kalerkantho

রবিবার । ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১০ রবিউস সানি ১৪৪১     

একটি রাস্তা বদলে দিয়েছে পার্বত্য দুই জেলার চিত্র

ওমর ফারুক, পার্বত্য অঞ্চল থেকে ফিরে    

২ ডিসেম্বর, ২০১৯ ১৯:০৬ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



একটি রাস্তা বদলে দিয়েছে পার্বত্য দুই জেলার চিত্র

২০০৩ সাল থেকে ২০০৮ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত সাড়ে পাচ বছরের চেষ্টায় পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি থেকে রাঙামাটির সাজেকের পাকা রাস্তা তৈরি করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। খাগড়াছড়ি থেকে সাজেকের দূরত্ব প্রায় ৭৫ কিলোমিটার। সেখান দিয়ে কখনো রাস্তা হবে ভাবেননি স্থানীয় বাসিন্দারা। অসম্ভবকে সম্ভব করে সেনাবাহিনী উচু উচু পাহাড়ে পাকা সড়ক বানিয়েছে। যে সড়ক দিয়ে সব ধরনের যানবাহন চলাচল করছে। ২০১৪ সালে সাজেকে গড়ে উঠে পর্যটন এলাকা। তখন থেকেই বদলে গেছে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির চিত্র। প্রতিদিন শত শত পর্যটক এখন যাচ্ছেন সেখানে। যে এলাকা গুলোতে যেতে এক সময় ভয় পেতেন সাধারণ মানুষ। আর সেখানেই এখন গড়ে উঠছে পর্যটন এলাকা। খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি এলাকার স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

স্থানীয়রা জানান, খাগড়াছড়ি এলাকার মানুষ এক সময় অন্ধকারে ছিলেন। এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে যেতে তাদের কয়েক ঘন্টা লেগে যেতো। সেই চিত্র এখন আর নেই। দীর্ঘদিন উচু পাহাড় পরিস্কার করে সেখানে পাথর, পিচ ঢেলে রাস্তা বানিয়েছে সেনা বাহিনী। ২০১৪ সাল থেকে খাগড়াছড়ি থেকে সাজেক পর্যন্ত রাস্তাটি চালু হওয়ার পর অর্থনীতির চাকা ঘুরে ওই এলাকার বাসিন্দাদের। এক সময় তারা জুম চাষের উপর নির্ভরশীল হলেও রাস্তা হওয়ার পর ব্যবসা বাণিজ্য নেমেছেন। এক সময় যে আনারস ৫ টাকায় বিক্রি করতেন তারা সেটি এখন বিক্রি করতে পারছেন ৫০ টাকায়। যে কলা ক্রেতার অভাবে পচে যেতো সেই কলা এখন পর্যটকদের কাছে বিক্রি করতে পারছেন সমতলের দামেই। সব মিলিয়ে রাস্তাটি হওয়ার পর গড়ে উঠছে পর্যটন শিল্প। পাহাড়ি বাসিন্দাদের কর্ম সংস্থানের ব্যবস্থা হচ্ছে। ফলে খুশি পাহাড়িরা। আর বদলে যাচ্ছে পাহাড়ের চিত্র। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাহাড়ে উপজাতীদের কয়েকটি গ্রুপের মধ্যে মারামারি কাটাকাটি লেগেই আছে। বাঙালিদের সঙ্গেও চলছে ঝামেলা। হচ্ছে খুন, চাঁদাবাজি, অপহরণসহ নানা অপরাধ। এ অবস্থা চললেও পর্যটকদের সব পক্ষই স্বাগত জানাচ্ছেন। আর এ কারণেই প্রতিদিন খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির সাজেকে শত শত পর্যটক যেতে পারছেন নির্ভয়ে। এর পরও অতিরিক্ত সতর্কতা হিসেবে নিরাপত্তা বাহিনী নিরাপত্তার আয়োজন করে থাকে পর্যটকদের।  

গত রবিবার খগড়াছড়ির আলু টিলা ও সোমবার রাঙমাটির সাজেকে সরজমিন গিয়ে দেখা গেছে প্রচুর পর্যটক এসেছেন। বিকালের দিকে দেখা যায় আলু টিলার গুহা দিয়ে বেরিয়ে আসছেন বেশ ক’জন ছাত্র-ছাত্রী। তারা বাইরে এসে জানান, জীবনে এমন অ্যাডভেঞ্চার তারা পাননি। 

ফরিদা পারভীন নামের এক শিক্ষার্থী কালের কণ্ঠকে জানান, তারা রংপুর থেকে এসেছেন। পাহাড়ের বৈচিত্র্যপূর্ণ পরিবেশ দেখে তারা বিমোহিত। আলু টিলা পর্যটন এলাকায় দেখা গেছে বেশ কিছু দোকান গড়ে উঠেছে। যেগুলোতে বিভিন্ন ধরনের সামগ্রী বিক্রি করা হচ্ছে। তাদের ক্রেতা মূলত পর্যটকরা। 

