রিপাবলিক অব এস্তোনিয়া উত্তর ইউরোপের বাল্টিক অঞ্চলের দেশ। যার উত্তরে ফিনল্যান্ড সাগর, পশ্চিমে বাল্টিক সাগর, দক্ষিণে লাটভিয়া ও পূর্বে রাশিয়া অবস্থিত। এস্তোনিয়া একটি জলা ও প্রাচীন অরণ্যে পূর্ণ নিম্নভূমির দেশ। এর উপকূলীয় জলসীমায় প্রায় আড়াই হাজার দ্বীপ এবং সমতলে দেড় হাজার হ্রদ আছে। এস্তোনিয়ার ভূভাগের প্রায় অর্ধেকই বনাঞ্চল। তথ্য-প্রযুক্তি, শিল্প, সেবা খাত, কৃষি ও প্রাকৃতিক সম্পদ দেশটির অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। তাল্লিন এস্তোনিয়ার সর্ববৃহৎ শহর ও রাজধানী। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর দেশটি পরিপূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে এবং ২০০৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেয়। দেশটির মোট আয়তন ৪৫ হাজার ৩৩৫ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা ১৩ লাখ ৬২ হাজার ৯৫৪ জন। তাদের বেশির ভাগ খ্রিস্টধর্ম অনুসারী। এস্তোনিয়ায় মুসলিমরা সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হিসেবে বসবাস করে। তাদের হার মোট জনসংখ্যার ১ শতাংশেরও কম। এস্তোনিয়ান মুসলিমদের বেশির ভাগ সুন্নি ও হানাফি মাজহাবের অনুসারী।
বর্তমান এস্তোনিয়ার ভূখণ্ডে খ্রিস্টপূর্ব ৯ হাজার বছর আগে মানব বসতি গড়ে উঠেছিল। খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতকে এস্তোনিয়ার পৌত্তলিক জনসাধারণ খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে। এস্তোনিয়ায় সর্বপ্রাচীন মুসলিম নিদর্শন হলো অষ্টম শতকের ইসলামী মুদ্রা। ধারণা করা হয়, ভাইকিং ব্যবসায়ীরা আব্বাসীয় আমলে তৈরি এসব রৌপ্য মুদ্রা এস্তোনিয়ায় নিয়ে এসেছিল। সংরক্ষিত ইতিহাস অনুসারে এস্তোনিয়ায় মুসলমানদের আগমন হয়েছিল খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতকে। তারা লিভোনিয়ান যুদ্ধের সময় রুশ সাম্রাজ্যের সৈনিক হিসেবে এখানে এসেছিল। সুন্নি তাতার সম্প্রদায়ের সৈনিকরাই এস্তোনিয়ায় প্রথম মুসলিম বসতি স্থাপন করেছিল। তবে তাদের অবস্থান ছিল অস্থায়ী। ১৭২১ সালে এস্তোনিয়া রুশ সাম্রাজ্যের অধীন হলে একদল তাতার মুসলিম তাল্লিনে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। তারা উনিশ শতকের মধ্যভাগে একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করে।
১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে এস্তোনিয়ায় তাতার ব্যবসায়ীদের একটি দল বসতি স্থাপন করে। নারভা শহর ছিল তাদের ব্যাবসায়িক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। এ ছাড়া তাল্লিন ও তারতু শহরেও তাতার মুসলিমরা ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠান খুলেছিল এবং ব্যবসা শুরু করেছিল। নারভার মুসলিমরা অনুদান হিসেবে পাওয়া একটি বাড়িকে মসজিদে রূপান্তর করেছিল। রিপাবলিক অব এস্তোনিয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর ১৯২৮ সালে নারভা মুহামেদি কোগদুস নামের একটি সংগঠন এবং ১৯৩৯ সালে তাল্লিনা মুহামেদি উসুহিং নামে আরেকটি সংগঠন নিবন্ধন লাভ করে। তাদের ধর্মীয় উপাসনার আয়োজন, পরিচালনা এবং মুসলিম কবরস্থানের রক্ষণাবেক্ষণের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ১৯৪০ সালে সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ উভয় সংগঠনকে নিষিদ্ধ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মুসলমানদের মসজিদ ও মুসলিম সংগঠনের কার্যালয় ধ্বংস করা হয়। বর্তমানে ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘দি এস্তোনিয়ান ইসলামিক কনগ্রেজেজন’ মুসলমানদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রধান মুসলিম সংগঠন, যা দেশের একমাত্র মসজিদ (এস্তোনিয়ান ইসলামিক সেন্টার) পরিচালনা করে।
এস্তোনিয়ায় মুসলিমরা বহু উত্থান-পতনের ভেতর দিয়ে গেছে। বিভিন্ন সময়ে তারা দুর্যোগ ও দুঃসময় পার করেছে। বিশেষত সোভিয়েত রাশিয়ার শাসনামলে এস্তোনিয়ান মুসলিমরা সংকটময় সময় কাটিয়েছে এবং তাদের ধর্মচর্চায় প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়েছে। সোভিয়েত আমলে মুসলিম সম্প্রদায়ের একাধিক নেতাকে হত্যা, আটক ও দেশান্তর করা হয়। ধর্ম ত্যাগে বাধ্য করা হয় অনেক মুসলিমকে। সে সময় প্রকাশ্যে ধর্মচর্চা ও ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার সুযোগ না থাকায় পারিবারিক পরিমণ্ডলেই ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করা হতো। পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছ থেকে নবীনরা কোরআন তিলাওয়াত, নামাজ ও ইসলামের মৌলিক বিধি-বিধানগুলো শিক্ষা করত। তার পরও এস্তোনিয়ায় মুসলমানদের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। ১৯৩৪ সালের পরিসংখ্যান অনুসারে এস্তোনিয়ায় মুসলমানের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৭০ জন। ২০০৮ সালে তাদের সংখ্যা বেড়ে হয় চার হাজার। ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান অনুসারে এস্তোনিয়ায় মুসলমানের সংখ্যা ১০ হাজার।
এস্তোনিয়ার মুসলমানরা স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনের সুযোগ পায় এবং তারা মধ্যপন্থী ও সহনশীল হিসেবে পরিচিত। দেশটির সংবিধান সব ধর্মের অনুসারীদের ধর্মীয় স্বাধীনতার সুরক্ষা দেয়। তবু মুসলমানদের ওপর কিছু পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ ও বৈষম্যের অভিযোগ আছে।
সূত্র : দাওয়াহ ডটসেন্টার
গ্রোকিপিডিয়া ও উইকিপিডিয়া



