<p>দুই বছর আগে কুকুরের কামড়ে ছোট ছেলে আলা উদ্দিনের (১২) মৃত্যু হয়। এর রেশ কাটতে না কাটতেই গত রবিবার আরো দুই ছেলে আজির উদ্দিন ও আমির উদ্দিন সিলেটে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়। এত পাগলপ্রায় সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুরের উপজেলার মুক্তিখলা গ্রামের বাসিন্দা দিনমজুর আব্দুল গফ্ফার। তার সংসার যেন জন্ম থেকেই দুঃখের সঙ্গে বাঁধা। জরাজীর্ণ টিনের বসতবাড়িতে অভাব-অনটনের সঙ্গেই ছিল তার সংগ্রাম। যাদের ওপর জীবন-জীবিকা অবলম্বন ছিল তারা আর বেঁচে নেই।</p> <p>গত রবিবার (৩ মে) সকালে সিলেটের তেলিবাজার এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় আজির উদ্দিন (২২) আর আমির উদ্দিন (১৯) দুজনেই প্রাণ হারালে যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে আব্দুল গফফারের মাথায়। দুই ছেলে হারিয়ে আগামী দিনগুলোতে অসুস্থ স্ত্রী, প্রতিবন্ধী মেয়ে, বড় ছেলের রেখে যাওয়া সন্তানসম্ভবা স্ত্রী, ছেলে হাবিব (৬), হাফিজুর (৪) আর ছোট্ট মেয়ে হালিমার (২) ভবিষ্যৎ অনিশ্চিতে দিশেহারা তিনি।</p> <p>সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, একসঙ্গে দুই ছেলে হারিয়ে জরাজীর্ণ বাড়ির ভেতরে মায়ের আহাজারি থামছে না। বাড়িতে আসছেন স্বজন আর পাড়া-প্রতিবেশীরাও। তারা সান্ত্বনা দিলেও পুত্রশোকে পাগলপ্রায় মা। নিহত আজির উদ্দিনের শিশুসন্তানরা এখনো কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। </p> <p><img alt="00" height="622" src="https://asset.kalerkantho.com/public/news_images/share/photo/shares/online/2026/05/04/my1240/আব্দুল গাফফার (2).jpg" width="1000" /></p> <p>মায়ের চিকিৎসাসহ নানা ঝামেলায় পরে ৫০ হাজার টাকা ঋণ করে। সেই টাকা পরিশোধ করতেই কাজের উদ্দেশ্যে বের হয়ে সিলেট যান আজির উদ্দিন ও আমির উদ্দিন। কিন্তু তাদের নিথর দেহ বাড়িতে ফিরবে, তা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না পরিবারের স্বজন ও এলাকাবাসী। একটি দুর্ঘটনা কিভাবে একটি পুরো পরিবারকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে, তারই নির্মম উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এ ঘটনা।</p> <p>জানা গেছে, মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় দুই নির্মাণ শ্রমিক আজির উদ্দিন ও আমির উদ্দিন মৃত্যুর পর আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে তাদের লাশ বাড়িতে নিতে পারেনি পরিবার। পরে পরিবারের চরম আর্থিক সংকটের বিষয়টি জানাজানি হলে সিলেটের একটি সামাজিক সংগঠন তাদের লাশ বাড়িতে নেওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়। রাতেই হয় তাদের দাফন।</p> <p>প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে আরো জানা গেছে, জরাজীর্ণ টিনের বসতবাড়িতে পরিবারের প্রতিবন্ধী মেয়ে রাজমিনা, অসুস্থ স্ত্রী, দুই সন্তান আজির উদ্দিন ও আমির উদ্দিনকে নিয়ে অভাব-অনটনের সঙ্গে সংগ্রাম ছিল আব্দুল গফফারের প্রতিদিনের সঙ্গী। সঙ্গে ছিল বড় ছেলের তিন সন্তান আর বউ।</p> <p>আব্দুল গফফার নিজেও কিছুদিন আগে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে বাড়িতে শয্যাশায়ী। সে কারণে সংসারের হাল ধরতে বড় ছেলে আজির উদ্দিন তার সন্তানসম্ভবা স্ত্রী শাহানা বেগমসহ বড় ছেলে হাবিব, হাফিজুর আর ছোট্ট মেয়ে হালিমাকে রেখে ছোট ভাই আমির উদ্দিনকে সঙ্গে নিয়ে কাজের সন্ধানে ৬ মাস আগে সিলেটে যান। সেখানে নির্মাণ শ্রমিকের কাজও শুরু করছিলেন তারা।</p> <p>গত ৩ মে সকালে সিলেটের তেলিবাজার এলাকায় সংসারের মূল হাতিয়ার দুই ছেলেকে সড়ক দুর্ঘটনায় হারিয়ে আব্দুল গফফারের পরিবারে ঘোর অন্ধকার নেমে এসেছে। রাতে লাশ বাড়িতে এলে কান্নার রোল পড়ে বাড়িটিতে। শোকে স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো এলাকা। </p> <p><img alt="11" height="622" src="https://asset.kalerkantho.com/public/news_images/share/photo/shares/online/2026/05/04/my1240/আব্দুল.jpg" width="1000" /></p> <p>স্থানীয় বাসিন্দা মনির হোসেনসহ অনেকেই জানান, জরাজীর্ণ টিনের ঘরে বসবাস করা এই পরিবারটি এখন সম্পূর্ণভাবে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে। নিহত আজির উদ্দিনের স্ত্রী শাহানা বেগম-সন্তান সম্ভবা, জীবনের একমাত্র অবলম্বন হাসি কান্নার সাথীকে হারিয়ে তিন সন্তানের জননী নির্বাক। এই পৃথিবীতে সামনে আরো একটি নতুন প্রাণ আসতে যাচ্ছে। কিন্তু সেই সন্তানের যেমন মুখ বাবা দেখতে পেল না তেমনি বাবার মুখ দেখার সুযোগ আর হবে না কখনো অনাগত শিশুটির। এদিকে বড় ছেলে হাবিব, হাফিজুর আর ছোট্ট মেয়ে হালিমা কোনো কিছুই যেন বুঝতে পাররছে না। </p> <p>বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবদুল মতিন খান জানান, এই পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরেই চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নগদ অর্থ সহায়তা করা হয়েছে। ওই পরিবারের বসত বাড়ি করাসহ সার্বিক সহায়তা করা হবে।</p>