পুকুরপারে এক তরুণ ছবি তুলছে। বন্ধুর হাতে স্মার্টফোন। নির্দেশনা আসছে-‘ঘাড় সোজা কেন, একটু বাঁকা করো।’ ঘাড় বাঁকা হতেই ক্যামেরার ক্লিক। শহরের কোনো এক ঝলমলে রেস্টুরেন্টে দুই বান্ধবী খাবার টেবিলে বসা। ধোঁয়া ওঠা সুস্বাদু খাবার সামনে রেখেই শুরু হয়েছে অন্য এক মহাসমারোহ। খাওয়া শুরুর চেয়েও তখন জরুরি ক্যামেরাবন্দি হওয়ার নিখুঁত প্রস্তুতি। একজন ঠোঁট বাঁকাচ্ছেন, অন্যজন অদ্ভুত সব অঙ্গভঙ্গিতে নিজেকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টায় মত্ত।
দৃশ্যগুলো আমাদের চেনা। এই শহরের প্রতিটি কোণে, প্রতিদিন এমন হাজারো ফ্রেম তৈরি হচ্ছে। এসব খণ্ডচিত্রের শেষ গন্তব্য একটাই—সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। অতিরিক্ত মেকআপের প্রলেপ, রঙিন জমকালো পোশাক, কৃত্রিম আলোকসম্পাত কিংবা আকর্ষণীয় লোকেশন খোঁজার পেছনের মূল মনস্তত্ত্বটি আসলে কী? খুব গভীরে না গিয়েও বলা যায়, এর পেছনে কাজ করে ছবি বা পোস্টটি শেয়ার করার পর ভার্চুয়াল বন্ধু মহল থেকে একটু বাড়তি লাইক, কমেন্ট আর প্রশংসা কুড়ানোর তীব্র আকাঙ্ক্ষা।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুধু একটি ছবি বা স্ট্যাটাস পোস্ট করলেই কিন্তু গল্পের শেষ হয় না; বরং সেখান থেকেই শুরু হয় এক নতুন মানসিক অস্থিরতা। একটি স্ট্যাটাস লিখতে গিয়েও যেমন চলে নানামুখী ভাবনা তেমনি পোস্ট করার পরই টুংটাং শব্দে আসতে থাকে নোটিফিকেশন। এই যে এক অদ্ভুত ভার্চুয়াল ব্যস্ততা, তা আমাদের অজান্তেই গিলে খাচ্ছে আমাদের চারপাশের বাস্তব সময় আর আসল সম্পর্কগুলোকে।
রাতে ঘুমানোর আগেও অনেকে ব্যস্ত থাকেন ফেসবুকে কে কী স্ট্যাটাস দিল, কোন নতুন রিল বা শর্টস আপলোড হলো তা দেখতে। শরীর ও মস্তিষ্কের বিশ্রাম নেওয়ার সময়ও কেড়ে নিচ্ছে এই মাধ্যম। একদিকে ব্যয় হচ্ছে মোবাইল ডেটা, অন্যদিকে অনুৎপাদনশীল কাজে অপচয় হচ্ছে সময় ও মনোযোগ। অথচ এই সময় কাজে লাগতে পারত নতুন কোনো পেশাগত নতুন দক্ষতা অর্জনে, পাঠ্যবইয়ের বাইরের জ্ঞানচর্চায় কিংবা সৃজনশীল কাজে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মূল উদ্দেশ্য ছিল যোগাযোগ সহজ করা। কিন্তু বাস্তবে অনেকেই এর গঠনমূলক ব্যবহার থেকে সরে এসে এটিকে পরিণত করেছেন আত্মপ্রদর্শন ও সময় অপচয়ের মাধ্যম হিসেবে। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই লাইক-কমেন্টের সংস্কৃতি মানুষকে এক ধরনের ছদ্ম-স্বীকৃতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমরা আমাদের সুখ, সৌন্দর্য এবং যোগ্যতার মাপকাঠি সঁপে দিয়েছি অন্যের হাতের একটা ডিজিটাল ক্লিকের ওপর। কোনো পোস্টে লাইক কম হলে একবিংশ শতাব্দীর তরুণ মন বিষাদে আক্রান্ত হচ্ছে, নিজেকে ভাবছে ব্রাত্য। আর লাইকের সংখ্যা হাজার পার হলে ক্ষণিকের জন্য মিলছে এক কৃত্রিম পরম তৃপ্তি। আমরা কি তবে ক্রমেই এক আত্মরতিমূলক (Narcissistic) সমাজে রূপান্তরিত হচ্ছি, যেখানে বাস্তব অভিজ্ঞতার চেয়ে সেই অভিজ্ঞতার ‘ডিজিটাল প্রদর্শন’ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
তথ্যের দ্রুত প্রবাহ, দূরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের যে সম্ভাবনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যাত্রা শুরু হয়েছিল, বাস্তবে তা অনেকাংশে আসক্তি, ভুয়া তথ্য, মানসিক স্বাস্থ্যের সংকট এবং সময়ের অপচয়ে পরিণত হয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ইতিবাচক ব্যবহারও রয়েছে।
