প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন থেকে প্রতিবছরের মতো এবারও এপ্রিল ও মে মাসজুড়ে মধু সংগ্রহ করেছেন মৌয়ালরা। তবে এ বছর মৌয়াল ও সংগ্রহ করা মধুর পরিমাণ অনেক কম। এতে বিপাকে এ খাতে জড়িতরা।
মৌয়ালরা বলছেন, মধু সংগ্রহের জন্য তাদের ‘জলে কুমির আর ডাঙায় বাঘ’-এর ভয় সঙ্গে নিয়ে বনে যেতে হয়। তার ওপর এবছর ছিল দস্যুদের তৎপরতা। ফলে সুন্দরবন নির্ভর মানুষের জীবিকা ও জিআই স্বীকৃতি পাওয়া আন্তর্জাতিক বাজারে সম্ভাবনা তৈরি হওয়া মধুর বাজার- দুটোই ছোট হয়ে আসছে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে মধু সংগ্রহ করা হয়েছিল মোট চার হাজার ৪৬৩ কুইন্টাল, ২০২২ সালে তিন হাজার আট কুইন্টাল এবং ২০২৩ সালে দুই হাজার ৮২৫ কুইন্টাল। ২০২৪ সালে কিছুটা বেড়ে হয়েছিল তিন হাজার ১৮৩ কুইন্টাল। তবে ২০২৫ সালে আবার সংগ্রহ হয়েছিল দুই হাজার ৭৬ কুইন্টাল। চলতি বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র এক হাজার ৭৩৮ কুইন্টালে।
সূত্র জানায়, ২০২৪ সালে সুন্দরবনে মধু সংগ্রহে নিয়োজিত ছিলেন প্রায় আট হাজার মৌয়াল। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় প্রায় পাঁচ হাজারে। আর চলতি বছর মধু আহরণে নিয়োজিত ছিলেন তিন হাজার ৪৭৯ জন মৌয়াল। দুই বছরের ব্যবধানে মৌয়ালের সংখ্যা কমেছে অর্ধেকের বেশি। মধু আহরণ কমেছে প্রায় ৪৫ শতাংশ।
সুন্দরবনে মধু আহরণ কমার পেছনে ছয়টি কারণ চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞ ও মৌয়ালরা। তারা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সময়মতো বৃষ্টিপাত না হওয়া, সনাতন পদ্ধতিতে মধু সংগ্রহ, বনের অভয়ারণ্য এলাকা বাড়ানোয় মধু আহরণের ক্ষেত্র ছোট হওয়া, মৌয়াল কমে যাওয়া, বনদস্যু আতঙ্ক এবং মধু সংগ্রহের সময়সীমা এক মাস কমানোর কারণে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
মৌয়ালরা জানান, আগে বনবিভাগ এপ্রিল, মে ও জুন মাসে মধু সংগ্রহের অনুমতি দিত। কিন্তু গত চার বছর ধরে শুধু এপ্রিল ও মে মাসে মধু সংগ্রহ করতে দিচ্ছে। এ ছাড়া সুন্দরবনের অভয়ারণ্য এলাকা ২৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫২ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে, কিন্তু বর্ধিত এলাকায় মধু সংগ্রহের অনুমতি দেয় না বন বিভাগ। তাছাড়া গত দুই বছরে বনদস্যুর অত্যাচার বেড়েছে। এসব কারণে মৌয়াল ও মধু সংগ্রহের পরিমাণ কমেছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সুন্দরবনের মধু সংগ্রহের প্রধান কেন্দ্র হলো পশ্চিম ও পূর্ব বন বিভাগ। পশ্চিম বন বিভাগ থেকে এ বছর সংগ্রহ করা মধুর পরিমাণ ১৩১৭ কুইন্টাল। অন্যদিকে যেখানে পূর্ব বন বিভাগ থেকে সংগ্রহ হয়েছে ৪২১ কুইন্টাল ।
পশ্চিম বন বিভাগে খুলনা রেঞ্জ থেকে ৪৪০ কুইন্টাল এবং সাতক্ষীরা রেঞ্জ থেকে ৮৭৭ কুইন্টাল মধু পাওয়া গেছে। আর পূর্ব বন বিভাগে চাঁদপাই রেঞ্জে ২৮৮ কুইন্টাল এবং শরণখোলা রেঞ্জে ১৩৩ কুইন্টাল মধু সংগ্রহ করা হয়েছে।
এদিকে, সংগ্রহ করা মধুর পরিমাণ কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার প্রায় তিন হাজার মৌয়াল। খুলনার কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের গোলখালি গ্রামের মৌয়াল আমজাদ আলি সরদার জানান, বাঘ, সাপ, কুমিরের ভয় উপেক্ষা করে ১৭ বছর ধরে সুন্দরবন থেকে মধু আহরণ করছেন তিনি। কিন্তু মধুর পরিমাণ কমে যাওয়ায় এখন আর আগের মতো লাভ হয় না।
