• ই-পেপার

রসিকতার সীমারেখা টেনে দিয়েছে ইসলাম

যেসব কারণে আপনার বিয়ে করা উচিত

মুফতি ওমর বিন নাছির
যেসব কারণে আপনার বিয়ে করা উচিত
সংগৃহীত ছবি

মানবজীবনকে আল্লাহ তাআলা এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে, তা একা পূর্ণতা লাভ করতে পারে না। মানুষ স্বভাবতই সামাজিক জীব—তার শান্তি, ভালোবাসা, নিরাপত্তা এবং মানসিক প্রশান্তি অন্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যেই গড়ে ওঠে। এই সম্পর্কগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র সম্পর্ক হলো বিবাহ।

বর্তমান যুগে অনেকেই ক্যারিয়ার, স্বাধীনতা বা ভোগবাদী জীবনধারার কারণে বিয়েকে পিছিয়ে দেন বা এড়িয়ে চলেন। কেউ কেউ মনে করেন, বিয়ে শুধু একটি সামাজিক দায়িত্ব, আবার কেউ একে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা হিসেবেও দেখেন। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে বিবাহ শুধু সামাজিক চুক্তি নয়; এটি একটি ইবাদত, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নত এবং মানবজীবনের ভারসাম্য রক্ষার এক অনন্য ব্যবস্থা। তাই আসুন, কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে জেনে নিই—কেন একজন মুসলিমের জন্য বিয়ে করা এত গুরুত্বপূর্ণ এবং কী কী কারণে বিয়ে করা উচিত।

১. বিবাহ মানসিক প্রশান্তি ও স্থিতির উৎস
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ কর; আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা : রূম, আয়াত : ২১)
এই আয়াত প্রমাণ করে যে, বিবাহ মানুষের জীবনে মানসিক শান্তি, ভালোবাসা ও সহানুভূতির এক অপরিহার্য মাধ্যম। একাকীত্ব কখনোই মানবমনের পূর্ণ শান্তি আনতে পারে না।

২. বিবাহ দ্বীনের অর্ধেক পূর্ণ করে
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন কোনো বান্দা বিয়ে করে, তখন সে তার দ্বীনের অর্ধেক পূর্ণ করে।’ (মুসতাদরাক হাকেম, আয়াত : ২৭২৮)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, বিবাহ মানুষের চরিত্র রক্ষা, দৃষ্টি সংযম এবং লজ্জাস্থানের হেফাজতের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই এটি দ্বীনের পূর্ণতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

৩. দৃষ্টি ও লজ্জাস্থানের হেফাজতের মাধ্যম
ইসলামে যৌন প্রবৃত্তিকে দমন নয়, বরং বৈধ উপায়ে নিয়ন্ত্রণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিবাহ এই নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে নিরাপদ পথ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হে যুবকগণ! তোমাদের মধ্যে যার সামর্থ্য আছে, সে যেন বিয়ে করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০৬৫)
বিয়ে মানুষকে হারাম থেকে রক্ষা করে এবং চরিত্রকে পবিত্র রাখে।

৪. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নত অনুসরণ
বিবাহ শুধু মানবিক প্রয়োজন নয়; এটি নবী-রাসুলদের সুন্নত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে আমার সুন্নত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, সে আমার দলভুক্ত নয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫০৬৩)
তিনি নিজেও বিবাহ করেছেন এবং উম্মতকে তা অনুসরণ করতে উৎসাহিত করেছেন। তাই বিয়ে থেকে দূরে থাকা মানে সুন্নত থেকে বিমুখ হওয়া।

৫. পরিবার ও সমাজ গঠনের ভিত্তি
বিয়ে শুধু দুই ব্যক্তির সম্পর্ক নয়; এটি একটি পরিবার, সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভিত্তি। সন্তানের সঠিক লালন-পালন, ন্যায় ভিত্তিক সমাজ গঠন, পারিবারিক স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক অপরাধ হ্রাস ইত্যাদি সবই বিবাহের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়। ইসলাম একটি সুস্থ সমাজ গঠনের জন্য পরিবারকে কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।

