• ই-পেপার

অন্যকে দেওয়া অভিশাপ যখন নিজের ওপর পড়ে

অনলাইনে আম-লিচু বিক্রি করার ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি

মুফতি ওমর বিন নাছির
অনলাইনে আম-লিচু বিক্রি করার ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি
সংগৃহীত ছবি

অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা আজকের যুগে মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশেষ করে আম, লিচু, কাঁঠালসহ মৌসুমি ফলের ব্যবসায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ই-কমার্সের ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ করা যায়। একজন উদ্যোক্তা ঘরে বসেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বাগান থেকে ফল সংগ্রহ করে ক্রেতার কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। এতে যেমন ব্যবসার প্রসার ঘটছে, তেমনি ক্রেতাও সহজে মানসম্মত পণ্য পাচ্ছেন। তবে একজন মুসলিম ব্যবসায়ীর জন্য শুধু লাভ করাই যথেষ্ট নয়; বরং সেই লাভ হালাল ও শরীয়তসম্মত হওয়াও অপরিহার্য। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৭৫)

এভাবে ইসলাম ব্যবসাকে উৎসাহিত করেছে, তবে সেই ব্যবসা অবশ্যই বৈধ ও ন্যায়সঙ্গত হতে হবে। বর্তমানে অনেক অনলাইন ব্যবসায়ী আগে বিজ্ঞাপন দেন, এরপর ক্রেতার কাছ থেকে অর্ডার ও মূল্য নির্ধারণ করে পরে বাজার বা বাগান থেকে পণ্য সংগ্রহ করেন। যদি বিক্রয়ের সময় পণ্যটি বিক্রেতার মালিকানায় বা দখলে না থাকে, তাহলে অধিকাংশ ফকীহের মতে এ ধরনের বিক্রয় বৈধ নয়। এ বিষয়ে সাহাবি হাকিম ইবন হিজাম (রা.) বলেন, ‘আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! কোনো ব্যক্তি আমার কাছে এমন জিনিস কিনতে আসে, যা আমার কাছে নেই। আমি কি পরে বাজার থেকে কিনে তাকে দিতে পারি? তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘যা তোমার মালিকানায় নেই, তা বিক্রি করো না।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৫০৩)

এই হাদিস ইসলামী বাণিজ্যনীতির একটি মৌলিক নীতিকে তুলে ধরে—বিক্রেতা যে পণ্য বিক্রি করবেন, তা তার মালিকানায় বা বৈধ নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে। আর হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আদ-দুররুল মুখতার ও রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করা হয়েছে, বিক্রয় চুক্তির অন্যতম শর্ত হলো— এক. বিক্রেতা পণ্যের মালিক হবেন। দুই. পণ্যটি বিদ্যমান থাকবে। তিন, তা ক্রেতার কাছে হস্তান্তর করার সক্ষমতা থাকবে। অন্যথায় চুক্তির মধ্যে অনিশ্চয়তা (গারার), প্রতারণা ও বিরোধের সম্ভাবনা তৈরি হয়, যা ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে। (রাদ্দুল মুহতার, ৭/২৪৬)

তাই বর্তমানে অনলাইনে শরীয়তসম্মতভাবে এই ব্যবসা পরিচালনার অন্তত দুটি গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি রয়েছে।

প্রথম পদ্ধতি : আগে সংগ্রহ, পরে বিক্রি
অবশ্যই ক্রেতাকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে যে, বর্তমানে আমার কাছে এই আম বা লিচু নেই। আমি বাগান থেকে সংগ্রহ করে আপনাকে অমুক দামে বিক্রি করতে পারব।’ এরপর বিক্রেতা প্রথমে বাগান থেকে ফল কিনে নিজের মালিকানায় নেবেন। এরপর তা নিজের নির্ধারিত লাভ যোগ করে ক্রেতার কাছে বিক্রি করবেন। এভাবে অর্জিত লাভ সম্পূর্ণ হালাল।

