• ই-পেপার

কিয়ামতের দিন যে পাঁচ প্রশ্নের উত্তর না দিলে রেহাই নেই

মৃত্যুর পরও সদকায়ে জারিয়ার মাধ্যমে সওয়াব লাভের ১০ উপায়

মুফতি ওমর বিন নাছির
মৃত্যুর পরও সদকায়ে জারিয়ার মাধ্যমে সওয়াব লাভের ১০ উপায়
সংগৃহীত ছবি

দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আখিরাত চিরস্থায়ী। একজন বুদ্ধিমান মুমিন সেই ব্যক্তি, যিনি মৃত্যুর আগেই নিজের জন্য এমন কিছু আমল রেখে যান যা কবরের অন্ধকারেও তার জন্য নূর হয়ে থাকবে। একটি মসজিদ, একটি নলকূপ, একটি কোরআন, একটি গাছ কিংবা একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—এসব ছোট উদ্যোগও হতে পারে অনন্ত সওয়াবের উৎস। আর মানুষের জীবনের সবচেয়ে নিশ্চিত সত্য হলো মৃত্যু। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৮৫)

মৃত্যুর মাধ্যমে মানুষের আমলের খাতা বন্ধ হয়ে যায়। তবে ইসলামের সৌন্দর্য হলো, কিছু নেক আমল এমন আছে যার সওয়াব মৃত্যুর পরও অব্যাহতভাবে পৌঁছাতে থাকে। এগুলোকে বলা হয় সদকায়ে জারিয়া বা চলমান সদকা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়; তবে তিনটি আমল বন্ধ হয় না— সদকায়ে জারিয়া, এমন জ্ঞান যা দ্বারা মানুষ উপকৃত হয় এবং নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৬৩১)
তাই একজন দূরদর্শী মুমিনের উচিত এমন কিছু নেক কাজ করে যাওয়া, যা মৃত্যুর পরও তার আমলনামায় সওয়াবের ধারা অব্যাহত রাখবে।


১. মসজিদ নির্মাণে সহযোগিতা
মসজিদ আল্লাহর ঘর। যারা মসজিদ নির্মাণে অংশগ্রহণ করে, তাদের জন্য জান্নাতে বিশেষ পুরস্কারের ঘোষণা রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একটি মসজিদ নির্মাণ করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৫০)
একটি মসজিদে যতদিন নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত ও ইবাদত চলবে, ততদিন নির্মাণকারীর সওয়াবও চলতে থাকবে।

২. বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা
পানি মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। তৃষ্ণার্ত মানুষ বা প্রাণীর জন্য পানির ব্যবস্থা করা অন্যতম শ্রেষ্ঠ সদকা। রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কোন সদকা সবচেয়ে উত্তম? তিনি বলেন, ‘পানি পান করানো।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৬৮১)
নলকূপ, গভীর নলকূপ, পানির ট্যাংক বা কূপ খনন করে অসংখ্য মানুষের উপকার করা যায়। যতদিন মানুষ সেই পানি ব্যবহার করবে, ততদিন সওয়াব চলতে থাকবে।

৩. কোরআন ও দ্বীনি জ্ঞান প্রচার
জ্ঞান এমন এক সম্পদ যা মৃত্যুর পরও মানুষের উপকার করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে?’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ৯)
কোরআন মাজিদ, হাদিসের বই, ইসলামী সাহিত্য কিংবা দ্বীনি শিক্ষা প্রসারের জন্য অর্থ ব্যয় করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ কাজ। কেউ সেই জ্ঞান থেকে উপকৃত হলে তার সওয়াব দানকারীর কাছেও পৌঁছায়।

৪. বৃক্ষরোপণ করা
গাছ মানুষের খাদ্য, অক্সিজেন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। ইসলামে বৃক্ষরোপণকে সদকা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুসলিম যদি একটি গাছ লাগায়, অতঃপর মানুষ, পাখি বা প্রাণী তা থেকে খায়, তবে তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩২০)
ফলদ, ঔষধি কিংবা বনজ গাছ রোপণ দীর্ঘমেয়াদি সওয়াবের মাধ্যম হতে পারে।

৫. মাদ্রাসা, স্কুল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা
শিক্ষা একটি জাতির উন্নতির ভিত্তি। কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা বা পরিচালনায় সহায়তা করা অত্যন্ত মূল্যবান সদকায়ে জারিয়া। যেখানে কোরআন শিক্ষা, দ্বীনি জ্ঞান বা উপকারী শিক্ষা অর্জিত হবে, সেখানে প্রতিটি উপকারের অংশ প্রতিষ্ঠাতার আমলনামায় যুক্ত হতে থাকবে।