২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ছয় কোটি; যা দেশের মোট জনসংখ্যার ৩৪ শতাংশ। সবচেয়ে জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম ফেসবুক, এরপর ইউটিউব, টিকটক ও ইনস্টাগ্রাম। এর ব্যবহার সবচেয়ে বেশি তরুণদের মধ্যে।
একসময় যৌথ পরিবারে সন্ধ্যার আড্ডা, একসঙ্গে খাওয়া কিংবা পারিবারিক সমস্যা নিয়ে আলোচনার যে সংস্কৃতি ছিল, তা এখন অনেকটাই হুমকির মুখে। পরিবারের সদস্যরা একই ছাদের নিচে থাকলেও অনেকেই ডুবে থাকছেন নিজ নিজ স্মার্টফোনে। ফলে কথোপকথন কমছে, বাড়ছে মানসিক দূরত্ব। বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের, এমনকি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কেও তৈরি হচ্ছে বিচ্ছিন্নতা। বয়স্করা ভুগছেন একাকিত্বে, শিশুরা বাস্তব সম্পর্কের বদলে আশ্রয় নিচ্ছে ভার্চুয়াল জগতে।
একটা সময় ছিল যখন মানুষের অন্দরমহলের কথা অন্দরেই থাকত। কিন্তু বর্তমানের ‘শেয়ারিং কালচার’ বা সবকিছু প্রকাশ করার সংস্কৃতিতে প্রাইভেসি বা গোপনীয়তা চরমভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। অনেকে নিজের অজান্তেই ঘরের খুঁটিনাটি তথ্য, সন্তানের স্কুলের অবস্থান, এমনকি নিজের দৈনন্দিন রুটিনও তুলে দিচ্ছেন সামাজিক মাধ্যমে। উদাহরণস্বরূপ আমরা যখন কোনো পাঁচতারা হোটেলে চেক-ইন দিই কিংবা ভ্রমণের লাইভ আপডেট দিই, তখন শুধু নিজের সামর্থ্যের প্রচার করছি না, বরং অপরাধীচক্র বা ডেটা শিকারি বিভিন্ন গ্রুপের হাতে তুলে দিচ্ছি নিজের লোকেশন ও ব্যক্তিগত তথ্য।
ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের ফিডগুলোতে এখন এক ধরনের অলিখিত প্রতিযোগিতা চলে—‘কে কার চেয়ে কত বেশি সুখী এবং সফল’। গাড়ি-বাড়ি, দামি রেস্তোরাঁ কিংবা বিদেশভ্রমণের চাকচিক্যময় ছবি যাঁরা প্রতিনিয়ত পোস্ট করছেন, তাঁরা হয়তো নিজেদের এক ধরনের সামাজিক শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করতে চাইছেন। কিন্তু মুদ্রার অপর পিঠ অত্যন্ত নির্মম।
সমাজের একটি বিশাল অংশ, যারা সৎ উপায়ে জীবনসংগ্রাম করছেন, যাঁদের এই ধরনের বৈভব প্রদর্শনের সামর্থ্য নেই, তাঁরা যখন অবিরত এই সমস্ত ‘লাইফস্টাইল’ দেখতে বাধ্য হন, তখন তাঁদের অবচেতনে এক ধরনের হীনম্মন্যতা ও আফসোসের জন্ম নেয়। এই অবাস্তব তুলনা সমাজে এক ধরনের হতাশা ও অসন্তোষ তৈরি করছে।
সামাজিক মাধ্যমের এই জাঁকজমকপূর্ণ দুনিয়া মানুষকে এক ধরনের নেশায় বুঁদ করে রাখছে। গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার এই ‘স্ক্রিন টাইম’ মানুষের মস্তিষ্কে ডোপামিনের ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করে এক ধরনের ছদ্ম-উত্তেজনা তৈরি করে। এর শারীরিক ও মানসিক মূল্য অত্যন্ত চড়া। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা এবং স্ক্রল করার কারণে যুবসমাজের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, অনিদ্রা এবং স্থূলতার মতো শারীরিক সমস্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এর চেয়েও বড় ক্ষতি হচ্ছে মানসিক স্বাস্থ্যের। যখন একজন ব্যক্তি নিজেকে ভার্চুয়াল দুনিয়ার ‘পারফেক্ট’ জীবনের সঙ্গে মেলাতে পারে না, তখন গ্রাস করে তীব্র মানসিক অবসাদ বা ডিপ্রেশন। বিশ্বজুড়েই চিকিৎসকরা এখন এই ‘ডিজিটাল ফ্যাটিগ’ বা মানসিক ক্লান্তিকে এক নতুন মহামারি হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নারীদের ওপর বিশেষ ধরনের মানসিক ও সামাজিক চাপ তৈরি করছে। একই সঙ্গে সাইবার হয়রানি, রিভেঞ্জ পর্ন, সেক্সটরশন ও ডিজিটাল সহিংসতা এখন উদ্বেগজনক বাস্তবতা।