দ্বিতীয় পদ্ধতি: কমিশন বা এজেন্ট হিসেবে কাজ করা
বিক্রেতা চাইলে নিজেকে পণ্যের বিক্রেতা হিসেবে নয়, বরং একজন প্রতিনিধি (এজেন্ট) হিসেবে পরিচয় দিতে পারেন। যেমন, ‘আমি আপনার পক্ষ থেকে বাগান থেকে আম সংগ্রহ করে পৌঁছে দেব। এর বিনিময়ে প্রতি কেজি বা মোট মূল্যের ওপর নির্ধারিত হারে আমার সার্ভিস চার্জ বা কমিশন থাকবে।’ এক্ষেত্রে তিনি বিক্রেতা নন; বরং সেবা প্রদানকারী বা মধ্যস্থতাকারী। তাই এই কমিশন গ্রহণ শরীয়তসম্মত। মানুষের প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে নির্ধারিত কমিশনের ভিত্তিতে এ ধরনের সেবা গ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘কেউ যদি বলে, ‘এই কাপড়টি বিক্রি করো; নির্ধারিত মূল্যের অতিরিক্ত যা থাকবে, তা তোমার’—এতে কোনো অসুবিধা নেই। (সহিহ বুখারি)

একজন মুসলিম অনলাইন ব্যবসায়ীর করণীয়
১. কখনো নিজের মালিকানায় না থাকা পণ্য সরাসরি বিক্রি না করা।
২. পণ্যের গুণগত মান, ওজন ও দামে স্বচ্ছতা বজায় রাখা।
৩. ক্রেতাকে বিভ্রান্ত করে বিজ্ঞাপন দেওয়া থেকে বিরত থাকা।
৪. প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা।
৫. প্রতারণা, মিথ্যা প্রচার ও তথ্য গোপন করা থেকে বিরত থাকা।

অনলাইন ব্যবসা ইসলামে বৈধ। তাই আম, লিচু বা অন্য কোনো পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে আগে মালিকানা অর্জন করে পরে বিক্রি করা, অথবা নিজেকে কমিশনভিত্তিক প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপন করা—এই দুটি পদ্ধতির যেকোনো একটি অনুসরণ করা উচিত। (তথ্যসূত্র : ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়্যা, ১/২৩৩, বাদায়েউস সানায়ে, ৪/৩৩৯, আল বাহরুর রায়েক, ৫/৪/৫৩৫)

সাহাবাদের চোখে মহানবী (সা.)-এর শারীরিক অবয়ব

ইসলামী জীবন ডেস্ক
সাহাবাদের চোখে মহানবী (সা.)-এর শারীরিক অবয়ব
সংগৃহীত ছবি

মানবজাতির ইতিহাসে মহানবী (সা.)-এর মতো পূর্ণাঙ্গ ও সুষম ব্যক্তিত্বের অধিকারী আর কেউ ছিলেন না। তাঁর চরিত্র যেমন ছিল অনুপম, তেমনি তাঁর শারীরিক গঠনও ছিল আল্লাহর এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। সাহাবায়ে কেরাম শুধু তাঁর বাণীই সংরক্ষণ করেননি; বরং তাঁর চেহারা, চলাফেরা, হাত, পা, হাসি ও আচার-আচরণের সূক্ষ্ম বর্ণনাও আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। এসব বর্ণনা আমাদের হৃদয়ে নবিজির প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি করে এবং তাঁর সুন্নাহ অনুসরণের আগ্রহ জাগিয়ে তোলে।

হজরত আলী (রা.), যিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে খুব কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন, তিনি নবিজির হাত, পা ও চলনভঙ্গির এমন কিছু বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন, যা তাঁর সৌন্দর্য, শক্তিমত্তা ও মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিত্বের এক জীবন্ত চিত্র ফুটিয়ে তোলে। আলী (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাত ও পায়ের তালু এবং আঙুলগুলো ছিল পরিপূর্ণ ও মাংসল। তাঁর হাত ছিল দৃঢ়, অথচ স্পর্শে ছিল অত্যন্ত কোমল। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাত ও পায়ের তালু ছিল মাংসল এবং তাঁর অস্থিসন্ধিগুলো ছিল শক্ত ও মোটা।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ৭৪৬)