৬. হাসপাতাল ও চিকিৎসাসেবায় সহযোগিতা
অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা ও সেবায় অংশ নেওয়া ইসলামে মহৎ কাজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের একটি কষ্ট দূর করে দেয়, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার একটি কষ্ট দূর করে দেবেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৯৯)
হাসপাতাল নির্মাণ, অ্যাম্বুলেন্স দান, চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রদান কিংবা দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসা সহায়তা—সবই সদকায়ে জারিয়ার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

৭. কবরস্থানের জন্য জমি দান
মুসলমানদের দাফনের জন্য জমি ওয়াকফ বা দান করা একটি গুরুত্বপূর্ণ জনকল্যাণমূলক কাজ। যতদিন সেই জমি মুসলমানদের দাফনের কাজে ব্যবহৃত হবে, ততদিন দানকারীর জন্য সওয়াব অব্যাহত থাকবে ইনশাআল্লাহ।

৮. রাস্তা, সেতু বা মুসাফিরখানা নির্মাণ
মানুষের চলাচল সহজ করার জন্য রাস্তা, সেতু, বিশ্রামাগার বা মুসাফিরখানা নির্মাণ করা সমাজের জন্য বড় উপকার। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা কল্যাণকর কাজ করো, যাতে সফল হতে পারো।’ (সুরা : হাজ্জ, আয়াত : ৭৭)
প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এসব সুবিধা ব্যবহার করে উপকৃত হয়, আর দানকারীর আমলনামায় সওয়াব জমা হতে থাকে।

৯. খাল, পুকুর বা নদী খনন
কৃষিকাজ, পানীয় জল ও পরিবেশ রক্ষার জন্য খাল, পুকুর বা জলাধার খনন অত্যন্ত উপকারী কাজ। এটি বহু মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ করে এবং দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ বয়ে আনে। তাই এটিও সদকায়ে জারিয়ার অন্যতম মাধ্যম।

১০. জীবন রক্ষাকারী সহায়তা ও রক্তদান
রক্তদানের মাধ্যমে একজন মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব। ইসলামে মানুষের জীবন রক্ষা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ কাজ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে একজন মানুষের জীবন রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতির জীবন রক্ষা করল।’ (সুরা : মায়িদাহ, আয়াত : ৩২)
যদিও রক্তদান ক্লাসিক অর্থে সবসময় সদকায়ে জারিয়ার উদাহরণ নয়, তবে এটি মহান সদকা ও মানবসেবামূলক কাজ। আর যদি কেউ স্থায়ীভাবে রক্তব্যাংক, চিকিৎসা প্রকল্প বা জীবনরক্ষাকারী ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলেন, তাহলে তা সদকায়ে জারিয়ার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

এছাড়া আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ সদকায়ে জারিয়া হলো- এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করা, হিফজখানা বা কোরআন শিক্ষা কেন্দ্র চালু করা, ইসলামী দাওয়াহ কার্যক্রমে সহায়তা করা, ওয়াকফ সম্পত্তি দান করা, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান করা এবং উপকারী ইসলামী বই রচনা ও প্রকাশ করা ইত্যাদি। 

তাই আসুন, আমরা নিজেদের জন্য এবং আমাদের মৃত বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন ও প্রিয়জনদের নামে সদকায়ে জারিয়ার ব্যবস্থা করি। কারণ মৃত্যুর পর মানুষ যখন একা হয়ে যায়, তখন তার নেক আমলই হয় সবচেয়ে বড় সঙ্গী। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এমন আমল করার তাওফিক দান করুন, যার সওয়াব মৃত্যুর পরও অব্যাহতভাবে আমাদের আমলনামায় পৌঁছাতে থাকবে। আমিন।

লেখক : আলেম ও সাংবাদিক


 

বিকাশ/রকেট/নগদ-এর মাধ্যমে লেনদেন ও এজেন্ট ব্যবসা কি জায়েজ?

