• ই-পেপার

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতিত্ব : অনন্য উচ্চতায় বাংলাদেশ

  • মীর আব্দুল আলীম

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কি বিচ্ছিন্নতার জাল

মাসুদ রুমী

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কি বিচ্ছিন্নতার জাল

পুকুরপারে এক তরুণ ছবি তুলছে। বন্ধুর হাতে স্মার্টফোন। নির্দেশনা আসছে-ঘাড় সোজা কেন, একটু বাঁকা করো। ঘাড় বাঁকা হতেই ক্যামেরার ক্লিক। শহরের কোনো এক ঝলমলে রেস্টুরেন্টে দুই বান্ধবী খাবার টেবিলে বসা। ধোঁয়া ওঠা সুস্বাদু খাবার সামনে রেখেই শুরু হয়েছে অন্য এক মহাসমারোহ। খাওয়া শুরুর চেয়েও তখন জরুরি ক্যামেরাবন্দি হওয়ার নিখুঁত প্রস্তুতি। একজন ঠোঁট বাঁকাচ্ছেন, অন্যজন অদ্ভুত সব অঙ্গভঙ্গিতে নিজেকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টায় মত্ত।

দৃশ্যগুলো আমাদের চেনা। এই শহরের প্রতিটি কোণে, প্রতিদিন এমন হাজারো ফ্রেম তৈরি হচ্ছে। এসব খণ্ডচিত্রের শেষ গন্তব্য একটাইসামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। অতিরিক্ত মেকআপের প্রলেপ, রঙিন জমকালো পোশাক, কৃত্রিম আলোকসম্পাত কিংবা আকর্ষণীয় লোকেশন খোঁজার পেছনের মূল মনস্তত্ত্বটি আসলে কী? খুব গভীরে না গিয়েও বলা যায়, এর পেছনে কাজ করে ছবি বা পোস্টটি শেয়ার করার পর ভার্চুয়াল বন্ধু মহল থেকে একটু বাড়তি লাইক, কমেন্ট আর প্রশংসা কুড়ানোর তীব্র আকাঙ্ক্ষা।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুধু একটি ছবি বা স্ট্যাটাস পোস্ট করলেই কিন্তু গল্পের শেষ হয় না; বরং সেখান থেকেই শুরু হয় এক নতুন মানসিক অস্থিরতা। একটি স্ট্যাটাস লিখতে গিয়েও যেমন চলে নানামুখী ভাবনা তেমনি পোস্ট করার পরই টুংটাং শব্দে আসতে থাকে নোটিফিকেশন। এই যে এক অদ্ভুত ভার্চুয়াল ব্যস্ততা, তা আমাদের অজান্তেই গিলে খাচ্ছে আমাদের চারপাশের বাস্তব সময় আর আসল সম্পর্কগুলোকে।

রাতে ঘুমানোর আগেও অনেকে ব্যস্ত থাকেন ফেসবুকে কে কী স্ট্যাটাস দিল, কোন নতুন রিল বা শর্টস আপলোড হলো তা দেখতে। শরীর ও মস্তিষ্কের বিশ্রাম নেওয়ার সময়ও কেড়ে নিচ্ছে এই মাধ্যম। একদিকে ব্যয় হচ্ছে মোবাইল ডেটা, অন্যদিকে অনুৎপাদনশীল কাজে অপচয় হচ্ছে সময় ও মনোযোগ। অথচ এই সময় কাজে লাগতে পারত নতুন কোনো পেশাগত নতুন দক্ষতা অর্জনে, পাঠ্যবইয়ের বাইরের জ্ঞানচর্চায় কিংবা সৃজনশীল কাজে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কি বিচ্ছিন্নতার জালসামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মূল উদ্দেশ্য ছিল যোগাযোগ সহজ করা। কিন্তু বাস্তবে অনেকেই এর গঠনমূলক ব্যবহার থেকে সরে এসে এটিকে পরিণত করেছেন আত্মপ্রদর্শন ও সময় অপচয়ের মাধ্যম হিসেবে। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই লাইক-কমেন্টের সংস্কৃতি মানুষকে এক ধরনের ছদ্ম-স্বীকৃতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমরা আমাদের সুখ, সৌন্দর্য এবং যোগ্যতার মাপকাঠি সঁপে দিয়েছি অন্যের হাতের একটা ডিজিটাল ক্লিকের ওপর। কোনো পোস্টে লাইক কম হলে একবিংশ শতাব্দীর তরুণ মন বিষাদে আক্রান্ত হচ্ছে, নিজেকে ভাবছে ব্রাত্য। আর লাইকের সংখ্যা হাজার পার হলে ক্ষণিকের জন্য মিলছে এক কৃত্রিম পরম তৃপ্তি। আমরা কি তবে ক্রমেই এক আত্মরতিমূলক (Narcissistic) সমাজে রূপান্তরিত হচ্ছি, যেখানে বাস্তব অভিজ্ঞতার চেয়ে সেই অভিজ্ঞতার ডিজিটাল প্রদর্শন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ?

তথ্যের দ্রুত প্রবাহ, দূরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের যে সম্ভাবনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যাত্রা শুরু হয়েছিল, বাস্তবে তা অনেকাংশে আসক্তি, ভুয়া তথ্য, মানসিক স্বাস্থ্যের সংকট এবং সময়ের অপচয়ে পরিণত হয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ইতিবাচক ব্যবহারও রয়েছে।

২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ছয় কোটি; যা দেশের মোট জনসংখ্যার ৩৪ শতাংশ। সবচেয়ে জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম ফেসবুক, এরপর ইউটিউব, টিকটক ও ইনস্টাগ্রাম। এর ব্যবহার সবচেয়ে বেশি তরুণদের মধ্যে।

একসময় যৌথ পরিবারে সন্ধ্যার আড্ডা, একসঙ্গে খাওয়া কিংবা পারিবারিক সমস্যা নিয়ে আলোচনার যে সংস্কৃতি ছিল, তা এখন অনেকটাই হুমকির মুখে। পরিবারের সদস্যরা একই ছাদের নিচে থাকলেও অনেকেই ডুবে থাকছেন নিজ নিজ স্মার্টফোনে। ফলে কথোপকথন কমছে, বাড়ছে মানসিক দূরত্ব। বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের, এমনকি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কেও তৈরি হচ্ছে বিচ্ছিন্নতা। বয়স্করা ভুগছেন একাকিত্বে, শিশুরা বাস্তব সম্পর্কের বদলে আশ্রয় নিচ্ছে ভার্চুয়াল জগতে।