আমজাদ আলি বলেন, ‘গত বছর আমি সুন্দরবনে মধু সংগ্রহে গিয়েছিলেন। এবার যাইনি। এখন বনের ভেতর গত দুই বছরে জলদস্যু বেড়েছে। একবার তাদের হাতে ধরা পড়লে ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ দিতে হয়। নির্যাতন তো আছেই। তাই এই বছর বাদ যাইনি।’
শ্যামনগর উপজেলার মুন্সীগঞ্জ গ্রামের মৌয়াল নুরমান শেখ জানান, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মধু আহরণ করতে হয়। তার ওপর মধু কমে গেছে। এ কারণে এ পেশা ছেড়ে দেওয়ার চিন্তাভাবনা করছেন তিনি।
কয়রার মহেশ্বরীপুর এলাকার মৌয়াল আবু ইছা ও আফজাল হোসেন জানান, গত বছর ১২ সদস্যের দলের প্রত্যেক সদস্য দুই মণের বেশি মধু পেয়েছিলেন। মৌসুমে খরচ প্রতিজন ১০ হাজার থেকে ১৩ হাজার টাকা। আর দুই মণ মধু বিক্রি করে আয় হয়েছিল প্রায় ৮০ হাজার টাকা।
তারা জানান, এ বছর আট সদস্যের দলের সঙ্গে মধু আহরণের যান তারা। কিন্তু একেকজন এক মণের একটু বেশি মধু পেয়েছেন। তাদের ভাষ্য, ‘কোনো রকম খরচটা উঠেছে, লাভ হয়নি। কীভাবে সংসার চলবে সেই চিন্তায় আছি।’
মৌয়াল পরিবার ও বাঘ বিধবাদের নিয়ে কাজ করেন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ইনিশিয়েটিভ ফর কোস্টাল ডেভেলপমেন্ট (আইসিডি)-এর প্রতিষ্ঠাতা মো. আশিকুজ্জামান। তিনি বলেন, দেশের বাজারে মধুর প্রচুর চাহিদা। ভেষজ গুণ, স্বাস্থ্য উপকারিতা এবং স্বাদে বৈচিত্র্যের কারণে সুন্দরবনের মধু সবসময়ই ক্রেতাদের প্রথম পছন্দের তালিকায় থাকে।
তবে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে এ বছর সুন্দরবন থেকে সংগ্রহ করা মধুর পরিমাণ গত পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। ফলে মধু কমে যাওয়ায় বাজারে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, দাম বাড়ছে দাম এবং ভেজালের প্রবণতাও বাড়ছে।
এদিকে, মধু উৎপাদনের এই ধস এমন এক সময় দেখা দিয়েছে, যখন বাংলাদেশের মধু আন্তর্জাতিকভাবে নতুন একটি পরিচিতি অর্জন করেছে। সম্প্রতি সুন্দরবনের মধু ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন (জিআই) বা ভৌগোলিক নির্দেশক স্বীকৃতি পেয়েছে, যা একটি দেশের নির্দিষ্ট অঞ্চলের পণ্যের মান, বৈশিষ্ট্য ও সুনামকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
এই স্বীকৃতির ফলে সুন্দরবনের মধু আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়। কিন্তু সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়নের আগেই মধু সংগ্রহে এ ধসকে উদ্বেগজনক বলছেন সংশ্লিষ্টরা। উৎপাদন কমে যাওয়ায় শুধু দেশীয় বাজারই নয়, ভবিষ্যতের রপ্তানি বাজারও হুমকির মুখে পড়বে বলে মনে করছেন তারা।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, ‘সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বিভিন্ন বাহিনীর সমন্বয়ে কাজ করা হচ্ছে। মধু সংগ্রহের পরিমাণ এ বছর তুলনামূলক কম হলেও আমরা মৌয়ালদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তার জন্য কাজ করে যাচ্ছি।’
বন কর্মকর্তা বলেন, ‘বনাঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি মৌয়ালদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। আশা করা যায়, আগামী বছর পরিস্থিতির উন্নতি হবে এবং মৌয়াল ও সংগ্রহ করা মধুর পরিমাণ বাড়বে।’