৬. রিজিক ও বরকত লাভের মাধ্যম
অনেকেই মনে করেন বিয়ে করলে আর্থিক চাপ বাড়ে, কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে এটি বরং বরকতের কারণ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যদি তারা দরিদ্র হয়, আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহে তাদেরকে সচ্ছল করে দেবেন।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৩২)
অর্থাৎ বিয়ের মাধ্যমে আল্লাহ রিজিকে বরকত দান করেন।

৭. মানসিক ও সামাজিক ভারসাম্য
বিয়ে মানুষের জীবনে শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ ও স্থিতিশীলতা আনে। এটি মানুষকে আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে বের করে পরিবারমুখী করে তোলে। ফলে জীবনে আসে ভারসাম্য, লক্ষ্য এবং মানসিক পরিপক্বতা।

৮. ইবাদতের সুযোগ ও মনোযোগ বৃদ্ধি
বিবাহিত জীবন মানুষকে এমন একটি পরিবেশ দেয় যেখানে সে সহজে হারাম থেকে বাঁচতে পারে এবং আল্লাহর ইবাদতে মনোযোগ দিতে পারে। পরিবার পরিচালনা, সন্তান লালন-পালন এবং হালাল জীবিকা অর্জন—সবই ইবাদতের অংশে পরিণত হয়।

অতএব, বিয়ে কোনো আধুনিক চিন্তার বিরোধী বিষয় নয়; বরং এটি মানবজীবনের স্বাভাবিক, পবিত্র এবং আল্লাহ নির্ধারিত একটি ব্যবস্থা। যারা ভোগবাদী চিন্তা বা ব্যক্তিস্বাধীনতার নামে বিয়ে থেকে দূরে থাকতে চান, তারা মূলত জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত ও আল্লাহর বিশেষ নিয়ামত থেকে নিজেদের বঞ্চিত করছেন। তবে সামর্থ্য, পরিস্থিতি বা বাস্তব বাধার কারণে কেউ বিলম্ব করলে তিনি গুনাহগার হবেন না। কেননা  ইসলাম কখনো কারও ওপর অযথা কঠোরতা আরোপ করে না। একজন সচেতন মুমিনের উচিত—সময় ও সামর্থ্য হলে বিয়ের মাধ্যমে নিজের জীবনকে সুন্নতের পথে পরিচালিত করা, চরিত্রকে পবিত্র রাখা এবং একটি সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখা। কারণ বিবাহ শুধু সম্পর্ক নয়—এটি ঈমান, দায়িত্ব এবং জীবনের পরিপূর্ণতার এক মহান অধ্যায়।

হিজরতের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও তাৎপর্য

মুফতি ওমর বিন নাছির
হিজরতের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও তাৎপর্য
সংগৃহীত ছবি