একটা সময় ছিল যখন মানুষের অন্দরমহলের কথা অন্দরেই থাকত। কিন্তু বর্তমানের শেয়ারিং কালচার বা সবকিছু প্রকাশ করার সংস্কৃতিতে প্রাইভেসি বা গোপনীয়তা চরমভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। অনেকে নিজের অজান্তেই ঘরের খুঁটিনাটি তথ্য, সন্তানের স্কুলের অবস্থান, এমনকি নিজের দৈনন্দিন রুটিনও তুলে দিচ্ছেন সামাজিক মাধ্যমে। উদাহরণস্বরূপ আমরা যখন কোনো পাঁচতারা হোটেলে চেক-ইন দিই কিংবা ভ্রমণের লাইভ আপডেট দিই, তখন শুধু নিজের সামর্থ্যের প্রচার করছি না, বরং অপরাধীচক্র বা ডেটা শিকারি বিভিন্ন গ্রুপের হাতে তুলে দিচ্ছি নিজের লোকেশন ও ব্যক্তিগত তথ্য।

ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের ফিডগুলোতে এখন এক ধরনের অলিখিত প্রতিযোগিতা চলে—‘কে কার চেয়ে কত বেশি সুখী এবং সফল। গাড়ি-বাড়ি, দামি রেস্তোরাঁ কিংবা বিদেশভ্রমণের চাকচিক্যময় ছবি যাঁরা প্রতিনিয়ত পোস্ট করছেন, তাঁরা হয়তো নিজেদের এক ধরনের সামাজিক শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করতে চাইছেন। কিন্তু মুদ্রার অপর পিঠ অত্যন্ত নির্মম।

সমাজের একটি বিশাল অংশ, যারা সৎ উপায়ে জীবনসংগ্রাম করছেন, যাঁদের এই ধরনের বৈভব প্রদর্শনের সামর্থ্য নেই, তাঁরা যখন অবিরত এই সমস্ত লাইফস্টাইল দেখতে বাধ্য হন, তখন তাঁদের অবচেতনে এক ধরনের হীনম্মন্যতা ও আফসোসের জন্ম নেয়। এই অবাস্তব তুলনা সমাজে এক ধরনের হতাশা ও অসন্তোষ তৈরি করছে।

সামাজিক মাধ্যমের এই জাঁকজমকপূর্ণ দুনিয়া মানুষকে এক ধরনের নেশায় বুঁদ করে রাখছে। গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার এই স্ক্রিন টাইম মানুষের মস্তিষ্কে ডোপামিনের ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করে এক ধরনের ছদ্ম-উত্তেজনা তৈরি করে। এর শারীরিক ও মানসিক মূল্য অত্যন্ত চড়া। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা এবং স্ক্রল করার কারণে যুবসমাজের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, অনিদ্রা এবং স্থূলতার মতো শারীরিক সমস্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এর চেয়েও বড় ক্ষতি হচ্ছে মানসিক স্বাস্থ্যের। যখন একজন ব্যক্তি নিজেকে ভার্চুয়াল দুনিয়ার পারফেক্ট জীবনের সঙ্গে মেলাতে পারে না, তখন গ্রাস করে তীব্র মানসিক অবসাদ বা ডিপ্রেশন। বিশ্বজুড়েই চিকিৎসকরা এখন এই ডিজিটাল ফ্যাটিগ বা মানসিক ক্লান্তিকে এক নতুন মহামারি হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নারীদের ওপর বিশেষ ধরনের মানসিক ও সামাজিক চাপ তৈরি করছে। একই সঙ্গে সাইবার হয়রানি, রিভেঞ্জ পর্ন, সেক্সটরশন ও ডিজিটাল সহিংসতা এখন উদ্বেগজনক বাস্তবতা।

শিশু-কিশোরদের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ঝুঁকি আরো গভীর। অশ্লীল কনটেন্ট, আসক্তি, ঘুমের ব্যাঘাত, মনোযোগহীনতা ও শিক্ষাগত ক্ষতি এর বড় প্রভাবগুলোর মধ্যে অন্যতম। ঢাকার শিশুরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ডিজিটাল স্ক্রিনে সময় কাটাচ্ছে, যা তাদের ঘুম, শারীরিক বৃদ্ধি ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি)। সংস্থাটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি শিশু চোখের সমস্যায় এবং ৮০ শতাংশ শিশু প্রায়ই মাথা ব্যথায় ভুগছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবেলায় বিভিন্ন দেশ কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া ২০২৫ সালে ১৬ বছরের নিচে শিশু-কিশোরদের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করে বিশ্বে নজির সৃষ্টি করেছে। আইন অমান্য করলে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

ফ্রান্স ১৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ বলেছেন, শিশুদের আবেগ কোনো পণ্যে পরিণত হতে পারে না। যুক্তরাজ্যও ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য কঠোর বয়স যাচাই ব্যবস্থা চালুর পথে এগোচ্ছে।

ইন্দোনেশিয়া ২০২৬ সাল থেকে ১৬ বছরের নিচে শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বয়স যাচাই বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নও একই ধরনের নীতিমালা নিয়ে কাজ করছে।

শিশু-কিশোরদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে মালয়েশিয়া। দেশটির সরকার ১ জুন থেকে ১৬ বছরের কম বয়সী কেউ ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, ইউটিউব কিংবা একই ধরনের জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নতুন অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবে না।

বাংলাদেশেও এ বিষয়ে কার্যকর ও সমন্বিত নীতি জরুরি। প্রথমত, বয়সভিত্তিক বিধি-নিষেধ আরোপ করা প্রয়োজন। ১৬ বছরের নিচে শিশু-কিশোরদের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ বা নিষেধাজ্ঞা বিবেচনা করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, জাতীয় পরিচয়পত্র বা নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল পরিচয়ের মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট যাচাই ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে, যাতে ভুয়া অ্যাকাউন্ট ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়। তৃতীয়ত, সাইবার অপরাধ দমনে বিদ্যমান আইনের কার্যকর প্রয়োগ ও সংস্কার জরুরি। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের সুরক্ষায় দ্রুত প্রতিকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অনলাইন হয়রানি ও ডিজিটাল সহিংসতার অভিযোগ দ্রুত তদন্ত ও বিচারের জন্য বিশেষ সাইবার ট্রাইব্যুনাল গঠন করা যেতে পারে। চতুর্থত, ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রমে সাইবার নিরাপত্তা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাব এবং মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিভাবকদেরও প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতন ও দক্ষ করে তুলতে হবে। পঞ্চমত, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কম্পানিগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বাংলা ভাষায় কার্যকর রিপোর্টিং ব্যবস্থা ও দ্রুত সাপোর্ট প্রদানে প্ল্যাটফর্মগুলোকে বাধ্য করা প্রয়োজন। ষষ্ঠত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিয়ন্ত্রিত নীতি প্রণয়ন করা যেতে পারে। পাশাপাশি ডিজিটাল ডিটক্স বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।