অন্য বর্ণনায় আনাস ইবনু মালিক (রা.) বলেন, ‘আমি কখনো রেশম কিংবা মখমল স্পর্শ করিনি, যা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাতের চেয়ে বেশি কোমল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৫৬১)

রাসুল (সা.)-এর মধ্যে—দৃঢ়তা ও কোমলতা—এই দুটি বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে বিদ্যমান ছিল, যা ছিল সত্যিই অনন্য। তাঁর হাত-পায়ের অস্থিসন্ধিগুলো ছিল শক্ত ও সুগঠিত। এটি তাঁর শারীরিক সক্ষমতা, সহনশীলতা ও কর্মঠ জীবনের পরিচায়ক। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছেন, দীর্ঘ সফর করেছেন, মানুষের সেবা করেছেন এবং ইবাদতে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকেছেন—এসবই তাঁর সুগঠিত দেহের বাস্তব প্রমাণ। আলী (রা.) বর্ণনা করে বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) অতিরিক্ত লম্বাও ছিলেন না, আবার খাটোও ছিলেন না; বরং মধ্যম উচ্চতার, সুগঠিত ও অত্যন্ত সুষম দেহের অধিকারী ছিলেন। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ৭৪৬)
 
একটি বর্ণনায় এসেছে, তাঁর মাথা সাধারণ মানুষের তুলনায় কিছুটা বড় ছিল, যা তাঁর ব্যক্তিত্বকে আরও গাম্ভীর্যময় ও আকর্ষণীয় করে তুলেছিল। তাঁর পুরো শরীর পশমে আবৃত ছিল না। বরং তাঁর বুক থেকে নাভি পর্যন্ত একটি সূক্ষ্ম ও সোজা পশমের রেখা ছিল। এই বৈশিষ্ট্য তাঁর দেহাবয়বকে আরও মনোমুগ্ধকর করে তুলেছিল। (মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদিস : ৪১৯৪)

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাঁটার ভঙ্গিও ছিল অত্যন্ত অনন্য। তিনি কখনো অলসভাবে কিংবা পা টেনে হাঁটতেন না। বরং দৃঢ় পদক্ষেপে দ্রুত ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে চলতেন। আলী (রা.) বলেন, ‘তিনি যখন হাঁটতেন, তখন মনে হতো যেন উঁচু স্থান থেকে নিচের দিকে নেমে আসছেন।’ ( ইবনে হিব্বান, হাদিস : ৬৩১১)

এই বর্ণনা তাঁর কর্মঠ, উদ্যমী ও আত্মবিশ্বাসী ব্যক্তিত্বের উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শারীরিক সৌন্দর্য ছিল এমন যে, তাঁকে একবার দেখলে সহজে ভুলে যাওয়া যেত না। হজরত আলী (রা.) গভীর ভালোবাসা ও আবেগ নিয়ে বলেন, ‘আমি তাঁর আগে কিংবা তাঁর পরে তাঁর মতো সুন্দর ও আকর্ষণীয় মানুষ আর কাউকে দেখিনি।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ৭৪৬)

এই সাক্ষ্য শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্যের নয়; বরং তাঁর মহিমান্বিত ব্যক্তিত্ব, নূরানি চেহারা ও হৃদয়জয়ী উপস্থিতিরও স্বীকৃতি। তিনি বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়েও তিনি চরিত্রের সৌন্দর্যকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাত ছিল শক্তিশালী, অথচ কোমল। তাঁর পা ছিল দৃঢ় ও মাংসল, তাঁর চলন ছিল আত্মবিশ্বাসী। আর তাঁর পুরো দেহাবয়ব ছিল ভারসাম্যপূর্ণ ও মনোমুগ্ধকর। এসব বৈশিষ্ট্য ছিল আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তাঁর প্রিয় নবির জন্য বিশেষ অনুগ্রহ। সাহাবিদের সংরক্ষিত এসব বর্ণনা আজও আমাদের হৃদয়ে নবিজির প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা আরও গভীর করে। তাই তাঁর বাহ্যিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হওয়ার পাশাপাশি তাঁর উত্তম চরিত্র, মহান আদর্শ ও সুন্নাহকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অনুসরণ করাই একজন মুমিনের প্রকৃত সফলতা।

সম্পদকে সুখের মাধ্যম বানানোর উপায়

মুফতি ওমর বিন নাছির
সম্পদকে সুখের মাধ্যম বানানোর উপায়
সংগৃহীত ছবি

সম্পদ মানুষের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামত। জীবনযাত্রার প্রয়োজন পূরণ, পরিবার-পরিজনের ভরণপোষণ, সমাজসেবা এবং আল্লাহর পথে ব্যয়—সব ক্ষেত্রেই সম্পদের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু ইসলাম সম্পদকে কখনোই জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য বানাতে শেখায়নি; বরং এটিকে একটি পরীক্ষা ও আমানত হিসেবে দেখেছে। যে সম্পদ আল্লাহর আনুগত্যে ব্যবহৃত হয়, তা মানুষের জন্য দুনিয়ায় প্রশান্তি এবং আখিরাতে মুক্তির কারণ হয়। পক্ষান্তরে, অবৈধ উপার্জন, কৃপণতা, অপচয় ও অহংকারে ব্যবহৃত সম্পদ মানুষের অশান্তি ও ধ্বংস ডেকে আনে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা আল্লাহ প্রদত্ত রিজিক থেকে হালাল ও পবিত্র বস্তু আহার করো।’ (সুরা : মায়েদা, আয়াত : ৮৮)

অতএব, সম্পদ তখনই প্রকৃত সুখের মাধ্যম হয়ে ওঠে, যখন তা ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী অর্জন ও ব্যয় করা হয়। তাই একজন মুমিনের করণীয় হলো-

১. হালাল উপায়ে সম্পদ উপার্জন করা
সম্পদের বরকত ও মানসিক প্রশান্তির প্রথম শর্ত হলো হালাল উপার্জন। হারাম উপায়ে অর্জিত অর্থ বাহ্যিকভাবে বেশি হলেও তা মানুষের হৃদয় থেকে শান্তি কেড়ে নেয় এবং দোয়া কবুলের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের মধ্যে অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ ভক্ষণ কোরো না।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ২৯)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র; তিনি কেবল পবিত্র (হালাল) বস্তুই গ্রহণ করেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১০১৫)
হালাল উপার্জনের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদে আল্লাহ তাআলা বরকত দান করেন, যা মানুষের জীবনে প্রকৃত সুখ ও প্রশান্তি এনে দেয়।

২. জাকাত ও সদকার মাধ্যমে সম্পদকে পবিত্র করা
ইসলামে সম্পদের প্রকৃত সৌন্দর্য শুধু সঞ্চয়ে নয়; বরং আল্লাহর পথে ব্যয়ে। জাকাত সম্পদকে পবিত্র করে এবং সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য সৃষ্টি করে। আর সদকা মানুষের বিপদ দূর করে ও আল্লাহর রহমত লাভের মাধ্যম হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তাদের সম্পদ থেকে সদকা গ্রহণ করুন; এর মাধ্যমে আপনি তাদের পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবেন।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ১০৩)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সদকা করলে সম্পদ কখনো কমে না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৮৮)
যে ব্যক্তি নিয়মিত জাকাত ও সদকা আদায় করে, তার সম্পদে বরকত আসে এবং অন্তরে তৃপ্তি জন্মায়।

৩. আত্মীয়-স্বজন ও অসহায় মানুষের হক আদায় করা
ইসলাম শুধু ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধির শিক্ষা দেয় না; বরং আত্মীয়-স্বজন, এতিম, মিসকিন ও অভাবগ্রস্তদের অধিকার আদায়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আত্মীয়কে তার প্রাপ্য দাও, অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ২৬)

যে ব্যক্তি নিজের সম্পদের মাধ্যমে মানুষের উপকার করে, আল্লাহ তার জীবনে রহমত ও প্রশান্তি দান করেন।

