সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য শাম্মী আক্তার গত ২৪ জুন সংসদে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তিনি প্রতিহিংসা-প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন না। এটি ইতিবাচক। কিন্তু প্রতিশোধ না নেওয়া মানে বিচারহীনতা নয়। আমরা চাই, এক-এগারোর সময়ে প্রধানমন্ত্রীর ওপর যে নির্যাতন সংঘটিত হয়েছে, এ ঘটনায় জড়িতদের মুখোশ উন্মোচন করা হোক এবং এ ঘটনার আমি বিচার দাবি করছি।’ তিনি এই আশঙ্কাও প্রকাশ করেন যে এর বিচার না হলে পরবর্তী সময়ে এমন ঘটনা আরো ঘটতে পারে।
এর আগে গত ১৬ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে জানান, ওই সময় শারীরিকভাবে নির্যাতনের কারণে তাঁর মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে যায়। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পাওয়ায় এখনো এক্স-রে করলে হয়তো দেখা যাবে ওই হাড় বাঁকাভাবে জোড়া লেগে আছে।
তারেক রহমান আরো জানান, যারা এর জন্য দায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এখন সম্ভব। কিন্তু তাতে তাঁর শারীরিক সমস্যা তো দূর হবে না। তিনি প্রতিশোধের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে দেশ, সমাজ ও মানুষের জন্য কাজ করার কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রীর এই মনোভাব প্রকাশকে অনেকে নির্যাতনকারীদের ক্ষমা করার উদারতা হিসেবেও দেখতে পারেন। সে ক্ষেত্রে এই প্রশ্নটি এড়ানো যাবে না যে মৃত্যু হতে পারে এমন নির্যাতনের অপরাধ কি ভুক্তভোগীর ক্ষমা করে দেওয়ার মাধ্যমেই বিচারহীন থেকে যাবে? তা ছাড়া বিষয়টি দেশে আইনের শাসনের সঙ্গেও সম্পর্কিত। ব্যক্তি পর্যায়ে ক্ষমা মহৎ গুণ হলেও বিচার প্রক্রিয়ার বাইরে থেকে অপরাধীরা দায়মুক্তি পেলে তা সমাজ ও আইনের শাসনকে দুর্বল করে। কোনো অপরাধীকে বিচারের মুখোমুখি না করে ছেড়ে দেওয়া একধরনের বিচারহীনতা।
২০০৭ সালের ৭ মার্চ বিনা অভিযোগে তারেক রহমানকে ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মঈনুল রোডের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেদিন মা বেগম খালেদা জিয়ার অঝোর কান্না আর প্রতিবাদ উপেক্ষিত হয়। এরপর চলে নির্মম নির্যাতন। একজন শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ওপর এ ধরনের নির্যাতন নজিরবিহীন। তারেক রহমানকে বারবার চাপ দেওয়া হয়েছিল রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার জন্য। রাজি না হওয়ায় তাঁর ওপর ভয়াবহ নির্যাতনের মাত্রা বাড়ে। প্রায় এক ডজন সাজানো মামলা দেওয়া হয়। ২০০৭ সালের ২৮ নভেম্বর আদালতের কাঠগড়ায় তিনি তাঁর ওপর অমানবিক নিপীড়নের বিবরণ তুলে ধরেন। সেদিন তিনি বলেছিলেন, ‘শারীরিকভাবে এতটাই নির্যাতনের শিকার হয়েছি যে এখন মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারছি না। চোখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে আমাকে ক্রসফায়ারে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়েছে। ২৪ ঘণ্টা মোটা কাপড় দিয়ে চোখ বেঁধে নির্জন স্থানে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে আমাকে।’
সম্প্রতি প্রকাশিত বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক ডা. মওদুদ আলমগীর পাভেল ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. সাইমুম পারভেজের সম্পাদিত ‘তারেক রহমান : সংগ্রাম ও রাজনৈতিক যাত্রা’ নামের বইয়ে তারেক রহমানের ওপর এই নির্যাতনের বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।
তারেক রহমান ১২টি মামলায় জামিন পাওয়ার পর ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কারামুক্ত হন। ১১ সেপ্টেম্বর তাঁকে স্ট্রেচারে করে লন্ডনগামী বিমানে তুলে দেওয়া হয়। তার আগে ওই দিনই বেগম খালেদা জিয়া কারামুক্ত হয়ে পিজি হাসপাতালে অসুস্থ পুত্রের সঙ্গে দেখা করেন। সেদিন মা ও ছেলের বেদনার্ত সাক্ষাতের সচিত্র খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়।