প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি এর অপব্যবহার রোধে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। পারিবারিক বন্ধন, শিশু ও নারীর নিরাপত্তা এবং জাতীয় উৎপাদনশীলতার স্বার্থে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে দায়িত্বশীলতা ও সচেতনতার বিকল্প নেই। 

আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে ডিজিটাল ডিটক্স বা প্রযুক্তি থেকে সাময়িক বিরতি নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। ব্যক্তিগত জীবনকে যতটা সম্ভব আড়ালে রাখাই শ্রেয়। অন্দরমহলের শান্তি আর বাইরের জগতের চাকচিক্যএই দুইয়ের মাঝে একটি সুস্থ সীমানা টেনে দেওয়া জরুরি। প্রদর্শনীর এই মোহময় ফাঁদ থেকে বের হয়ে এসে যদি আমরা বাস্তব জীবন, প্রকৃতি এবং রক্ত-মাংসের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে না পারি, তবে এক কৃত্রিম ও অবসাদগ্রস্ত সমাজ থেকে আমাদের কেউ রক্ষা করতে পারবে না।

লেখক : সাংবাদিক ও বিশ্লেষক

কালের কণ্ঠের উপসম্পাদক

গ্যাস অনুসন্ধানের নতুন উদ্যোগ : দেশের স্বার্থ কতটা রক্ষিত হচ্ছে

আবু তাহের খান

গ্যাস অনুসন্ধানের নতুন উদ্যোগ : দেশের স্বার্থ কতটা রক্ষিত হচ্ছে

সরকার সম্প্রতি সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে দরপত্র আহ্বানের উদ্যোগ নিয়েছে। গভীর সমুদ্রের ১৫টি ও অগভীর সমুদ্রের ১১টি মিলিয়ে মোট ২৬টি ব্লকের জন্য এ দরপত্র আহবান করা হয়েছে, যার দলিলাদি ক্রয়ের সুযোগ উন্মুক্ত করা হয়েছে গত ১ জুন থেকে। বঙ্গোপসাগরে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ২০২৫ সালেও একবার দরপত্র আহবান করা হয়েছিল। কিন্তু সাতটি বহুজাতিক কম্পানি তখন দরপত্র কিনলেও শেষ পর্যন্ত কেউই তা জমা দেয়নি। কেন দেয়নি, তা সহজেই বোধগম্য। মব-শাসনের সেকালে সরকারপ্রধানের ব্যক্তিগত আগ্রহে বিশেষ সুবিধা ভোগকারী স্টারলিংক ছাড়া অন্য কোনো খাতের কোনো কম্পানিই তখন বাংলাদেশে বিনিয়োগের ব্যাপারে আগ্রহ দেখায়নি এবং সেটি সম্ভবও ছিল না। আর সে কারণেই বহুজাতিক তেল-গ্যাস কম্পানিগুলোও তখন দরপত্র জমাদানে বিরত থাকে। বিষয়টি মোটেও অস্বাভাবিক ছিল না। কারণ পৃথিবীর অন্য যেকোনো দেশে হলেও এ ধরনের পরিস্থিতিতে একইরূপ ঘটনাই ঘটত। কেননা চরম অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলাপূর্ণ একটি দেশে কোনো বিদেশি কম্পানিরই বিনিয়োগের ব্যাপারে আগ্রহ দেখানোর কথা নয়।

তো গ্যাস অনুসন্ধানের কাজে বিদেশি কম্পানিগুলোর এরূপ স্বাভাবিক অনাগ্রহকেই অস্বাভাবিক ধরে নিয়ে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হবে নাকি রক্ষা পাবে, সে বিষয়গুলো ভালোভাবে যাচাই-গ্যাস অনুসন্ধানের নতুন উদ্যোগ : দেশের স্বার্থ কতটা রক্ষিত হচ্ছেবাছাই না করেই বিদেশি কম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী এরই মধ্যে ঘোষিত দরপত্রের শর্তে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা যুক্ত করে দিয়েছে। পেট্রোবাংলার যুক্তি অনুযায়ী এতে দরপত্রে বিদেশি কম্পানির অংশগ্রহণ বাড়বে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, নতুন সরকারের মেয়াদ তিন মাস পেরোনোর আগেই বিষয়গুলো ভালোভাবে যাচাই-বাছাই না করে এবং এ ধরনের একটি উচ্চ কারিগরি বিষয়ে ব্যাপকভিত্তিক বিশেষজ্ঞ মতামত গ্রহণ ছাড়াই তাড়াহুড়া করে এভাবে দরপত্র আহবান করাটা কি আদৌ সমীচীন হয়েছে? অভিজ্ঞ মহলের মতে, এর জবাব হচ্ছে ‘না’। সমুদ্রসীমা নিয়ে ভারত ও মায়ানমারের সঙ্গে সৃষ্ট বিরোধে এতদসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আদালত যথাক্রমে ২০১২ ও ২০১৪ সালে বাংলাদেশের পক্ষে রায় দেওয়ার পর এক যুগ পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এই এক যুগেও যখন এ বিষয়ে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি, তখন বিশেষজ্ঞ অভিমত হচ্ছে, বিষয়টি ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করে দেখা ও এ বিষয়ে অধিকতর মতামত গ্রহণের জন্য আরো চার-ছয় মাস বিলম্ব হলে তাতে মোটেও এমন বড় কোনো ক্ষতি হয়ে যেত না। কিন্তু সেটি না করে তাড়াহুড়া করে সম্ভাব্য দরদাতা কম্পানির দেওয়া অগ্রিম শর্তে দরপত্র আহবান করার প্রেক্ষিতেই বরং দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এখন দেখা যাক, দরপত্রে অংশগ্রহণকারী সম্ভাব্য বহুজাতিক তেল-গ্যাস কম্পানিগুলোর পরামর্শ মেনে পেট্রোবাংলা তাদের দরপত্রে এমন কী কী শর্ত অন্তর্ভুক্ত করেছে, যা দেশের স্বার্থকে ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ন করতে পারে। এক. ২০১৯ সালের উৎপাদন-বণ্টন চুক্তিতে (পিএসসি) গভীর সমুদ্র থেকে আহরিত প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের দাম যেখানে নির্ধারণ করা হয়েছিল সোয়া সাত মার্কিন ডলার, সেখানে বর্তমান পিএসসিতে তা করা হয়েছে ১১ মার্কিন ডলার—বৃদ্ধির হার ৫৪ শতাংশ। অন্যদিকে অগভীর সমুদ্র থেকে আহরিত প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের মূল্য পূর্বের ৫ শতাংশ থেকে দ্বিগুণ বাড়িয়ে বর্তমানে করা হয়েছে ১০ শতাংশ। দুটি শর্তই প্রচণ্ডভাবে দেশের স্বার্থবিরোধী।

