• ই-পেপার

হিজরি নববর্ষ ১৪৪১

আরবে হিজরি সনের আগে প্রচলিত ছিল 'হস্তীবর্ষ'

জন্মদাতা পিতা ব্যতীত অন্যকে ‘বাবা’ বলা প্রসঙ্গে ইসলাম কী বলে?

মুফতি ওমর বিন নাছির
জন্মদাতা পিতা ব্যতীত অন্যকে ‘বাবা’ বলা প্রসঙ্গে ইসলাম কী বলে?
সংগৃহীত ছবি

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, আর্জেন্টিনার তারকা ফুটবলার লিওনেল মেসির প্রতি অতিরিক্ত আবেগ প্রকাশ করতে অনেকেই তাকে ‘বাবা’ বলে সম্বোধন করছেন। কেউ মজা করে, কেউ প্রতিপক্ষকে খোঁচা দিতে, আবার কেউ ভক্তির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এ ধরনের ভাষা ব্যবহার করছেন। কিন্তু একজন মুসলিমের জন্য কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিশেষ করে যখন সেই ব্যক্তি জন্মদাতা পিতা নন এবং একজন অমুসলিম হন সেক্ষেত্রে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর। 

ইসলামে পিতা-মাতার মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমার প্রতিপালক আদেশ করেছেন যে, তোমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে এবং পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করবে।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ২৩)
কেননা একজন পিতা শুধু একজন অভিভাবক নন; তিনি সন্তানের পরিচয়, বংশ এবং পারিবারিক মর্যাদার অন্যতম ভিত্তি। তাই নিজ পিতার পরিচয় পরিবর্তন বা অন্যকে পিতা বলে দাবি করা সম্পূর্ণ হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তাদেরকে তাদের পিতার নামেই ডাকো। এটিই আল্লাহর কাছে অধিক ন্যায়সঙ্গত।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৫)

এই আয়াত প্রমাণ করে, একজন মানুষের প্রকৃত পিতার পরিচয় সংরক্ষণ করা ইসলামের নির্দেশ। তাছাড়া রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জেনে-শুনে নিজ পিতা ছাড়া অন্য কাউকে নিজের পিতা বলে দাবি করে, তার জন্য জান্নাত হারাম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৭৬৬)

আরেক হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি নিজেকে তার পিতা ব্যতীত অন্য কারও সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত করে, তার ওপর আল্লাহ, ফেরেশতা ও সমগ্র মানুষের লানত।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৩৭০)
এ হাদিসগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো বংশপরিচয় বিকৃত করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

মজা করে বা আবেগে কাউকে 'বাবা' বলা যাবে কি?
যদি কেউ সত্যিকার অর্থে তাকে নিজের জন্মদাতা পিতা মনে না করে, তবে এটি বংশ পরিবর্তনের শামিল নয়। তবে এখানেই বিষয়টি শেষ নয়। ইসলাম ভাষার শালীনতা ও শব্দচয়নের প্রতিও গুরুত্ব দিয়েছে। একজন মুসলিমের মুখ থেকে এমন শব্দ বের হওয়া উচিত নয়, যা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে, অতিরঞ্জিত ভক্তি প্রকাশ করে অথবা পিতা শব্দের মর্যাদাকে হালকা করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তার নিকট তৎপর প্রহরী (ফেরেশতা) উপস্থিত থাকে।’ (সুরা : ক্বাফ, আয়াত : ১৮)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘বান্দা এমন একটি কথা বলে, যার পরিণতি সে গুরুত্ব দেয় না; অথচ সে কারণে সে জাহান্নামে অনেক দূরে নিক্ষিপ্ত হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৭৮)
অতএব, ‘বাবা’ শব্দটি ঠাট্টা, ট্রল বা অন্ধ ভক্তির ভাষা হিসেবে ব্যবহার করাও একজন মুসলিমের মর্যাদাপূর্ণ চরিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