নির্যাতনে কতটা অমানবিক হওয়ার পর তারেক রহমানকে কারাগার থেকে তৎকালীন পিজি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল তা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক কাজী মাজহারুল ইসলামের দোলনের একটি লেখা থেকে জানা যায়। গত ২৫ ডিসেম্বর একটি পত্রিকায় প্রকাশিত ওই লেখায় তিনি উল্লেখ করেন, ‘তারেক রহমানকে যখন বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে (আগের পিজি হাসপাতাল) নিয়ে আসা হয়, তখন তাঁর শারীরিক অবস্থা ছিল খুবই নাজুক। এসেছিলেন সাংঘাতিক কোমর ব্যথা নিয়ে। বাঁ পায়ে ভর দিতে পারছিলেন না। ভর্তি না করিয়ে কারা কর্তৃপক্ষ তাঁকে নিয়ে যেতে চাইছিল। কিন্তু হাসপাতালে আসার পর এক্স-রে করলাম। তাতে দেখা যায়, মেরুদণ্ডে যে ১২টি ভার্টিকুলার থাকে তার মধ্যে ৮-৯-এর মাঝের স্পেস কমে গেছে। যে কারণে এমআরআই করিয়ে পরিষ্কার দেখা গেল ইন্টার ভার্টিব্রাল ডিস্ক চেপে গেছে। এখন প্রশ্ন হলো ডিস্কে এই সমস্যা কেন হয়? অনেক ভারী জিনিস তুললে, দুর্ঘটনায় বা ওপর থেকে পড়ে গেলে এমন হতে পারে। তখন উনি (তারেক রহমান) বলেছিলেন, প্রায় ১৫ ফুট ওপর থেকে পড়ে গেছেন। উনি তো আর নিজে নিজে পড়েননি। উনাকে হয়তো বেঁধে ঝুলিয়ে রেখেছিল, সেখান থেকে হয়তো পড়ে গেছেন বা ফেলে দিয়েছে। সেইভাবে তিনি আঘাত পেয়েছেন। তখন তো ওই পরিবেশে তিনি আমাদেরও খোলামেলা কিছু বলেননি।’
তারেক রহমানের ওপর নির্যাতন কারা চালিয়েছিল, তাদের নাম-পরিচয় সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে ‘সাম্প্রতিক অনুসন্ধান’ সূত্রে জানানো হয়। এতে কারো কারো ধারণা, বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে এবং দায়ি ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা হবে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এই সম্ভাবনার স্পষ্ট কোনো স্বীকৃতি এখনো নেই।
ব্যক্তি পর্যায়ে ছাড়াও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীদের ক্ষমা করার বিষয়টিও অনেকাংশে বিচারহীনতা বলে অনেকে মনে করেন। সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুসারে দণ্ডপ্রাপ্তদের ক্ষমা করার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির রয়েছে এবং এই ক্ষমতা অবাধ। ৪৯ অনুচ্ছেদে বলা আছে, কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত যেকোনো দণ্ডের মার্জনা এবং যেকোনো দণ্ড মওকুফ, স্থগিত বা হ্রাস করার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির থাকবে। পৃথিবীর অনেক দেশে এই বিধান রাখা হয়েছে ভুল বিচারে কেউ শাস্তি পেলে বা অত্যন্ত মানবিক কারণে ক্ষমা করার জন্য। তবে কে, কিসের ভিত্তিতে ক্ষমা পাবে, তার কোনো নীতিমালা নেই; যা সংবিধানের ৭, ২৭, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে আইনজ্ঞরা মনে করেন। ফৌজদারি কার্যবিধিতেও সরকারের পক্ষে এই ক্ষমতা প্রয়োগের বিধান রয়েছে।
দেশের স্বাধীনতার পর ২০১৩ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ২৫ জন আসামি রাষ্ট্রপতির ক্ষমা পায়। এর মধ্যে ২০০৯ সাল থেকে আওয়ামী লীগ সরকার আমলেই ক্ষমা পায় ২১ জন। ২০০৯ সালে একজন, ২০১০ সালে ১৮ জন এবং ২০১১ সালে দুজন ফাঁসির আসামি রাষ্ট্রপতির ক্ষমা পান। ওই ২১ জনের মধ্যে ছিল লক্ষ্মীপুরের বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট নূরুল ইসলাম হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ড পাওয়া আসামি এইচ এম বিপ্লব। বিপ্লব লক্ষ্মীপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা আবু তাহেরের ছেলে। ২০১১ সালের ১৪ জুলাই বিপ্লবের সাজা মওকুফের আদেশ কার্যকর হয়।
২০০৯ সালের আগে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা পাওয়া ফাঁসির আসামির সংখ্যা ছিল চারজন। স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত্ত মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কোনো আসামিকে ক্ষমা করা হয়নি। সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সময়ে এই ক্ষমার চর্চা শুরু হয়। আওয়ামী লীগ নেতা ময়েজউদ্দিন আহমেদ হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত এক আসামিকে ১৯৮৭ সালে ক্ষমা করা হয়।