৪. অপচয় ও অহংকার থেকে বিরত থাকা
অতিরিক্ত ভোগ-বিলাস, অপচয় এবং সম্পদের অহংকার মানুষের সুখকে ধ্বংস করে দেয়। ইসলাম মধ্যপন্থা অবলম্বনের শিক্ষা দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ২৭)

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘আল্লাহ অহংকারী ও আত্মগর্বীদের পছন্দ করেন না।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৩৬)
অপচয় ও অহংকার পরিত্যাগ করে সংযমী জীবনযাপন করলে সম্পদ সত্যিকার অর্থে সুখের কারণ হয়।

৫. সম্পদের ওপর নয়, আল্লাহর ওপর ভরসা করা
সম্পদ মানুষের নিরাপত্তার একটি উপায় হতে পারে; কিন্তু প্রকৃত নিরাপত্তা ও সফলতার মালিক একমাত্র আল্লাহ। তাই মুমিনের হৃদয় সম্পদের সঙ্গে নয়, আল্লাহর সঙ্গে যুক্ত থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।’ (সুরা : তালাক, আয়াত : ৩)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা যদি আল্লাহর ওপর যথাযথভাবে ভরসা করতে, তবে তিনি তোমাদের এমনভাবে রিজিক দিতেন, যেমন তিনি পাখিদের রিজিক দেন। তারা সকালে ক্ষুধার্ত বের হয় এবং সন্ধ্যায় পেটভরে ফিরে আসে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৩৪৪)
তাওয়াক্কুল মানুষের অন্তরে অদম্য সাহস, প্রশান্তি ও সন্তুষ্টি সৃষ্টি করে।

৬. দুনিয়ার পাশাপাশি আখিরাতকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য বানানো
ইসলাম দুনিয়াকে পরিত্যাগ করতে বলে না; বরং দুনিয়াকে আখিরাতের সফলতার ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলতে নির্দেশ দেয়। যে ব্যক্তি সম্পদকে আখিরাতের পাথেয় বানায়, তার জীবনই প্রকৃত অর্থে সফল হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন, তা দ্বারা আখিরাতের আবাস অন্বেষণ কর এবং দুনিয়ার অংশও ভুলে যেয়ো না।’ (সুরা : কাসাস, আয়াত : ৭৭)

তাই যখন মানুষের জীবনের লক্ষ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আখিরাতের সফলতা হয়, তখন সম্পদ তার জন্য কল্যাণের সোপান হয়ে ওঠে। কেননা সম্পদ নিজে সুখ কিংবা দুঃখের কারণ নয়; বরং মানুষ কিভাবে তা উপার্জন করে, ব্যয় করে এবং তার প্রতি কী দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে—সেটিই নির্ধারণ করে সম্পদ তার জন্য রহমত হবে, নাকি বিপদের কারণ হবে। তাই একজন মুমিনের উচিত সম্পদের দাস না হয়ে সম্পদকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি উপায়ে পরিণত করা। তাহলেই দুনিয়ায় শান্তি এবং আখিরাতে চিরস্থায়ী সফলতা লাভ করা সম্ভব হবে। ইনশাআল্লাহ। 

জুমার দিন যে পাঁচ কাজ বর্জনীয়

ইসলামী জীবন ডেস্ক
জুমার দিন যে পাঁচ কাজ বর্জনীয়
সংগৃহীত ছবি

মহান আল্লাহ দিন ও রাত সৃষ্টি করেছেন। সব দিনের মধ্যে জুমার দিন বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ। কোরআন ও হাদিসে এই দিনের বিশেষ সম্মান ও মর্যাদা বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) জুমার দিনের পাঁচটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন। তা হলো—এক. আল্লাহ তাআলা এই দিন আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করেছেন, দুই. আল্লাহ তাআলা এই দিনে আদম (আ.)-কে জমিনে অবতরণ করিয়েছেন, তিন. এই দিনে আদম (আ.)-কে মৃত্যু দিয়েছেন, চার. এই দিনে এমন সময় আছে যখন বান্দা আল্লাহর কাছে যা কিছুই প্রার্থনা করবে তিনি তা দেবেন। যতক্ষণ না সে হারাম কিছু প্রার্থনা করবে না, পাঁচ. এই দিনে কিয়ামত সংঘটিত হবে।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৮৯৫)

