতুন সরকার গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে পূর্ববর্তী সরকারের সঙ্গে যুক্ত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের একটি সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করেছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘তারেক রহমানের সরকার পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু ১০০ দিন পেরোলেও অর্থপূর্ণ অগ্রগতি খুব সামান্য দেখা গেছে।’
বর্তমান সরকার কারারুদ্ধ সাংবাদিকদের মুক্তি দিয়ে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলক মামলা প্রত্যাহার করে, গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বন্ধ করে, সাংবাদিকদের গণসহিংসতা থেকে সুরক্ষা দিয়ে, কুৎসা রটানোর অভিযানে লাগাম টেনে এবং এসব সম্ভব করে এমন সব আইন সংশোধনের মাধ্যমে পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করতে পারে। এমন পরামর্শ দিয়েছে সিপিজে। এর ফলে প্রত্যেক সাংবাদিকের ক্ষেত্রে একই মানদণ্ড প্রয়োগ করা যাবে। আর এভাবে বিদ্যমান চক্রটি ভেঙে ফেলা যাবে।
সিপিজের মতে, ১০টি পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা যাবে। এ পদক্ষেপগুলো হলো—
এক. সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা পর্যালোচনা, গণহারে এফআইআর ও একাধিক মামলা দেওয়ার চর্চা বন্ধ এবং সাংবাদিকতার কারণে করা মামলায় জামিনে বাধা না দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে একাত্তর টিভির ফারজানা রুপা, শাকিল আহমেদ ও মোজাম্মেল বাবু এবং ভোরের কাগজের শ্যামল দত্তের বিরুদ্ধে মামলাগুলো। তাদের ২০২৪ সালের আগস্ট বা সেপ্টেম্বর থেকে আটক রাখা হয়েছে। চলতি বছরের ১১ মে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ফারজানা রুপা ও শাকিল আহমেদকে তাদের বিরুদ্ধে থাকা অধিকাংশ মামলায় জামিন দেন, তবে বাকি মামলাগুলোর কারণে তারা এখনো কারাগারে রয়েছেন।
দুই. সাংবাদিকতার কাজকে গণহত্যা বা মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে যুক্ত করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) মামলা না করা এবং চলমান মামলাগুলো স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করতে হবে।
তিন. যে সরকারের আমলেই ঘটনা ঘটুক না কেন, সাংবাদিক হত্যা, হামলা, নজরদারি ও হয়রানির ঘটনার স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে এবং সেখানে মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার থাকবে না। স্বচ্ছ, স্বাধীন তদন্ত এবং ভুক্তভোগীদের জন্য অর্থবহ প্রতিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অবসান ঘটাতে হবে।
চার. বাংলাদেশে সাংবাদিক ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলো সংগঠিত গোষ্ঠী এবং রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের সহিংসতা ও ভয়ভীতির মুখোমুখি হচ্ছে। গত বছরের ডিসেম্বরে দুটি বৃহত্তম সংবাদপত্র—প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। আগুনে জ্বলতে থাকা নিউজরুমে সাংবাদিকেরা সাময়িকভাবে আটকা পড়েন এবং উভয় প্রতিষ্ঠানই মুদ্রিত ও অনলাইন প্রকাশনা বন্ধ করতে বাধ্য হয়।
২০২৫ সালে সিপিজে রাজনৈতিক কর্মসূচির সংবাদ সংগ্রহের সময় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অন্তত ১০টি সহিংসতা ও হয়রানির ঘটনা নথিভুক্ত করেছে, যার অধিকাংশই বিএনপি এবং তাদের ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলের সদস্য বা সহযোগীদের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে। সরকারকে এই সহিংসতার নিন্দা জানাতে হবে এবং সংবাদমাধ্যমের ওপর হামলার ঘটনাগুলোর দ্রুত, নিরপেক্ষ তদন্ত ও অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে জবাবদিহির আওতায় আনতে কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিতে হবে।
পাঁচ. বর্তমান ও আগের সাইবার আইনগুলো গণমাধ্যম দমনের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এই আইনগুলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সংশোধন এবং এসব আইনে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলো পর্যালোচনা করে প্রত্যাহার করতে হবে।
