• ই-পেপার

উত্তপ্ত পৃথিবী বিপন্ন পরিবেশ

  • ড. কানন পুরকায়স্থ

ক্ষমাও কখনো বিচারহীনতাকে প্রশ্রয় দেয়

কাজী হাফিজ

ক্ষমাও কখনো বিচারহীনতাকে প্রশ্রয় দেয়

সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য শাম্মী আক্তার গত ২৪ জুন সংসদে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তিনি প্রতিহিংসা-প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন না। এটি ইতিবাচক। কিন্তু প্রতিশোধ না নেওয়া মানে বিচারহীনতা নয়। আমরা চাই, এক-এগারোর সময়ে প্রধানমন্ত্রীর ওপর যে নির্যাতন সংঘটিত হয়েছে, এ ঘটনায় জড়িতদের মুখোশ উন্মোচন করা হোক এবং এ ঘটনার আমি বিচার দাবি করছি।’ তিনি এই আশঙ্কাও প্রকাশ করেন যে এর বিচার না হলে পরবর্তী সময়ে এমন ঘটনা আরো ঘটতে পারে।

এর আগে গত ১৬ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে জানান, ওই সময় শারীরিকভাবে নির্যাতনের কারণে তাঁর মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে যায়। সঠিক সময়ে  চিকিৎসা না পাওয়ায় এখনো এক্স-রে করলে হয়তো দেখা যাবে ওই হাড় বাঁকাভাবে জোড়া লেগে আছে।

ক্ষমাও কখনো বিচারহীনতাকে প্রশ্রয় দেয় তারেক রহমান আরো জানান, যারা এর জন্য দায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এখন সম্ভব। কিন্তু  তাতে তাঁর শারীরিক সমস্যা তো দূর হবে না। তিনি প্রতিশোধের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে দেশ, সমাজ ও মানুষের জন্য কাজ করার কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রীর এই মনোভাব প্রকাশকে অনেকে নির্যাতনকারীদের ক্ষমা করার উদারতা হিসেবেও দেখতে পারেন। সে ক্ষেত্রে এই প্রশ্নটি এড়ানো  যাবে না যে মৃত্যু হতে পারে এমন  নির্যাতনের অপরাধ কি ভুক্তভোগীর ক্ষমা করে দেওয়ার মাধ্যমেই বিচারহীন থেকে যাবে? তা ছাড়া বিষয়টি দেশে আইনের শাসনের সঙ্গেও সম্পর্কিত। ব্যক্তি পর্যায়ে ক্ষমা মহৎ গুণ হলেও বিচার প্রক্রিয়ার বাইরে থেকে অপরাধীরা দায়মুক্তি পেলে তা সমাজ ও আইনের শাসনকে দুর্বল করে। কোনো অপরাধীকে বিচারের মুখোমুখি না করে ছেড়ে দেওয়া একধরনের বিচারহীনতা।

২০০৭ সালের ৭ মার্চ বিনা অভিযোগে তারেক রহমানকে ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মঈনুল রোডের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেদিন মা বেগম খালেদা জিয়ার অঝোর কান্না আর প্রতিবাদ উপেক্ষিত হয়। এরপর চলে নির্মম নির্যাতন। একজন শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ওপর এ ধরনের নির্যাতন নজিরবিহীন। তারেক রহমানকে বারবার চাপ দেওয়া হয়েছিল রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার জন্য। রাজি না হওয়ায় তাঁর ওপর ভয়াবহ নির্যাতনের মাত্রা বাড়ে। প্রায় এক ডজন সাজানো মামলা দেওয়া হয়। ২০০৭ সালের ২৮ নভেম্বর আদালতের কাঠগড়ায় তিনি তাঁর ওপর অমানবিক নিপীড়নের বিবরণ তুলে ধরেন। সেদিন তিনি বলেছিলেন, ‘শারীরিকভাবে এতটাই নির্যাতনের শিকার হয়েছি যে এখন মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারছি না। চোখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে আমাকে ক্রসফায়ারে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়েছে। ২৪ ঘণ্টা মোটা কাপড় দিয়ে চোখ বেঁধে নির্জন স্থানে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে আমাকে।’

সম্প্রতি প্রকাশিত বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক ডা. মওদুদ আলমগীর পাভেল ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. সাইমুম পারভেজের সম্পাদিত ‘তারেক রহমান : সংগ্রাম ও রাজনৈতিক যাত্রা’ নামের বইয়ে তারেক রহমানের ওপর এই নির্যাতনের বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।   

তারেক রহমান ১২টি মামলায় জামিন পাওয়ার পর ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কারামুক্ত হন। ১১  সেপ্টেম্বর তাঁকে স্ট্রেচারে করে লন্ডনগামী বিমানে তুলে দেওয়া হয়। তার আগে ওই দিনই বেগম খালেদা জিয়া কারামুক্ত হয়ে পিজি হাসপাতালে অসুস্থ পুত্রের সঙ্গে দেখা করেন। সেদিন মা ও ছেলের বেদনার্ত সাক্ষাতের সচিত্র খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়।

