অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার অর্থ পৃথিবীর পৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা বাড়ছে। এ অবস্থায় সাগরে পানির ঘনত্বের পরিবর্তন হয়। তা ছাড়া গলে যাওয়া বরফ ও অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের ফলে মেরু অঞ্চলে সাগরের পানির লবণাক্ততা হ্রাস পায় এবং সাগর পৃষ্ঠের পানি হালকা হয়ে যায়। এরই প্রভাবে আটলান্টিক মেরিডিওনাল ওভারটার্নিং সার্কুলেশন (এএমওসি)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র স্রোতগুলোর গতি কমে যায়। মহাসাগরীয় স্রোতগুলো বিশ্বব্যাপী এক ধরনের পরিবাহক বেল্ট হিসেবে কাজ করে এবং বিপুল পরিমাণে সৌরতাপ বিষুবরেখা থেকে মেরুর দিকে নিয়ে যায়। যখন এএমওসির গতি কমে যায়, থেমে যায় বা ব্যাহত হয়, তখন স্থানীয়ভাবে তাপ বৃদ্ধি পায়। এর ফলে ‘সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ’ সৃষ্টি হয়। এই দীর্ঘস্থায়ী চরম তাপমাত্রা বাস্তুতন্ত্রকে ব্যাহত করে এবং ভূমিতে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণ হয় ।
বর্তমানে যুক্তরাজ্য একটি চরম তাপপ্রবাহের মুখোমুখি। লেখক বিল ম্যাকগুয়ার তাঁর ‘দি ফ্যাট অব দি ওয়ার্ল্ড : আ হিস্টোরি অ্যান্ড ফিউচার অব দি ক্লাইমেট ক্রাইসিস’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন যে ‘যুক্তরাজ্যের তাপমাত্রা
এ বছর এবং/অথবা পরের বছর চল্লিশ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছতে পারে।’ ম্যাকগুয়ার আরো বলেন, ‘বিশেষ করে প্রশান্ত মহাসাগরে রেকর্ড পরিমাণে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো তৈরি হওয়ার কারণে পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি পর্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রা সম্ভব।’ ‘এল নিনো’ হলো প্রশান্ত মহাসাগরের একটি প্রাকৃতিক আবহাওয়ার ধরন, যা বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বাড়ায় এবং সম্ভবত এই গ্রীষ্মে এটি আবির্ভূত হবে। প্রকৃতপক্ষে এই সপ্তাহে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের কিছু অংশে তাপমাত্রা আটত্রিশ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। ইংল্যান্ডের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এবং ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের দক্ষিণ-পশ্চিমের কিছু অংশের জন্য অতি তাপপ্রবাহের অ্যাম্বার সতর্ক সংকেত জারি করা হয়েছে।
অ্যাডভান্সেস ইন ক্লাইমেট চেঞ্জ রিসার্চ-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে এশিয়ার পামির পর্বতমালাজুড়ে অভূতপূর্ব হারে বরফ কমে যাওয়া লক্ষ করা গেছে। ২০২২-এর আগে হিমবাহের কিছুটা ওঠানামা দেখা গিয়েছিল, কিন্তু তার পর থেকে বরফের ক্ষয় দ্রুত হয়েছে। গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে ২০২৫ সালে রেকর্ড পরিমাণ বরফ গলে, যা হিমবাহের পুরো পৃষ্ঠের ১.৫ মিটার পানি হারানোর সমতুল্য। এটি ২০১১-২৪-এর সময়কালে হিমবাহের গড় ক্ষয়ের চেয়ে চার গুণ বেশি। গবেষণার ফলাফল থেকে বোঝা যায় যে পামির-কারাকোরাম অঞ্চলের হিমবাহের ক্ষয়, বিশ্বব্যাপী বরফ গলার প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং চরম ঘটনাগুলো সম্ভবত সেখানে হিমবাহ গলে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে আরো ত্বরান্বিত করছে।