একটি দোকানের মালিক বিন্দু বড়ুয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, পর্যটন এলাকা হওয়ায় আমরা এখন ব্যবসা করতে পারছি। পাহাড়িদের দুঃখ ঘোচার সময় এসেছে। এ কারণে পাহাড়িরা পর্যটকদেরকে স্বাগত জানাই।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, খাগড়াছড়ির আলু টিলা থেকে জেলা পরিষদ পার্ক পর্যন্ত ক্যাবল কার করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এরই মধ্যে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া গিয়ে গবেষণা করে এসেছেন সংশ্লিষ্টরা। এই ক্যাবল কার খাগড়াছড়ির আলু টিলা থেকে জেলা পরিষদ পার্ক পর্যন্ত চলবে। যার দূরত্ব অন্তত তিন কিলোমিটার। বর্তমানে আলু টিলা থেকে জেলা পরিষদ পার্ক পর্যন্ত যেতে পাহাড়ি রাস্তায় ৮-৯ কিলো মিটার রাস্তা। ক্যাবল কারে সেটি নেমে আসবে তিন কিলোমিটারে। এই কেবল কার হবে সিঙ্গাপুরের চেয়েও উচু ও অত্যাধুনিক। ক্যাবল কার হয়ে গেলে খাগড়াছড়ি এলাকায় পর্যটকের সংখ্যা আরো বাড়বে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক প্রতাপ চন্দ্র বিশ্বাস কালের কণ্ঠকে বলেন, খাগড়াছড়ি একটি পর্যটন সম্ভাব্য এলাকা। এখানে ক্যাবল কার করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে পার্বত্য জেলা পরিষদ কাজ করছে।

সাজেক গিয়ে দেখা যায়, সেখানে সেনাবাহিনীর একটি রিসোর্টসহ এক কিলোমিটারের বেশি জায়গাজুড়ে অর্ধ শতাধিক রিসোর্ট বানানো হয়েছে। সকালের দিকে দুই পাহাড়ের মাঝখানে মেঘ দেখা যায়। যে মেঘ দেখে উচ্ছ্বসিত পর্যটকরা। 

ঢাকা থেকে যাওয়া পর্যটক তনিমা রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, এ যেন দার্জিলিং। আমি এক বান্ধবীর কাছ থেকে শোনে বাবা মাকে বলি সাজেকে আসার জন্য। সাজেকে এসে এতো ভালো লাগছে যা বলে বুঝাতে পারবো না।

সেখানে পরিবার পরিজন নিয়ে ঢাকা থেকে গিয়েছিলেন আলী আহম্মদ নামের এক ব্যবসায়ী। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, পর্যটক হিসেবে বহুদেশ ঘুরেছি। কিন্তু নিজের দেশে এতো সুন্দর জায়গা আছে না এলে বুঝতে পারতাম না। 

সাজেক এলাকার হেডম্যান লাল থাঙ্গা কালের কণ্ঠকে জানান, এক সময় তারা জুম চাষ করতেন। ২০১৪ সালে সাজেকে পর্যটন এলাকা গড়ে উঠার পর তার ছেলেরা রিসোর্ট দিয়েছে। সেই রিসোর্ট থেকে ভালো আয় হয়। 

তিনি বলেন, পর্যটন হওয়ার আগে একটি আনারস ৫ টাকায় বিক্রি হতো। এখন সেটি ৫০ টাকায় বিক্রি হয়। এভাবে ব্যবসা বানিজ্য গড়ে উঠছে এলাকাটিতে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পর্যটকরা এখানে নিরাপদে থাকতে পারেন। আমি হেড ম্যান হিসেবে কোন অভিযোগ পাইনি।

খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার আহমার উজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, যেসব পর্যটক রাঙামাটির সাজেক যান তাদের বেশির ভাগই খাগড়াছড়ি শহরে থাকেন। তারা এখানকার আলু টিলা পর্যটন এলাকায় যান। পর্যটকদের নিরাপত্তা দিচ্ছে পুলিশ। এখানে সম্ভাবনা ময় একটি পর্যটন এলাকা গড়ে উঠছে। 

ইউপিডিএফের (গণতান্ত্রিক) প্রধান শ্যামল চাকমা কালের কণ্ঠকে বলেন, পাহাড়ে শান্তি ফিরিয়ে আনার পক্ষে আমরা কাজ করছি। আমাদের এতো সুন্দর এলাকায় টুরিষ্টদের স্বাগত জানাই।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা