এপ্রিল মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের কথা। ময়মনসিংহের কয়েকজন সংস্কৃতিকর্মী যান নগরের জেলখানার ঘাট এলাকায়। উদ্দেশ্য, ব্রহ্মপুত্রপাড়ে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য জায়গা নির্ধারণ।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি করা হবে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে। অনুষ্ঠানের নাম ‘বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে’। নববর্ষ উদযাপনের পাশাপাশি ওই অনুষ্ঠানে ব্রহ্মপুত্র নদ মরে যাওয়ার জন্য আক্ষেপও করা হবে।
সংস্কৃতিকর্মীরা চলে যাওয়ার পর জেলখানার ঘাট এলাকায় যতদূর চোখ যায়, ব্রহ্মপুত্রের অনেক জায়গায় হাঁটু পরিমাণ পানিও নেই। অনেক জায়গায় চর পড়েছে। কসরত করে এদিক ওদিক ঘুরছে খেয়া নৌকা।
এদিকে, ছয় বছর ধরে ময়মনসিংহে চলছে ব্রহ্মপুত্র নদের খনন কাজ। প্রকল্পের উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়, ব্রহ্মপুত্র নদে শুকনো মৌসুমেও যেন নৌযান চলাচলের উপযোগী পানি থাকে। কিন্তু ছয় বছরেও সে উদ্দেশ্য পুরণ হয়নি। নৌযান চলাচলের উপযোগী হওয়ার বদলে শুকনো মৌসুমে ব্রহ্মপুত্র নদে হাঁটু পানিও থাকে না। অনেকে তখন পায়ে হেঁটে ব্রহ্মপুত্র পার হন।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডাব্লিউটিএ) এ খনন কাজ করাচ্ছে ঠিকাদারের মাধ্যমে। প্রকল্প অনুযায়ী ৯০ মিটার প্রস্থে ১০ ফুট গভীরতায় খনন করা হবে, যাতে ওই অংশে বর্ষাকাল ছাড়াও সারা বছর নৌযান চলাচলের উপযোগী পানি থাকে। ২০২০ সালে শুরু হওয়া প্রকল্প ২০২৪ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে ব্রহ্মপুত্রে সারা বছর নৌযান চলাচলের উপযোগী পানি না থাকায় মেয়াদ বাড়ানো হয় ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত। এর পরও উদ্দেশ্য পূরণ না হওয়ায় মেয়াদ বাড়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত।
প্রকল্প অনুযায়ী, গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া উপজেলার টোক এলাকা থেকে কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর হয়ে গাইবান্ধার ফুলছড়ি পর্যন্ত মোট ২২৭ কিলোমিটার অংশে হবে এ খনন কাজ। এতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে দুই হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা।
খনন কাজ ছয় বছর ধরে চললেও এ প্রকল্পে সুফল পাওয়া নিয়ে শুরু থেকেই সংশয় প্রকাশ করে আসছেন ময়মনসিংহের সংস্কৃতিকর্মীসহ নাগরিক সমাজের মানুষ। বিভিন্ন সময় তারা খনন কাজের নানা অসঙ্গতি নিয়ে সভা-সেমিনার এমনকি রাজপথে প্রতিবাদ কর্মসূচিও পালন করেছেন তারা। সংস্কৃতিকর্মী নদের চরে কর্মসূচি পালন করছেন।
তাদের ভাষ্য, শুরু থেকেই এ খনন কাজ অপরিকল্পিতভাবে চলছে। খননের বালু নদীর পাড়েই রাখা হচ্ছে। ওই বালু নিলামে বিক্রি করার কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে নিলাম হতে দীর্ঘ সময় লাগে। ওই সময়ের মধ্যে স্তূপ করে রাখা বালু আবারও বৃষ্টির পানিতে ভেসে ব্রহ্মপুত্র নদের পানিতে মিশে যাচ্ছে। এতে খননের সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।
‘ব্রহ্মপুত্র সুরক্ষা আন্দোলন’ নামের নাগরিক সংগঠনের সমন্বয়ক আবুল কালাম আল আজাদ এ বিষয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, ব্রহ্মপুত্র নদের খনন কাজ শুরু হয়েছে সঠিক পরিকল্পনা ছাড়াই। এত বড় একটি প্রকল্প শুরু করার আগে উচিৎ ছিল বিজ্ঞানসম্মতভাবে সম্ভাব্যতা যাচাই করা। নদীর তলদেশের অবস্থা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ যাচাই করে দেখা। কিন্তু এসবের কোনো কিছু না করেই খনন শুরু হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘শুরু থেকেই বোঝা গেছে এই খনন কোনো সুফল বয়ে আনবে না। আমি বহুবার বলেছি, এ খনন মূলত ব্রহ্মপুত্রকে আরো মেরে ফেলার শামিল।
ময়মনসিংহের বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০২০ সালের শুরুতে জেলায় শুরু হয় ব্রহ্মপুত্র খনন। ২০২১ সালের নভেম্বর মাসে খনন হওয়া ময়মনসিংহ নগরের জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালাসংলগ্ন ও কাচারি ঘাট এলাকায় অসংখ্য চর জাগে।
চর দেখে স্থানীয় বাসিন্দা ও নৌকার মাঝিরা জানান, খনন কাজ শুরুর আগে কখনো এমন চর জাগতে দেখেননি তারা। সরকারের টাকা ব্যয়ে খনন কাজের পরও নদীতে চর জেগে উঠলে ময়মনসিংহের একটি নাট্য সংগঠন ওই চরে প্রতিবাদী নাটক মঞ্চস্থ করে। আরো একটি সংগঠন নদের চরে ‘মৃতের চিৎকার’ নামে প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে। ওই দুটি ঘটনাই ব্যপক সাড়া ফেলে। প্রশ্ন ওঠে ব্রহ্মপুত্র খনন নিয়ে।
পরে ২০২১ সালের ৬ ডিসেম্বর খনন প্রকল্পের তখনকার পরিচালক রাকিবুল ইসলাম তালুকদার ময়মনসিংহ প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে চর জাগার কারণ ব্যাখ্যা করেন। পরিচালক বলেছিলেন, পলি জমে প্রাকৃতিক কারণেই চর জেগেছে। খনন কাজ কয়েক বছর চললে চর জাগবে না।
তবে সম্প্রতি সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, ব্রহ্মপুত্র নদের বুকে অসংখ্য চর জেগেছে। গত এপ্রিল মাস পর্যন্ত এসব চর জাগে বলে জানায় স্থানীয়রা।
ব্রহ্মপুত্র নদ খনের দায়িত্বে থাকা বিআইডাব্লিউটিএ’র একজন প্রকৌশলী কালের কণ্ঠের সঙ্গে আলাপের সময় জানান, নানা কারণেই ব্রহ্মপুত্র খনন কাজের সুফল পাওয়া নিয়ে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
প্রথমত, ব্রহ্মপুত্র নদের উৎসমুখ হিসেবে পরিচিত গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলায় যমুনা নদীর সঙ্গে সংযোগস্থল। মূলত ব্রহ্মপুত্র নদে পানি ওই উৎস নিয়ে প্রবেশ করে। তবে প্রাকৃতিক কারণে সংযোগস্থলটি বছরের আট মাসই শুকনো থাকে। এ কারণে ব্রহ্মপুত্রে পানি ঢুকতে পারে না। ওই অংশে দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে চেষ্টা করে বিআইডাব্লিউটিএ খনন কাজ করতে পারেনি স্থানীয়দের বাধার কারণে। মানুষের ফসলি জমি থাকায় তারা ব্রহ্মপুত্র খনন করতে দেয় না।
শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের জুন মাস থেকে সেখানে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ব্রহ্মপুত্র খননের কাজ শুরু হয়েছে।
এছাড়া আরো একটি চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, খননের মাটি ব্যবস্থাপনা। খননের আগে পরিকল্পনা ছিল নদের পাড়েই রাখা হবে মাটি। পরে তা নিলামে বিক্রি করা হবে। তবে সব এলাকায় খাস জমি না পাওয়ায় মাটি রাখতে গিয়ে বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। আবার বিভিন্ন জায়গায় মাটি রাখার পর তা বৃষ্টিতে আবারও নদীর পানিতে মিশে গিয়ে ভরাট হচ্ছে খনন হওয়া ব্রহ্মপুত্র। এছাড়া খনন শুরুর পর থেকে ব্রহ্মপুত্রের তলদেশে পানির স্তর অন্তত দেড় ফুর নিচে নেমে গেছে।
ব্রহ্মপুত্র খননের ময়মনসিংহ জেলার দায়িত্বে থাকা বিআইডাব্লিউটিএ’র নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মহসীন কালের কণ্ঠকে বলেন, শুরু থেকেই আমরা অনেকগুলো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। এ কারণে এখনো খননের আশানুরূপ ফল পাওয়া যাচ্ছে না। তবে গ্রাম এলাকার কৃষক খননের সুফল পাচ্ছে বলে আমাদের জানিয়েছেন। আবার নৌযান চলতেও দেখা গেছে ব্রহ্মপুত্রে।
নির্বাহী প্রকৌশলী আরো বলেন, বাস্তবতা হচ্ছে ব্রহ্মপুত্র নদ বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ভরাটপ্রবণ একটি নদী। একদিকে খনন হলে অন্যদিকে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এ সমস্যা কাটাতে একসঙ্গে যতগুলো ড্রেজার মেশিন ব্যবহার করা প্রয়োজন, ততগুলো পাওয়া যাচ্ছে না। তবে আশার কথা হচ্ছে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে গাইবান্ধার ফুলছড়িতে সংযোগস্থলে খনন কাজ চলছে। এটি অবশ্যই সুফল বয়ে আনবে।