তাপপ্রবাহ ও গ্রিনহাউস গ্যাসের মধ্যে একটি দুষ্টচক্র রয়েছে। তাপপ্রবাহ দাবানলের কারণ হতে পারে। সুমেরু অঞ্চলে গাছপালা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়, কিন্তু তাদের অবশিষ্টাংশ পিটের মতো আকারে মাটিতে জমা হতে পারে, যা সহস্রাব্দ ধরে জমা হতে থাকে। এর অর্থ হলো, সুমেরু অঞ্চল এবং কাছাকাছি উত্তর গোলার্ধের বনের মাটি কার্বনের আধার হিসেবে কাজ করছে। কিন্তু গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে সুমেরু অঞ্চলে আগুনের ঘটনা আরো ঘন ঘন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাটির পৃষ্ঠের উদ্ভিদের দ্রুত জ্বলন কার্বন ডাই-অক্সাইডের পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে শুট বা ব্ল্যাক কার্বনের নির্গমন ঘটাচ্ছে। হেলসিংকিভিত্তিক ফিনিশ মেটেরোলজিকাল ইনস্টিটিউট উল্লেখ করেছে যে ‘মাটির দহন দীর্ঘদিন ধরে সঞ্চিত কার্বনকে এমন মাটি থেকে মুক্ত করতে পারে, যা আগে কার্বনের আধার হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল।’ এটা স্পষ্ট যে বিশ্ব উষ্ণায়ন এবং তাপপ্রবাহের কারণে আমরা নতুন অগ্নিকাণ্ডের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, যা ওপরের মাটির স্তরগুলোকে ধ্বংস করছে এবং পিটল্যান্ডগুলোকেও পুড়িয়ে ফেলছে এবং মাটি থেকে পুরনো কার্বন নির্গত হচ্ছে।
সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে বনের আগুন কার্বন মনোক্সাইড নির্গত করতে পারে, তবে এটি জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার থেকেও নির্গত হতে পারে। এই যৌগ ও বিভিন্ন অস্থায়ী জৈব যৌগগুলো বায়ুমণ্ডলে অন্যান্য যৌগের সঙ্গে বিক্রিয়া করে ওজোন গঠন করে। এই ওজোন ওপরের স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট ওজোনের মতো নয়। ঊর্ধ্ব স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে ওজোন ক্ষতিকারক অতিবেগুনি রশ্মি ফিল্টার করে, যেখানে নিম্ন বায়ুমণ্ডলে গঠিত ওজোন তাপকে আটকে রাখে, যা অন্যথায় মহাকাশে বিকিরিত হবে। পরোক্ষ গ্রিনহাউস গ্যাসগুলো হাইড্রক্সিল মুক্ত মূলকের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া করে গ্রহকে উষ্ণ করে। উদাহরণস্বরূপ যদি আরো বেশি হাইড্রক্সিল কার্বন মনোক্সাইড এবং উদ্বায়ী জৈব যৌগের সঙ্গে বিক্রিয়া করে, তাহলে মিথেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করার জন্য কম হাইড্রক্সিল পাওয়া যাবে। এর অর্থ বায়ুমণ্ডলে আরো মিথেন থাকবে, যা কার্বন ডাই-অক্সাইডের চেয়ে আশি গুণ বেশি তাপ আটকে রাখতে পারে।
আরেকটি বিষয় হলো, পৃথিবী কী পরিমাণ আলো প্রতিফলিত করে এবং তার প্রতিফলনের প্রকৃতি, তার সঙ্গে বৈশ্বিক উষ্ণতা জড়িত। আমরা জানি যে উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধের প্রতিফলন ক্ষমতা বা অ্যালবেডো প্রায় সমান, যেখানে অ্যালবেডো হলো কোনো পৃষ্ঠ দ্বারা কী পরিমাণ আলো, বিশেষত সৌর বিকিরণ, প্রতিফলিত হয় তার পরিমাপ। এর মানে হলো আফ্রিকা, ইউরোপ, আলাস্কা এবং উভয় মেরুর মধ্য দিয়ে যাওয়া একটি রেখা পৃথিবীকে দুটি ভাগে বিভক্ত করে, যা সমান পরিমাণ আলো প্রতিফলিত করে। কিন্তু ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনওএএ) দ্বারা পরিচালিত সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে জানা যায় যে সাতাশ ডিগ্রি পূর্ব এবং এক শ তিপ্পান্ন ডিগ্রি পশ্চিম দ্রাঘিমা রেখা বরাবর একটি দ্বিতীয় প্রতিসাম্য রেখা রয়েছে। নেচার জার্নালে প্রকাশিত এনওএএ-এর গবেষণা আমাদের জানিয়েছে যে এই দ্বিতীয় রেখা দ্বারা বিভক্ত গোলার্ধগুলো তিনটি ক্ষেত্রে সমান : মেঘমুক্ত আকাশে তাদের অ্যালবেডো, মেঘের প্রতিফলন ক্ষমতা এবং বরফমুক্ত মহাসাগর দ্বারা আবৃত অংশের পরিমাণ। অসলোর আন্তর্জাতিক জলবায়ু গবেষণাকেন্দ্রের গবেষকরা মনে করেন যে এটি সম্ভবত ‘একটি সুদৃঢ় বৈশিষ্ট্য এবং পৃথিবীর আরেকটি আকর্ষণীয় ধর্ম’। এই প্রতিসাম্য বিষয়টি পৃথিবীতে জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি পদ্ধতির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