শিশু-কিশোরদের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ঝুঁকি আরো গভীর। অশ্লীল কনটেন্ট, আসক্তি, ঘুমের ব্যাঘাত, মনোযোগহীনতা ও শিক্ষাগত ক্ষতি এর বড় প্রভাবগুলোর মধ্যে অন্যতম। ঢাকার শিশুরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ডিজিটাল স্ক্রিনে সময় কাটাচ্ছে, যা তাদের ঘুম, শারীরিক বৃদ্ধি ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি)। সংস্থাটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি শিশু চোখের সমস্যায় এবং ৮০ শতাংশ শিশু প্রায়ই মাথা ব্যথায় ভুগছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবেলায় বিভিন্ন দেশ কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া ২০২৫ সালে ১৬ বছরের নিচে শিশু-কিশোরদের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করে বিশ্বে নজির সৃষ্টি করেছে। আইন অমান্য করলে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
ফ্রান্স ১৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ বলেছেন, শিশুদের আবেগ কোনো পণ্যে পরিণত হতে পারে না। যুক্তরাজ্যও ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য কঠোর বয়স যাচাই ব্যবস্থা চালুর পথে এগোচ্ছে।
ইন্দোনেশিয়া ২০২৬ সাল থেকে ১৬ বছরের নিচে শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বয়স যাচাই বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নও একই ধরনের নীতিমালা নিয়ে কাজ করছে।
শিশু-কিশোরদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে মালয়েশিয়া। দেশটির সরকার ১ জুন থেকে ১৬ বছরের কম বয়সী কেউ ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, ইউটিউব কিংবা একই ধরনের জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নতুন অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবে না।
বাংলাদেশেও এ বিষয়ে কার্যকর ও সমন্বিত নীতি জরুরি। প্রথমত, বয়সভিত্তিক বিধি-নিষেধ আরোপ করা প্রয়োজন। ১৬ বছরের নিচে শিশু-কিশোরদের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ বা নিষেধাজ্ঞা বিবেচনা করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, জাতীয় পরিচয়পত্র বা নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল পরিচয়ের মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট যাচাই ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে, যাতে ভুয়া অ্যাকাউন্ট ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়। তৃতীয়ত, সাইবার অপরাধ দমনে বিদ্যমান আইনের কার্যকর প্রয়োগ ও সংস্কার জরুরি। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের সুরক্ষায় দ্রুত প্রতিকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অনলাইন হয়রানি ও ডিজিটাল সহিংসতার অভিযোগ দ্রুত তদন্ত ও বিচারের জন্য বিশেষ সাইবার ট্রাইব্যুনাল গঠন করা যেতে পারে। চতুর্থত, ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রমে সাইবার নিরাপত্তা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাব এবং মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিভাবকদেরও প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতন ও দক্ষ করে তুলতে হবে। পঞ্চমত, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কম্পানিগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বাংলা ভাষায় কার্যকর রিপোর্টিং ব্যবস্থা ও দ্রুত সাপোর্ট প্রদানে প্ল্যাটফর্মগুলোকে বাধ্য করা প্রয়োজন। ষষ্ঠত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিয়ন্ত্রিত নীতি প্রণয়ন করা যেতে পারে। পাশাপাশি ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।
প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি এর অপব্যবহার রোধে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। পারিবারিক বন্ধন, শিশু ও নারীর নিরাপত্তা এবং জাতীয় উৎপাদনশীলতার স্বার্থে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে দায়িত্বশীলতা ও সচেতনতার বিকল্প নেই।
আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ বা প্রযুক্তি থেকে সাময়িক বিরতি নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। ব্যক্তিগত জীবনকে যতটা সম্ভব আড়ালে রাখাই শ্রেয়। অন্দরমহলের শান্তি আর বাইরের জগতের চাকচিক্য—এই দুইয়ের মাঝে একটি সুস্থ সীমানা টেনে দেওয়া জরুরি। প্রদর্শনীর এই মোহময় ফাঁদ থেকে বের হয়ে এসে যদি আমরা বাস্তব জীবন, প্রকৃতি এবং রক্ত-মাংসের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে না পারি, তবে এক কৃত্রিম ও অবসাদগ্রস্ত সমাজ থেকে আমাদের কেউ রক্ষা করতে পারবে না।
লেখক : সাংবাদিক ও বিশ্লেষক
কালের কণ্ঠের উপসম্পাদক



বাছাই না করেই বিদেশি কম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী এরই মধ্যে ঘোষিত দরপত্রের শর্তে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা যুক্ত করে দিয়েছে। পেট্রোবাংলার যুক্তি অনুযায়ী এতে দরপত্রে বিদেশি কম্পানির অংশগ্রহণ বাড়বে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, নতুন সরকারের মেয়াদ তিন মাস পেরোনোর আগেই বিষয়গুলো ভালোভাবে যাচাই-বাছাই না করে এবং এ ধরনের একটি উচ্চ কারিগরি বিষয়ে ব্যাপকভিত্তিক বিশেষজ্ঞ মতামত গ্রহণ ছাড়াই তাড়াহুড়া করে এভাবে দরপত্র আহবান করাটা কি আদৌ সমীচীন হয়েছে? অভিজ্ঞ মহলের মতে, এর জবাব হচ্ছে ‘না’। সমুদ্রসীমা নিয়ে ভারত ও মায়ানমারের সঙ্গে সৃষ্ট বিরোধে এতদসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আদালত যথাক্রমে ২০১২ ও ২০১৪ সালে বাংলাদেশের পক্ষে রায় দেওয়ার পর এক যুগ পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এই এক যুগেও যখন এ বিষয়ে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি, তখন বিশেষজ্ঞ অভিমত হচ্ছে, বিষয়টি ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করে দেখা ও এ বিষয়ে অধিকতর মতামত গ্রহণের জন্য আরো চার-ছয় মাস বিলম্ব হলে তাতে মোটেও এমন বড় কোনো ক্ষতি হয়ে যেত না। কিন্তু সেটি না করে তাড়াহুড়া করে সম্ভাব্য দরদাতা কম্পানির দেওয়া অগ্রিম শর্তে দরপত্র আহবান করার প্রেক্ষিতেই বরং দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসেও কিন্তু সেটাই ঘটেছে। মতাদর্শিকভাবে জামায়াতে ইসলামীই যে দেশের জন্য তো বটেই, নিজেদের দলের জন্যও প্রধান শত্রু, আওয়ামী লীগের নব্য ফ্যাসিবাদী নেতৃত্ব সেই স্থূল সত্যটাকে