দুই. ২০২৩ সালের শ্রম আইনে কম্পানির মুনাফার ৫ শতাংশ শ্রমিক তহবিলে প্রদানের যে বাধ্যবাধকতা ছিল, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেটি সংশোধন করে মাত্র দেড় শতাংশে নির্ধারণ করে। এবং দুর্ভাগ্য ও হতাশার বিষয় এই যে বর্তমান নির্বাচিত সরকারও চরম শ্রমিক স্বার্থবিরোধী ওই অধ্যাদেশটির ওপর জাতীয় সংসদে কোনো প্রকার আলাপ-আলোচনার সুযোগ না দিয়েই উত্থাপনের মাত্র ৬০ সেকেন্ডেরও কম সময়ের ব্যবধানে গত ৯ এপ্রিল সংসদে সেটি পাস করে নেয়। আর নতুন শ্রমিক আইনে অন্তর্ভুক্ত এই বিধানটির কারণে এ অন্যায্য সুবিধাটি এখন গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে যুক্ত হতে যাওয়া বহুজাতিক তেল-গ্যাস কম্পানিগুলোকেও প্রদান করতে হচ্ছে।

তিন. ২০১৯ সালের পিএসসিতে গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ছিল সংশ্লিষ্ট তেল-গ্যাস কম্পানির এবং উক্ত নির্মাণ, গ্যাসের মজুদ সংরক্ষণ, গ্যাস সরবরাহকরণ ইত্যাদি বাবদ ব্যয়িত অর্থের বিপরীতে কম্পানি কর্তৃক তখন ট্যারিফ দাবি করার কোনো সুযোগ ছিল না। কিন্তু বর্তমান পিএসসিতে সংশ্লিষ্ট কম্পানিকে এ বাবদ ট্যারিফ সুবিধা প্রদানের বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা বাংলাদেশের স্বার্থের পরিপন্থী।

উল্লিখিত বিষয়াদির বাইরেও উক্ত দরপত্রে এমন আরো কিছু শর্ত অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে দেশের স্বার্থ—যে ক্ষুণ্ন হবে সেটি সহজেই বোধগম্য। তবে সে ক্ষেত্রে প্রকৃত ক্ষতি নিরূপণের জন্য বিশেষজ্ঞ অভিমতের দ্বারস্থ হওয়া প্রয়োজন। তদুপরি ২০১৯ সালের পিএসসির যেসব ধারা নতুন পিএসসিতে হুবহু রেখে দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যেও এমন কিছু ধারা আছে, যেগুলোতে দেশের স্বার্থরক্ষায় ব্যাপকভিত্তিক পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ ২০১৯ সালের পিএসসিতে শুধু অগভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র খাতের প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কম্পানিকে (বাপেক্স) ১০ শতাংশ অংশীদারি দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল, যা বর্তমান পিএসসিতেও বহাল রয়েছে। এ ক্ষেত্রে দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে চাই যে অনুরূপ ১০ শতাংশ হিস্যা বাপেক্সকে গভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রমের ক্ষেত্রেও প্রদান করা জরুরি। এ বিধান এখনই সংযুক্ত করা না হলে সেটি হবে সবকিছু জেনেবুঝেও বাংলাদেশের জ্বালানি খাতকে স্থায়ীভাবে পরনির্ভরশীল ও বহুজাতিক তেল-গ্যাস কম্পানিগুলোর কাছে জিম্মি করে রাখার মতো একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। বিষয়টি কি দেশের রাজনীতিক ও সংশ্লিষ্ট বিষয় বিশেষজ্ঞগণের দৃষ্টিতে পড়েছে?

প্রসঙ্গত বলি, গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কাজে বাংলাদেশকে যদি বিশ্বমানের দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে স্বনির্ভরতা অর্জনের পথে এগোতে হয়, তাহলে এ ধরনের কাজে বাপেক্সকে আরো অধিক হারে যুক্ত করার কোনো বিকল্প নেই। বিশেষজ্ঞ অভিমত যে বাপেক্সের বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের মধ্যে সে যোগ্যতা ও দক্ষতা দুই-ই যথেষ্ট পরিমাণে রয়েছে। কিন্তু অভিযোগ হচ্ছে, সব সরকারের আমলেই রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের ভেতরকার একটি মহল তাদের ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত স্বার্থে বাপেক্সকে সে সুযোগটি দিতে চায়নি এবং এখনো দিতে চান না, যেমনটি নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দিতে চান না চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেডকে (সিডিডিএল)। সিডিডিএলকে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দিলে সে ক্ষেত্রে দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ড যেমন বঞ্চিত হয়, তেমনি বাপেক্সকে গভীর সমুদ্রের গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন কাজের শরিকানা দিলে সেখানেও সংশ্লিষ্ট বহুজাতিক কম্পানি ও তাদের স্থানীয় প্রতিনিধিদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়। বিষয়টির প্রতি দেশের সচেতন নাগরিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

২০১৯ সালের পিএসসিতে তেল-গ্যাস কম্পানিসমূহের সব আমদানিকেই কর ও শুল্কমুক্ত রাখা হয়েছিল এবং নতুন পিএসসিতেও তা বদল করা হয়নি। দেশে কর-জিডিপির অনুপাত যেভাবে বছরের পর বছর ধরে প্রায় একই নিম্নচক্রে খাবি খাচ্ছে, সেখান থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে এ ধরনের কর ও শুল্কমুক্তির ধারা ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত রাখার প্রবণতা থামাতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রস্তাব হচ্ছে, তেল-গ্যাস কম্পানিগুলোর জন্য কর ও শুল্কমুক্ত সুবিধা বহাল থাকুক; তবে সেটি হতে হবে শুধু মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে।

