অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা আজকের যুগে মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশেষ করে আম, লিচু, কাঁঠালসহ মৌসুমি ফলের ব্যবসায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ই-কমার্সের ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ করা যায়। একজন উদ্যোক্তা ঘরে বসেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বাগান থেকে ফল সংগ্রহ করে ক্রেতার কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। এতে যেমন ব্যবসার প্রসার ঘটছে, তেমনি ক্রেতাও সহজে মানসম্মত পণ্য পাচ্ছেন। তবে একজন মুসলিম ব্যবসায়ীর জন্য শুধু লাভ করাই যথেষ্ট নয়; বরং সেই লাভ হালাল ও শরীয়তসম্মত হওয়াও অপরিহার্য। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৭৫)
এভাবে ইসলাম ব্যবসাকে উৎসাহিত করেছে, তবে সেই ব্যবসা অবশ্যই বৈধ ও ন্যায়সঙ্গত হতে হবে। বর্তমানে অনেক অনলাইন ব্যবসায়ী আগে বিজ্ঞাপন দেন, এরপর ক্রেতার কাছ থেকে অর্ডার ও মূল্য নির্ধারণ করে পরে বাজার বা বাগান থেকে পণ্য সংগ্রহ করেন। যদি বিক্রয়ের সময় পণ্যটি বিক্রেতার মালিকানায় বা দখলে না থাকে, তাহলে অধিকাংশ ফকীহের মতে এ ধরনের বিক্রয় বৈধ নয়। এ বিষয়ে সাহাবি হাকিম ইবন হিজাম (রা.) বলেন, ‘আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! কোনো ব্যক্তি আমার কাছে এমন জিনিস কিনতে আসে, যা আমার কাছে নেই। আমি কি পরে বাজার থেকে কিনে তাকে দিতে পারি? তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘যা তোমার মালিকানায় নেই, তা বিক্রি করো না।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৫০৩)
এই হাদিস ইসলামী বাণিজ্যনীতির একটি মৌলিক নীতিকে তুলে ধরে—বিক্রেতা যে পণ্য বিক্রি করবেন, তা তার মালিকানায় বা বৈধ নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে। আর হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আদ-দুররুল মুখতার ও রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করা হয়েছে, বিক্রয় চুক্তির অন্যতম শর্ত হলো— এক. বিক্রেতা পণ্যের মালিক হবেন। দুই. পণ্যটি বিদ্যমান থাকবে। তিন, তা ক্রেতার কাছে হস্তান্তর করার সক্ষমতা থাকবে। অন্যথায় চুক্তির মধ্যে অনিশ্চয়তা (গারার), প্রতারণা ও বিরোধের সম্ভাবনা তৈরি হয়, যা ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে। (রাদ্দুল মুহতার, ৭/২৪৬)
তাই বর্তমানে অনলাইনে শরীয়তসম্মতভাবে এই ব্যবসা পরিচালনার অন্তত দুটি গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি রয়েছে।
প্রথম পদ্ধতি : আগে সংগ্রহ, পরে বিক্রি
অবশ্যই ক্রেতাকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে যে, বর্তমানে আমার কাছে এই আম বা লিচু নেই। আমি বাগান থেকে সংগ্রহ করে আপনাকে অমুক দামে বিক্রি করতে পারব।’ এরপর বিক্রেতা প্রথমে বাগান থেকে ফল কিনে নিজের মালিকানায় নেবেন। এরপর তা নিজের নির্ধারিত লাভ যোগ করে ক্রেতার কাছে বিক্রি করবেন। এভাবে অর্জিত লাভ সম্পূর্ণ হালাল।
দ্বিতীয় পদ্ধতি: কমিশন বা এজেন্ট হিসেবে কাজ করা
বিক্রেতা চাইলে নিজেকে পণ্যের বিক্রেতা হিসেবে নয়, বরং একজন প্রতিনিধি (এজেন্ট) হিসেবে পরিচয় দিতে পারেন। যেমন, ‘আমি আপনার পক্ষ থেকে বাগান থেকে আম সংগ্রহ করে পৌঁছে দেব। এর বিনিময়ে প্রতি কেজি বা মোট মূল্যের ওপর নির্ধারিত হারে আমার সার্ভিস চার্জ বা কমিশন থাকবে।’ এক্ষেত্রে তিনি বিক্রেতা নন; বরং সেবা প্রদানকারী বা মধ্যস্থতাকারী। তাই এই কমিশন গ্রহণ শরীয়তসম্মত। মানুষের প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে নির্ধারিত কমিশনের ভিত্তিতে এ ধরনের সেবা গ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘কেউ যদি বলে, ‘এই কাপড়টি বিক্রি করো; নির্ধারিত মূল্যের অতিরিক্ত যা থাকবে, তা তোমার’—এতে কোনো অসুবিধা নেই। (সহিহ বুখারি)
একজন মুসলিম অনলাইন ব্যবসায়ীর করণীয়
১. কখনো নিজের মালিকানায় না থাকা পণ্য সরাসরি বিক্রি না করা।
২. পণ্যের গুণগত মান, ওজন ও দামে স্বচ্ছতা বজায় রাখা।
৩. ক্রেতাকে বিভ্রান্ত করে বিজ্ঞাপন দেওয়া থেকে বিরত থাকা।
৪. প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা।
৫. প্রতারণা, মিথ্যা প্রচার ও তথ্য গোপন করা থেকে বিরত থাকা।
অনলাইন ব্যবসা ইসলামে বৈধ। তাই আম, লিচু বা অন্য কোনো পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে আগে মালিকানা অর্জন করে পরে বিক্রি করা, অথবা নিজেকে কমিশনভিত্তিক প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপন করা—এই দুটি পদ্ধতির যেকোনো একটি অনুসরণ করা উচিত। (তথ্যসূত্র : ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়্যা, ১/২৩৩, বাদায়েউস সানায়ে, ৪/৩৩৯, আল বাহরুর রায়েক, ৫/৪/৫৩৫)