ভবিষ্যৎ এএমওসির পরিণতি নিয়ে জলবায়ু মডেলগুলোতে ব্যাপক অনিশ্চয়তা রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত আন্ত সরকারি প্যানেল (আইপিসিসি) তার ষষ্ঠ মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলেছে যে যদিও তারা নিশ্চিত যে এই শতাব্দীর বাকি সময়ের মধ্যে এএমওসির অবক্ষয় ঘটবে, তবে ২১০০ সালের আগে এটি ভেঙে পড়বে না—এ বিষয়ে তাদের ‘মাঝারি আস্থা’ রয়েছে। জিওফিজিক্যাল রিসার্চ লেটার্স জার্নালে ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে যদি এএমওসি ভেঙে পড়ে, তাহলে লন্ডনে চরম ঠাণ্ডা অর্থাৎ মাইনাস কুড়ি ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং অসলোতে মাইনাস আটচল্লিশ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এএমওসির যেকোনো দুর্বলতা এই ব্যবস্থাটিকে একটি অজানা সংকটময় সীমা অতিক্রম করানোর ঝুঁকি তৈরি করে। এই সীমাটি কোথায় অবস্থিত তা জানা কঠিন। এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ লেটার্স-এ প্রকাশিত আরেকটি গবেষণা থেকে জানা যায় যে উচ্চ নির্গমনের ক্ষেত্রে ৬৭ শতাংশ এবং মাঝারি নির্গমনের ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ এলাকায় অগঙঈ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রবাহ কোন দিকে যাচ্ছে, তা নিয়ে ব্যাপক অনিশ্চয়তা রয়েছে। এএমওসির আচরণ বোঝার জন্য মডেলে এখনো অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত করা বাকি থাকতে পারে।
সংক্ষেপে বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য কাকে দোষ দেওয়া যায় তা খোঁজার পরিবর্তে প্রকৃতিতে কী ঘটছে এবং কেন ঘটছে তা জানা প্রয়োজন। এটি আমাদের বৈশ্বিক উষ্ণতা এবং জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে কিছু যুক্তিসংগত ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে। তাই আমাদের ঈশপের এই উপদেশটি গ্রহণ করা উচিত, ‘ঝাঁপ দেওয়ার আগে দেখে নাও।’ অর্থাৎ জলবায়ু সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের আড়ে জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে গভীর পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ জরুরি।
লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক
ও অধ্যাপক, যুক্তরাজ্য





এসব অপরাধের ধরন পাল্টেছে, কিন্তু অপরাধ ঠিকই অব্যাহত আছে। গভর্নরের এমন ঘোষণার পরপরই বাংলা কিউআর বেশ ঘটা করে উদ্বোধনও হয়েছে, যেখানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক ডেপুটি গভর্নর, কয়েকটি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী এবং কয়েকটি অংশগ্রহণকারী বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। উদ্বোধনী বক্তব্যে একজন ডেপুটি গভর্নর উল্লেখ করেছেন যে বাংলা কিউআর ব্যবহার করে নগদবিহীন অর্থনীতি চালু হলে দেশের জিডিপি বৃদ্ধি পাবে। নগদবিহীন লেনদেনের কারণে দেশের জিডিপি কিভাবে বৃদ্ধি পাবে, তা আমি বুঝে উঠতে পারলাম না। নগদবিহীন লেনদেন তো কোনো পণ্য বা সেবা উৎপাদন করবে না। আগে যে লেনদেন নগদে সম্পন্ন হতো, এখন সেই লেনদেনই নগদের পরিবর্তে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন হবে। এর সঙ্গে জিডিপি বৃদ্ধি পাওয়ার কী সম্পর্ক আছে, তা আমার জানা নেই। যা হোক, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর যেহেতু বলেছেন, তাই আশা করছি তাঁদের কাছে অর্থনীতির সেই সূত্র নিশ্চয়ই আছে।