সব মিলিয়ে তাই বলব, গ্যাস বাংলাদেশের একটি অপার সম্ভাবনাময় খাত। বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে অন্যান্য বিকল্প অনুসন্ধানের পাশাপাশি গ্যাস অনুসন্ধান ও আহরণের বিষয়টিকেও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, নিজেদের কারিগরি ও প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা, বিনিয়োগ সামর্থ্যের অভাব ও দক্ষতাজনিত ঘাটতির কারণে বাংলাদেশের গ্যাসসম্পদের বেশির ভাগই চলে যাচ্ছে বহুজাতিকদের কবজাধীনে। দেশে গ্যাসের যারা পাইপলাইন ভোক্তা, তাদের অধিকাংশই কি জানেন, তাদের চুলায় বা কারখানায় সরবরাহকৃত এ গ্যাস বহুজাতিক কম্পানিগুলোর কাছ থেকে দুষ্প্রাপ্য বৈদেশিক মুদ্রায় কেনা? যদি জানতেন, তাহলে এ দাবি আরো অনেক আগেই হয়তো জোরদার হতো যে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কাজে বাপেক্সকে আরো অধিক হারে যুক্ত করার মাধ্যমে স্থানীয় দক্ষতার উন্নয়ন ঘটানো হোক, যাতে উক্ত কাজে বাংলাদেশ ক্রমান্বয়ে আরো স্বনির্ভর হয়ে উঠতে পারে।

গ্যাস অনুসন্ধানসংক্রান্ত দরপত্র আহবান প্রসঙ্গে ওপরে যা যা বলা হলো, তার পুরোটাই এ দেশের সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার অংশ হিসেবে বলা। অতএব রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত প্রণেতাদের কাছে অনুরোধ, দেশ ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে এ প্রস্তাবগুলোর আলোকে গ্যাস অনুসন্ধানসংক্রান্ত উল্লিখিত দরপত্র-দলিলসমূহ অবিলম্বে পর্যালোচনা ও সংশোধন করা হোক, যে সুযোগ ওই দরপত্র-দলিলের ভেতরেই রয়েছে, যেমনটি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এআরটি পর্যালোচনা বা বাতিলের সুযোগও।

 

লেখক : আর্থ-সামাজিক বিশ্লেষক

জান্নাতের টিকিট ও জাহান্নামে নিক্ষিপ্তের বয়ান

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

জান্নাতের টিকিট ও জাহান্নামে নিক্ষিপ্তের বয়ান

জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির মিলন অস্বাভাবিক না হলেও জামায়াতের নব-উত্থানটা কিন্তু বিস্ময়কর। যে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে তারা সম্ভব-অসম্ভব সব কিছুই করেছে, কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চাওয়ার পথেও এগোয়নি; যে দল তার আদি জন্মভূমি ভারতে বিলুপ্তই হয়ে গেছে এবং বিশিষ্ট কর্মভূমি পাকিস্তান রাষ্ট্রে যাদের অস্তিত্ব এখন প্রান্তিক পর্যায়ে, সেই দল স্বাধীন বাংলাদেশে দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থান দখল করে নেবে এই ঘটনা বিস্ময়কর তো বটেই; আপাতদৃষ্টিতে অবিশ্বাস্যই। যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সূচনাস্থল ও লালন-ভূমি, চিন্তা ও মননশীলতার ক্ষেত্রে ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চার জন্য যাদের ছিল বিশেষ খ্যাতি, সেখানে জামায়াতপন্থী ছাত্ররা আধিপত্য বিস্তার করবে এমনটা ২০২৬ সালের আগে কল্পনা করাও ছিল দুঃসাধ্য। অথচ সেটাই ঘটেছে। এবং হয়তো বা জামায়াতের চাপেই নবগঠিত জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের শোক প্রস্তাবে দণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীদের নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। জামায়াতের এই উত্থানের মতাদর্শিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য মোটেই উপেক্ষণীয় নয়।

জামায়াতের উত্থানের পেছনে একটা বড় কারণ অবশ্য আওয়ামী লীগের দুঃশাসন। তাদের ফ্যাসিবাদী তৎপরতায় অতিষ্ঠ হয়ে মানুষ বিকল্প খুঁজেছে। পথের সন্ধান সমাজতন্ত্রীরা দিতে পারতেন। কিন্তু সে কর্তব্যপালনে সমাজতন্ত্রীরা ব্যর্থ হয়েছেন। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের কথা আবারও মনে পড়ে। তিনি সমাজতন্ত্রী ছিলেন না, তবে অবশ্যই উদারনৈতিক ছিলেন। ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের অবসান চেয়েছেন এবং সে লক্ষ্যে কাজও করেছেন। তবে তাঁর আস্থা ছিল ব্যক্তির নেতৃত্বে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর নৈরাজ্যিক ইতালিতে মুসোলিনির অভ্যুদয় দেখে তাঁর ধারণা হয়েছিল ‘উন্মত্ত’ ওই জনগোষ্ঠীকে শৃঙ্খলার মধ্যে এনে সম্মানের নতুন জায়গায় প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে নেতৃত্ব দানের ক্ষমতা মুসোলিনির মধ্যে রয়েছে। তাঁর এই আস্থা অবশ্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মুসোলিনি যে ঘোরতর কর্তৃত্ববাদী, ভয়ংকর রকমের পরমত-অসহিষ্ণু, ফ্যাসিবাদী এক নায়ক, নিজের ইতালি ভ্রমণের সময়ে এবং পরে ফরাসি সাহিত্যিক রোমাঁ রলাঁর সঙ্গে আলাপচারিতায় রবীন্দ্রনাথের কাছে সেটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। মুসোলিনির অভ্যুত্থানের জন্য রলাঁ প্রধানত দায়ী করেছিলেন সমাজতন্ত্রীদের ব্যর্থতাকেই।

