অফিসে দীর্ঘ সময় বসে কাজ করা বর্তমানে অনেক মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। ইমেইলের জবাব দেওয়া, কম্পিউটারে কাজ করা কিংবা ভিডিও মিটিংয়ে অংশ নেওয়া—এসব কারণে দিনের বড় একটি সময় চেয়ারে বসেই কাটে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ সময় একটানা বসে থাকা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
তাদের মতে, দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে ওজন বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। একই সঙ্গে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের মতো রোগের আশঙ্কাও বৃদ্ধি পায়। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ঘণ্টায় মাত্র পাঁচ মিনিট হাঁটাহাঁটি করলে শরীর ও মনের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। গবেষকদের মতে, এটি কাজের ব্যাঘাত না ঘটিয়ে স্বাস্থ্য ভালো রাখার সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর উপায়গুলোর একটি। ব্রিটিশ জার্নাল অব স্পোর্টস মেডিসিনে প্রকাশিত গবেষণায় প্রতি ঘণ্টায় পাঁচ মিনিটের হাঁটার বিরতিকে ‘মুভমেন্ট স্ন্যাকস’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণার প্রধান গবেষক কিথ ডিয়াজ বলেন, বর্তমানে অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ জেগে থাকার সময়ের প্রায় ৭৫ শতাংশই বসে কাটান। তাই শুধু ‘কম বসুন, বেশি নড়াচড়া করুন’ বললেই হবে না, মানুষের জানা দরকার ঠিক কতটা নড়াচড়া করলে উপকার পাওয়া যায়। তার মতে, প্রতি ঘণ্টায় পাঁচ মিনিট হাঁটলে মানুষের মন ভালো থাকে, ক্লান্তি কমে এবং এটি বেশিরভাগ কর্মীর কাছেই বাস্তবসম্মত বলে মনে হয়েছে।
গবেষণাটি পরিচালনা করেছে কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ১১ হাজারের বেশি কর্মী অংশ নেন। তাদের বেশিরভাগই অফিসে কাজ করেন এবং প্রতিদিন আট থেকে নয় ঘণ্টা কর্মস্থলে থাকেন। গবেষণার প্রথম সপ্তাহে অংশগ্রহণকারীরা স্বাভাবিক নিয়মে কাজ করেন। এ সময় তারা প্রতিদিন নিজেদের ক্লান্তি, মনোভাব এবং কাজের দক্ষতা সম্পর্কে তথ্য দেন। পরবর্তী দুই সপ্তাহে তাদের বিভিন্ন সময় পরপর হাঁটার বিরতি নিতে বলা হয়। কেউ প্রতি আধা ঘণ্টা পর পাঁচ মিনিট হাঁটেন, কেউ প্রতি ঘণ্টায় পাঁচ মিনিট হাঁটেন, আবার কেউ প্রতি দুই ঘণ্টা পর একবার হাঁটেন। এরপর গবেষকেরা অংশগ্রহণকারীদের অভিজ্ঞতা ও কাজের ফলাফল বিশ্লেষণ করেন।
গবেষণায় দেখা যায়, প্রতি আধা ঘণ্টা পর হাঁটলে মন ভালো থাকে এবং ক্লান্তি কমে। তবে এত ঘন ঘন বিরতি নেওয়ার কারণে নিয়মিত কাজের কিছুটা ব্যাঘাত ঘটতে পারে। অন্যদিকে প্রতি দুই ঘণ্টা পর হাঁটা একেবারে না হাঁটার চেয়ে ভালো হলেও এর প্রভাব তুলনামূলক কম ছিল। গবেষকেরা দেখেছেন, প্রতি ঘণ্টায় পাঁচ মিনিট হাঁটার অভ্যাস সবচেয়ে বেশি ইতিবাচক ফল দিয়েছে। এতে কর্মীদের কাজের গতি বেড়েছে, মনোযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তারা বেশি সতর্ক ও সক্রিয় অনুভব করেছেন।
কিথ ডিয়াজ বলেন, অনেক কর্মী মনে করেন কাজের মাঝখানে বিরতি নিলে উৎপাদনশীলতা কমে যাবে। আবার কেউ কেউ উদ্বিগ্ন থাকেন, তাদের বস বা সহকর্মীরা বিষয়টি কীভাবে দেখবেন। তবে গবেষণার ফলাফল বলছে, বাস্তবতা ঠিক উল্টো হতে পারে। ডিয়াজের ভাষায়, নড়াচড়ার জন্য নেওয়া ছোট বিরতি কর্মীদের পরিকল্পনা করার ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা, মনোযোগ এবং স্মৃতিশক্তি উন্নত করতে সাহায্য করে। পাশাপাশি তারা নিজেদের বেশি স্বস্তিদায়ক, সতেজ এবং কর্মক্ষম মনে করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অভ্যাস গড়ে তুলতে অতিরিক্ত খরচের প্রয়োজন নেই। অফিসের ভেতরে বা বাইরে কয়েক মিনিট হাঁটলেই যথেষ্ট। মিটিংয়ের সময় হাঁটতে হাঁটতে আলোচনা করা, ফোনে কথা বলার সময় হাঁটাহাঁটি করা কিংবা প্রতি ঘণ্টায় কয়েক মিনিট ডেস্ক ছেড়ে উঠে দাঁড়ানো—এসব ছোট পরিবর্তনও উপকার বয়ে আনতে পারে।
ব্রিটিশ হার্ট ফাউন্ডেশনের জ্যেষ্ঠ হৃদরোগ নার্স এমিলি ম্যাকগ্রাথ গবেষণার ফলাফলকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও কিছু সতর্কতার কথা বলেছেন। তার মতে, সাধারণ কিছু শারীরিক নড়াচড়াও মানুষের সামগ্রিক স্বাস্থ্য উন্নত করতে পারে। তবে এই গবেষণার তথ্য অংশগ্রহণকারীদের নিজের দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং গবেষণাটি তুলনামূলক স্বল্প সময়ের ছিল। তাই দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্স্বাস্থ্য ও অন্যান্য শারীরিক উপকারিতা কতটা পাওয়া যায়, তা নিশ্চিত করতে আরো বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
তবে বর্তমান গবেষণার ফলাফল বলছে, দীর্ঘ সময় একটানা বসে থাকার পরিবর্তে প্রতি ঘণ্টায় অন্তত পাঁচ মিনিট হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুললে তা শরীর ও মন দুইয়ের জন্যই উপকারী হতে পারে।