এ বছরের ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী পদ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন টিম কুক। তাই এটিই তাঁর মেয়াদের শেষ ডব্লিউডব্লিউডিসি অনুষ্ঠান। তাই নতুন সফটওয়্যার ফিচার উন্মোচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠানে ছিল বিদায়ের সুর।
২০২৪-এর ডব্লিউডব্লিউডিসি-তে টিম কুক উন্মোচন করেন অ্যাপল ইন্টেলিজেন্স। এরপর দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এর বেশির ভাগ ফিচার বাস্তবায়ন করতে পারেনি অ্যাপল। এআই দৌড়ে অ্যাপলের পিছিয়ে পড়াকে টিম কুকের অন্যতম অসফলতা হিসেবে গণ্য করা হয়। এবারের ডব্লিউডব্লিউডিসি-তে উন্মোচিত নতুন সব ফিচারের বেশির ভাগই ছিল অ্যাপল ইন্টেলিজেন্সের বিভিন্ন আপডেট। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে মন্তব্য করেছে, ‘পদত্যাগের আগে দুর্নাম ঘুচিয়ে গেলেন কুক’। এহেন মন্তব্যগুলো অহেতুক নয়। আইওএস ও ম্যাকওএস আপডেটে এআই ছাড়া তেমন বড় কোনো ফিচার যোগ করা হয়নি। প্রতিটি নতুন ফিচারের কেন্দ্রে রয়েছে অ্যাপল ইন্টেলিজেন্সের প্রধান আপডেট—নতুন সিরি। আইওএস/ম্যাকওএস ২৭ এর ইন্টারফেসে নতুনত্ব এতটাই কম যে চট করে বর্তমান সংস্করণ (২৬) এর সঙ্গে তফাত করা কঠিন। তবে অ্যাপল জানিয়েছে, এবারের আপডেটের মূল লক্ষ্য ছিল অপারেটিং সিস্টেমের গতি বাড়ানো। আইওএস/ম্যাকওএস ২৭ আপডেটের পর বেশির ভাগ কাজে প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি পারফরম্যান্স পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছে অ্যাপল। তবে সব কাজে সমানভাবে গতি বাড়বে না।

অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী টিম কুক
নতুন সিরি
প্রথম ঘোষণার দুই বছর পর অবশেষে ব্যবহারকারীদের হাতে পৌঁছাচ্ছে নতুন সিরি। এখন থেকে সিরি এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট ব্যবহারকারীরা অ্যাপল ডিভাইস ও আইক্লাউডে সংরক্ষিত সব ফাইল, স্ক্রিনের কনটেন্ট ও অন্যান্য তথ্য কাজে লাগিয়ে ছোট-বড় কাজ করতে পারবে। সময় ধরে ব্যবহারকারীর সঙ্গে কথোপকথনও চালিয়ে যেতে পারবে, অনেকটা জেমিনি অথবা চ্যাটজিপিটির মতো। সিরি এখন থেকে জটিল কাজকে কয়েক ধাপে ভাগ করে সম্পন্ন করতে পারবে। সিরির বেশির ভাগ প্রসেসিং হবে অ্যাপলের নিজস্ব সার্ভারে। আইফোন ১৭ প্রো এবং এয়ার ডিভাইসে বেশির ভাগ প্রসেসিং হবে অন-ডিভাইস।
টিম কুক চেয়েছিলেন অ্যাপল ইন্টেলিজেন্সে ব্যবহৃত হবে তাদের নিজস্ব এআই এলএলএম। প্রায় দুই বছর চেষ্টার পরও মানসম্মত এলএলএম তৈরি করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটির গবেষকদল, ফলে পিছিয়ে যায় নতুন সিরি আপডেট। অবশেষে প্রতিষ্ঠানটি বেছে নিয়েছে গুগলের জেমিনি মডেল। অর্থাৎ সিরি ব্যবহার করলে কিছু তথ্য গুগলের সার্ভারেও পাঠানো হতে পারে। অ্যাপলের দাবি, এতে ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তা লঙ্ঘন হবে না।
নতুন সিরির বেটা ভার্সন পরীক্ষার পর ব্যবহারকারীরা মন্তব্য করেছে, ‘সিরি এখন কাজের’। ইনবক্সের মেসেজ ও মেইল চেক করে আগামী দিনগুলোতে কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্ট বা বুকিং আছে কি না জানাতে পারে, থাকলে সরাসরি ক্যালেন্ডারে যোগ করে দিতে পারে সিরি। গাছের পরিচর্যা নিয়ে প্রশ্ন করলে প্রাসঙ্গিক উত্তর খুঁজে দেওয়ার পাশাপাশি অ্যাপল ম্যাপসে দেখাতে পারে নিকটস্থ নার্সারির অবস্থান। অন্যান্য এআই অ্যাসিস্ট্যান্টের মতো অপ্রয়োজনীয় আবেগ দেখায় না সিরি, এটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে ব্যবহারকারীরা। অ্যাপল বরাবরই চটকের বদলে নির্ভরযোগ্যতায় জোর দিয়ে থাকে, নতুন সিরির ফিচারগুলো ব্যতিক্রম নয়।