নির্যাতনে কতটা অমানবিক হওয়ার পর তারেক রহমানকে কারাগার থেকে তৎকালীন পিজি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল তা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক কাজী মাজহারুল ইসলামের দোলনের একটি লেখা থেকে জানা যায়। গত ২৫ ডিসেম্বর একটি পত্রিকায় প্রকাশিত ওই লেখায় তিনি উল্লেখ করেন,  ‘তারেক রহমানকে যখন বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে (আগের পিজি হাসপাতাল) নিয়ে আসা হয়, তখন তাঁর শারীরিক অবস্থা ছিল খুবই নাজুক। এসেছিলেন সাংঘাতিক কোমর ব্যথা নিয়ে। বাঁ পায়ে ভর দিতে পারছিলেন না। ভর্তি না করিয়ে কারা কর্তৃপক্ষ তাঁকে নিয়ে যেতে চাইছিল। কিন্তু হাসপাতালে আসার পর এক্স-রে করলাম। তাতে দেখা যায়,  মেরুদণ্ডে যে ১২টি ভার্টিকুলার থাকে তার মধ্যে ৮-৯-এর মাঝের স্পেস কমে গেছে। যে কারণে এমআরআই করিয়ে পরিষ্কার দেখা গেল ইন্টার ভার্টিব্রাল ডিস্ক চেপে গেছে। এখন প্রশ্ন হলো ডিস্কে এই সমস্যা কেন হয়? অনেক ভারী জিনিস তুললে, দুর্ঘটনায় বা ওপর থেকে পড়ে গেলে এমন হতে পারে। তখন উনি (তারেক রহমান) বলেছিলেন, প্রায় ১৫ ফুট ওপর থেকে পড়ে গেছেন। উনি তো আর নিজে নিজে পড়েননি। উনাকে হয়তো বেঁধে ঝুলিয়ে রেখেছিল, সেখান থেকে হয়তো পড়ে গেছেন বা ফেলে দিয়েছে। সেইভাবে তিনি আঘাত পেয়েছেন। তখন তো ওই পরিবেশে তিনি আমাদেরও খোলামেলা কিছু বলেননি।’

তারেক রহমানের ওপর নির্যাতন কারা চালিয়েছিল, তাদের নাম-পরিচয় সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে  ‘সাম্প্রতিক অনুসন্ধান’ সূত্রে জানানো হয়। এতে কারো কারো ধারণা, বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে এবং দায়ি ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা হবে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এই সম্ভাবনার স্পষ্ট কোনো স্বীকৃতি এখনো নেই। 

ব্যক্তি পর্যায়ে ছাড়াও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীদের ক্ষমা করার বিষয়টিও অনেকাংশে বিচারহীনতা বলে অনেকে মনে করেন। সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুসারে দণ্ডপ্রাপ্তদের ক্ষমা করার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির রয়েছে এবং এই ক্ষমতা অবাধ। ৪৯ অনুচ্ছেদে বলা আছে, কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত যেকোনো দণ্ডের মার্জনা এবং যেকোনো দণ্ড মওকুফ, স্থগিত বা হ্রাস করার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির থাকবে। পৃথিবীর অনেক দেশে এই বিধান রাখা হয়েছে ভুল বিচারে কেউ শাস্তি পেলে বা অত্যন্ত মানবিক কারণে ক্ষমা করার জন্য। তবে কে, কিসের ভিত্তিতে ক্ষমা পাবে, তার কোনো নীতিমালা নেই; যা সংবিধানের ৭, ২৭, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে আইনজ্ঞরা মনে করেন। ফৌজদারি কার্যবিধিতেও সরকারের পক্ষে এই ক্ষমতা প্রয়োগের বিধান রয়েছে।

দেশের স্বাধীনতার পর ২০১৩ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ২৫ জন আসামি রাষ্ট্রপতির ক্ষমা পায়। এর মধ্যে ২০০৯ সাল থেকে আওয়ামী লীগ সরকার আমলেই ক্ষমা পায় ২১ জন। ২০০৯ সালে একজন, ২০১০ সালে ১৮ জন এবং ২০১১ সালে দুজন ফাঁসির আসামি রাষ্ট্রপতির ক্ষমা পান। ওই ২১ জনের মধ্যে ছিল লক্ষ্মীপুরের বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট নূরুল ইসলাম হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ড পাওয়া আসামি এইচ এম বিপ্লব। বিপ্লব লক্ষ্মীপুর  পৌরসভার  সাবেক  মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা আবু তাহেরের ছেলে। ২০১১ সালের ১৪ জুলাই বিপ্লবের সাজা মওকুফের আদেশ কার্যকর হয়।

২০০৯ সালের আগে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা পাওয়া ফাঁসির আসামির সংখ্যা ছিল চারজন। স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত্ত মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কোনো আসামিকে ক্ষমা করা হয়নি। সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সময়ে এই ক্ষমার চর্চা শুরু হয়। আওয়ামী লীগ নেতা ময়েজউদ্দিন আহমেদ হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত এক আসামিকে ১৯৮৭ সালে ক্ষমা করা হয়।

২০১৩ সালের মার্চে নবম সংসদের পঞ্চদশ অধিবেশনের প্রথম দিন লিখিত এক প্রশ্নের উত্তরে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর রাষ্ট্রপতির ক্ষমার এই তথ্য জানিয়েছিলেন। পরেও এভাবে ক্ষমা করার ঘটনা অব্যাহত থাকে।  সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ভাই হারিছ ও জোসেফ দুটি খুনের মামলায় যথাক্রমে যাবজ্জীবন ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ছিলেন। তাঁদের আরেক ভাই আনিস আহমেদ একটি খুনের মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ছিলেন। ২০১৯ সালের ২৮ মার্চ হারিছ ও আনিসের সাজা মওকুফ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আর জোসেফের সাজা মাফ করেন রাষ্ট্রপতি।

আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিতদের দণ্ড মওকুফ করে সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে নামিয়ে আনার অধিকার সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির থাকলেও তার প্রয়োগ নিয়ে সমালোচনা অনেক পুরনো। ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির এই ক্ষমতা চ্যালেঞ্জ করে জনস্বার্থে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান। রিটে কোনো নীতিমালা ছাড়া সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের রাষ্ট্রপতির ক্ষমা করার ক্ষমতা কেন অসাংবিধানিক হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারির নির্দেশনা চাওয়া হয়। 

জুলাই অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন রাষ্ট্রপতির এই ক্ষমতা প্রয়োগে স্বেচ্ছাচারিতা রোধে বোর্ড গঠনের সুপারিশ করে। কমিশনের সুপারিশে বলা হয়, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোতে (আওয়ামী লীগ সরকার আমলে) সরকার যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা প্রদর্শনের ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে তা সর্বজনবিদিত। রাজনৈতিক বিবেচনায় বিচারকাজ শেষ হওয়ার আগেই ক্ষমা প্রদর্শন করা হয়েছে। একই অপরাধীকে দুবার ক্ষমা প্রদর্শনের ঘটনাও ঘটেছে। ক্ষমা প্রদর্শনের এই ঘটনাগুলো আমাদের দেশের আইনের শাসনের ধারণাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।’

কমিশন ‘ক্ষমা প্রদর্শন আইন’ নামে একটি আইন প্রণয়নের প্রস্তাব দিয়ে বলে, এই আইনের মাধ্যমে একটি ‘ক্ষমা প্রদর্শন বোর্ড’ গঠিত হবে। বোর্ডের সদস্য থাকবেন অ্যাটর্নি জেনারেল, জাতীয় সংসদের সরকার ও বিরোধী দলের দুজন সংসদ সদস্য, একজন সিভিল সার্জন এবং একজন মনোবিদ। এই  বোর্ডের সুপারিশের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি বা সংশ্লিষ্ট নির্বাহী বিভাগ ক্ষমা প্রদর্শন করবেন।

গত বছরের শেষ দিকে রাষ্ট্রের সংস্কার বিষয়ে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সভায়ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমা সম্পর্কিত বিধান পরিবর্তনে ঐকমত্যে পৌঁছায় রাজনৈতিক দলগুলো। এখন অপেক্ষা এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কারের। অপেক্ষা তারেক রহমানের ওপর নির্যাতনকারীদের বিচারের সম্মুখীন করার।

 

লেখক : কালের কণ্ঠের উপসম্পাদক

ডিজিটাল যুগে মানুষের অস্থিরতা ও মনোজগতের পরিবর্তন

ড. শাহরীনা আখতার

ডিজিটাল যুগে মানুষের অস্থিরতা ও মনোজগতের পরিবর্তন

আজকের পৃথিবীকে অনেকে ‘হাইপারকানেক্টেড ওয়ার্ল্ড’ বা ‘অতিসংযুক্ত বিশ্ব’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তথ্য, প্রযুক্তি ও যোগাযোগের অভূতপূর্ব বিস্তার মানুষের জীবনকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি তার ভেতরে তৈরি করেছে এক নতুন ধরনের মানসিক চাপ ও অস্থিরতা। ইতিহাসে পরিবর্তন সব সময় ছিল, কিন্তু বর্তমান সময়ের মতো এত দ্রুত, এত ধারাবাহিক এবং এত সর্বব্যাপী পরিবর্তন আগে কখনো দেখা যায়নি। এই পরিবর্তনের ভেতরে মানুষ ক্রমেই নিজের মনোজগতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে—এটিই আজকের সবচেয়ে বড় সামাজিক বাস্তবতা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ ও বিষণ্নতার হার গত দুই দশকে প্রায় ২৫ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। বিশেষ করে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে মানসিক চাপ ও অনিদ্রাজনিত সমস্যার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতির যুগে এই পরিসংখ্যান একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে, উন্নয়ন কি সত্যি মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাচ্ছে, নাকি তা নতুন সংকট তৈরি করছে?

প্রযুক্তি বিপ্লব ও মনোযোগের সংকট : স্মার্টফোন, সামাজিক মাধ্যম এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম আজ মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। গড়ে একজন মানুষ দিনে চার থেকে ছয় ঘণ্টা সময় মোবাইল বা ডিজিটাল স্ক্রিনে ব্যয় করছে—এমন তথ্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় উঠে এসেছে। এই ধারাবাহিক তথ্যপ্রবাহ, নোটিফিকেশন এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল কনটেন্ট মানুষের মনোযোগের স্বাভাবিক গঠনকে বদলে দিচ্ছে।