ফুটবল কিংবা অন্য কোনো খেলাকে কেন্দ্র করে আবেগ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই আবেগ যেন ইসলামের সীমারেখা অতিক্রম না করে। জন্মদাতা পিতা ছাড়া অন্য কাউকে ‘বাবা’ বলে সম্বোধন করা—বিশেষ করে একজন বিধর্মী খেলোয়াড়কে—ইসলামী আদব ও শালীনতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। যদিও তা বংশ পরিবর্তনের দাবি না-ও হতে পারে, তবুও এ ধরনের শব্দচয়ন পরিহার করাই তাকওয়া, ভদ্রতা ও ঈমানি ব্যক্তিত্বের দাবি। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে কথাবার্তা, আচরণ ও ভালোবাসার প্রকাশ—সবকিছুতে কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

প্রথম জাতীয় তাফসির প্রতিযোগিতা শুরু করছে সরকার, পুরস্কার সাড়ে ৪ লাখ টাকা

অনলাইন ডেস্ক
প্রথম জাতীয় তাফসির প্রতিযোগিতা শুরু করছে সরকার, পুরস্কার সাড়ে ৪ লাখ টাকা

সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা ও নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো আয়োজন করা হতে যাচ্ছে ‘জাতীয় তাফসির প্রতিযোগিতা ২০২৬’। ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে ইসলামিক ফাউন্ডেশন এই মেগাপ্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে।

শনিবার (১৮ জুলাই) ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সমন্বয় বিভাগের পরিচালক মো. মহিউদ্দিনের স্বাক্ষর করা এক বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। যোগ্য প্রার্থীদের দ্রুত সময়ের মধ্যে অনলাইনে আবেদন করার জন্য আহ্বান জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, প্রতিযোগিতাটি বিভাগীয় পর্যায় থেকে শুরু হয়ে জাতীয় পর্যায়ের চূড়ান্ত পর্বের মাধ্যমে শেষ হবে। যোগ্য ও আগ্রহী বাংলাদেশী নাগরিকদের কাছ থেকে ইতিমধ্যে দরখাস্ত আহ্বান করা হয়েছে।

প্রতিযোগিতার গ্রুপ ও বিষয়

গ্রুপ ‘ক’ (অনূর্ধ্ব ৩০ বছর) : ফাজিল, জালালাইন, দাওরায়ে হাদিস, কামিল এবং আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নিতে পারবেন। তাফসিরের বিষয় : সুরা ফাতিহা, সুরা বাকারা ও সুরা আলাক।

গ্রুপ ‘খ’ (অনূর্ধ্ব ৪০ বছর) : কামিল, দাওরায়ে হাদিস এবং আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী মাদরাসা শিক্ষক, খতিব, ইমাম, গবেষক, দাঈ, ইসলামী লেখক, ওয়ায়েজ ও সংস্কৃতিকর্মীরা এই গ্রুপে আবেদন করতে পারবেন। তাফসিরের বিষয়: সূরা আন-নূর, সূরা ইয়াছীন, সূরা হুজরাত, সূরা আর রাহমান ও সূরা ওয়াকিয়াহ।

আবেদনের যোগ্যতা

আবেদনকারীকে অবশ্যই বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে এবং আরবি ভাষায় কথা বলায় পারদর্শী হতে হবে। এছাড়া পবিত্র কুরআনের শাব্দিক অর্থসহ তরজমা করার যোগ্যতা এবং উলুমুল কোরআন, উসুলুত তাফসির, হাদিস, ফিকহ, ইলমুন নাহু, ইলমুস সরফ ও বালাগাতসহ প্রয়োজনীয় বিষয়ে সম্যক জ্ঞান থাকতে হবে।

আকর্ষণীয় পুরস্কারের মূল্যমান

জাতীয় ও বিভাগীয়—উভয় পর্যায়েই বিজয়ীদের জন্য বিশাল অঙ্কের অর্থ ও সম্মাননা রয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন (একজন) পাবেন ২ লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সনদপত্র। ১ম রানার্স আপ (দুই জন) পাবেন দেড় লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সনদপত্র। ২য় রানার্স আপ (দুই জন) পাবেন ১ লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সনদপত্র।