উপেক্ষা করে; শুধু তাই নয়, ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার ব্যাপারে তাদের বুর্জোয়া প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপিকেই প্রধান শত্রু বলে ধরে নিয়ে তদনুযায়ী আচরণ করে। এটা অবশ্য অপ্রত্যাশিত ছিল না, তবে দেশবাসীর দিক থেকে যেটা প্রত্যাশিত ছিল সেটা হলো স্বাধীন বাংলাদেশে সমাজতন্ত্রীরাই প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। প্রত্যাশার কারণও ছিল। সেটা এই যে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার পর প্রথমে স্বাধীনতার ও পরে মুক্তির সংগ্রামে জাতীয়তাবাদীদের পাশাপাশি সমাজতন্ত্রীরা সর্বক্ষণই উপস্থিত ছিলেন; বস্তুত তাঁরাই ছিলেন মূল চালিকাশক্তি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে এবং তার আগে সত্তরের নির্বাচনেও; আওয়ামী লীগ যে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে সেটা দেশের সংগ্রামী মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করা অসম্ভব—এই বিবেচনা থেকেই। কিন্তু স্বাধীনতার পর দেখা গেল সমাজতন্ত্রীরা পিছিয়ে যাচ্ছেন, রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নিয়েছে বুর্জোয়ারা। সমাজতন্ত্রীদের মধ্যে রুশপন্থী-চীনপন্থী আত্মঘাতী বিভাজন, রুশপন্থীদের আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকার প্রবণতা, চীনপন্থীদের বিভ্রান্তি ও বিভক্তি, এসবের মধ্য দিয়ে আরো একটি ঘটনা ঘটল, সেটা হলো আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে এবং সমাজতন্ত্রীদের কার্যকর অনুপস্থিতির দরুন সৃষ্ট শূন্যতা পূরণের সুযোগকে ব্যবহার করে আওয়ামীপন্থী তরুণদের নেতৃত্বে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) আবির্ভাব। দলটি সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার যতটা উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা করা সম্ভব সেভাবেই করেছে, তাদের দলের নামকরণেও সমাজতন্ত্র জ্বলজ্বল করেছে, কিন্তু তাদের মূল নেতৃত্ব যে সমাজতন্ত্রবিরোধী ছিল সেটা শুধু যে তাদের পূর্বপরিচয়ের মধ্যেই সুপ্ত ছিল তা নয়, নিজেদের ‘জাতীয় সমাজতান্ত্রিক’ পরিচয়দানের ভেতর দিয়েও প্রকাশ পেয়েছে বৈকি। চক্ষুষ্মানরা দেখতে ভুল করেননি, এবং স্মরণ না-করে পারেননি যে নািস হিটলার এবং ফ্যাসিস্ট মুসোলিনিও ‘জাতীয়তাবাদী সমাজতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার জন্যই লড়ছিলেন। একদিকে সমাজতন্ত্রীদের ব্যর্থতা, অপরদিকে মুখে সমাজতন্ত্রী অন্তরে সমাজতন্ত্রবিরোধী জাসদের উগ্র অভ্যুদয়—এই দুই ঘটনা বাংলাদেশে বুর্জোয়াদের শাসনকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার ব্যাপারে যে প্রভূত পরিমাণে সহায়তা প্রদান করেছে সে ব্যাপারে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। জাসদের ক্ষতিকর ভূমিকা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে, এখানে কৌতূহলোদ্দীপক একটি ঘটনার উল্লেখ হয়তো অপ্রাসঙ্গিক হবে না। জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান আমির সম্পর্কে জানা যাচ্ছে যে ছাত্রাবস্থাতেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সেটা ঘটেছিল জাসদের ছাত্রসংগঠনের মধ্য দিয়ে। তারপর তিনি ইসলামী ছাত্রশিবির হয়ে জামায়াতে প্রবেশ করেছেন এবং অবশেষে সর্বোচ্চ নেতৃত্বে সংস্থাপিত হয়েছেন। 
