kalerkantho

রবিবার । ৪ ডিসেম্বর ২০২২ । ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

আপওয়ার্কের অপু

৯ সেপ্টেম্বর পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস আপওয়ার্ক নিজেদের অফিশিয়াল ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ, ইনস্টাগ্রাম ও লিংকডইন আইডি থেকে বাংলাদেশি এক ফ্রিল্যান্সার সুদীপ্ত কুমার মণ্ডলকে (অপু) আপওয়ার্ক স্পটলাইট হিসেবে ঘোষণা করে। ২০২২ সালে তিনিই এ পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে একমাত্র আপওয়ার্ক স্পটলাইট ফ্রিল্যান্সার। তাঁর সফল ফ্রিল্যান্সার হয়ে ওঠার গল্পটা শুনেছেন মুহাম্মদ শফিকুর রহমান

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০৮:২৫ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



আপওয়ার্কের অপু

যেভাবে শুরু

২০১৪ সালে গ্রাফিক ডিজাইনার হিসেবে সুদীপ্ত কুমার মণ্ডলের (অপু) কাজের শুরু। ২০১৮ সাল থেকে কয়েক বছর কাজ করেছেন খুলনার ‘এন্ড আইটি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে। বেতন ছিল মাত্র আট হাজার টাকা। রুম ভাড়াই দিতে হতো তাঁকে এক হাজার টাকা।

বিজ্ঞাপন

অন্যান্য খরচ দিয়ে হাঁপিয়ে উঠতেন অপু। সারা দিন অফিস করে রাতে যেতেন অফিসের সিনিয়র ডিজাইনার রবিউল ইসলামের কাছে। তাঁকে ফ্রিল্যান্সিং শেখাতেন রবিউল।  

অপু বলেন, ‘এমনও হয়েছে যে সারা রাতে ঘুমিয়েছি মাত্র তিন-চার ঘণ্টা। তবু চেষ্টা করে যেতাম নিজের দক্ষতা আরো বাড়ানোর। উদ্দেশ্য ছিল, ২০২০ সালের মধ্যে ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে মাসে এক লাখ টাকা আয় করা। চাকরি এবং ফ্রিল্যান্সিং শেখা—দুটিই একসঙ্গে চলল বেশ কিছুদিন। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। অর্থনৈতিক টানাপড়েন না থাকলেও নিজেকে স্বাবলম্বী করার চাপ বরাবরই ছিল। অপু ভাবলেন, সরকারি চাকরি তো সোনার হরিণ, তার চেয়ে বরং ফ্রিল্যান্সিংই ভালো। তিনি বলেন, “ঘরে বসে কাজ করার সুযোগ আছে এবং অধিক আয়ের সুযোগ থাকার কারণে জীবিকা অর্জনের জন্য ফ্রিল্যান্সিংকেই বেছে নিই। এই সিদ্ধান্ত বন্ধু থেকে আত্মীয়-স্বজন কেউই ভালোভাবে নেয়নি। তাদের কাছে আমার এ যাত্রা যেন নেহাতই গরিবের ঘোড়ারোগ। আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুরা বলত, ‘ডলার কামাবি? ডলার কামানো এত সোজা নাকি?’ চরম উপহাসের পাত্র হয়েছিলাম। তবু হাল ছাড়িনি। ”

মার্কেটপ্লেসে তাঁর জীবনে প্রথম উপার্জন একটি লোগো ডিজাইনের কনটেস্ট থেকে ৩০ ডলার। তখন ছিল শীতকাল। এই টাকা দিয়ে মাকে একটি চাদর কিনে দিয়েছিলেন।

অবশেষে নিজের প্রতিষ্ঠান

ঝুঁকি তো কিছুটা ছিলই। তার পরও ২০২০ সালের শেষের দিকে অপু নিজেই অফিস নিয়ে বসলেন। মাত্র ১২ জন ছাত্রকে নিয়ে তাঁর প্রথম ব্যাচ। তাঁদের গ্রাফিক ডিজাইন শেখাতে শুরু করেন। প্রতিষ্ঠানের নাম দেন ‘ডিজাইন বিডি আইটি ফার্ম’। অপু জানান, প্রথম ব্যাচের প্রায় সবাই এখন সফল ফ্রিল্যান্সার। এরপর তিনি আরো ২৫ জনকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তাঁরাও ফ্রিল্যান্সিং করে ভালোই আয় করছেন। নিজে ফ্রিল্যান্সিং করে অন্যদের শেখানোর সময় পান? এমন প্রশ্নের জবাবে অপু বলেন, ‘বিকেলে এক ঘণ্টা সময় বাঁচিয়ে একটি মাত্র ব্যাচ চালু রেখেছি এবং ওই ব্যাচে নিজের আত্মীয়দের কাজ শেখাচ্ছি। ’ নিজের প্রতিষ্ঠানকে ভবিষ্যতে আরো উচ্চতায় নিয়ে যেতে চান অপু। আরো মানুষকে শিখিয়ে একটা কম্পানির আকার দেবেন, যার চেয়ারম্যান হবেন তিনি নিজে। এমনটাই তাঁর পরিকল্পনা।