এদিকে বিভাগীয় পর্যায়ে প্রথম পুরস্কার বিজয়ী পাবেন নগদ ২০ হাজার টাকা, ক্রেস্ট ও সনদপত্র। ২য় পুরস্কার বিজয়ী পাবেন নগদ ১৫ হাজার টাকা, ক্রেস্ট ও সনদপত্র। ৩য় পুরস্কার বিজয়ী পাবেন নগদ ১০ হাজার টাকা, ক্রেস্ট ও সনদপত্র।

আবেদনের নিয়মাবলী ও নির্বাচন প্রক্রিয়া

১। আগ্রহী প্রার্থীদের আগামী ৩১ আগস্ট ২০২৬ তারিখের মধ্যে অনলাইনে এই লিঙ্কের (https://tinyurl.com/tafsircompetition26) মাধ্যমে আবেদন সম্পন্ন করতে হবে।

২। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ৮টি বিভাগীয় কার্যালয়ের (ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, রংপুর ও ময়মনসিংহ) যেকোনো একটিকে বেছে নিয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে হবে এবং তা অনলাইন আবেদনে উল্লেখ করতে হবে।

৩। বিভাগীয় পরীক্ষার সময়সূচি পরবর্তীতে জানিয়ে দেওয়া হবে।

৪। বিভাগীয় পর্যায়ের বিজয়ীদের নিয়ে রাজধানী ঢাকায় এক সপ্তাহের বিশেষ গ্রুমিং বা প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে। এরপরই অনুষ্ঠিত হবে চূড়ান্ত জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতা।

৫। নির্বাচনী পরীক্ষায় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।

সহায়ক গ্রন্থাবলী : প্রতিযোগিতার প্রস্তুতির জন্য সাফওয়াতুত তাফাসীর, কালিমাতুল কুরআন, তাফসীরে জালালাইন, তাফসীরে মাজহারী, তাফসীর ইবনে কাছীর ও তাফসীরে মারেফুল কুরআনকে সহায়ক গ্রন্থ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।


 

হাদিসের বাণী

শাসকের আনুগত্য করার গুরুত্ব

ইসলামী জীবন ডেস্ক
শাসকের আনুগত্য করার গুরুত্ব
সংগৃহীত ছবি

বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আবু হুনাইদা ওয়াইল ইবনে হুজর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সালামাহ ইবনে ইয়াজিদ আল জুফি একবার মহানবী (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, যদি আমাদের ওপর এমন কোনো শাসক বা বাদশাহ নিযুক্ত হয়, যারা শুধু নিজেদের হক আদায় করতে চায়, কিন্তু আমাদের হক আদায় করে না। সেই পরিস্থিতিতে আপনি আমাদের কী করতে বলবেন? এ কথা শুনে মহানবী (সা.) তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। লোকটি পুনরায় জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, তোমরা তাদের কথা শুনবে এবং তাদের আনুগত্য করবে। কারণ তাদের দায়িত্ব তাদের ওপর আবশ্যক করে দেওয়া হয়েছে। আর তোমাদের দায়িত্ব তোমাদের ওপর আবশ্যক করে দেওয়া হয়েছে। (সহিহ মুসলিম, ৪৭৮২)

শিক্ষা ও বিধান 
১. বৈধ বিষয়ে শাসকের আনুগত্য করা জরুরি। শাসক যদি ব্যক্তিগতভাবে জুলুমও করে, তবুও আল্লাহর অবাধ্যতা নয়—এমন বিষয়ে তার আনুগত্য করতে হবে।

২. নিজ নিজ দায়িত্ব পালনই মূল বিষয়। শাসকের ওপর আবশ্যক হলো জনগণের হক যথাযথভাবে আদায় করা, আর জনগণের ওপর আবশ্যক হলো বৈধ আনুগত্য ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা।

৩. অন্যায়ের কারণে বিদ্রোহ বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা সমর্থিত নয়। কারণ তা সমাজে আরো বড় ফিতনা, রক্তপাত ও অস্থিরতার কারণ হতে পারে।

৪. অন্যের অন্যায় আমার অন্যায়ের বৈধতা দেয় না। শাসক তার দায়িত্বে ব্যর্থ হলে সে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করবে; কিন্তু জনগণও নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে।