জান্নাতের টিকিট ও জাহান্নামে নিক্ষিপ্তের বয়ানবাংলাদেশের ইতিহাসেও কিন্তু সেটাই ঘটেছে। মতাদর্শিকভাবে জামায়াতে ইসলামীই যে দেশের জন্য তো বটেই, নিজেদের দলের জন্যও প্রধান শত্রু, আওয়ামী লীগের নব্য ফ্যাসিবাদী নেতৃত্ব সেই স্থূল সত্যটাকে উপেক্ষা করে; শুধু তাই নয়, ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার ব্যাপারে তাদের বুর্জোয়া প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপিকেই প্রধান শত্রু বলে ধরে নিয়ে তদনুযায়ী আচরণ করে। এটা অবশ্য অপ্রত্যাশিত ছিল না, তবে দেশবাসীর দিক থেকে যেটা প্রত্যাশিত ছিল সেটা হলো স্বাধীন বাংলাদেশে সমাজতন্ত্রীরাই প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। প্রত্যাশার কারণও ছিল। সেটা এই যে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার পর প্রথমে স্বাধীনতার ও পরে মুক্তির সংগ্রামে জাতীয়তাবাদীদের পাশাপাশি সমাজতন্ত্রীরা সর্বক্ষণই উপস্থিত ছিলেন; বস্তুত তাঁরাই ছিলেন মূল চালিকাশক্তি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে এবং তার আগে সত্তরের নির্বাচনেও; আওয়ামী লীগ যে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে সেটা দেশের সংগ্রামী মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করা অসম্ভব—এই বিবেচনা থেকেই। কিন্তু স্বাধীনতার পর দেখা গেল সমাজতন্ত্রীরা পিছিয়ে যাচ্ছেন, রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নিয়েছে বুর্জোয়ারা। সমাজতন্ত্রীদের মধ্যে রুশপন্থী-চীনপন্থী আত্মঘাতী বিভাজন, রুশপন্থীদের আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকার প্রবণতা, চীনপন্থীদের বিভ্রান্তি ও বিভক্তি, এসবের মধ্য দিয়ে আরো একটি ঘটনা ঘটল, সেটা হলো আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে এবং সমাজতন্ত্রীদের কার্যকর অনুপস্থিতির দরুন সৃষ্ট শূন্যতা পূরণের সুযোগকে ব্যবহার করে আওয়ামীপন্থী তরুণদের নেতৃত্বে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) আবির্ভাব। দলটি সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার যতটা উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা করা সম্ভব সেভাবেই করেছে, তাদের দলের নামকরণেও সমাজতন্ত্র জ্বলজ্বল করেছে, কিন্তু তাদের মূল নেতৃত্ব যে সমাজতন্ত্রবিরোধী ছিল সেটা শুধু যে তাদের পূর্বপরিচয়ের মধ্যেই সুপ্ত ছিল তা নয়, নিজেদের ‘জাতীয় সমাজতান্ত্রিক’ পরিচয়দানের ভেতর দিয়েও প্রকাশ পেয়েছে বৈকি। চক্ষুষ্মানরা দেখতে ভুল করেননি, এবং স্মরণ না-করে পারেননি যে নািস হিটলার এবং ফ্যাসিস্ট মুসোলিনিও ‘জাতীয়তাবাদী সমাজতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার জন্যই লড়ছিলেন। একদিকে সমাজতন্ত্রীদের ব্যর্থতা, অপরদিকে মুখে সমাজতন্ত্রী অন্তরে সমাজতন্ত্রবিরোধী জাসদের উগ্র অভ্যুদয়—এই দুই ঘটনা বাংলাদেশে বুর্জোয়াদের শাসনকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার ব্যাপারে যে প্রভূত পরিমাণে সহায়তা প্রদান করেছে সে ব্যাপারে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। জাসদের ক্ষতিকর ভূমিকা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে, এখানে কৌতূহলোদ্দীপক একটি ঘটনার উল্লেখ হয়তো অপ্রাসঙ্গিক হবে না। জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান আমির সম্পর্কে জানা যাচ্ছে যে ছাত্রাবস্থাতেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সেটা ঘটেছিল জাসদের ছাত্রসংগঠনের মধ্য দিয়ে। তারপর তিনি ইসলামী ছাত্রশিবির হয়ে জামায়াতে প্রবেশ করেছেন এবং অবশেষে সর্বোচ্চ নেতৃত্বে সংস্থাপিত হয়েছেন।

জামায়াতে ইসলামীর উঠে দাঁড়ানোর পেছনে সামাজিক-সাংস্কৃতিক কারণগুলোও উল্লেখযোগ্য। দেশে বেকার ও দরিদ্র মানুষের সংখ্যা হু হু করে বেড়েছে। অন্যায়, অপরাধ, অবিচার, জুলুম স্থায়ী প্লাবনের আকার ধারণ করেছে। বিচার আগেও পণ্যই ছিল, এখন তার ব্যবসায়ী চরিত্র আরো প্রকট হয়েছে। রাষ্ট্র ও সমাজের কোথাও জবাবদিহিতার বালাই নেই। রাষ্ট্র নিজেই বৈষম্য ও নিষ্পেষণ বৃদ্ধির নির্মম যন্ত্রে পরিণত হয়ে গেছে। ধর্ষণ মহামারির আকার ধারণ করবে বলে শঙ্কা। সবকিছু মিলিয়ে সর্বত্র গভীর এক হতাশা দেখা দিয়েছে। বিত্তবানরা বিদেশে বিকল্প বাসস্থানের খোঁজ করছে। দেশে হত্যা ও আত্মহত্যা দুটোই বেড়েছে। হতাশ মানুষ মাদকের দিকে ঝুঁকছে। প্রযুক্তি মানুষকে বিচ্ছিন্ন ও একাকী করে ফেলছে। অনলাইনে জুয়া খেলা বিনোদনের স্তর পার হয়ে নেশায় পরিণত হয়েছে। ওদিকে সামাজিকভাবে সংস্কৃতির চর্চা ক্রমাগত কমে আসছে। বাড়ছে ওয়াজ এবং বিনোদনের জন্য মোবাইল ও অনলাইনের ওপর নির্ভরতা। সব দিকেই অন্ধকার গাঢ় থেকে গাঢ়তর হচ্ছে। অন্ধকার বাড়লে আশ্রয়ের জন্য মানুষ ধর্মের শরণাপন্ন হয়, বাংলাদেশেও সেটাই ঘটে চলেছে। এবং তাতে সুবিধা হচ্ছে ধর্মকে যারা রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে তাদের। যেমন— জামায়াতে ইসলামীর।

