আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন ডলারের দাম বেড়ে এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড) মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়াতে পারে—এমন আভাসে বিনিয়োগকারীদের মাঝে ডলার কেনার হিড়িক পড়েছে। আর ডলারের এই রেকর্ড লাফের কারণে বিশ্ববাজারে বড় পতন হয়েছে মূল্যবান ধাতু সোনার দামে। মঙ্গলবার (২৩ জুন) আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম প্রায় ২ শতাংশ কমে গেছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, স্পট মার্কেটে প্রতি আউন্স (১ আউন্স = ২.৪৩ ভরি) সোনার দাম ১.৮ শতাংশ কমে ৪ হাজার ১১৬.০৭ মার্কিন ডলারে নেমে আসে। এর আগে দিনের শুরুতে দাম কমে ৪ হাজার ৯০.২৭ ডলারে ঠেকেছিল, যা গত ১১ জুনের পর সর্বনিম্ন। অন্যদিকে, মার্কিন সোনার ফিউচার বা চুক্তি মূল্য ১.৬ শতাংশ কমে আউন্স প্রতি ৪ হাজার ১৩৩.৭০ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বড় ধরনের মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হয়েছে। এটি সামাল দিতে ফেডারেল রিজার্ভ কঠোর আর্থিক নীতি নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এর ফলে সোমবার সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার শান্তি আলোচনার পর তেলের দাম কিছুটা কমে যাওয়ার যে ইতিবাচক প্রভাব সোনার ওপর পড়ার কথা ছিল, তা প্রায় ভেস্তে গেছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক অনলাইন ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাক্টিভট্রেডস’-এর বিশ্লেষক রিকার্ডো ইভাঞ্জেলিস্তা বলেন, ফেডের সুদের হার বাড়ানোর ইঙ্গিতে ডলারের বাজার চাঙ্গা হয়েছে, যা সোনার দামের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে। মাঝারি থেকে দীর্ঘমেয়াদে সোনার বাজার কেমন যাবে, তা মূলত মার্কিন ডলারের শক্তি ও ফেডের মুদ্রানীতির ওপরই নির্ভর করবে।
গত সপ্তাহে ফেডারেল রিজার্ভের নীতি-নির্ধারকদের প্রায় অর্ধেকই চলতি বছর সুদের হার বাড়ানোর পক্ষে মত দেন। এরপরই মার্কিন ডলারের সূচক গত বছরের মে মাসের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। ‘সিএমই ফেডওয়াচ টুল’-এর তথ্য অনুযায়ী, আগামী সেপ্টেম্বরে সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা গত সপ্তাহের ২৯ শতাংশ থেকে লাফিয়ে এখন ৬৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
এদিকে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা বুঝতে বিনিয়োগকারীরা এখন চলতি সপ্তাহের শেষে প্রকাশ পেতে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের ‘পার্সোনাল কনজাম্পশন এক্সপেন্ডিচার্স’ (পিসিই) বা ব্যক্তিগত ভোগ ব্যয় সূচকের দিকে তাকিয়ে আছেন। ফেড মূলত এই সূচক দেখেই মূল্যস্ফীতি পরিমাপ করে।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের বিশ্লেষক সুকি কুপার এক নোটে জানিয়েছেন, ইরান শান্তি চুক্তির পর বিনিয়োগকারীরা আশা করেছিলেন সোনার দাম আউন্স প্রতি চার হাজার ডলারের ঘরে স্থিতিশীল থাকবে। কিন্তু পরিস্থিতি এখন উল্টো। বাজারে এখন সোনার দাম একটু বাড়লেই বিনিয়োগকারীরা তা বিক্রি করে মুনাফা তুলে নেওয়ার নীতি নিয়েছেন।
জার্মানিভিত্তিক ডয়চে ব্যাংকের বিশ্লেষক মাইকেল হুসুয়েহ জানিয়েছেন, ফেড যদি সুদের হার আর না বাড়ায়, তবে বছরের শেষ প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) সোনার দাম আউন্স প্রতি ৪ হাজার ৮০০ ডলারে উঠতে পারে। তবে ফেড যদি ৩ থেকে ৪ বার সুদের হার বাড়ায়, তবে সোনার দাম কমে ৩ হাজার ৮০০ ডলারে নেমে যাওয়ার বড় ঝুঁকি রয়েছে।
ডলারের এই জয়রথের কারণে সোনার পাশাপাশি অন্যান্য ধাতুর দামেও ধস নেমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে রুপার দাম ৪.৪ শতাংশ কমে আউন্স প্রতি ৬২.৩৪ ডলারে নেমেছে। এছাড়া প্লাটিনামের দাম ২.৫ শতাংশ কমে ১ হাজার ৬৩৭.৩৯ ডলার এবং প্যালাডিয়ামের দাম ১.৩ শতাংশ কমে ১ হাজার ২৪৯.১৩ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
দেশের বাজারে ভ্যাটসহ প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) ২২ ক্যারেটের স্বর্ণের দাম পড়ছে ২ লাখ ৩০ হাজার ৭৭২ টাকা। এছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ২০ হাজার ৩৯১ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ১ লাখ ৮৯ হাজার ২৪৮ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণ ১ লাখ ৫৪ হাজার ৬০৬ টাকায় বেচাকেনা হচ্ছে।
এদিকে বর্তমানে ২২ ক্যারেটের এক ভরি রুপা বিক্রি হচ্ছে ৫ হাজার ২৪৯ টাকায়। এছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ৫ হাজার ১৬ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ৪ হাজার ২৫৭ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি রুপা ৩ হাজার ২০৮ টাকায় বেচাকেনা হচ্ছে।




