আষাঢ়ী-ফুলের মুখে রোদের জিকির
তীব্র ঢেউ প্রকৃতির খোঁপায় নজর
ভরা-মৌসুমে আকাশে বিচ্ছেদের জ্বর
পর্দা খুলে মনোচোখে মেঘের শহর
ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে সামনে গেলেই
ক্ষত বুক রোদ্রভেজা সুখের আলোয়।

আষাঢ়ী-ফুলের মুখে রোদের জিকির
তীব্র ঢেউ প্রকৃতির খোঁপায় নজর
ভরা-মৌসুমে আকাশে বিচ্ছেদের জ্বর
পর্দা খুলে মনোচোখে মেঘের শহর
ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে সামনে গেলেই
ক্ষত বুক রোদ্রভেজা সুখের আলোয়।

অন্ধি-সন্ধি ফন্দি-ফিকির বৃথা যখন সবি
ঠিক করেছি অবশেষে নাম লেখাবো আমি
কেল্লাফতেহ বাক্যবাগীশ চাটুকারের দলে,
বলবে তারা ‘এতদিন কোথায় ছিলে কবি?’
ধান্দাবাজির এই জমানায় আজো তুমি ভাবো
আসনখানি তোমার জন্য শূন্য পড়ে রবে?
তা হলে আর দেরি কেন? চরণতলে বসে তার
বলতে শুরু করো : ঈষৎ বাঁকা নাসা তোমার
বাঁশির মতো লাগে,
নৃত্যপাগল চড়ুই পাখি চক্ষু এমন
দেখিনি তো আগে।
ভুবনমোহন ওই হাসিতে মুক্তো যেন ঝরে
দেখে আমার ইচ্ছে করে
মুক্তো ও তার মালকিনকে জড়িয়ে ধরে
খাই লুটোপুটি,
স্বর্গ হতে নেমে আসা, অমিয়ধারা
দু’হাত ভরে লুটি।
জন্মাবধি বুকের ভেতর পুষে রাখা ভালবাসার কথা
সাহস করে দেবীর কাছে যেই বলেছি আমি
অমনি তিনি রেগেমেগে যষ্টিহাতে ওঠেন গর্জে : ‘গেলি?’
আর আমি তখন বালাই ষাট, থুক্কু, বলে
দে ছুট দে ছুট, পার হয়ে যাই বেলাবেলি
তেপান্তরের মাঠ
‘যাব ফের? কানমনি ভাই,’
প্রেম করিতে আর যদি যাই...।

শহীদুল জহিরের গল্পগুলোকে সম্পূর্ণ পরাবাস্তব গল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। সুরিয়ালিজমে চেতন ও অবচেতনের একটা বন্ধন গড়ে ওঠে। অন্য কথায়, স্বপ্নের সঙ্গে জাগতিক বিষয় যুক্ত হয়ে স্বপ্নবাস্তবতার সৃষ্টি করে। বিষয়টা ভীষণভাবে ব্যক্তিগত। শহীদুল জহিরের গল্পগুলো অবচেতন থেকে আসেনি। শহীদুল জহির নিজেও বলছেন যে তিনি বেশ সময় নিয়ে গল্প লেখেন। অনেক সময় কাঠামোটা পূর্বপরিকল্পিত থাকে।
মুক্তিযুদ্ধের আগে বাংলাদেশের সাহিত্যের একটা বিরাট অংশ লেখা হয়েছে সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে। এই পর্বের ছোটগল্পে নির্মিতির চেয়ে মুখ্য হয়ে দাঁড়ায় বক্তব্য, যেহেতু সময়টা ছিল জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের এবং জাতি গঠনের। কিন্তু স্বাধীনতা-উত্তরকালে এসে ছোটগল্পে নিরীক্ষা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই পর্বের সবচেয়ে আলাদা ছোটগল্পকার হলেন শহীদুল জহির। তিনি প্রবণতার দিক থেকে বাংলা সাহিত্যে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র ধারাবাহিকতা। শহীদুল জহির নিজেও সেটা স্বীকার করে জানিয়েছেন, ‘...আমার গল্প, বাংলা সাহিত্যের যে ঐতিহ্য আছে, সেগুলো থেকেই আসা এবং বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে আসতে পারে। এটা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ হতে পারে।’ [সাক্ষাৎকার, আর কে রনি গৃহীত]। শহীদুল জহির যখন লিখতে এসেছেন, তখন বিশ্বসাহিত্যের বড় তারকা হলেন গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস। তাঁর দ্বারা তিনি কিছুটা প্রভাবিত হন। গদ্যে সৈয়দ শামসুল হকের প্রভাবও লক্ষ করা যায়। আরেকটু বিশদভাবে বললে, কমলকুমার মজুমদার, জেমস জয়েস ও ইলিয়াসের প্রভাবও তাঁর ভেতর আছে। তবে এসব প্রভাব ছাপিয়ে পরবর্তীকালে তিনি নিজেই গল্প বলার একটি স্বতন্ত্র ধারা সৃষ্টি করেছেন, যেটা আমরা শুধু ‘শহীদুল জহিরীয় ধারা’ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি।