জুমার দিনটি যেমন মর্যাদা ও ফজিলতে পরিপূর্ণ, তেমনি এই দিনে কিছু নিষিদ্ধ কাজও রয়েছে। এর মধ্যে বেশ কিছু কাজ আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে, যেগুলো ইসলামে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ। জুমার দিনের নিষিদ্ধ কাজ হলো—

১. আজান হওয়ার পর ব্যবসা-বাণিজ্যে লিপ্ত থাকা : জুমার আজান হওয়ার পর কেনাবেচা করা এবং দুনিয়াবি সব কাজ নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! যখন জুমার দিনে সালাতের জন্য আজান দেওয়া হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং ব্যবসা ছেড়ে দাও। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম যদি তোমরা বুঝো।’ (সুরা : জুমুআ, আয়াত : ৯)

এখানে বেচাকেনা ও ব্যবসা বলতে বোঝানো হয়েছে যাবতীয় ব্যস্ততাকে, তা যেকোনো প্রকারেরই হোক না কেন। জুমার আজানের পর তা ত্যাগ করতে হবে। খুতবা চলাকালীন ঘাড় মাড়িয়ে যাওয়া : খুতবা চলা অবস্থায় মানুষের ঘাড় ডিঙিয়ে সামনের কাতারে যাওয়া নিষেধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) খুতবা দিচ্ছিলেন এমন সময় দেখলেন জনৈক ব্যক্তি মানুষের ঘাড় ডিঙিয়ে সামনের দিকে যাচ্ছে। তিনি তাকে বললেন, ‘তুমি বসো, তুমি লোকদের কষ্ট দিচ্ছ।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ১১১৮)

২. খুতবার সময় দুই হাঁটু উঁচু করে বসা : অনেকে দুই হাঁটু খাড়া করে দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে বা কাপড় পেঁচিয়ে বসেন। একে আরবিতে ইহতেবা বলা হয়। খুতবা চলাকালীন এভাবে বসা নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) জুমার দিন ইমামের খুতবা চলাকালে কাউকে হাঁটু খাড়া করে কাপড় জড়িয়ে বসতে নিষেধ করেছেন।’(আবু দাউদ, হাদিস : ১১১০)

৩. খুতবার সময় অনর্থক কথা বলা ও কাজ করা : খুতবার সময় সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনা জরুরি। খুতবার সময় অনর্থক কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। অনেকেই খুতবার সময় মোবাইল টেপা, মেসেজ চেক করা বা সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করা ইত্যাদি অনর্থক কাজ করেন। এ কাজগুলো জুমার সওয়াব বাতিল করে দিতে পারে। যেমনটি রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জুমার দিন যখন তোমার সাথিকে চুপ থাকো বলবে, অথচ ইমাম খুতবা দিচ্ছেন, তাহলে তুমি অনর্থক কাজ করলে।’ (বুখারি, হাদিস : ৯৩৪)

৪. খুতবা চলাকালীন ঘুমানো : খুতবার সময় ঘুম চলে এলে অজু ভঙ্গের আশঙ্কা থাকে এবং খুতবার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন,  ‘যদি মসজিদে কোনো ব্যক্তি তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়, তবে সে যেন স্বীয় স্থান ত্যাগ করে অন্যত্র সরে বসে। (আবু দাউদ, হাদিস : ১১১৯)

৫. শুধু জুমার দিন রোজা রাখা : শুধু জুমার দিন নির্দিষ্ট করে সিয়াম পালন করা জায়েজ নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যেন শুধু জুমার দিন সিয়াম পালন না করে। তবে তার আগে এক দিন অথবা পরের দিন (মিলিয়ে রাখবে)।’ (বুখারি, হাদিস : ১৯৮৫

অন্যকে দেওয়া অভিশাপ যখন নিজের ওপর পড়ে | কালের কণ্ঠ