স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণা বলছে, মস্তিষ্ক স্বল্পমেয়াদি ‘ডোপামিন রিওয়ার্ড’ অর্থাৎ দ্রুত আনন্দের প্রতি ক্রমেই বেশি সংবেদনশীল হয়ে উঠছে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে মনোযোগ ধরে রাখা, গভীরভাবে চিন্তা করা বা ধৈর্য ধরে কোনো কাজ সম্পন্ন করার ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কমে যাচ্ছে। একে অনেক গবেষক ‘অ্যাটেনশন ফ্র্যাগমেন্টেশন’ বা খণ্ডিত মনোযোগ সংকট হিসেবে উল্লেখ করছেন। ফলে আমরা একদিকে তথ্য বেশি জানছি, কিন্তু গভীরভাবে বোঝার ক্ষমতা হারাচ্ছি। এই দ্বন্দ্বই আধুনিক মানুষের মানসিক অস্থিরতার একটি মৌলিক উৎস।

সামাজিক মাধ্যম ও তুলনার অদৃশ্য চাপ : সামাজিক মাধ্যম আজ শুধু যোগাযোগের প্ল্যাটফর্ম নয়, এটি এক ধরনের ‘সামাজিক প্রদর্শন মঞ্চ’। এখানে মানুষ তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর, সফল বা আকর্ষণীয় অংশটিই উপস্থাপন করে। কিন্তু দর্শক সেই সাজানো বাস্তবতার সঙ্গে নিজের অসম্পূর্ণ বাস্তবতাকে তুলনা করতে শুরু করে। গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক মাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার আত্মসম্মানবোধ কমিয়ে দিতে পারে এবং এফওএমও (ফিয়ার অব মিসিং আউট) বা পিছিয়ে পড়ার ভয় তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি। এক ধরনের অদৃশ্য প্রতিযোগিতা তৈরি হয়, যেখানে মানুষ নিজের জীবনকে ‘কম সফল’ মনে করতে শুরু করে। এই তুলনার সংস্কৃতি ধীরে ধীরে মানসিক চাপ, উদ্বেগ এবং হতাশার জন্ম দেয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই চাপ অনেক সময় ব্যবহারকারী নিজেও সরাসরি বুঝতে পারেন না, কিন্তু তাঁর আচরণ ও মানসিক অবস্থায় এর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

শিক্ষা, প্রতিযোগিতা ও শৈশবের চাপ : বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো ফলাফলনির্ভরতা। পরীক্ষার নম্বর, গ্রেড এবং র‌্যাংকিংকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হয়। ইউনেসকো ও বিভিন্ন শিক্ষা গবেষণা বলছে, অতিরিক্ত পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা শিশুদের সৃজনশীলতা ও মানসিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। শৈশব থেকেই যখন সাফল্যের মানদণ্ড শুধু ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়, তখন শেখার আনন্দ ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। শিশু শেখে ‘চাপের মধ্যে সাফল্য অর্জন’ করতে, কিন্তু ‘অন্বেষণের মাধ্যমে শেখা’ কমে যায়। এই মানসিক কাঠামো পরবর্তী সময়ে কর্মজীবনেও অস্থিরতা ও অতিরিক্ত চাপ গ্রহণের প্রবণতা তৈরি করে। ফলে শিক্ষা আর শুধু জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্র থাকে না, এটি এক ধরনের মানসিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়ায়।

তথ্যের অতিভার ও সিদ্ধান্তহীনতা : বর্তমান যুগকে তথ্যের যুগ বলা হলেও এর একটি বড় সমস্যা হলো তথ্যের অতিভার। প্রতিদিন মানুষ অসংখ্য সংবাদ, মতামত, ভিডিও ও বিশ্লেষণের মুখোমুখি হচ্ছে। গবেষণায় দেখা যায়, অতিরিক্ত তথ্য মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। ছোট ছোট সিদ্ধান্ত নেওয়াও অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। মানুষ দ্বিধাগ্রস্ত হয়, মানসিক ক্লান্তি অনুভব করে এবং এক ধরনের স্থায়ী অস্থিরতার মধ্যে থাকে।

বাস্তব জীবনের প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে ধীর। ফলে সেটি অনেক সময় বিরক্তিকর মনে হয়। এই মানসিক পরিবর্তনের কারণে ভার্চুয়ালজগৎ যত বেশি আকর্ষণীয় হচ্ছে, বাস্তব জীবন তত বেশি জটিল ও অসহনীয় মনে হচ্ছে। এই দ্বৈত বাস্তবতা মানুষের ভেতরে এক ধরনের স্থায়ী অসন্তোষ তৈরি করছে, যা আধুনিক অস্থিরতার আরেকটি বড় কারণ।

অস্থিরতা একক নয়, জটিল বাস্তবতা : মানুষের এই অস্থিরতা কোনো একক কারণে সৃষ্টি হয়নি। এটি প্রযুক্তি, শিক্ষা, সামাজিক কাঠামো, তথ্যপ্রবাহ এবং জীবনযাত্রার সমন্বিত ফলাফল। আধুনিক সভ্যতা যেমন সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি মানসিক ভারসাম্যের ওপর নতুন চাপও সৃষ্টি করেছে। তবে এই বাস্তবতা অপরিবর্তনীয় নয়। গবেষণায় দেখা যায়, ডিজিটাল ডিটক্স, প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানো, মনোযোগ প্রশিক্ষণ এবং সচেতন প্রযুক্তি ব্যবহার মানসিক চাপ কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সচেতনতা। প্রযুক্তি বা আধুনিকতা নয়, বরং আমরা কিভাবে এর সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছি, সেটিই নির্ধারণ করবে আমাদের মানসিক ভবিষ্যৎ। আজকের মানুষ তাই শুধু প্রযুক্তির ব্যবহারকারী নয়, বরং নিজের মানসিক স্থিতিরও রক্ষক। এই দায়িত্ব যত দ্রুত আমরা বুঝতে পারব, ততই অস্থির সময়ের ভেতরেও কিছুটা স্থিরতা খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে।

বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে করণীয় ও নীতিগত সুপারিশ : সাম্প্রতিক স্নায়ুবিজ্ঞান, জনস্বাস্থ্য এবং ডিজিটাল আচরণ বিষয়ক গবেষণায় একটি বিষয় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে, মানুষের মানসিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় জীবনযাত্রাভিত্তিক আচরণগত পরিবর্তন সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা যায়, দৈনন্দিন স্ক্রিন ব্যবহার ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কমাতে পারলে মাত্র দু-তিন সপ্তাহের মধ্যেই উদ্বেগজনিত চাপ এবং ঘুমের মানে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা যায়।

মস্তিষ্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স, যা আমাদের চিন্তা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ করে। গবেষণা বলছে, নিয়মিত মনোযোগ অনুশীলন বা ধ্যানজাতীয় অভ্যাস এই অংশের কার্যক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। প্রতিদিন অল্প সময়, প্রায় ১০ থেকে ১৫ মিনিট নিঃশব্দে শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রতি মনোযোগ দিলে মস্তিষ্কের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়। এ ছাড়া প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গেছে, সপ্তাহে অন্তত দুই ঘণ্টা প্রাকৃতিক পরিবেশে সময় কাটালে শরীরের কর্টিসল নামক চাপ সৃষ্টিকারী হরমোনের মাত্রা কমে যায়। এর ফলে মানসিক চাপ হ্রাস পায় এবং আবেগীয় স্থিতিশীলতা বাড়ে।

ঘুমের নিয়মানুবর্তিতা বা নির্দিষ্ট সময়সূচি মানসিক সুস্থতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। যাদের ঘুম-জাগরণের একটি স্থির রুটিন থাকে, তাদের মধ্যে উদ্বেগ ও বিষণ্নতার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রেও এখন বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং মনোযোগ স্বাস্থ্য রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার কমিয়ে ‘ডিজিটাল বিরতি’ বা নির্দিষ্ট সময় পর পর পর্দা থেকে দূরে থাকা মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে।

সব মিলিয়ে বৈজ্ঞানিক প্রমাণগুলো একটি বিষয় স্পষ্ট করে, মানসিক অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণের উপায় আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাসের মধ্যেই নিহিত। সচেতন জীবনযাপন, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ—এই তিনটি উপাদান একসঙ্গে মানসিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

লেখক : রিসার্চ কো-অর্ডিনেটর ও সহকারী অধ্যাপক ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

কৈবর্ত বিদ্রোহ থেকে অক্টোবর বিপ্লব : ইতিহাসের ফিরে ফিরে আসা...

অজেয় রোহিতাশ্ব আল্-কাযী

কৈবর্ত বিদ্রোহ থেকে অক্টোবর বিপ্লব : ইতিহাসের ফিরে ফিরে আসা...

ইতিহাস সোজা পথে হাঁটে না কখনো, বরং চক্রাকারে ঘোরে, ঘড়ির কাঁটার মতোই একসময় ফিরে আসে ঠিক একই বিন্দুতে। নির্মমভাবে ফিরে আসে একই সত্যে—শোষিতের অধিকারের লড়াই শাসকের সিংহাসন নাড়িয়ে দেয়। বারবার...একাদশ শতাব্দীর বাংলার কৈবর্ত বিদ্রোহ আর বিংশ শতাব্দীর রুশ অক্টোবর বিপ্লব এই অমোঘ সত্যের জ্বলন্ত প্রমাণ। দুই ঘটনার মাঝে ৯০০ বছরের ব্যবধান, কিন্তু শোষণের কৌশল আর প্রতিরোধের আগুন একই।

কৈবর্তভূমি ১০৭১ : বৌদ্ধ পাল রাজা দ্বিতীয় মহিপালের শাসন ছিল লোভ ও অযোগ্যতার চরম উদাহরণ। খরায় খাজনা কম আসছে, রাজকোষ ফাঁকা। সমাধান কী? উর্বর বাংলার কৈবর্তদের ওপর খাজনা দ্বিগুণ করে চাপিয়ে দেওয়া! এই অঞ্চল ছিল উপমহাদেশের শস্যভাণ্ডার। শাসকরা বারবার এখানে লুটপাট করেছে, আর প্রান্তিক কৈবর্তরা হয়েছে শোষণের প্রধান শিকার।

রাজা দ্বিতীয় মহিপালের আরোপিত বাড়তি এই কর আদায়ে অনাগ্রহী ছিলেন স্থানীয় ভূস্বামীরা! দ্বিতীয় মহিপাল ভূস্বামীদের শিক্ষা দিতে জোর করে খাজনা আদায়ে বরকন্দাজদের পাঠান। অত্যাচার শুধু লুটপাটে সীমাবদ্ধ থাকেনি—হত্যা, অগ্নিসংযোগ, এমনকি নারী নির্যাতনের ঘটনাও বেড়ে যায়। প্রান্তিক বলেই হয়তো বা, কৈবর্ত রমণীদের সঙ্গে বারাঙ্গনার মতোই আচরণ করে পাল বাহিনী, ঠিক পাকিস্তানি বাহিনীর মতোই! এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন দিব্য। সপরিবারে গড়ে উঠল প্রতিরোধ!

