ঝুট ব্যবসার হাতবদল ও দখল নিয়ে টঙ্গী শিল্পাঞ্চলে (বিসিক) প্রায়শই মোটরসাইকেলের মহড়া হয়। কয়েক দিন পর পর ব্যবসার হাতবদল ও ব্যবসা দখলের হাতিয়ার হিসেবে এই ধরনের মহড়া এখন নিত্যদিনের চিত্র। যে কোনো সময় মহড়া শুরু হওয়ার কারণে শিল্পনগরী টঙ্গীর দুই শতাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং প্রতিষ্ঠানসংলগ্ন দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ জননিরাপত্তা এখন হুমকিতে পড়ে গেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, টঙ্গী বিসিকে দুই শতাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান চলমান রয়েছে। এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ঝুটসহ নানা ধরনের লাভজনক ব্যবসা সব সময়ই রাজনৈতিকভাবে করা হয়ে থাকে। যে দল যখন ক্ষমতায় থাকে সে দলের লোকজন এসব ব্যবসা করেন। ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় শীর্ষ নেতৃবৃন্ধ অন্ধকারে থেকে ভাগ-বাটোয়ারা করেন। সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে এসব ব্যবসারও হাতবদল হয়। হাতবদলের সময় ব্যবসা দখলে বেআইনি শক্তি প্রদর্শনের জন্য মোটরসাইকেল মহড়া দিয়ে শক্তির জানান দেওয়া হয়। কারণ শিল্পপতিরা যে নেতার শক্তি বেশি তাকেই ব্যবসার সুযোগ দেয়। নিরাপত্তাজনিত কারণে শিল্পমালিকেরা শক্তিশালী নেতাদের এসব ব্যবসার সুযোগ দেন সব সময়। তবে ক্ষমতাসীন স্থানীয় নেতাদের মধ্যে কে কোন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ব্যবসা করবেন তাও আবার ওপর থেকে ডিও লেটারের মতো সংকেত আসে। কাঁচা টাকার লাভজনক এই ব্যবসার জন্য শিল্প এলাকায় এখন রাজনীতি বেশি হয়। যে এলাকায় শিল্পপ্রতিষ্ঠান যত কম রাজনৈতিক সহিংসতা ওইসব এলাকায় তত কম।
সূত্রমতে, ক্ষমতার পালাবাদলের সঙ্গে সঙ্গে কিছু দিন এসব মহড়া দিয়ে ব্যবসা দখল জবরদখল ও হাতবদল হয়। কিন্তু নেতাদের দলে গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস পেলে বা বড় নেতাদের আশীর্বাদ কমে গেলে আবার ব্যবসারও হাতবদল হয়ে যায়। রাজনীতিতে জোয়ার-ভাটা থাকার কারণে প্রায় সারা বছরই ঝুট ব্যবসার জন্য হাতিয়ার হিসেবে মোটরসাইকেল মহড়া অবধারিত হয়ে যায়। ফলে নেতারাও মহড়া দেওয়ার শক্তি সঞ্চয় করতে গিয়ে মহড়ার লোকজন হাতে রাখেন।
খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, মোটরসাইকেল মহড়ায় যারা অংশগ্রহণ করেন তাদের মধ্যে অধিকাংশই বয়সে তরুণ বা কিশোর। অল্প বয়সে কাঁচা টাকার গন্ধে তারা সহজেই মহড়ার সদস্য হয়ে যায়। এ ছাড়া টঙ্গী শিল্পাঞ্চলে ১৯টি বস্তিতে বসবাসকারী দুই লক্ষাধিক বাসিন্দার মধ্যে ৩০/৪০ হাজার মানুষ নিম্ন আয়ের ও বেকার। বেকার থাকায় জীবিকার তাগিদে তারা সহজেই চুরি, ছিনতাই, মাদক ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়ে যায়। ফলে সহজেই ঝুট ব্যবসা দখলের জন্য মোটরসাইকেল মহড়ায় কিশোরদের ব্যবহার করা যায়। আর যারা মাদক সেবন করে তাদের কিছু টাকা দিলেই মহড়ায় অংশগ্রহণ করে। ফলে মোটরসাইকেল মহড়ায় অংশ নেওয়া অধিকাংশ কিশোর ও তরুণ দুর্ধর্ষ হয়ে গেছে। তারা অ্যাকশনের সময় যা খুশি তাই করতে পারে। সাধারণ মানুষ ও শিল্পমালিকেরা এই মহড়ার ভয়ে সব সময় তটস্থ থাকে। এতে টঙ্গী শিল্পাঞ্চলের দুই শতাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও কয়েক লাখ মানুষ সব সময় নিরাপত্তা সংকটে আতঙ্কিত থাকেন। এ ছাড়া ঘনবসতিপূর্ণ টঙ্গী শিল্পাঞ্চলে বস্তির সংখ্যা বেশি হওয়ায় চুরি, ছিনতাই ও মাদকের ছড়াছড়ি অহরহ। সব মিলিয়ে টঙ্গী এখন অনিরাপদ অনেকটাই।
টঙ্গী শিল্পাঞ্চলের পাগার এলাকার হোটেল ব্যবসায়ী তাসলিমা বেগম (৪৫) জানান, বিভিন্ন মিলে প্রায়ই হোন্ডার বহর আসে। এরকম দেখলে ভয়ে আমরা হোটেল বন্ধ করে ফেলি।
টঙ্গীর তিস্তারগেট এলাকার চায়ের দোকানি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রকাশ্যেই অস্ত্র নিয়ে দোকানে চা খেতে আসে অল্প বয়সীরা। আমি ভয়ে চা-সিগারেট দিই। টাকা না দিলেও চাই না। কারণ যদি ভাঙচুর শুরু করে।
নিরাপত্তাজনিত কারণে টঙ্গীতে অবস্থিত তিনটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকার পরিবর্তন, নেতাদের ক্ষমতা কমে যাওয়া ও ঝুট ব্যবসার হাতবদলে প্রায়ই মহড়ার মুখোমুখি হই আমরা। অনেক সময় আমাদের প্রতিষ্ঠান ভাঙচুরও হয়। এসব বিষয়ে আমরা সহজে আইনের আশ্রয় নিই না। কারণ এখানেই ব্যবসা করতে হবে। তাই নিরাপত্তা একটি বড় বিষয়।
এসব বিষয়ে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম এন্ড অপস) মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, টঙ্গীতে ছিনতাই ও মাদক আগের থেকে কমেছে। আমরা ধারাবাহিকভাবে অভিযান করছি। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ কমিশনার আমাদের সব ধরনের নির্দেশনা দিয়েছেন। আশা করছি, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের থেকে উন্নতি হয়েছে, সামনে আরো উন্নতি হবে ইনশাআল্লাহ।