শহীদুল জহির কাঠামোসচেতন লেখক ছিলেন। তিনি ঐতিহ্যগত নির্মাণশৈলী থেকে বের হতে চেয়েছেন। তাঁর ছোটগল্পের কাহিনিতে বহির্জীবন ও অন্তর্লোক এক রেখায় এসে মিলিত হয়। ফলে অন্তর্বয়ান ও বহির্বয়ান একই সঙ্গে ঘটে। গল্পে ‘অথবা/হয়তো/কিংবা/বা’ ইত্যাদি শব্দের পৌনঃপুনিক ব্যবহারের ভেতর দিয়ে কতগুলো সম্ভাব্য বাস্তবতার কথা উল্লেখ করে সেগুলো বাতিল করার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে। এর ব্যাখ্যা তিনি নিজে দিয়েছেন এই বলে, ‘এইসব অপশন দেয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে, ব্যাপারটা একটু ঘোলাটে রাখা। জিনিসটাকে যদি আপনি ছবি মনে করেন, তাহলে বলব, ছবির আউটলাইনটাকে একদম ক্লিয়ার না করা, ফটোগ্রাফিক না করা, একটু ফাজি রাখা। অর্থাৎ ছবিটাকে আমি একটু ঝাপসা রাখতে চাই।’ [সাক্ষাৎকার, আহমাদ মোস্তফা কামাল গৃহীত]।
শহীদুল জহির বেশির ভাগ সময় ঘটে যাওয়া গল্প লেখেন। সেই গল্পটা আবার তিনি নির্মাণ করেন সমষ্টির বয়ানে। অর্থাৎ মহল্লা বা ডাউনটাউনের লোকজন সেই গল্পের কথক। তিনি গল্পে কথা বলার ধরন মিশিয়ে যে আখ্যান তৈরি করেন, সেখানে বাংলা ছোটগল্পের ঐতিহ্যগত নির্মাণশৈলী থাকে না। তাঁকে আমরা উত্তরকাঠামোবাদী লেখক হিসেবে ভাবতে পারি। জ্যাক দেরিদা Freeplay of Structure-এর যে ধারণা দিয়েছেন, তা এখানে শহীদুল জহিরের গল্পে লক্ষ করা যায়। দেরিদার কথা থেকে বলা যেতে পারে, শহীদুল জহিরের গল্পে ‘The Center is at the center of the totality, and yet, since the center does not belong to the totality (is not part of the totality), the totality has its center elsewhere. The center is not the center.’
প্রচলিত কাঠামো ভাঙার ক্ষেত্রে শহীদুল জহির তাঁর গল্পে চিত্রকলার কিউবিক এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিমূর্তকরণের ফর্ম ব্যবহার করেছেন। গল্পটা যৌক্তিকতা ভেঙে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে। পাঠককে নিজের মতো করে সেই বিচ্ছিন্ন কোলাজকে মিলিয়ে নিতে হয়। ফলে যেমন দুর্বোধ্যতার সৃষ্টি হয়, তেমনি পাঠকভেদে তৈরি হয় ভিন্ন ভিন্ন পাঠ। শহীদুল জহির এই ফর্মের কথা উল্লেখ করে বলছেন, ‘মার্কেসের লেখা পড়ে আমার মনে হয়েছে, এখানে চিত্রকল্পের ফর্ম আছে। পিকাসোর গুয়েরনিকা যে ফর্মে আঁকা, এটা হচ্ছে কিউবিক ফর্ম। একটা জিনিস ভেঙে ভেঙে ছড়িয়ে দেওয়া আছে। তো, সেই ছবিতে ঘোড়ার মাথা এক দিকে, পা এক দিকে; বিষয়টা হচ্ছে, ঘোড়াটা বোমার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে।...আমারও মনে হয়েছে, লেখাগুলো যখন যেভাবে খুশি লেখা।’ [সাক্ষাৎকার, আর কে রনি গৃহীত]।