দিব্যরই ভ্রাতুষ্পুত্র ভীম এই প্রতিরোধকে সত্যিকারের বিপ্লবে রূপ দিলেন। ভীম ব্রাহ্মণ ও বৌদ্ধ মঠের বিশাল করমুক্ত জমি ছিনিয়ে নিয়ে কৈবর্তদের মধ্যে বিতরণ করলেন। রামশরণ শর্মা একে মধ্যযুগীয় ভারতের অন্যতম প্রথম সত্যিকারের ভূমি সংস্কার বলেছেন। রমেশচন্দ্র মজুমদারও স্বীকার করেছেন—এ ছিল স্থানীয় জনগণের স্বার্থে জমির মালিকানার পরিবর্তন। ভীম কোনো আদর্শের বুলি আওড়াননি। তিনি সরাসরি ব্রাহ্মণ আর বৌদ্ধ মঠের নিজস্ব জমি দিয়েছিলেন প্রান্তিক মানুষকে। আর সেই জমির আকাঙ্ক্ষায় কৃষক, জেলে, মাঝি—সব প্রান্তিক শোষিত মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল।

অবস্থা বেগতিক দেখে রাজা দ্বিতীয় মহিপাল এই বিদ্রোহ দমনে বিশাল সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন। প্রশিক্ষিত এই বিশাল পাল বাহিনীর বিরুদ্ধে সংখ্যায় ছোট হলেও কৈবর্ত বাহিনী অসাধারণ সাহস দেখায়। কৈবর্তদের কাছে লড়াইটা ছিল অস্তিত্বের লড়াই—১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধেরই মতো! অতঃপর কয়েক দশকের জন্য স্বাধীন কৈবর্তভূমি। কার্ল মার্ক্সের জন্মের শত শত বছর আগে বাংলাদেশে গঠিত হয়েছিল পৃথিবীর প্রথম প্রান্তিক শ্রমজীবী মানুষের দেশ কৈবর্তভূমি। প্রথম প্রলেতারিয়েত রাষ্ট্র!

পেট্রোগ্রাদ ১৯১৭ : ভ্লাদিমির লেনিন কৈবর্ত বিদ্রোহের কথা জানতেন কি না, জানা যায় না, কিন্তু তিনি ঠিক একই অস্ত্র ব্যবহার করলেন। ১৯১৭ সালের ৮ নভেম্বর ‘ল্যান্ড ডিক্রিজারি করে জমিদারি প্রথা ধ্বংস করে কৃষকদের হাতে জমি তুলে দিলেন। স্লোগান ছিল সহজ, কিন্তু আকর্ষক—শান্তি, জমি, রুটি। ভীমের বল্লম আর লেনিনের রাইফেলের মধ্যে শুধু যুগের ফারাক। কিন্তু কৌশল অভিন্ন—জমির মালিকানা হলো ক্ষমতা দখলের চাবিকাঠি। কিন্তু লেনিনের পরবর্তী ইতিহাস এক বড় বিশ্বাসঘাতকতার গল্প। সোভিয়েত ইউনিয়ন টিকল মাত্র ৭৪ বছর।

লেনিনের মৃত্যুর পর স্তালিনেরকোলেক্টিভাইজািসয়া’র নামে কৃষকদের সেই জমি আবার কেড়ে নেওয়া হলো। লেনিনের ডিক্রি পুরোপুরি টিকেছিল মাত্র ১৩ বছর! অথচ মার্ক্স না পড়া অশিক্ষিত ভীম লিখিত দলিল রাখতে না পারলেও যত দিন স্বাধীন কৈবর্তভূমি টিকেছিল, তত দিন টিকেছিল প্রান্তিক কৈবর্তের ভূমির মালিকানা! এই দুই বিপ্লব প্রমাণ করে—শাসকশ্রেণি যতবার শোষকে পরিণত হয়, শাসিতের অধিকার ক্ষুণ্ন করে; ততবারই জনগণের মধ্যে নতুন দিব্য, নতুন ভীম বা নতুন লেনিন জন্ম নেয়। কখনো কখনো কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো, কখনো বা ভেনেজুয়েলার হুগো শাভেজ...শুধু অধিকার আদায়ের লড়াইটা থামে না। কখনোই!

লেখক : প্রাবন্ধিক, রাষ্ট্রচিন্তক

 

নগদবিহীন অর্থনীতি এবং বাস্তবতা

নিরঞ্জন রায়

নগদবিহীন অর্থনীতি এবং বাস্তবতা

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক দেশে নগদবিহীন অর্থনীতি গড়ে তোলার ব্যাপারে অগ্রসর হতে শুরু করেছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর উল্লেখ করেছেন যে দেশে নগদবিহীন অর্থনীতি চালু করার উদ্দেশ্যে এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এসব পদক্ষেপের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে—(১) গভর্নরের নেতৃত্বে স্টিয়ারিং কমিটি গঠন ও কার্যক্রম শুরু করা; (২) এখন থেকে গভর্নর নিজে বিষয়টি সরাসরি তদারকি করবেন; (৩) একটি ইউনিক কিউআর কোডের মাধ্যমে সব ব্যাংক এমএফএস (মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিস) লেনদেনের সুযোগ সৃষ্টি করা। এই প্রসঙ্গে গভর্নর আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন যে দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে এবং নগদের ওপর নির্ভরতা কমাতে বাংলা কিউআর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