মার্কিন প্রতিষ্ঠানের লোগো ডিজাইনার

মার্কিন প্রতিষ্ঠান টিভি স্টার্টআপে লোগো ডিজাইনার অ্যান্ড এনিমেশন মেকার হিসেবে দেড় বছর ধরে ফুল-টাইম কাজ করছেন অপু। বেতন, সুযোগ-সুবিধার কমতি নেই মোটেও। রাত ১০টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত টানা সাত ঘণ্টা ডিউটি তাঁর। নিজের কাজ সম্পর্কে অপু বলেন, ‘আমার করা সবচেয়ে আলোচিত কাজ হলো ডমিনিকান রিপাবলিকের এক ক্লায়েন্টের আরএম অটোস নামের অফিস স্টেশনারি ডিজাইন, যেটা ক্লায়েন্ট খুব বেশি পছন্দ করেন এবং আমাকে প্রজেক্ট ভ্যালু থেকে বোনাস বেশি দেন। ’

অপু আপওয়ার্ক ও ফাইবারে লোগো, ব্র্যান্ডিং, ফ্লায়ার, ব্রশিউর, টি-শার্ট, কার রপিং, ভেক্টর আর্ট ও এনিমেশন নিয়ে কাজ করেন। ফাইবারে গিগ এবং গিগের র‌্যাংকিং ভালো থাকার কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তিনি অর্ডার পান। অপুর কাজে খুশি তাঁর প্রতিষ্ঠান। অপুর রিপোর্টিং বস আবনার হিল বলেন, ‘সুদীপ্ত আমাদের সঙ্গে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ করেছেন। সারা বিশ্বে টিভি স্টার্টআপ গ্রাহকদের জন্য সর্বোচ্চ মানের এনিমেশন ও গ্রাফিক ডিজাইন করে থাকেন তিনি। ’

অর্জন

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, নাইজেরিয়া, ইতালি, ইন্ডিয়া, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের ক্লায়েন্টদের ৫০০-এও বেশি প্রজেক্ট তিনি সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। শেষ তিন বছরে তাঁর আয় ৩০ হাজার ডলারেরও বেশি। মাসে তাঁর গড় আয় দুই লাখ টাকার মতো।

সমস্যাও ছিল অনেক

যখন-তখন বিদ্যুৎ চলে যেত। ইন্টারনেট থেকে শুরু করে পারিপার্শ্বিক পরিবেশ কোনো কিছুই তাঁর অনুকূলে ছিল না। তার ওপর জানতেন না ভালো ইংরেজি। অপু বলেন, ‘ইংরেজি ও কাজের অদক্ষতার কারণে আমাকে অনেক প্রজেক্টে খারাপ ফিডব্যাক দিয়েছিলেন ক্লায়েন্টরা। এমনকি অনেক কাজ হাতছাড়াও হয়েছে। আবার ফ্রিল্যান্সার হিসেবে সামাজিক পরিচয়ে সমস্যা তো আছেই। ’

এত সমস্যার কোনোটাই অপুর যাত্রা রোধ করতে পারেনি। কারণ তত দিনে তিনি ফ্রিল্যান্সিং কাজটাকে ভালোবেসে ফেলেছেন।

প্রফাইল সাসপেন্ডের দুঃখ ভোলার নয়

১০০-এর ওপর জব সম্পন্ন করেছে—এমন একটি অ্যাকাউন্ট যদি হুট করে সাসপেন্ড হয়, কেমন লাগে! অপুর একটি অ্যাকাউন্টের অবস্থা এমনই হয়েছিল। অপু বলেন, ‘এত বড় ক্ষতি হলেও হাল ছাড়িনি। পরিবারের সান্ত্বনা আর নিজের ভালো কিছু করার অদম্য মনোবল নিয়ে আবার অ্যাকাউন্ট তৈরি করে কাজ শুরু করি। ’

