৯৬ বছর বয়সী বৃদ্ধা ছামেনা খাতুন। অনাহারে-অর্ধাহারে জীবন যাপন করছেন। ছেলের নতুন বিল্ডিং ঘরে ঠাঁই হয়নি। দীর্ঘ বছর ধরে মেয়ের বাড়িতে অবস্থান করতে হচ্ছে তাকে। এমন ঘটনা ঘটেছে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের আলকরা ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর গ্রামে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আলকরা ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর গ্রামের ছামেনা খাতুনের জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী জন্ম ১৯৩১ সালের ২২ নভেম্বর। ২০০৮ সালে স্বামী আবদুল হক মারা যান। ছামেনা খাতুনের তিন মেয়ে ও এক ছেলে। একমাত্র ছেলে ফয়েজ আহমেদ ২০০৬ সাল থেকে সৌদি আরব প্রবাসী। স্বামী মারা যাওয়ার পরে ছামেনা খাতুনের জীবনে দুর্দশা নেমে আসে। ২০১১ সালে ছামেনা বেগমকে তার ছেলে ফয়েজ আহমেদ ভরণপোষণ না দিয়ে পাশের বাড়ির বাসিন্দা মেয়ে রোকেয়া বেগমের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। তার পর থেকে তার অবস্থান হয় রোকেয়া বেগমের বাড়িতেই। রোকেয়া বেগমের স্বামী নেই। দুই ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে তার সংসার। দুই ছেলে দিন মজুরি করে পরিবার নির্বাহ করেন। কিন্তু ছামেনা খাতুনের খোঁজখবর রাখেন না একমাত্র ছেলে ফয়েজ আহমেদ।
সর্বশেষ চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ছামেনা খাতুনের একমাত্র ছেলে ফয়েজ আহমেদ দেশে এলে গ্রামের সর্দারগণের অনুরোধে ছেলে মাকে তার বাড়িতে নিয়ে যান। তৈরি করা হয় নতুন বিল্ডিং। ৪ মে ছেলে ফয়েজ আহমেদ আবারও সৌদি আরব চলে যান। তার পরই ছামেনা খাতুনকে নতুন বিল্ডিং ঘর থেকে বের করে দেন ফয়েজ আহমেদের স্ত্রী রুমা বেগম। গভীর রাতে ছামেনা খাতুনের সব মালামাল নিয়ে পার্শ্ববর্তী বাড়িতে তার মেয়ে রোকেয়া বেগমের ঘরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

মেয়ে রোকেয়া বেগম বলেন, ‘আমার ভাই ফয়েজ আহমেদের দুই ছেলে ও এক মেয়ে। তিনি দীর্ঘ বছর ধরে সৌদি আরবে থাকেন। আমার বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে আমার ভাই ফয়েজ আহমেদ ও তার স্ত্রী রুমা বেগম মাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতেন। ২০১১ সালে তারা আমার মাকে জোরপূর্বক আমার বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। দুই ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে আমার অভাবের সংসার। তার পরও মায়ের সব ভরণপোষণ আমরাই দিয়ে যাচ্ছি। এ বছর আমার ভাই বাড়িতে এসে নতুন বিল্ডিং ঘর দেন। সমাজের লোকজনের অনুরোধে মাকে ভাই ফয়েজ আহমেদ ঘরে তুলে নিলেও তিনি সৌদি আরব চলে যাওয়ার পর ভাইয়ের স্ত্রী রুমা বেগম রাতের আঁধারে আমার মাকে বিল্ডিং ঘর থেকে বের করে দেন। বয়স হয়ে যাওয়ায় তিনি নানা জটিল রোগে ভুগছেন।
বৃদ্ধা ছামেনা খাতুন বলেন, ‘আমাকে আমার ছেলে ঘর থেকে অনেক বছর আগে বের করে দিয়েছে। তারা আমার কোনো খোঁজখবর রাখে না। আমার তিন মেয়ে আমার ভরণপোষণ বহন করে।’
লক্ষ্মীপুর গ্রামের আবদুল মান্নান নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘ছামেনা খাতুনের দুর্দশা যেন কাটছেই না। একটি মাত্র ছেলেও তার ভরণপোষণ বহন করছে না। ২০১১ সাল থেকে তিনি মেয়ের বাড়িতে বসবাস করে আসছিলেন। এবার তার ছেলে ফয়েজ আহমেদ দেশে আসলে আমাদের অনুরোধে মা ছামেনা খাতুনকে নতুন ঘরে নিয়ে যায়। কিন্তু ছেলে বিদেশ যাওয়ার পরদিনই নতুন বিল্ডিং ঘর থেকে ছামেনা খাতুনকে পুত্রবধূ রুমা বেগম রাতের আঁধারে বের করে দেয়। বর্তমানে যে মেয়ের বাড়িতে বসবাস করছেন, তারাও অসহায়। তাদের ঘরটিও জরাজীর্ণ।’
অভিযুক্ত রুমা বেগমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে মুঠোফোনের সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করে দেন। তারপর একাধিকবার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
আলকরা ইউপির প্যানেল চেয়ারম্যান আবুল বশর বুধবার বলেন, ‘আমি আসলে বিষয়টি আপনার মাধ্যমে জানতে পারলাম। খোঁজখবর নিয়ে গ্রামবাসীকে নিয়ে ছামেনা খাতুনের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করব।’
চৌদ্দগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহাদাৎ হোসেন বলেন, ‘ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। এ বিষয়ে আমি স্থানীয় চেয়ারম্যানকে দায়িত্ব প্রদান করব এবং ছামেনা খাতুনের ভরণপোষণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’