দেশ থেকে ঘুষ, দুর্নীতি এবং কর ফাঁকি ঠেকাতে নগদ টাকার ব্যবহার কমিয়ে আনা হচ্ছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এই লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ক্যাশলেস লেনদেন বাড়াতে ব্যাংক এবং অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিস কম্পানিগুলোকে এক প্ল্যাটফর্মে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। নগদবিহীন অর্থনীতি চালু করলে ঘুষ, দুর্নীতি বা কর ফাঁকির মতো অপরাধ কতটা কমবে, তা বলা কঠিন। এসব অপরাধ যে কারণে সংঘটিত হয়, সেসব কারণ দূর করতে না পারলে শুধু নগদবিহীন অর্থনীতি চালুর মাধ্যমে এই অপরাধ বন্ধ করা সম্ভব নয়। তখন দেখা যাবে যে নগদবিহীন অর্থনীতিতে নগদবিহীন অর্থনীতি এবং বাস্তবতাএসব অপরাধের ধরন পাল্টেছে, কিন্তু অপরাধ ঠিকই অব্যাহত আছে। গভর্নরের এমন ঘোষণার পরপরই বাংলা কিউআর বেশ ঘটা করে উদ্বোধনও হয়েছে, যেখানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক ডেপুটি গভর্নর, কয়েকটি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী এবং কয়েকটি অংশগ্রহণকারী বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। উদ্বোধনী বক্তব্যে একজন ডেপুটি গভর্নর উল্লেখ করেছেন যে বাংলা কিউআর ব্যবহার করে নগদবিহীন অর্থনীতি চালু হলে দেশের জিডিপি বৃদ্ধি পাবে। নগদবিহীন লেনদেনের কারণে দেশের জিডিপি কিভাবে বৃদ্ধি পাবে, তা আমি বুঝে উঠতে পারলাম না। নগদবিহীন লেনদেন তো কোনো পণ্য বা সেবা উৎপাদন করবে না। আগে যে লেনদেন নগদে সম্পন্ন হতো, এখন সেই লেনদেনই নগদের পরিবর্তে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন হবে। এর সঙ্গে জিডিপি বৃদ্ধি পাওয়ার কী সম্পর্ক আছে, তা আমার জানা নেই। যা হোক, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর যেহেতু বলেছেন, তাই আশা করছি তাঁদের কাছে অর্থনীতির সেই সূত্র নিশ্চয়ই আছে।

দেশের জিডিপি বৃদ্ধি পাক আর না পাক, অথবা ঘুষ, দুর্নীতি এবং কর ফাঁকির মতো অপরাধ বন্ধ হোক বা না হোক, নগদবিহীন অর্থনীতি এখন সময়ের দাবি। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংক খুবই ভালো একটি উদ্যোগ নিয়েছে এবং এগিয়ে যাওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, নগদবিহীন অর্থনীতি স্লোগান হিসেবে যতটা জনপ্রিয়, বাস্তবে কার্যকর করা ততটাই কঠিন। এ জন্য সবার আগে প্রয়োজন নগদবিহীন অর্থনীতির সংজ্ঞা এবং বৈশিষ্ট্য বা প্যারামিটার নির্ধারণ করা। কেননা অর্থনীতিকে শতভাগ নগদবিহীন করে তোলা কখনোই সম্ভব নয়। সমাজে এবং অর্থনীতিতে কিছু অংশ থাকে, যেখানে নগদেই লেনদেন নিষ্পত্তি করতে হয়। আমেরিকা, কানাডাসহ উন্নত বিশ্ব নগদবিহীন অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। এখানে এখন আর সেভাবে নগদে লেনদেন হয় না। কিন্তু তার পরও অর্থনীতির শতভাগ এখনো নগদবিহীন করা সম্ভব হয়নি। এ ব্যাপারে সঠিক তথ্য না থাকলেও মার্কেটে নগদ লেনদেনের দৃশ্য থেকে খুব সহজেই অনুমান করা যায় যে এখনো ১৫ থেকে ২০ শতাংশ লেনদেন নগদে সম্পন্ন হয়। সেখানে বাংলাদেশের মতো দেশে নগদবিহীন অর্থনীতি গড়ে তোলার কাজটা মোটেই সহজ নয়। আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত যে নগদবিহীন লেনদেন হয়, তার বেশির ভাগই সম্পন্ন হয়ে থাকে বিকাশ ও নগদ এমএফএস কম্পানির মাধ্যমে। সেখানে এখনো নির্দিষ্ট কিছু মানুষ এই আর্থিক সেবা নিয়ে থাকে। কিন্তু প্রকৃত নগদবিহীন অর্থনীতি বলতে যা বোঝায়, সে রকম নগদবিহীন অর্থনীতি তৈরি করতে হলে দেশের অতি সাধারণ মানুষকে নগদবিহীন লেনদেনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। একজন দিনমজুর, রিকশাচালক, শ্রমিক, কৃষক, রাস্তার পাশের চায়ের দোকানদার, কাঁচাবাজারের তরকারি বিক্রেতা, কামার, কুমার, এমনকি কাজের বুয়ার মতো সাধারণ মানুষ যখন নগদের পরিবর্তে ডিজিটাল পেমেন্ট নিতে অভ্যস্ত হবে, তখনই নগদবিহীন অর্থনীতি বা সমাজ গড়ে উঠবে।