মানব ইতিহাসে কিছু ঘটনা শুধু একটি জাতির ভাগ্য পরিবর্তন করেনি, বরং সমগ্র মানবসভ্যতার গতিপথকে নতুন করে নির্মাণ করেছে। ইসলামের ইতিহাসে হিজরত এমনই এক মহিমান্বিত ঘটনা। এটি কোনো সাধারণ স্থানান্তর ছিল না, ছিল না শুধু মক্কা থেকে মদিনায় যাওয়ার একটি ভ্রমণ। বরং এটি ছিল ঈমান রক্ষার জন্য সর্বস্ব ত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত, সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য অবিচল সংগ্রামের এক উজ্জ্বল অধ্যায় এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও নির্ভরতার এক জীবন্ত প্রমাণ। হিজরতের মাধ্যমেই ইসলামের ইতিহাসে সূচিত হয় নতুন যুগ, প্রতিষ্ঠিত হয় প্রথম ইসলামী রাষ্ট্র এবং বিশ্বময় ইসলামের বিজয়যাত্রার ভিত্তি রচিত হয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন মক্কার বুকে তাওহিদের আহ্বান নিয়ে দাঁড়ালেন, তখন সমাজের প্রচলিত শিরক, কুসংস্কার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর এই দাওয়াত কুরাইশ নেতাদের স্বার্থে আঘাত হানে। ফলে শুরু হয় নির্যাতনের এক দীর্ঘ অধ্যায়। মুসলমানদের ওপর নেমে আসে অকথ্য অত্যাচার। কেউ উত্তপ্ত মরুভূমির বালুর ওপর শুয়ে নির্যাতিত হচ্ছেন, কেউ শিকলে বন্দী, কেউ বা সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবরোধের শিকার। তিন বছরব্যাপী শি'বে আবি তালিবের অবরোধ মুসলমানদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। একদিকে অত্যাচার, অন্যদিকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে হত্যা করার গভীর ষড়যন্ত্র—সব মিলিয়ে মক্কার পরিবেশ মুসলমানদের জন্য ক্রমেই সংকীর্ণ হয়ে উঠতে থাকে।

এমন কঠিন সময়ে ইয়াসরিব (পরবর্তীতে মদিনা) থেকে আগত কিছু সৌভাগ্যবান ব্যক্তি ইসলামের আলো গ্রহণ করেন এবং আকাবার ঐতিহাসিক বাইআতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে নিজেদের শহরে আমন্ত্রণ জানান। তারা প্রতিশ্রুতি দেন, নিজেদের জীবন ও সম্পদের মতো করেই তাঁকে রক্ষা করবেন। এরই প্রেক্ষাপটে আল্লাহ তাআলার নির্দেশে মুসলমানরা ধীরে ধীরে মদিনায় হিজরত করতে শুরু করেন। অবশেষে যখন কুরাইশরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে হত্যার জন্য বিভিন্ন গোত্রের যুবকদের নিয়ে চূড়ান্ত পরিকল্পনা করে, তখন আল্লাহর নির্দেশে তিনি মক্কা ত্যাগ করেন।

সেই রাতটি ছিল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় রাত। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজের বিছানায় শয়ন করতে বললেন সাহাবি আলী (রা.)-কে। তারপর তিনি বেরিয়ে পড়েন তাঁর প্রিয় সঙ্গি আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে। তারা আশ্রয় নেন সাওর গুহায়। শত্রুরা যখন গুহার মুখ পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তখন আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অন্তর ছিল আল্লাহর ওপর অটল ভরসায় পরিপূর্ণ। সেই সময়ের ঘটনাকে স্মরণ করে আল্লাহ তাআলা কোরআনে ঘোষণা করেন, ‘তিনি তাঁর সঙ্গীকে বললেন, ‘দুঃখ কোরো না, নিশ্চয় আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা : তাওবা,আয়াত : ৪০)

এই সংক্ষিপ্ত বাক্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে হিজরতের সবচেয়ে বড় শিক্ষা—যার সঙ্গে আল্লাহ আছেন, তার বিরুদ্ধে পৃথিবীর সমস্ত শক্তি একত্রিত হলেও তাকে পরাজিত করতে পারে না।

মদিনায় পৌঁছার পর ইসলামের ইতিহাসে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। সেখানে রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রথমেই মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন, মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব গড়ে তোলেন এবং এমন একটি সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন, যার ভিত্তি ছিল ঈমান, ন্যায়বিচার, সাম্য ও মানবিকতা। যে মুসলমানরা মক্কায় নির্যাতিত ও অসহায় ছিলেন, তারাই অল্প সময়ের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ও আদর্শ জাতিতে পরিণত হন। এভাবেই হিজরত ইসলামের বিজয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে।

হিজরতের তাৎপর্য শুধু ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। এর শিক্ষা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। হিজরত আমাদের শেখায়, ঈমানের জন্য ত্যাগ ছাড়া সফলতা আসে না। মুহাজির সাহাবিগণ নিজেদের ঘরবাড়ি, ব্যবসা-বাণিজ্য, সম্পদ, আত্মীয়-স্বজন—সবকিছু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগ করেছিলেন। তাদের এই ত্যাগ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা নির্যাতিত হওয়ার পর আল্লাহর পথে হিজরত করেছে, আমি অবশ্যই তাদেরকে দুনিয়ায় উত্তম আবাস দান করব।’ (সুরা : নাহল, আয়াত :  ৪১)

হিজরত আমাদের আরও শেখায় যে, মুসলমানদের শক্তি তাদের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের মধ্যে নিহিত। মদিনায় আনসাররা মুহাজিরদের যেভাবে বরণ করে নিয়েছিলেন, তা মানব ইতিহাসে ভ্রাতৃত্বের এক অনুপম দৃষ্টান্ত। কুরআন ঘোষণা করে., ‘নিশ্চয় মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১০)

তবে হিজরতের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা হলো আত্মিক হিজরত। আজ আমাদেরকে মক্কা থেকে মদিনায় যেতে হবে না, কিন্তু গুনাহ থেকে তওবার দিকে, অন্যায় থেকে ন্যায়ের দিকে, শিরক থেকে তাওহিদের দিকে, গাফেলতি থেকে আল্লাহর স্মরণের দিকে এবং হারাম থেকে হালালের দিকে অবশ্যই হিজরত করতে হবে। এ কারণেই রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রকৃত মুহাজির সে, যে আল্লাহ নিষিদ্ধ করেছেন এমন সবকিছু পরিত্যাগ করে।’ (সহিহ বুখারি)

নতুন হিজরি বছর আমাদের সামনে উপস্থিত হলে হিজরতের সেই মহান স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আল্লাহর পথে করা কোনো ত্যাগ কখনো বৃথা যায় না। মক্কার নিপীড়িত মুসলমানদের সেই কষ্টময় যাত্রাই শেষ পর্যন্ত বদর, মক্কা বিজয় এবং ইসলামের বিশ্বব্যাপী প্রসারের পথ সুগম করেছিল। তাই হিজরতের শিক্ষা হলো—কঠিনতা সাময়িক, কিন্তু আল্লাহর প্রতিশ্রুতি চিরন্তন; ত্যাগ ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু তার প্রতিদান অনন্ত; আর যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য সবকিছু ছেড়ে দিতে পারে, আল্লাহ তাকে এমন সম্মান দান করেন, যা ইতিহাসের পাতায় চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে হিজরতের প্রকৃত শিক্ষা উপলব্ধি করার, গুনাহ থেকে নেকির দিকে হিজরত করার এবং ঈমান, ত্যাগ ও তাকওয়ার আলোকে জীবন গড়ে তোলার তাওফিক দান করুন। আমিন।

ঘরে জ্বিন-শয়তানের প্রভাব  প্রতিরোধে ইসলামী নির্দেশনা

মুফতি ওমর বিন নাছির
ঘরে জ্বিন-শয়তানের প্রভাব  প্রতিরোধে ইসলামী নির্দেশনা
সংগৃহীত ছবি

মানবজীবন শুধুমাত্র দৃশ্যমান জগতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর পাশাপাশি একটি অদৃশ্য জগতও রয়েছে, যেখানে আল্লাহ তাআলা জ্বিন ও শয়তান জাতিকে সৃষ্টি করেছেন। তারা মানুষের মতোই একটি বাস্তব সৃষ্টি, যারা মানুষের ঈমান, চিন্তা ও আমলকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। তবে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের জন্য তাদের থেকে নিরাপদ থাকার পথও দেখিয়ে দিয়েছেন— তা হলো কোরআন, সুন্নাহ এবং জিকির-আজকারের মাধ্যমে আত্মরক্ষা।

ইসলাম আমাদেরকে শিখিয়েছে যে ঘরকে শুধু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখাই যথেষ্ট নয়; বরং ঘরের আধ্যাত্মিক নিরাপত্তার দিকেও মনোযোগ দিতে হয়। তাইতো মহানবী (সা.) তাঁর উম্মতকে এমন কিছু দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, যেগুলো অনুসরণ করলে ঘর শয়তানের প্রভাব থেকে সুরক্ষিত থাকে। নিচে ঘরের কিছু নির্দিষ্ট স্থান এবং সেখানে শয়তানের প্রভাব থেকে বাঁচার সুন্নাহসম্মত দিকনির্দেশনা তুলে ধরা হলো।

১. বিছানা ঝেড়ে ঘুমানো
ঘুম মানুষের সবচেয়ে দুর্বল অবস্থাগুলোর একটি, যখন মানুষ সম্পূর্ণ অচেতন থাকে। তাই ঘুমানোর আগে মহানবী (সা.) বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যখন বিছানায় যাবে, সে যেন তার কাপড় দিয়ে বিছানাটি ঝেড়ে নেয় এবং আল্লাহর নাম স্মরণ করে; কারণ সে জানে না তার পরে সেখানে কী এসেছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৩২০, সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৭১৪)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, বিছানা পরিষ্কার রাখা এবং আল্লাহর নাম স্মরণ করা শয়তানের অনিষ্ট থেকে রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

২. অগোছালো কাপড় ও ঘরের আসবাবপত্র গুছিয়ে রাখা
ইসলাম পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও শৃঙ্খলাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। ঘরের জিনিসপত্র অগোছালো রাখা কেবল দৃষ্টিকটু নয়; বরং এটি শয়তানের জন্য অশান্তির সুযোগ তৈরি করে। মহানবী (সা.) ঘুমানোর আগে ঘরের পাত্র ঢেকে রাখা, দরজা বন্ধ রাখা এবং আগুন নিভিয়ে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন, যা ঘরের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার প্রতি গুরুত্ব নির্দেশ করে। অতএব, কাপড়-চোপড় ও ঘরের জিনিসপত্র অগোছালো রাখা থেকে বিরত থাকা সুন্নাহসম্মত একটি সুন্দর অভ্যাস।

৩. ওয়াশরুম পরিস্কার রাখা ও দোয়া পড়ে প্রবেশ করা 
বাথরুম বা শৌচাগার এমন একটি স্থান, যেখানে মানুষ একাকী ও অরক্ষিত অবস্থায় প্রবেশ করে। তাই এখানে প্রবেশের আগে মহানবী (সা.) বিশেষ দোয়া পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই এই শৌচাগারগুলোতে (অশুভ শক্তির) উপস্থিতি থাকে। তাই তোমাদের কেউ প্রবেশ করলে সে যেন বলে, ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযু বিকা মিনাল খুবুসি ওয়াল খাবাইস।’(সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৪২)
এটি প্রমাণ করে যে, এই স্থানে প্রবেশের সময় আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত আমল।

৪. রান্নাঘর ও আগুনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা
রান্নাঘর ঘরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যেখানে আগুন ও তাপ ব্যবহার করা হয়। ইসলাম অগ্নি নিরাপত্তার পাশাপাশি আধ্যাত্মিক সতর্কতার দিকেও গুরুত্ব দিয়েছে।  ঘুমানোর আগে আগুন নিভিয়ে রাখতে বলেছেন, যাতে কোনো অনিষ্ট না ঘটে। অনেক আলেমের মতে, ঘরের আগুন বা চুলার আশেপাশে অসতর্কতা ও বিশৃঙ্খলা শয়তানের প্রভাবের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। তাই রান্নাঘরকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও নিয়মিত ব্যবস্থাপনার মধ্যে রাখা ইসলামী শিষ্টাচারের অন্তর্ভুক্ত।

৫. দরজা-জানালা ও ঘরের প্রবেশপথ বন্ধ রাখা
ঘরের নিরাপত্তার জন্য দরজা-জানালা বন্ধ রাখা এবং আল্লাহর নাম স্মরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা দরজা বন্ধ করো এবং আল্লাহর নাম স্মরণ করো; কারণ শয়তান এমন দরজা খুলতে পারে না যা আল্লাহর নাম নিয়ে বন্ধ করা হয়েছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৩০৪)
এটি ঘরের আধ্যাত্মিক সুরক্ষার এক শক্তিশালী মাধ্যম।

শয়তানের অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য আরো কিছু প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা:
১. নিয়মিত আয়াতুল কুরসি তিলাওয়াত করা। 
২. ঘরে সুরা বাকারা তিলাওয়াত করা। 
৩. ঘুমের আগে ও সকালে-সন্ধ্যায় জিকির করা।
৪. ঘর প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় দোয়া পাঠ করা।
৫. ঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা। 

অতএব, ঘরকে শুধু বসবাসের স্থান নয়, বরং ইবাদতের পরিবেশ হিসেবে গড়ে তোলা প্রত্যেক মুমিনের দায়িত্ব। আল্লাহর জিকির, কোরআনের তিলাওয়াত এবং সুন্নাহভিত্তিক জীবনই আমাদের ঘরকে প্রশান্তি, রহমত ও বরকতে পরিপূর্ণ করতে পারে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তাঁর আশ্রয়ে সুরক্ষিত রাখুন এবং শয়তানের সকল অনিষ্ট থেকে হেফাজত করুন। আমিন।


 

মধ্য এশিয়ার গর্ব : নুর সুলতান গ্র্যান্ড মসজিদ

ইসলামী জীবন ডেস্ক
মধ্য এশিয়ার গর্ব : নুর সুলতান গ্র্যান্ড মসজিদ
সংগৃহীত ছবি

মধ্য এশিয়ার হৃদয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে কাজাখস্তানের রাজধানী আস্তানার দৃষ্টিনন্দন নুর সুলতান গ্র্যান্ড মসজিদ। আধুনিক স্থাপত্য, ইসলামী শিল্পকলার সৌন্দর্য এবং জাতীয় ঐতিহ্যের অনন্য সমন্বয়ে নির্মিত এই মসজিদ আজ শুধু কাজাখস্তানের নয়, বরং সমগ্র মুসলিম বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় ধর্মীয় স্থাপনায় পরিণত হয়েছে। 

মধ্য এশিয়ার বৃহত্তম এবং বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মসজিদ হিসেবে পরিচিত এই মহিমান্বিত স্থাপনাটি নির্মিত হয়েছে প্রায় ১০ হেক্টর (প্রায় ২৫ একর) ভূমির ওপর। বিশাল এই মসজিদে একসঙ্গে প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন, যা একে বিশ্বের বৃহত্তম মসজিদগুলোর কাতারে স্থান দিয়েছে।

আকাশছোঁয়া মিনার ও বিশাল গম্বুজ
মসজিদের চার কোণে স্থাপিত চারটি সুউচ্চ মিনারের প্রতিটির উচ্চতা ১৩০ মিটার। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, মিনারগুলো যেন রাজধানীর আকাশরেখাকে স্পর্শ করেছে। মসজিদের কেন্দ্রীয় গম্বুজের ব্যাস ৬২ মিটার এবং উচ্চতা প্রায় ৯০ মিটার, যা বিশ্বের বৃহত্তম গম্বুজগুলোর অন্যতম হিসেবে বিবেচিত। প্রধান গম্বুজকে ঘিরে রয়েছে আরো ৭২টি ছোট গম্বুজ, যা পুরো স্থাপনাটিকে দিয়েছে এক অনিন্দ্যসুন্দর ও রাজকীয় আবহ। নীল, সাদা ও সোনালি রঙের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই স্থাপত্য যেন ইসলামী সভ্যতার সৌন্দর্যের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

আধুনিক প্রযুক্তি ও ইসলামী স্থাপত্যের অসাধারণ সমন্বয়
মসজিদটির নকশা প্রণয়ন করেছে দুবাইভিত্তিক দিওয়ান আর্কিটেক্টস অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স। স্থপতিরা এমনভাবে পরিকল্পনা করেছেন যাতে স্থাপনাটির বিশালতা, নান্দনিকতা এবং আধ্যাত্মিক পরিবেশ একে অপরের সঙ্গে সুশোভিতভাবে মিশে যায়। গম্বুজ নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে বিশেষ হালকা স্টিল ফ্রেম, যার ফলে মসজিদের প্রধান নামাজঘরটি প্রায় স্তম্ভবিহীন রাখা সম্ভব হয়েছে। এতে বিপুলসংখ্যক মুসল্লি একসঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্যে ইবাদত করতে পারেন।

আলো-ছায়ার মোহনীয় জগৎ
মসজিদের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে মনোমুগ্ধকর আলোকসজ্জা। গম্বুজ, দেয়াল, খিলান এবং কার্পেটের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলতে ব্যবহার করা হয়েছে অত্যাধুনিক এলইডি প্রযুক্তি ও কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত লাইটিংব্যবস্থা। বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এসব আলো প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করা যায়। জুমা, রমজান, ঈদ কিংবা অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানে আলোকসজ্জা ভিন্ন ভিন্ন আবহ সৃষ্টি করে, যা দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।

কিবলা দেয়ালে আল্লাহর ৯৯ নাম
মসজিদের অন্যতম আকর্ষণ হলো এর কিবলামুখী দেয়াল। সেখানে কুফি ক্যালিগ্রাফিতে অত্যন্ত নান্দনিকভাবে অঙ্কিত হয়েছে আল্লাহ তাআলার ৯৯টি পবিত্র নাম। জ্যামিতিক নকশা, কাচের ব্যাকলিট মোজাইক এবং সোনালি আলোকছটার সমন্বয়ে এই দেয়াল এক অপার্থিব সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছে। নামাজরত মুসল্লিরা যখন কিবলার দিকে মুখ করে দাঁড়ান, তখন আলোকিত এসব নাম তাদের হৃদয়ে আল্লাহর মহিমা ও স্মরণকে আরো গভীর করে তোলে। এ কারণেই স্থপতিরা এই অংশকে মসজিদের ‘ফোকাল পয়েন্ট’ হিসেবে বিবেচনা করেন।

জাতীয় পরিচয় ও ইসলামী ঐতিহ্যের প্রতিফলন
মসজিদের বাহ্যিক অংশে ব্যবহৃত সাদা পাথর, নীল ও সোনালি রং কাজাখস্তানের জাতীয় পতাকার রঙের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে এটি শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বরং কাজাখ জাতীয় পরিচয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও প্রতীক। মসজিদের চারপাশের প্রাঙ্গণ পাঁচটি অংশে বিভক্ত, যা প্রতীকীভাবে ইসলামের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের স্মারক। চারদিকে সুনিপুণ বাগান, খোলা প্রাঙ্গণ ও শান্ত পরিবেশ দর্শনার্থীদের মনে প্রশান্তির অনুভূতি জাগায়।

ইবাদতের পাশাপাশি শিক্ষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্র
নুর সুলতান গ্র্যান্ড মসজিদ শুধু নামাজ আদায়ের স্থান নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ও সামাজিক কমপ্লেক্স। এখানে রয়েছে আধুনিক গ্রন্থাগার, কনফারেন্স হল, ইসলামী শিক্ষা ও গবেষণা কেন্দ্র, শিশুদের প্রশিক্ষণ কক্ষ, টেলিভিশন স্টুডিও, বিয়ে ও সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্য নির্ধারিত স্থান এবং পর্যটকদের জন্য তথ্যকেন্দ্র। ফলে মসজিদটি আজ ধর্ম, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

রসিকতার সীমারেখা টেনে দিয়েছে ইসলাম | কালের কণ্ঠ