জামায়াতের ইতিহাস দ্বিচারিতায় সমুজ্জ্বল। দ্বিচারিতাকে মোনাফেকি বললে বোধকরি বুঝতে সুবিধা হয়। শুরুতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানেই হেডকোয়ার্টার্স স্থাপন করে জামায়াতের জনবিরোধী তৎপরতা চালু থাকে। কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণার দাবিতে পাঞ্জাবে তারা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধিয়েছিল। মুসলিম বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদ অধ্যাদেশকে আইনে রূপদানের উদ্যোগের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা তাদের উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক কাজ। সন্তানের জন্মদানের সক্ষমতাকে মেয়েদের পক্ষে নেতৃত্বদানের ক্ষেত্রে তারা অযোগ্যতা জ্ঞান করে, অথচ পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে সম্মিলিত বিরোধী দলের প্রার্থী হিসেবে মিস ফাতেমা জিন্নাহকে তাদের পার্টি সমর্থন করেছে। বাংলাদেশে তারা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যুগপৎ আন্দোলন করেছে। আর খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রিত্বকালে নারী নেত্রীর পরিচালনায় তাদের আমির ও সেক্রেটারি জেনারেল মন্ত্রিত্ব করাতেও কোনো প্রকার দ্বিধা প্রকাশ করেননি। এবারের জাতীয় সংসদের নির্বাচনে তারা একজন নারী প্রার্থীকেও মনোনয়ন দেয়নি, অথচ ওই সংসদেরই সংরক্ষিত নারী আসনে প্রার্থী মনোনয়ন আগেও দিয়েছে, এবারও অবশ্যই দেবে। দলের পক্ষে ভোট চাইতে মেয়েদের দ্বারে দ্বারে পাঠাতেও তাদের কুণ্ঠা ছিল না, তারা ইসলামী শাসন কায়েম করতে বদ্ধপরিকর, তবে নির্বাচনে জেতার আশায় হিন্দু সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তিকে প্রার্থী করতে অসুবিধা দেখতে পায়নি। তাদের নেতারা কেউ আমির, কেউ নায়েবে আমির, আবার কেউ সেক্রেটারি জেনারেল। জামায়াতিরা নিজেদের সততার বড়াই করেন এবং দেশে সেলাকের শাসন কায়েম করবে বলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকেন, তবে ভোট টানার আশায় মিথ্যাচারে দ্বিধা করেন না। বিগত নির্বাচনের সময় তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল যে জামায়াতকে ভোট দেওয়ার অর্থ জান্নাতে যাওয়ার টিকিট কেনা, হয়তো আশা করেছিল যে জ্বলন্ত জাহান্নামের প্রান্তে অবস্থানরত গরিব মানুষ তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতিতে উদ্দীপ্ত হয়ে দলে দলে তাদের ভোট দিতে ছুটে আসবে; পরে সমালোচনার মুখে ওই বক্তব্যটি ব্যক্তিগত, দলীয় নয় বলে প্রচার করে। ভোট কেনার জন্য প্রকাশ্যে অর্থ বিতরণ করা হচ্ছে এমন ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হয়ে সংবাদপত্রে চলে এসেছে।

 

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও জনশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে সহিংসতা

ড. মো. রুহুল আমিন সরকার

রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও জনশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে সহিংসতা

রাষ্ট্র একটি সংগঠিত রাজনৈতিক কাঠামো, যেখানে নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, জনসংখ্যা, সরকার এবং সর্বোপরি সার্বভৌমত্ব বিদ্যমান থাকে। এই চারটি উপাদান ছাড়া কোনো রাষ্ট্র কল্পনা করা যায় না। সার্বভৌমত্ব হলো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতা, যার মাধ্যমে রাষ্ট্র তার নিজস্ব ভূখণ্ডে আইন প্রণয়ন, প্রয়োগ এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখে। এই ক্ষমতার অন্যতম বাস্তব রূপ হলো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশেষ করে পুলিশ। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পুলিশকে রাষ্ট্রের ভৌত ক্ষমতার একমাত্র বৈধ প্রয়োগকারী বাহিনী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অর্থাৎ রাষ্ট্র ছাড়া আর কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা সংগঠন আইনগতভাবে বলপ্রয়োগের অধিকার রাখে না।

এই প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি সংঘটিত দুটি দৃশ্যমান ঘটনাএকটিতে ট্রাফিক পুলিশকে প্রকাশ্যে আক্রমণ ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার চিত্র, অন্যটিতে একটি জনসমাগমে পুলিশি যানবাহন ঘিরে ভাঙচুর ও আক্রমণাত্মক আচরণ; যা রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা, আইন এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে। এই ঘটনাগুলো শুধু একটি আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যত্যয় নয়, বরং রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব ও বৈধ ক্ষমতার ওপর সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

প্রথম ঘটনায় দেখা যায়, নগর সড়কে দায়িত্ব পালনরত একজন ট্রাফিক পুলিশ সদস্যকে কয়েকজন ব্যক্তি শারীরিকভাবে আক্রমণ করছে। একজন আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাকে কর্তব্যরত অবস্থায় আঘাত করা শুধু ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, এটি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিকে আক্রমণের শামিল। কারণ পুলিশ ব্যক্তি হিসেবে সেখানে উপস্থিত নন; তিনি রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে আইন প্রয়োগ করছেন। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, যানবাহন চলাচল নিয়মিত রাখা, এবং জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের সাংবিধানিক দায়িত্বের অংশ।

দ্বিতীয় ঘটনায় দেখা যায়, একটি এলাকায় পুলিশি যানবাহনকে ঘিরে জনসমাগম সৃষ্টি হয়েছে এবং সেখানে উত্তেজিত জনতা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছে। এমন পরিস্থিতি শুধু বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে না, বরং রাষ্ট্রের চলমান প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকেও অকার্যকর করার চেষ্টা হিসেবে দেখা যায়। কারণ পুলিশের যানবাহন রাষ্ট্রীয় শক্তির চলমান প্রতীক, যা আইন প্রয়োগের সরাসরি মাধ্যম।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব অনুযায়ী, বিশেষ করে ম্যাক্স ওয়েবারের ধারণা অনুসারে, রাষ্ট্র হলো এমন একটি রাজনৈতিক সংগঠন, যা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বৈধ বলপ্রয়োগের একচেটিয়া অধিকার রাখে। এই একচেটিয়া বলপ্রয়োগের অধিকার (Monopoly of Legitimate Violeance) রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের মূল ভিত্তি। অর্থাৎ, যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রাষ্ট্রের অনুমতি ছাড়া বলপ্রয়োগ শুরু করে বা রাষ্ট্রের প্রতিনিধি বাহিনীর ওপর আক্রমণ করে, তবে তা রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তিকে চ্যালেঞ্জ করে।