মুফতি ওমর বিন নাছির
বিকাশ/রকেট/নগদ-এর মাধ্যমে লেনদেন ও এজেন্ট ব্যবসা কি জায়েজ?
সংগৃহীত ছবি

বর্তমান যুগে প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে অর্থ লেনদেনের পদ্ধতিতেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। এক সময় টাকা পাঠানোর জন্য ব্যাংক বা ব্যক্তির ওপর নির্ভর করতে হলেও আজ মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) যেমন বিকাশ, নগদ, রকেট ইত্যাদির মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যেই দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে টাকা পাঠানো সম্ভব হচ্ছে। ফলে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—এসব মাধ্যমে টাকা লেনদেন করা কি শরীয়তসম্মত? এজেন্ট বা দোকান পরিচালনা করে যে কমিশন পাওয়া যায়, তা কি হালাল? এতে কোনো সুদ বা হারাম উপাদান জড়িত আছে কি না?

ইসলাম মানুষের জীবনকে সহজ ও কল্যাণময় করার জন্য বৈধ ব্যবসা-বাণিজ্যের অনুমতি দিয়েছে এবং সুদকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। তাই এ বিষয়ে শরীয়তের মূলনীতি জানা জরুরি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৭৫)
অতএব, কোনো লেনদেন বৈধ না অবৈধ হবে, তা নির্ভর করে সেখানে সুদ, প্রতারণা বা হারাম কোনো উপাদান আছে কি না তার ওপর।

বিকাশ/নগদ/রকেটে টাকা লেনদেন কি সুদের অন্তর্ভুক্ত?
সাধারণভাবে বিকাশ, নগদ বা রকেটের মাধ্যমে টাকা পাঠানো, ক্যাশ ইন, ক্যাশ আউট বা বিল পরিশোধ করা সুদের অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ এখানে মূলত একটি সেবা (Service) প্রদান করা হচ্ছে এবং সেই সেবার বিনিময়ে নির্ধারিত ফি নেওয়া হচ্ছে। যেমন, একজন ব্যক্তি ঢাকায় টাকা জমা দিলেন, আর অন্যজন চট্টগ্রামে সেই টাকা উত্তোলন করলেন। এখানে কোম্পানি একটি অর্থ স্থানান্তর সেবা প্রদান করছে। এটি সুদ নয়; বরং বৈধ সেবামূলক লেনদেন। ইসলামী ফিকহে এ ধরনের লেনদেনকে হাওয়ালা (حوالة) বা অর্থ স্থানান্তরের একটি বৈধ পদ্ধতির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

বিখ্যাত ফিকহগ্রন্থ রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে, ‘এক ব্যক্তি অন্য শহরে অবস্থানরত বন্ধুর কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য একজন ব্যবসায়ীর কাছে অর্থ প্রদান করে এবং ব্যবসায়ী তা ঋণ হিসেবে গ্রহণ করে সেখানে সমপরিমাণ অর্থ প্রদান করে। এটি বৈধ।’ (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল হাওয়ালা, ৮/১৭)
অর্থাৎ নিরাপদে অর্থ স্থানান্তরের জন্য এ ধরনের ব্যবস্থা শরীয়তে স্বীকৃত।

এজেন্ট বা বিকাশের দোকান দিয়ে আয় করা কি জায়েজ?
যদি একজন ব্যক্তি বিকাশ, নগদ বা রকেটের অনুমোদিত এজেন্ট হিসেবে কাজ করেন এবং কোম্পানির নির্ধারিত কমিশন গ্রহণ করেন, তাহলে সেই আয় বৈধ ও হালাল হবে। কারণ তিনি প্রকৃতপক্ষে একটি বৈধ সেবা প্রদান করছেন। তিনি গ্রাহকের টাকা গ্রহণ করছেন, উত্তোলনের ব্যবস্থা করছেন এবং বিনিময়ে কমিশন পাচ্ছেন। এটি ব্যবসা ও সেবার পারিশ্রমিক, সুদ নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না; তবে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে ব্যবসা হলে তা বৈধ।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ২৯)

এখানে গ্রাহক ও সেবাদাতার উভয়ের সম্মতিতে সেবা প্রদান করা হচ্ছে, তাই কমিশন গ্রহণ বৈধ।

কখন সতর্ক থাকতে হবে?
যদিও সাধারণ লেনদেন ও এজেন্ট ব্যবসা জায়েজ, তবুও কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন—

১. সুদভিত্তিক স্কিমে অংশ না নেওয়া
যদি কোনো মোবাইল ব্যাংকিং সেবার সঙ্গে সুদভিত্তিক সঞ্চয়, ঋণ বা বিনিয়োগ স্কিম যুক্ত থাকে, তাহলে সেগুলো থেকে বিরত থাকতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ সুদগ্রহীতা, সুদদাতা, সুদের লেখক এবং এর সাক্ষীদের ওপর অভিশাপ করেছেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৫৯৮)

২. প্রতারণা ও জালিয়াতি থেকে দূরে থাকা
এজেন্ট ব্যবসায় গ্রাহকের অর্থের ব্যাপারে সর্বোচ্চ সততা বজায় রাখতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১০২)

৩. অবৈধ লেনদেনে সহযোগিতা না করা
যদি নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে কোনো লেনদেন হারাম কাজে ব্যবহৃত হবে, তাহলে তাতে সহযোগিতা করা বৈধ নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা কর না।’ (সুরা : মায়িদাহ, আয়াত : ২)

ইসলামের দৃষ্টিতে ডিজিটাল লেনদেনের সুবিধা
ডিজিটাল অর্থ লেনদেন মানুষের সময়, শ্রম ও ঝুঁকি কমিয়ে দিয়েছে। নিরাপদে অর্থ স্থানান্তর, বিল পরিশোধ এবং আর্থিক সেবার সহজলভ্যতা মানুষের জন্য কল্যাণকর। ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো, ‘লেনদেনের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো বৈধতা, যতক্ষণ না হারাম হওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়।’ সুতরাং যেসব ডিজিটাল লেনদেনে সুদ, জুয়া, প্রতারণা বা অন্য কোনো শরীয়তবিরোধী উপাদান নেই, সেগুলো বৈধ বলে গণ্য হবে।

অতএব, বিকাশ, নগদ, রকেটসহ অন্যান্য মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে সাধারণ অর্থ লেনদেন করা শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েজ। কারণ এটি সুদভিত্তিক লেনদেন নয়; বরং অর্থ স্থানান্তর ও আর্থিক সেবার বিনিময়ে ফি গ্রহণের একটি বৈধ ব্যবস্থা। একইভাবে অনুমোদিত এজেন্ট হিসেবে দোকান পরিচালনা করে কমিশনভিত্তিক আয় করাও বৈধ ও হালাল। তবে একজন মুসলমানের কর্তব্য হলো সবসময় সুদ, প্রতারণা, জালিয়াতি এবং হারাম কার্যক্রম থেকে নিজেকে দূরে রাখা। ব্যবসার প্রতিটি ক্ষেত্রে সততা, আমানতদারিতা ও আল্লাহভীতিকে প্রাধান্য দিলে তার উপার্জন হবে বরকতময় এবং আখিরাতেও কল্যাণের কারণ।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে হালাল উপার্জনের তাওফিক দান করুন, হারাম ও সন্দেহজনক বিষয় থেকে হেফাজত করুন এবং আমাদের রিজিকে বরকত দান করুন। আমিন।

লেখক : আলেম ও সাংবাদিক 

হাদিসের বাণী

মহানবী (সা.) এর সাদাসিধে জীবন-যাপন

ইসলামী জীবন ডেস্ক
মহানবী (সা.) এর সাদাসিধে জীবন-যাপন
সংগৃহীত ছবি

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)- থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার মহানবী (সা.) একটি চাটাইয়ের উপর ঘুমিয়েছিলেন। তারপর যখন উঠলেন, তখন দেখা গেল তার শরীরে চাটাইয়ের দাগ পড়ে আছে। আমরা বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনার জন্য একটি নরম বিছানার ব্যবস্থা করে দিই? জবাবে মহানবী (সা.) বললেন, দুনিয়ার সাথে আমার কী সম্পর্ক? দুনিয়াতে আমি তো সেই সাওয়ারি-মুসাফিরের মতো, যে ক্লান্ত হয়ে একটু গাছের ছায়ার নিচে বিশ্রাম নেয়, তারপর গাছ ছেড়ে আবার চলে যায়। (তিরমিজি, হাদিস নং : ২৩৭৭)

হাদিসের শিক্ষা
১. দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী, আখিরাত চিরস্থায়ী। তাইতো মহানবী (সা.) দুনিয়াকে একটি গাছের ছায়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। যেমন একজন পথিক কিছুক্ষণ ছায়ায় বিশ্রাম নিয়ে আবার যাত্রা শুরু করে, তেমনি মানুষের দুনিয়ার জীবনও খুবই অল্প সময়ের। প্রকৃত আবাস হলো আখিরাত।