সর্বত্র অ্যাপল ইন্টেলিজেন্স
আইওএস ও ম্যাকওএস আপডেটের প্রতিটি অংশে অ্যাপল ইন্টেলিজেন্সের ছোঁয়া রয়েছে। এখন থেকে আইফোনের ডায়নামিক আইল্যান্ডে সোয়াইপ করে সিরির সঙ্গে চ্যাট করা যাবে। ক্যামেরার মধ্যে দেওয়া হয়েছে সিরি মোড, এতে চারপাশের দৃশ্য ধারণ করে ছবির বিষয়বস্তু নিয়ে সিরির সঙ্গে আলোচনা করা যাবে অনেকটা গুগল লেন্সের মতো। ম্যাকওএস-এর চিরচেনা স্পটলাইট সার্চের সঙ্গে একীভূত করা হয়েছে সিরি। সাফারি ব্রাউজারে ওপেন করা সব ট্যাবকে বিষয়বস্তু অনুযায়ী সর্টিং করবে অ্যাপল ইন্টেলিজেন্স। সাফারিতে খোলা ট্যাবগুলোর কোনো ওয়েবসাইটের কনটেন্ট বদলে গেলে তা সম্পর্কে নোটিফিকেশন দেবে সিরি। যেমন—ই-কমার্স সাইটে মূল্য বা স্টকের তারতম্য হলে সেটি ব্যবহারকারীকে জানানো হবে। সাফারিতে সেভ করা কোনো পাসওয়ার্ড ডার্ক ওয়েবে লিক হলে সেটি নিজ থেকেই বদলে দেবে অ্যাপল ইন্টেলিজেন্স। আইমেসেজের মাধ্যমে পাঠানো বার্তার বিষয়বস্তু বুঝে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ দেবে সিরি। যেমন—সাম্প্রতিক কোনো ভ্রমণ নিয়ে আলোচনা করলে সেই জায়গার কোনো ছবি থাকলে সেটি শেয়ার করার কথা মনে করিয়ে দেবে। অ্যাপল হোমের সঙ্গে সংযুক্ত সিকিউরিটি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করবে অ্যাপল ইন্টেলিজেন্স। সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডের ফুটেজের ক্লিপ তৈরি করে ব্যবহারকারীকে সে বিষয়ে অবহিত করবে। অ্যাপল ওয়াচেও নতুন সিরির নানাবিধ ছোট-বড় ফিচার যোগ করা হয়েছে। যেমন—নিজ থেকেই ওয়াচে তৈরি হবে সর্বাধিক ব্যবহৃত অ্যাপের শর্টকাট, ব্যবহারকারীর স্বাস্থবিষয়ক তথ্য বিশ্লেষণ করে এআই কোচ নতুন ধরনের ব্যায়ামের পরামর্শ দেবে। এমন ছোট-বড় বহু অ্যাপল ইন্টেলিজেন্স ফিচারে ভরপুর অ্যাপল অপারেটিং সিস্টেমগুলোর আপডেট।
অন্যান্য নতুনত্ব
আইওএস/ম্যাকওএস ২৬ আপডেটে অ্যাপল উন্মোচন করে ‘লিকুইড গ্লাস’ ইউজার ইন্টারফেস। স্বচ্ছ কাচের মতো উইন্ডো বর্ডার ও নোটিফিকেশন বক্স ব্যবহারের ফলে এই আপডেটের পর আইফোন, আইপ্যাড ও ম্যাকের পারফরম্যান্স ও ব্যাটারি লাইফ অনেকটাই কমে যায়। এবারের আপডেটে লিকুইড গ্লাসের স্বচ্ছতা কমানো হয়েছে। এতে হারানো পারফরম্যান্স অনেকটাই ফিরবে বলে দাবি করেছে অ্যাপল। প্যারেন্টাল কন্ট্রোলসের মেন্যু নতুন করে সাজানো হয়েছে। অভিভাবকরা সহজেই সন্তানের আইফোন ও ম্যাক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। থিডি ও স্পেশল (spatial) কনটেন্ট দেখা ও এডিট করার জন্য অ্যাপল ভিশন প্রো হেডসেট ব্যবহার করা যাবে।
বাদ পড়ছে ইন্টেল ম্যাক
২০২০ সালে এম সিরিজ প্রসেসর উন্মোচনের পর অ্যাপল জানিয়েছিল, ইন্টেল প্রসেসরভিত্তিক ম্যাকের মেয়াদ আর পাঁচ বছর। এ বছর শেষ হচ্ছে সেই আলটিমেটাম, ফলে ইন্টেল প্রসেসরযুক্ত কোনো ম্যাক কম্পিউটারে চলবে না ম্যাকওএস ২৭। পাশাপাশি ম্যাকওএস থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে রসেটা ২ ফিচার। ইন্টেল ম্যাকের জন্য তৈরি সফটওয়্যারও ম্যাকওএস ২৭-এ চলবে না।
কবে আসবে নতুন আপডেট
ব্যবহারকারীরা এখনই বেটা আপডেট ইনস্টল করতে পারবে। তবে পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের আগে আসবে না। বেটা সংস্করণে কিছু বাগ আছে, তাই ডিভাইসে ইনস্টল করার আগে সব ডেটা ব্যাকআপ নেওয়ার নিতে বলেছে অ্যাপল। নাহলে তথ্য হারানোর ঝুঁকি আছে।