মেঘনার ভাঙনে ঘরবাড়ি হারিয়ে স্বামী-সন্তানদের নিয়ে ভোলার দৌলতখানের চরমুন্সি গ্রামে আসেন শহিদা বেগম। চরের এই গ্রামে তিন বছর ধরে আশ্রয়ণের ঘরে বসবাস করছেন তিনি। দুর্গম চরাঞ্চলে বাস করলেও ঝড়ঝঞ্ঝার সময় আতঙ্কে দিন কাটে তাদের। কেননা, চরে কোনো ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নেই।
শহিদা বেগম বলেন, ‘ঝড় হলে ছেলে-সন্তান নিয়ে ভাঙা ঘরের মধ্যে বইয়া বইয়া আল্লাহ আল্লাহ করি। যাওয়ার কোনো জায়গা নাই। কোনো খানে যাইয়া যে একটু আশ্রয় নিমু, সেটি পারি না। তাই কী করমু, ঘরে বইয়া আল্লাহরে ডাকা ছাড়া আর উপায় নাই। আল্লায় আমাগোরে বাঁচায়া রাখে।’
দৌলতখান উপজেলার মেঘনার মধ্যবর্তী মদনপুর ইউনিয়নের চরমুন্সি গ্রামে শহিদা বেগমের মতো বসবাস সাড়ে চার হাজার মানুষের। কৃষিনির্ভর এই চরে রয়েছে কয়েক হাজার গরু-মহিষ। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগে আশ্রয় নেওয়ার মতো নেই আশ্রয়কেন্দ্র। ফলে অনিশ্চিত জীবনে সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা রেখেই ঝড়-জলোচ্ছ্বাস মোকাবেলা করতে হয় তাদের।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চরমুন্সির মতো ভোলায় প্রায় ২১টি বিচ্ছিন্ন চর রয়েছে। মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর মধ্যবর্তী ২১টি চরের ৯টিতেই নেই কোনো আশ্রয়কেন্দ্র। বাকি ১২টিতে নামমাত্র দু-একটি করে আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
এদিকে জেলার ২০ লাখ মানুষের দুর্যোগে আশ্রয়ের জন্য ৯১৯টি স্কুল-কাম সাইক্লোন শেল্টার রয়েছে। এর মধ্যেও শতাধিক সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ অবস্থায়। এতে আশ্রয় নিতে পারবে মোট বসতির চার ভাগের এক ভাগ। বাকি তিনভাগ থেকে যাচ্ছে অরক্ষিত।
স্থানীয় তথ্যানুযায়ী, সাগরকূলের ঢালচর, পূর্ব ঢালচর; মেঘনার মধ্যবর্তী চর লাদেন, চর লক্ষ্মী, হাজিপুর, চর সামসুদ্দিন, কাজিরচর, চর সুলতানি এবং তেঁতুলিয়ার মধ্যবর্তী চর কচুয়াখালীতে কোনো আশ্রয়কেন্দ্র নেই। এসব চরে বসতির সংখ্যা অর্ধলক্ষাধিক। এছাড়া প্রয়োজনীয় আশ্রয়কেন্দ্রের অভাবে মেঘনা ও তেঁতুলিয়ার মধ্যবর্তী ২১টি চরের বাসিন্দাদের অর্ধেকের বেশি নিরাপদ আশ্রয়ের বাইরে থেকে যায়। নাজুক কাঁচা ঘরই ভয়াবহ দুর্যোগ মোকাবেলায় তাদের একমাত্র ভরসা। এছাড়া মূল ভুখণ্ডের নদীতীরের এলাকাগুলোতেও আশ্রয়কেন্দ্রের সংকট রয়েছে।
এছাড়া মূল ভূখণ্ড থেকে বিছিন্ন দুর্গম এলাকা চর নিজামের তিন হাজার মানুষের জন্য একটি, কলতলির চরের ২০ হাজার মানুষের জন্য দুইটি, চর মোজাম্মেলে সাত হাজার মানুষের জন্য একটি, মেদুয়ায় পাঁচ হাজার মানুষের জন্য দুইটি ও মদনপুরের ১০ হাজার মানুষের জন্য দুইটি স্কুল-কাম সাইক্লোন শেল্টার রয়েছে।
চর মুন্সি এলাকার বাসিন্দা মো. মনির হোসেন জানান, মদনপুর ইউনিয়নের কয়েকটি ওয়ার্ড মেঘনা নদীর ভাঙনে বিলীন হয়ে যাওয়ায় সেখানকার বাসিন্দারা চর মুন্সি এলাকায় বসতি স্থাপন করেছেন। তবে এখানে সাড়ে ৪০০ পরিবার বাস করলেও প্রকৃতিক দুর্যোগে আশ্রয় নেওয়ার জন্য কোনো আশ্রয়কেন্দ্র নেই। ঝড় এলে নিজেদের কাঁচা ঘরেই তাদের ভরসা। গবাদি পশুর জন্য উঁচু কিল্লা না থাকায় বেশিরভাগ সময় ঝড়ে গরু-মহিষ পানিতে ভেসে যায়। তাই চরের বাসিন্দাদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র করার দাবি তাদের।
মনদপুর ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. হেলাল উদ্দিন জানান, যুগ যুগ ধরে অরক্ষিত চরে বসবাস করে আসছে বাসিন্দারা। মেঘনায় মাছ ধরা আর গবাদি পশু পালন করেই চলে চরের মানুষের জীবিকা। তিনি জানান, তার ইউনিয়নের প্রায় ১০ হাজার মানুষের জন্য মাত্র দুইটি সাইক্লোন শেল্টার রয়েছে। এর মধ্যে চরমুন্সির সাড়ে চার হাজার মানুষের জন্য একটিও নেই। তাই তাদের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র বাড়ানো জরুরি।
সাগরকূলের ঢালচরের বাসিন্দা রফিক ফরাজি জানান, দুর্যোগ শুরু হলে গবাদি পশু রেখে অনেক পরিবার অন্যত্র যেতে চায় না। দুর্যোগ সংকেত ৮ থেকে ১০ হলে প্রশাসনের পক্ষে এসব মানুষ সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয় না। কারণ তখন নদীতে কোনো নৌযান চলাচল করতে পারে না। এমন পরিস্থিতিতে জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যাওয়া বা ঘরে বসে প্রাণ দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না।
ভোলার জেলা প্রশাসক ডা. শামীম রহমান বলেন, যেসব চরে সাইক্লোন শেল্টার নেই, সেখানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নির্মাণ করা হবে। দুর্যোগে যেন সবাইকে আশ্রয়ের আওতায় আনা যায়, সে লক্ষ্যে কাজ চলছে। আর যেগুলো রয়েছে সেগুলোকে ব্যবহার উপযোগী করতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।