ছয়. সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯ এবং বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪ ও অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট, ১৯২৩-এর মতো আইন সাংবাদিকদের আটক ও বিচারের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরে সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে তার টেলিভিশন মন্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের কারণে এই আইনে গ্রেপ্তার করা হয়, যদিও পরে তিনি জামিন পান। ২০২১ সালের মে মাসে রোজিনা ইসলামকে গোপন সরকারি নথি চুরি ও গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের আওতায় গ্রেপ্তার ও আটক করা হয়। সরকারকে এসব আইন বাতিল বা মৌলিকভাবে সংশোধন করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে, সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞা সংকুচিত করতে হবে এবং বৈধ সাংবাদিকতার জন্য স্পষ্ট আইনি সুরক্ষা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
সাত. জাতীয় সম্প্রচার কমিশন ও জাতীয় গণমাধ্যম কমিশনসংক্রান্ত খসড়া অধ্যাদেশ ২০২৬ এমন নিয়ন্ত্রক সংস্থা তৈরির ঝুঁকি তৈরি করছে, যেগুলো শেখ হাসিনার সময়কার ব্যবস্থার মতো সম্প্রচার ও মুদ্রিত গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করা যেতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীনতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ দিয়েছিল, কিন্তু সেগুলো এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। সরকারের উচিত বর্তমান আকারে এসব অধ্যাদেশ গ্রহণ না করা এবং এর পরিবর্তে স্বচ্ছ, বহুপক্ষীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করা, যাতে যেকোনো গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়।
আট. সরকারের উচিত অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট, ১৯২৩ বাতিল বা মৌলিকভাবে সংশোধন করা; দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর মানহানির বিধান বাতিল করা এবং বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪ সংশোধন করা, যাতে এটি সাংবাদিকদের খামখেয়ালিভাবে আটক করার জন্য ব্যবহার করা না যায়। এ ছাড়া বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০০১-এর নজরদারি ও আড়ি পাতার বিধানগুলো সংস্কার করতে হবে, যাতে স্বাধীন বিচারিক তদারকি বাধ্যতামূলক হয় এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর পরোয়ানাবিহীন আড়ি পাতা বন্ধ হয়।
নয়. সাংবাদিকদের অ্যাক্রেডিটেশন বাতিলের বর্তমান পদ্ধতি সংস্কার এবং হয়রানিমূলক মামলা (স্ট্র্যাটেজিক ল’সুটস এগেইনস্ট পাবলিক পার্টিসিপেশন—এসএলএপিপি) ঠেকাতে আইনি সুরক্ষা চালু করতে হবে।
দশ. সাংবাদিকদের ‘ভারতপন্থী’, ‘ইসলামবিরোধী’, ‘দেশদ্রোহী’ বা সাবেক সরকারের এজেন্ট আখ্যা দিয়ে অপপ্রচার বন্ধ এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার সাংবিধানিক সুরক্ষার বিষয়ে সরকারকে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে। এ ধরনের অপপ্রচার শুধু সাংবাদিকদের কাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করে না বরং তাদের নিরাপত্তাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলে এবং তথ্যসূত্রদের ভীত করে তোলে। এই হেয়প্রতিপন্ন করার সংস্কৃতির কারণে অনেক সাংবাদিক দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন এবং অন্যরা নানা ধরনের হুমকির মুখে পড়েছেন।
সরকারকে স্পষ্ট ও বারবার জনসমক্ষে ঘোষণা দিতে হবে, স্বাধীন সাংবাদিকতা একটি সাংবিধানিক অধিকার এবং গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য। একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের মাধ্যমে সহিংসতায় উসকানি দেওয়া ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে—তা-ও স্পষ্টভাবে জানাতে হবে।