বিশ্ববাজারে মার্কিন ডলারের শক্তিশালী অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) সুদের হার বাড়ানোর অনমনীয় মনোভাবের কারণে সোনার দামে বড় পতন হয়েছে। শুক্রবার (১৯ জুন) আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবান এই ধাতুর দাম আরও কমেছে, যা টানা তৃতীয় সপ্তাহের মতো সাপ্তাহিক দরপতনের রেকর্ড গড়ল। খবর রয়টার্স
আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, স্পট মার্কেটে সোনার দাম ১ দশমিক ৫ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ১৪৫ দশমিক ০২ ডলারে নেমে আসে। এর আগে দিনের শুরুতে এটি গত ১১ জুনের পর সর্বনিম্নে নেমে ৪ হাজার ১১৯ দশমিক ৭৮ ডলারে ঠেকেছিল। বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গত ৫ জুন থেকেই সোনা তার ২০০ দিনের গড় দামের (মুভিং অ্যাভারেজ) নিচে কেনাবেচা হচ্ছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সোনার ভবিষ্যৎ সরবরাহ মূল্য (গোল্ড ফিউচার্স) ১ দশমিক ৯ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ১৬৩ দশমিক ২০ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
চলতি সপ্তাহে মার্কিন ডলারের দর বৃদ্ধির ধারা বজায় থাকায় অন্যান্য মুদ্রার ব্যবহারকারীদের জন্য ডলারের মূল্যে সোনা কেনা বেশ ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। ফলে কমেছে সোনার চাহিদা।
জেফরিসের মালিকানাধীন ট্রেডু ডটকমের জ্যেষ্ঠ বাজার বিশ্লেষক নিকোস জাবোরাস বলেন, ‘সোনার বাজার এখন বড় ধরনের মন্দার (বেয়ার মার্কেট) ঝুঁকিতে রয়েছে। যেকোনো সময় দাম প্রতি আউন্স ৪ হাজার ডলারের নিচে নেমে যেতে পারে। ফেড সুদের হার দীর্ঘদিন চড়া রাখবে—এমন আভাসে ডলার লাভবান হলেও সোনার মতো অলংকারিক ধাতুর বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
গত বুধবার মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি-নির্ধারকদের বৈঠক শেষে এক প্রক্ষেপণে জানানো হয়, ১৯ জন নীতি-নির্ধারকের মধ্যে ৯ জনই মনে করেন চলতি বছর সুদের হার আরও বাড়ানো প্রয়োজন। যদিও এবারের বৈঠকে সুদের হার বর্তমান ৩ দশমিক ৫০ থেকে ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশের ঘরেই অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। তবে সিএমই ফেডওয়াচ টুলের হিসাব অনুযায়ী, ব্যবসায়ীরা আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে ফেডের সুদের হার বৃদ্ধির ৭০ শতাংশ সম্ভাবনা দেখছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সোনার ভবিষ্যৎ দাম এখন মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে—যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার কূটনৈতিক আলোচনা, আগামী সপ্তাহের মার্কিন মূল্যস্ফীতির (ইনফ্লেশন) প্রতিবেদন এবং ফেডের নীতিমালার প্রতি বিনিয়োগকারীদের প্রতিক্রিয়া।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিরসনে সুইজারল্যান্ডে ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যে বৈঠক হওয়ার কথা ছিল, তা বাতিল হয়েছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সুইজারল্যান্ড সফর বাতিল করায় এই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যা ভূ-রাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকস আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সোনার দামের পূর্বাভাস কমিয়েছে। আগের ৫ হাজার ৪০০ ডলারের প্রক্ষেপণ থেকে কমিয়ে তারা এখন প্রতি আউন্স সোনার দাম ৪ হাজার ৯০০ ডলার হতে পারে বলে জানিয়েছে। তবে ব্যাংকটি মনে করে, দীর্ঘমেয়াদে সোনার বাজার ইতিবাচক হলেও স্বল্পমেয়াদে দাম আরও কমতে পারে।
সোনার পাশাপাশি বিশ্ববাজারে অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দামও কমেছে। স্পট সিলভার বা রুপার দাম ১ দশমিক ৮ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৬৪ দশমিক ৬১ ডলারে নেমেছে। এছাড়া প্ল্যাটিনামের দাম ১ দশমিক ৮ শতাংশ কমে ১ হাজার ৬৬৫ দশমিক ০৭ ডলার এবং প্যালাডিয়ামের দাম ১ দশমিক ৯ শতাংশ কমে ১ হাজার ২৫৪ দশমিক ১৬ ডলারে দাঁড়িয়েছে। সোনার মতো এই তিনটি ধাতুরও সপ্তাহ শেষে দরপতন হয়েছে।
দেশের বাজারে ভ্যাটসহ প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) ২২ ক্যারেটের স্বর্ণের দাম পড়বে দাম ২ লাখ ২৮ হাজার ৫৫৬ টাকা। এছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ১৮ হাজার ২৯২ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ১ লাখ ৮৭ হাজার ৪৪০ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ১ লাখ ৫৩ হাজার ১৪৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এদিকে ২২ ক্যারেটের এক ভরি রুপার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ হাজার ২৪৯ টাকা। এছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ৫ হাজার ১৬ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ৪ হাজার ২৫৭ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি রুপার দাম ৩ হাজার ২০৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।