সত্যিকার অর্থে নগদবিহীন অর্থনীতি গড়ে তুলতে হলে প্রথমেই একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন। সেটি হতে পারে যে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের ৭০ শতাংশ মানুষকে নগদবিহীন লেনদেনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। এরপর নির্ধারণ করতে হবে যে কিভাবে এবং কী পদ্ধতিতে এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে নগদবিহীন লেনদেনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হবে। শুধু নগদ বা বিকাশের মতো মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিস কম্পানির মাধ্যমে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। এ জন্য আরো এমএফএস প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন হবে এবং দেশের পুরো ব্যাংকিং খাতকে কাজে লাগাতে হবে। দেশের প্রতিটি বাণিজ্যিক ব্যাংককে তাদের গ্রাহকদের কার্ড প্রদানের মাধ্যমে মানুষকে নগদবিহীন লেনদেন সম্পন্ন করার পথ সুগম করে দিতে হবে। সেই সঙ্গে পয়েন্ট অব সেল মেশিন ব্যবহার সহজ করে দিতে হবে। একজন রিকশাচালক থেকে শুরু করে শ্রমিক বা চায়ের দোকানদার চাইলেই যেন পিওএস মেশিন পেতে পারে। এই পিওএস মেশিনের মাধ্যমেই নগদের পরিবর্তে ডেবিট অথবা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে লেনদেন সম্পন্ন করতে পারবে। আর এ জন্য প্রয়োজন হবে জাতীয়ভাবে এবং ইন্ডাস্ট্রিব্যাপী পেমেন্ট প্রসেসিং, সেটলমেন্ট ও রিকনসিলিয়েশন সম্পন্ন করার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

এসব করার পরও যে মানুষ ব্যাপক হারে নগদবিহীন লেনদেনে উৎসাহিত হবে, তেমন নয়। প্রথমত, দীর্ঘদিনের অভ্যাস নগদ টাকায় লেনদেন করা। তাই সেই অভ্যাস খুব সহজে পরিবর্তন করা কঠিন কাজ। দ্বিতীয়ত, মানুষ স্বাভাবিকভাবেই নগদ টাকা কাছে পেতে বেশি পছন্দ করে। তা ছাড়া শুধু ডেবিট কার্ড ব্যবহার করে নগদবিহীন লেনদেন জনপ্রিয় করে তোলা বেশ কঠিন। কেননা ডেবিট কার্ড ব্যবহার করে নগদবিহীন লেনদেন করতে হলে কার্ডহোল্ডারকে প্রথমে তার হিসাবে টাকা জমা করতে হবে এবং সেই অর্থের বিপরীতে ডেবিট কার্ড ব্যবহার করা সম্ভব হবে। তখন মানুষ ডেবিট কার্ড এবং নগদ অর্থের মধ্যে কোনো পার্থক্য খুঁজে পাবে না। উল্টো ব্যাংকের হিসাবে টাকা জমা দিয়ে সেই টাকার বিপরীতে কার্ড ব্যবহার করার চেয়ে নগদ টাকা ব্যবহার করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে। ফলে নগদবিহীন লেনদেন কখনোই অতটা জনপ্রিয় হয়ে উঠবে না। মূলত ক্রেডিট কার্ডের ব্যাপক ব্যবহারই দ্রুত নগদবিহীন লেনদেন জনপ্রিয় করে তুলতে পারে। উন্নত বিশ্বে যে নগদবিহীন লেনদেন এত জনপ্রিয়, তার পেছনে আছে ক্রেডিট কার্ডের ব্যাপক ব্যবহার। উন্নত বিশ্বে ক্রেডিট কার্ড ছাড়া এক দিনও চলার উপায় নেই। আর এই ক্রেডিট কার্ডের কারণেই মানুষ নগদে লেনদেন করতে পারে না। কিন্তু আমাদের দেশে ক্রেডিট কার্ড এখনো ব্যাপকভাবে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত হয়ে ওঠেনি। তবে এর অর্থ এই নয় যে আমাদের দেশেও সব ব্যবহারকারীর জন্য ক্রেডিট কার্ড প্রদানের ব্যবস্থা করা যাবে না। অবশ্যই যাবে, কিন্তু এ জন্য প্রয়োজন ভিন্ন ধরনের প্রস্তুতি। আর সেই প্রস্তুতি নিতে পারলেই দেশের বেশির ভাগ নাগরিক, এমনকি সব নাগরিকের জন্য ক্রেডিট কার্ড প্রদান করা সম্ভব হবে। 

বিশ্বের আর্থিক খাত যেভাবে দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে আমাদের দেশকেও নগদবিহীন অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যেতে হবে। তবে সেটি করতে হবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে। খুব দ্রুত এবং সংক্ষেপে কোনো কিছু করতে গেলে সেটি প্রকৃত নগদবিহীন অর্থনীতি হবে না। আমাদের দেশে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের যে অবস্থা, সে রকম অবস্থাই হবে নগদবিহীন অর্থনীতির ক্ষেত্রেও। তাই সময় লাগলেও ভেবেচিন্তে, পরিকল্পনা করে এই পথে এগোতে হবে।

 

লেখক : সার্টিফায়েড অ্যান্টি মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা

উত্তপ্ত পৃথিবী বিপন্ন পরিবেশ | কালের কণ্ঠ