৫. ধৈর্য ধারণের শিক্ষা। জুলুমের পরিস্থিতিতেও ধৈর্য, দোয়া এবং শরিয়তসম্মত উপায়ে সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতিবাদের মাধ্যমে সংশোধনের চেষ্টা করা একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য।

৬. কিয়ামতের দিন প্রত্যেককেই নিজ নিজ আমলের হিসাব দিতে হবে। তাই অন্যের অবিচারকে অজুহাত বানিয়ে নিজের দায়িত্ব অবহেলা করা যাবে না।

৭. শাসকের জন্যও সতর্কবার্তা হলো, জনগণের হক যথাযথভাবে আদায় না করলে সে আল্লাহর কাছে কঠিন জবাবদিহির সম্মুখীন হবে।

সারকথা, এই হাদিসের অর্থ এই নয় যে, শাসকের সব অন্যায়কে সমর্থন করতে হবে। বরং ইসলামে সৎ উপদেশ (নসিহত), ন্যায়ের আদেশ, অন্যায় থেকে নিষেধ এবং বৈধ উপায়ে সংশোধনের চেষ্টা করার নির্দেশ রয়েছে। তবে যদি শাসক আল্লাহর অবাধ্যতার আদেশ দেন, তাহলে সেই ক্ষেত্রে তার আনুগত্য করা বৈধ নয়।

বন্যা-পরবর্তী সাপের উপদ্রব থেকে বাঁচতে করণীয়

ইসলামী জীবন ডেস্ক
বন্যা-পরবর্তী সাপের উপদ্রব থেকে বাঁচতে করণীয়
সংগৃহীত ছবি

বর্ষাকাল বাংলাদেশের মানুষের জন্য যেমন রহমতের বার্তা নিয়ে আসে, তেমনি অতিবৃষ্টি ও বন্যা অনেক সময় তা দুর্ভোগে পরিণত করে। চলমান বন্যায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল, বিশেষ করে চট্টগ্রামের বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, বোয়ালখালী, পটিয়া, আনোয়ারা, রাউজান, রাঙ্গুনিয়াসহ বৃহত্তর চট্টগ্রামের বহু এলাকা পানিতে প্লাবিত হয়েছে। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি মানুষের সামনে দেখা দিয়েছে আরেকটি নীরব কিন্তু প্রাণঘাতী সংকট—সাপের উপদ্রব।

বন্যার পানিতে সাপের গর্ত ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল ডুবে গেলে তারা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে মানুষের বসতঘর, রান্নাঘর, গোয়ালঘর, খড়ের গাদা, বিদ্যালয়, আশ্রয়কেন্দ্র, এমনকি বিছানার নিচেও আশ্রয় নিতে পারে। ফলে অসতর্কতার কারণে সাপের কামড়ের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে ভয় নয়, সচেতনতা, সঠিক জ্ঞান এবং দ্রুত চিকিৎসাই হতে পারে জীবন রক্ষার সর্বোত্তম উপায়।

মানুষের জীবনের সর্বোচ্চ মর্যাদা
ইসলাম মানুষের জীবনকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছে। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি একটি প্রাণ রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে রক্ষা করল।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৩২)

অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা নিজেদের ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ কোরো না।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৯৫)

যদিও এই আয়াতের মূল প্রসঙ্গ আল্লাহর পথে ব্যয়, তবু এর নির্দেশনা অনুযায়ী নিজের জীবনকে অযথা ঝুঁকির মুখে না ফেলা ইসলামের একটি সাধারণ নীতি। আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা সতর্কতা অবলম্বন করো।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৭১)
এই আয়াত আমাদের শিক্ষা দেয় যে সম্ভাব্য বিপদ মোকাবেলায় আগাম প্রস্তুতি ও সতর্কতা অবলম্বন করা ঈমানদারের কর্তব্য।

সাপ-বিচ্ছুর দংশন থেকে বাঁচার দোয়া
প্রিয় নবী (সা.) ছিলেন সাপ-বিচ্ছুসহ বিষাক্ত প্রাণীর দংশন থেকে বাঁচতে বিভিন্ন দোয়া শিখিয়েছেন। এর মধ্যে একটি দোয়া হলো-