২০১৩ সালের মার্চে নবম সংসদের পঞ্চদশ অধিবেশনের প্রথম দিন লিখিত এক প্রশ্নের উত্তরে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর রাষ্ট্রপতির ক্ষমার এই তথ্য জানিয়েছিলেন। পরেও এভাবে ক্ষমা করার ঘটনা অব্যাহত থাকে। সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ভাই হারিছ ও জোসেফ দুটি খুনের মামলায় যথাক্রমে যাবজ্জীবন ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ছিলেন। তাঁদের আরেক ভাই আনিস আহমেদ একটি খুনের মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ছিলেন। ২০১৯ সালের ২৮ মার্চ হারিছ ও আনিসের সাজা মওকুফ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আর জোসেফের সাজা মাফ করেন রাষ্ট্রপতি।
আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিতদের দণ্ড মওকুফ করে সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে নামিয়ে আনার অধিকার সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির থাকলেও তার প্রয়োগ নিয়ে সমালোচনা অনেক পুরনো। ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির এই ক্ষমতা চ্যালেঞ্জ করে জনস্বার্থে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান। রিটে কোনো নীতিমালা ছাড়া সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের রাষ্ট্রপতির ক্ষমা করার ক্ষমতা কেন অসাংবিধানিক হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারির নির্দেশনা চাওয়া হয়।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন রাষ্ট্রপতির এই ক্ষমতা প্রয়োগে স্বেচ্ছাচারিতা রোধে বোর্ড গঠনের সুপারিশ করে। কমিশনের সুপারিশে বলা হয়, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোতে (আওয়ামী লীগ সরকার আমলে) সরকার যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা প্রদর্শনের ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে তা সর্বজনবিদিত। রাজনৈতিক বিবেচনায় বিচারকাজ শেষ হওয়ার আগেই ক্ষমা প্রদর্শন করা হয়েছে। একই অপরাধীকে দুবার ক্ষমা প্রদর্শনের ঘটনাও ঘটেছে। ক্ষমা প্রদর্শনের এই ঘটনাগুলো আমাদের দেশের আইনের শাসনের ধারণাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।’
কমিশন ‘ক্ষমা প্রদর্শন আইন’ নামে একটি আইন প্রণয়নের প্রস্তাব দিয়ে বলে, এই আইনের মাধ্যমে একটি ‘ক্ষমা প্রদর্শন বোর্ড’ গঠিত হবে। বোর্ডের সদস্য থাকবেন অ্যাটর্নি জেনারেল, জাতীয় সংসদের সরকার ও বিরোধী দলের দুজন সংসদ সদস্য, একজন সিভিল সার্জন এবং একজন মনোবিদ। এই বোর্ডের সুপারিশের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি বা সংশ্লিষ্ট নির্বাহী বিভাগ ক্ষমা প্রদর্শন করবেন।
গত বছরের শেষ দিকে রাষ্ট্রের সংস্কার বিষয়ে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সভায়ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমা সম্পর্কিত বিধান পরিবর্তনে ঐকমত্যে পৌঁছায় রাজনৈতিক দলগুলো। এখন অপেক্ষা এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কারের। অপেক্ষা তারেক রহমানের ওপর নির্যাতনকারীদের বিচারের সম্মুখীন করার।
লেখক : কালের কণ্ঠের উপসম্পাদক





এসব অপরাধের ধরন পাল্টেছে, কিন্তু অপরাধ ঠিকই অব্যাহত আছে। গভর্নরের এমন ঘোষণার পরপরই বাংলা কিউআর বেশ ঘটা করে উদ্বোধনও হয়েছে, যেখানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক ডেপুটি গভর্নর, কয়েকটি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী এবং কয়েকটি অংশগ্রহণকারী বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। উদ্বোধনী বক্তব্যে একজন ডেপুটি গভর্নর উল্লেখ করেছেন যে বাংলা কিউআর ব্যবহার করে নগদবিহীন অর্থনীতি চালু হলে দেশের জিডিপি বৃদ্ধি পাবে। নগদবিহীন লেনদেনের কারণে দেশের জিডিপি কিভাবে বৃদ্ধি পাবে, তা আমি বুঝে উঠতে পারলাম না। নগদবিহীন লেনদেন তো কোনো পণ্য বা সেবা উৎপাদন করবে না। আগে যে লেনদেন নগদে সম্পন্ন হতো, এখন সেই লেনদেনই নগদের পরিবর্তে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন হবে। এর সঙ্গে জিডিপি বৃদ্ধি পাওয়ার কী সম্পর্ক আছে, তা আমার জানা নেই। যা হোক, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর যেহেতু বলেছেন, তাই আশা করছি তাঁদের কাছে অর্থনীতির সেই সূত্র নিশ্চয়ই আছে।