রাজধানীর ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেস (ইউআইটিএস) এ বসুন্ধরা শুভসংঘের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়েছে সাহিত্যভিত্তিক পাঠচক্র।
আজ মঙ্গলবার (১২ মে) তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে বইপড়া, সাহিত্যচর্চা, মানবিক মূল্যবোধ ও মুক্তচিন্তার বিকাশ ঘটানোর লক্ষ্য নিয়ে বসুন্ধরা শুভসংঘ আয়োজিত পাঠচক্রে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল দেশের খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন রচিত বহুল আলোচিত উপন্যাস ‘পরাধীনতা’। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নেন।
পাঠচক্রে বইটির বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে অংশগ্রহণকারীরা বলেন, ‘পরাধীনতা’ শুধু একটি উপন্যাস নয়; এটি প্রবাসজীবনের কঠিন বাস্তবতা, মানুষের স্বপ্নভঙ্গ, আত্মসংগ্রাম এবং বেঁচে থাকার নিরন্তর যুদ্ধের এক নির্মম দলিল। উপন্যাসটিতে লেখক অত্যন্ত বাস্তব ও হৃদয়স্পর্শী ভাষায় তুলে ধরেছেন বিদেশে জীবন গড়ার আশায় দেশ ছেড়ে যাওয়া অসংখ্য মানুষের দুঃখ-কষ্ট, একাকীত্ব এবং শোষণের চিত্র।
আলোচনায় উঠে আসে, ১৯৭৯ সালে উন্নত জীবনের আশায় পশ্চিম জার্মানিতে পাড়ি জমান ইমদাদুল হক মিলন। সেখানে প্রায় দুই বছর ধরে অত্যন্ত কঠিন ও অমানবিক জীবনযাপন করেন। ভাষাগত সীমাবদ্ধতা, সাংস্কৃতিক ভিন্নতা, অনিশ্চয়তা এবং টিকে থাকার সংগ্রাম তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। সেই বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই দেশে ফিরে তিনি লেখেন ‘পরাধীনতা’।
বইটি প্রকাশের পর দেশের সাহিত্য অঙ্গনে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়। দেশের প্রখ্যাত কবি, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরা বইটি পড়ে বিস্মিত হন এবং সাধারণ পাঠকদের মাঝেও এটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
বসুন্ধরা শুভসংঘ ইউআইটিএস শাখার সভাপতি এ ই এম ফাহিম হাসান বলেন, বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন অনেকের কাছেই আকর্ষণীয় মনে হলেও বাস্তবতা অনেক সময় ভয়াবহ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশের দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য প্রবাসজীবন সবসময় সুখকর নয়। অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, অমানবিক শ্রম, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা তাদের প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়ায়। ‘পরাধীনতা’ উপন্যাসটি সেই বাস্তবতাকে অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে তুলে ধরেছে।
বসুন্ধরা শুভসংঘ ইউআইটিএস শাখার সাধারণ সম্পাদক রোহান বলেন, বইটি পড়ে তার প্রবাসজীবনের এমন অনেক দিক সম্পর্কে জানতে পেরেছি, যা সাধারণত বাইরে থেকে বোঝা যায় না। অনেকেই মনে করেন, বর্তমান প্রজন্মের তরুণদের শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদনে সীমাবদ্ধ না থেকে সাহিত্যচর্চার দিকে আরো বেশি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। কারণ সাহিত্য মানুষকে চিন্তা করতে শেখায়, বাস্তবতা উপলব্ধি করতে সাহায্য করে এবং মানবিক গুণাবলি বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ইউআইটিএসের শিক্ষার্থীরা বলেন, বর্তমান সময়ে তরুণদের মাঝে বইপড়ার আগ্রহ কমে যাওয়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক। একটি ভালো বই শুধু জ্ঞান বাড়ায় না, বরং একজন মানুষকে দায়িত্বশীল, সচেতন ও মানবিক নাগরিক হিসেবেও গড়ে তোলে। সেই জায়গা থেকেই বসুন্ধরা শুভসংঘের এই ধরনের আয়োজন অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
নিয়মিত পাঠচক্র আয়োজনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল চিন্তার বিকাশ ঘটানো সম্ভব বলে মত দেন তারা।
আলোচনায় আরো উঠে আসে, ‘পরাধীনতা’ উপন্যাসটি এখনো দেশের বহু পাঠকের কাছে সমানভাবে জনপ্রিয়। বিশেষ করে বিদেশে পাড়ি জমানোর আগে অনেক তরুণ বইটি পড়েন। প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যেও বইটি ব্যাপকভাবে আলোচিত। অনেকেই মনে করেন, এটি প্রবাসজীবনের এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি, যেখানে স্বপ্নের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কঠিন সত্যগুলো ফুটে উঠেছে।
এ সময় অংশগ্রহণকারীদের মাঝে বইপড়া ও জ্ঞানচর্চার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করা হয় এবং তরুণদের আলোকিত সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানানো হয়।
বসুন্ধরা শুভসংঘের সদস্যরা জানান, ভবিষ্যতেও দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্ম নিয়ে পাঠচক্র, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের আয়োজন অব্যাহত থাকবে।
অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা নিয়মিত বইপড়া ও সাহিত্যচর্চার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।