২. দুনিয়ার ভোগ-বিলাসে মগ্ন হওয়া উচিত নয়। মহানবী (সা.) চাইলে বিলাসবহুল জীবনযাপন করতে পারতেন। কিন্তু তিনি সাধারণ জীবন বেছে নিয়েছিলেন। এজন্য দুনিয়ার প্রয়োজনীয় জিনিস গ্রহণ করা বৈধ, তবে ভোগ-বিলাসকে জীবনের লক্ষ্য বানানো উচিত নয়।

৩. সরল ও সাদাসিধে জীবন উত্তম। মহানবী (সা.)-এর শরীরে চাটাইয়ের দাগ পড়ে গিয়েছিল, তবুও তিনি আরাম-আয়েশের প্রতি আগ্রহ দেখাননি। এটি তাঁর দুনিয়াবিমুখতা ও বিনয়ের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

৪. একজন মুমিন নিজেকে মুসাফির মনে করবে। মহানবী (সা.)-এর ভাষায়, মুমিন এই পৃথিবীতে একজন যাত্রী। তাই তার চিন্তা হবে— আমি কোথা থেকে এসেছি, কোথায় যাব এবং সফরের জন্য কী প্রস্তুতি নিয়েছি?

৫. আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। যাত্রী যেমন গন্তব্যের জন্য রসদ সংগ্রহ করে, তেমনি একজন মুমিনেরও নেক আমল, তাকওয়া ও ইবাদতের মাধ্যমে আখিরাতের পাথেয় সংগ্রহ করা উচিত।

৬. মৃত্যু ও আখিরাতকে স্মরণ রাখা উচিত। গাছের ছায়া ছেড়ে যেমন পথিক চলে যায়, তেমনি একদিন মানুষকে দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতে হবে। তাই মৃত্যু ও হিসাব-নিকাশের দিনের কথা স্মরণ করে জীবন পরিচালনা করা উচিত।

আল্লাহর রহমত লাভের বিশেষ দোয়া

ইসলামী জীবন ডেস্ক
আল্লাহর রহমত লাভের বিশেষ দোয়া
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো আল্লাহ তাআলার রহমত। কারণ আল্লাহর রহমত ছাড়া কোনো মানুষ দুনিয়ায় প্রকৃত সফলতা লাভ করতে পারে না, আর আখিরাতে নাজাত পাওয়াও সম্ভব নয়। তাই একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা হওয়া উচিত আল্লাহর অশেষ রহমত ও অনুগ্রহ লাভ করা। আর হাদিসে বর্ণিত আল্লাহর রহমত লাভের বিশেষ একটি দোয়া হলো—

اللَّهُمَّ رَحْمَتَكَ أَرْجُو فَلَا تَكِلْنِي إِلَى نَفْسِي طَرْفَةَ عَيْنٍ، وَأَصْلِحْ لِي شَأْنِي كُلَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা রাহমাতাকা আরজু ফালা তাকিলনী ইলা নাফসি তরফাতা আইন, ওয়া আসলিহ লি শানি কুল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লা আনতা।

অর্থ : হে আল্লাহ, তোমার রহমতেরই আশা রাখি। অতএব, তুমি আমাকে পলকের জন্যও আমার নিজের ওপর সোপর্দ করে দিও না এবং আমার সব অবস্থাকে সংশোধিত করে দাও। তুমি ছাড়া কোনো সত্য মাবুদ নেই। (আবু দাউদ, হাদিস : ৫০৯০, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২০৪৩০)

নবী-রাসুলরা সর্বদা আল্লাহর রহমতের জন্য দোয়া করতেন। কোরআনে তাঁদের অনেক দোয়া বর্ণিত হয়েছে, যা আজও মুমিনদের জন্য রহমত, বরকত ও কল্যাণ লাভের উত্তম মাধ্যম। তাই আমাদের উচিত বেশি বেশি আল্লাহর রহমত প্রার্থনা করা, তাঁর ক্ষমা কামনা করা এবং এমন দোয়াগুলো নিয়মিত পাঠ করা, যা কোরআন ও হাদিসে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। তাই আসুন, আমরা এমন একটি বিশেষ দোয়া সম্পর্কে জানি, যা আল্লাহর রহমত লাভ, গুনাহ মাফ এবং দুনিয়া-আখিরাতের কল্যাণ অর্জনের জন্য অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।