اِنَّا نَسْئَلُكَ بِعَهْدِ نُوْحٍ وَبِعَهْدِ سُلَيْمَانَ بْنِ دَاؤُدَ اَنْ لَا تُؤْذِيْنَا

উচ্চারণ : ইন্না নাসআলুকা বিআহদি নুহ, ওয়া বিআহদি সুলাইমানাবনি দাউদা আল্লা তুযিনা।

অর্থ : ও হে সাপ! আমরা নূহ্ আলাইহিস সালাম এবং সুলাইমান আলাইহিস সালামের অঙ্গীকারের কথা তোদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। তোরা আমাদের কোন ক্ষতি করিস না এবং আমাদের কষ্ট দিস না। (আবু দাউদ, হাদিস : ৫২৬০)

চিকিৎসা গ্রহণের প্রতি নবীজির উৎসাহ
রাসুলুল্লাহ (সা.) চিকিৎসা গ্রহণের প্রতি উৎসাহ দিয়ে বলেছেন, ‘হে আল্লাহর বান্দারা! চিকিৎসা গ্রহণ করো। কেননা আল্লাহ এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি, যার চিকিৎসা নেই।’ (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৩৮৫৫; জামে তিরমিজি, হাদিস : ২০৩৮)

এই হাদিস স্পষ্ট করে যে দুর্ঘটনা বা রোগব্যাধির ক্ষেত্রে যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ করা তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়; বরং ইসলামের নির্দেশনা।


সাপে কামড়ালে কী করবেন?
সাপে কামড়ানোর পর অনেকেই ওঝা, ঝাড়ফুঁক বা কুসংস্কারের আশ্রয় নেন। এতে মূল্যবান সময় নষ্ট হয় এবং রোগীর জীবন ঝুঁকিতে পড়ে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে শান্ত রাখতে হবে, কামড়ানো অঙ্গ যতটা সম্ভব স্থির রাখতে হবে এবং দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নিতে হবে। বিষ চুষে বের করা, ক্ষত কেটে রক্ত বের করা বা শক্ত করে দড়ি বাঁধার মতো ভুল পদ্ধতি পরিহার করতে হবে।

প্রতিরোধই সর্বোত্তম ব্যবস্থা
বন্যার সময় কয়েকটি সাধারণ সতর্কতা অনেক বড় দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করতে পারে। রাতে চলাফেরার সময় টর্চ ব্যবহার করা, খালি পায়ে না হাঁটা, ঘরের চারপাশ পরিষ্কার রাখা, জুতা ও কাপড় ব্যবহারের আগে পরীক্ষা করা, মেঝেতে না শুয়ে উঁচু খাটে ঘুমানো এবং শিশুদের প্রতি বিশেষ নজর রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পরিবেশ ও ইসলামের ভারসাম্য
ইসলাম অকারণে কোনো প্রাণী হত্যা সমর্থন করে না। সাপ মানুষের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি সৃষ্টি করলে আত্মরক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া বৈধ। তবে নিরাপদভাবে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব হলে সেটিই উত্তম। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সাপেরও একটি ভূমিকা রয়েছে, কারণ তারা ইঁদুরসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

সমাজ ও রাষ্ট্রের করণীয়
বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু ত্রাণ বিতরণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। আশ্রয়কেন্দ্রে পর্যাপ্ত আলো, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সাপ প্রতিরোধে সচেতনতামূলক প্রচার, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনমের মজুদ এবং দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা জরুরি। মসজিদের ইমাম, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি ও সামাজিক সংগঠনগুলোও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

বৃহত্তর চট্টগ্রামের মতো পাহাড়ি, বনাঞ্চলসংলগ্ন ও জলাবদ্ধ এলাকায় বসবাসকারী মানুষের জন্য এই সচেতনতা আরো বেশি প্রয়োজন। কারণ সামান্য অবহেলা একটি পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হতে পারে। বন্যা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় ধৈর্য, দোয়া, সতর্কতা এবং যথাযথ ব্যবস্থা—সবকিছুর প্রয়োজন।

আরবে হিজরি সনের আগে প্রচলিত ছিল 'হস্তীবর্ষ' | কালের কণ্ঠ