আরেকবার কিছু ফ্রিল্যান্সার দিয়ে ‘ক্রিয়েটিভ ফেব্রিকা’ শপের জন্য ৮০০+ টি-শার্ট করেন তিনি। ওগুলোর মধ্য অনেক কপিরাইট ছিল। কপিরাইট চেক না করেই অপলোড করেছিলেন। ফলে ক্রিয়েটিভ ফেব্রিকা অ্যাকাউন্টটিও সাসপেন্ড হয়। এই অ্যাকাউন্ট থেকে প্রতি মাসে ২০০ ডলার আয় হতো তাঁর।

২০২০ সালের একটি ঘটনা মনে পড়লে আজও খারাপ লাগে অপুর। একজন ক্লায়েন্ট তাঁকে দিয়ে টানা ৯ ঘণ্টা কাজ করানোর পর টাকা রিফান্ড করতে বলেন। তিনি নাকি আরেকজন ভালো ডিজাইনার পেয়েছেন। সত্যি ছিল কি না, অপুর জানা নেই। তবে তিনি টাকা ঠিকই রিফান্ড করেছিলেন।

ফ্রিল্যান্সিং নিয়ে কিছু ভুল

ফ্রিল্যান্সিং নিয়ে প্রচলিত কিছু ভুলের কথা জানতে চাইলে অপু বলেন, ‘ফ্রিল্যান্সিং করার জন্য অনেক পড়াশোনা করতে হয়—এ কথা সম্পূর্ণ ভুল। আপনার যদি কর্মদক্ষতা ও যোগাযোগ দক্ষতা থাকে, তাহলে আপনি ফ্রিল্যান্সিং করতে পারবেন। আপনি দেশের একজন রেমিট্যান্স যোদ্ধা এবং বেকারত্ব দূর করছেন। এমনটা ভাবতে হবে।

লোকের কথায় কান দিতে নেই। ফ্রিল্যান্সিংয়ের কোনো ভবিষ্যৎ নেই—এ কথা সম্পূর্ণ মিথ্যা। বাংলাদেশে প্রায় সাত লাখ ফ্রিল্যান্সার। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন লাখ ফ্রিল্যান্সার সফলভাবে কাজ করে ডলার আয় করে দেশ, পরিবারকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। এটাই বা কম কিসে!’

পরিবার

অপুর গ্রামের বাড়ি বাগেরহাটের রামপালের গিগাতলা। বাবা চিংড়ি মাছের ঘেরের ব্যবসায়ী। মা-বাবা, স্ত্রী ও একমাত্র পুত্রসন্তান নিয়ে তাঁর পরিবার। তিনি সরকারি পিসি কলেজ বাগেরহাট থেকে বিবিএস সম্পন্ন করেছেন। কাজের সুবিধার জন্য এখন তিনি খুলনায় থাকেন।

আপওয়ার্ক স্পটলাইট

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের আইটি অভিজ্ঞরা কাজ করেন আপওয়ার্কে। পেশাদার ফ্রিল্যান্সারদের এত বড় কমিউনিটি আর নেই। কাজের পূর্ব অভিজ্ঞতা, টপ রেটেড প্লাস প্রফাইলসহ অন্যান্য যোগ্যতা এবং সব শর্ত পূরণ করেই অপু আপওয়ার্ক স্পটলাইট হয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে বড় মার্কেটপ্লেস আপওয়ার্ক। এখানে পৃথিবীর তাবৎ পেশাদার ফ্রিল্যান্সার কাজ করেন। এত পেশাদার মানুষের মধ্য থেকে তাঁদের কমিউনিটিতে আমার গল্প ও পারিবারিক ছবি পোস্ট করাটা আমার জন্য অনেক বড় অর্জন। এর মধ্য দিয়ে নিজের দেশকে বিশ্বের সামনে উপস্থাপন করার সুযোগ পেয়েছি। ’ অপুর আগে যে চারজন আপওয়ার্ক স্পটলাইট হয়েছেন তাঁরা হলেন শাহরিয়ার কবির (২০১৮), ওয়াহিদুল ইসলাম মুরাদ (২০২০), মাহবুব রাতুল (২০২১) ও সাইফুর রহমান (২০২১)।



সাতদিনের সেরা