এই দুটি ঘটনার আলোকে আমরা দেখতে পাই, পুলিশ শুধু একটি প্রশাসনিক সংস্থা নয়; এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের বাস্তব প্রতিফলন। পুলিশের ওপর আক্রমণ মানে ব্যক্তিগত পর্যায়ে কোনো কর্মকর্তার ওপর আক্রমণ নয়; বরং রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা এবং কর্তৃত্বের ওপর আঘাত। এই কারণে বিশ্বের সব আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই পুলিশকে বিশেষ আইনি সুরক্ষা প্রদান করা হয়।

রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ধারণা আরো গভীরভাবে বুঝতে হলে এর অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক দুই দিক বিবেচনা করতে হয়। বাহ্যিক সার্বভৌমত্ব মানে অন্য কোনো রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থাকা, আর অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব মানে নিজের ভূখণ্ডে আইন প্রয়োগের পূর্ণ ক্ষমতা। পুলিশ এই অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্বের বাস্তব রূপ। যখন কোনো জনতা বা ব্যক্তি পুলিশের ওপর আক্রমণ করে, তখন তা অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করার চেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হয়। আইনের দৃষ্টিতে এই ধরনের আক্রমণ গুরুতর অপরাধ। বাংলাদেশ দণ্ডবিধি অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীর ওপর আক্রমণ, সরকারি কাজে বাধা প্রদান এবং সরকারি সম্পত্তি ক্ষতিসাধন একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কারণ এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং জনগণের নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।

রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও জনশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে সহিংসতা

এই ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে আসে, তা হলো সমাজে আইন মানার সংস্কৃতি। একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয় যখন তার নাগরিকরা স্বেচ্ছায় আইন মেনে চলে। আইনকে বাধ্যতামূলক শাস্তির ভয় থেকে নয়, বরং সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকে মানা উচিত। কিন্তু যখন এই দায়িত্ববোধ দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন রাষ্ট্রকে তার বলপ্রয়োগের ক্ষমতা ব্যবহার করতে হয়। পুলিশ সেই বলপ্রয়োগের বৈধ বাহন।

ট্রাফিক পুলিশ একজন সাধারণ নাগরিকের চলাচলকে সীমাবদ্ধ করছে না; বরং সব নাগরিকের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করছে। উদাহরণস্বরূপ, যদি ট্রাফিক নিয়ম না মানা হয়, তবে সড়কে দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পায়, প্রাণহানি ঘটে এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। তাই পুলিশের নিয়ন্ত্রণমূলক ভূমিকা আসলে নাগরিকদের সুরক্ষার জন্যই।

দ্বিতীয় ঘটনায় ভিড় বা আক্রমণাত্মক আচরণ সমাজে এক ধরনের ভ্রান্ত বার্তা দেয় যে আইন ভাঙা বা রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করা গ্রহণযোগ্য। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত। রাষ্ট্র যদি তার আইন প্রয়োগের ক্ষমতা হারায়, তবে সেটি আর রাষ্ট্র থাকে না, সেটি বিশৃঙ্খল জনসমষ্টিতে পরিণত হয়। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টিকে থাকে তিনটি স্তম্ভের ওপরআইন, শৃঙ্খলা এবং বৈধ বলপ্রয়োগ। পুলিশ এই তিনটির মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে। বিচার বিভাগ আইন ব্যাখ্যা করে, প্রশাসন নীতি বাস্তবায়ন করে, আর পুলিশ মাঠ পর্যায়ে তা কার্যকর করে। এই সমন্বয় ভেঙে গেলে রাষ্ট্র অকার্যকর হয়ে পড়ে।

এ ছাড়া পুলিশের ওপর আক্রমণ সমাজে নেতিবাচক মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলে। এটি আইন মানার প্রবণতা কমিয়ে দেয় এবং অপরাধপ্রবণতা বাড়িয়ে দেয়। কারণ অপরাধীরা তখন মনে করে যে রাষ্ট্রের প্রয়োগ ক্ষমতা দুর্বল। ফলে ছোট অপরাধ থেকে শুরু করে বড় ধরনের অপরাধ পর্যন্ত বিস্তার লাভ করতে পারে। তবে এই ধরনের পরিস্থিতি বিশ্লেষণে শুধু শাস্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নয়, সামাজিক ও আচরণগত বিশ্লেষণও জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে জন-অসন্তোষ, ভুল-বোঝাবুঝি বা তাৎক্ষণিক উত্তেজনা থেকেও এমন ঘটনা ঘটে। কিন্তু যেকোনো কারণেই হোক, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ওপর আক্রমণ কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য হলোসে তার নাগরিকের অধিকার রক্ষা করবে, আবার একই সঙ্গে আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবে। এই ভারসাম্য রক্ষা করাই রাষ্ট্র পরিচালনার মূল চ্যালেঞ্জ। পুলিশ এই ভারসাম্যের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে।

উল্লিখিত দুটি ঘটনার মাধ্যমে এটি স্পষ্ট হয় যে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব শুধু সংবিধান বা লিখিত নথিতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি প্রতিদিনের বাস্তব কর্মকাণ্ডে প্রতিফলিত হয়। একজন ট্রাফিক পুলিশ যখন সড়কে দাঁড়িয়ে নিয়ম বাস্তবায়ন করে, তখনই রাষ্ট্র তার সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করে। আবার সেই পুলিশ যদি আক্রমণের শিকার হয়, তবে সেটি রাষ্ট্রের ক্ষমতার ওপর আঘাত হিসেবে বিবেচিত হয়। অতএব, রাষ্ট্র, পুলিশ এবং জনগণএই তিনটি উপাদান একে অপরের পরিপূরক। জনগণ ছাড়া রাষ্ট্র অর্থহীন, রাষ্ট্র ছাড়া পুলিশ অকার্যকর, আর পুলিশ ছাড়া রাষ্ট্রের আইন বাস্তবায়ন অসম্ভব। তাই এই তিনটির মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধ অত্যন্ত জরুরি।

পরিশেষে বলা যায়, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। আইনকে সম্মান করা, পুলিশের কাজে সহযোগিতা করা এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখা একটি সভ্য সমাজের পরিচয়। পুলিশের ওপর আক্রমণ মানে শুধু একজন ব্যক্তির ওপর আঘাত নয়, বরং সমগ্র রাষ্ট্র কাঠামোর ওপর আঘাত। তাই এই ধরনের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের উচিত একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ, আইননিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল সমাজ গঠন করা, যেখানে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন থাকে এবং আইন সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হয়।

লেখক : অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার, সিআইডি