শহীদুল জহিরের গল্পের ভাষা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে কথা আছে। প্রমিত ভাষা ব্যবহারের মধ্যে তিনি ডায়ালগে কথ্য বা আঞ্চলিক ভাষারীতি ব্যবহার করেছেন; যেমন—ক্রিয়াপদের ব্যবহারের ক্ষেত্রে লক্ষ করা যায়, যায়া (গিয়ে/যেয়ে), হয়া (হয়ে), হারায়া (হারিয়ে), শিখায়া (শিখিয়ে), দিয়া (দিয়ে) প্রভৃতি। এ ক্ষেত্রেও তিনি হয়তো ভাষার ‘কেন্দ্রগত’ ধারণাটা ভেঙে দিতে চেয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘আসলে আমি ভাষাশিল্পী না।...আমি ভাষা সৌন্দর্যের প্রাসাদ তৈরি করতে চাই না।...আমি যাদের কথা বলি, যেভাবে বলি, তাতে এই ভাষায় (কথ্য ভাষা) প্রাণ থাকে।’ [সাক্ষাৎকার, আহমাদ মোস্তফা কামাল গৃহীত]। এই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে অনেকে সাব-অল্টার্ন অ্যাপ্রোচ খুঁজে পেতে পারেন। আবার বলা যেতে পারে, তিনি ভাষার সাম্রাজ্যবাদিতার বিপক্ষে দাঁড়াতে চেয়েছেন।
ফলে আমরা দেখি, শহীদুল জহির সাহিত্যে বাস্তবের মতো হুবহু চরিত্র নির্মিতি ও ব্যবহৃত ভাষা প্রয়োগে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি ভাষার দিক থেকে সাহিত্যকে আলাদা একটি নির্মাণ হিসেবে দেখতে চাননি।
শহীদুল জহিরের গল্পে জাদুবাস্তবতা বা কুহকী বাস্তবতা নিয়ে কমবেশি আলোচনা হয়েছে। শহীদুল জহির নিজেও বলেছেন, তিনি জাদুবাস্তবতার বিষয়টি মার্কেস থেকে গ্রহণ করেছেন। কিন্তু শহীদুল জহিরকে পড়ার পর পাঠকের মনে স্বভাবতই প্রশ্ন চলে আসে, শহীদুল জহিরের জাদুবাস্তবতা কি মার্কেসীয় বা লাতিন সাহিত্যের জাদুবাস্তবতা? এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর আমি দিতে চাই না।
আমরা তাঁর কোনো একটা গল্প ধরে সিদ্ধান্তে পৌঁছার চেষ্টা করতে পারি। ‘কাঠুরে ও দাঁড়কাক’ গল্পটি শুরু হয় এভাবে : ‘ঢাকা শহরের প্রবীণ অধিবাসীরা স্মরণ করতে পারে যে বহুদিন পূর্বে ঢাকা শহর একবার কাকশূন্য হয়ে পড়ে।’ তুলনাটা এখান থেকেও করা যাবে। লক্ষ করার বিষয়, গল্পটি আরেকটু এগোলেই দেখা যাবে, গল্পের কথক কাঠুরে আকালু ও তার স্ত্রী টেপিকে নিয়ে যে গল্পটি ফাঁদেন, সেটি যতটা না জাদুবাস্তব গল্প, তার চেয়ে বেশি জনশ্রুতি হয়ে ওঠে বা মিথিক ফ্যান্টাসিও বলতে পারি। কারণ বাস্তবতা-জ্ঞান থেকে এই গল্পের কোনো অর্থ উদ্ধার করা যায় না। মার্কেসীয় জাদুবাস্তবতা হলে হয়তো সূচনাটা হতো এভাবে : ‘ঢাকা শহরের প্রবীণ অধিবাসীদের মনে আছে, আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পূর্বে ঢাকা শহর একবার কাকশূন্য হয়ে পড়ে।’ অর্থাৎ আরো নির্দিষ্ট করে বলা। তাতে ঘটনাটি যে ঘটেছে, সে বিষয়ে পাঠকের মনে আর কোনো প্রশ্ন থাকে না। জাদুবাস্তবতার কৌশল নিয়ে মার্কেস নিজে বলছেন : ‘যখন আপনি বলবেন, হাতি আকাশে উড়ছে, মানুষ আপনাকে বিশ্বাস করবে না। কিন্তু আপনি যদি বলেন, ৪২৫টা হাতি আকাশে উড়ছে, লোকজন আপনাকে বিশ্বাস করলেও করতে পারে।’ [সাক্ষাৎকার : প্যারিস রিভিউ]। অর্থাৎ মার্কেস যেটা বোঝাতে চাচ্ছেন, অবাস্তব ঘটনাকে বিশ্বাসযোগ্য বা বাস্তব করে তুলতে হলে পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনার ভেতর চলে যেতে হবে। পাঠক তখন ধরে নেবেন, বিষয়টি সত্যিই ঘটছে বা ঘটেছে। উদাহরণ হিসেবে মার্কেসের ‘আ ভেরি ওল্ড ম্যান উইথ ইনরমাস উইংস’ গল্পটির কথা স্মরণ করতে পারি। মার্কেসীয় এই ডিটেল ও নির্দিষ্টকরণের অভাব আছে শহীদুল জহিরে। মার্কেস যেভাবে জাদু-উপকরণের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দেন, শহীদুল জহির তা করেন না। সব সময় যে করেন না তা-ও নয়, তবে বেশির ভাগ সময় তিনি পরিস্থিতির বর্ণনা করেই ছেড়ে দেন। তিনি নিজেই ‘অথবা/হয়তো/কিংবা/বা’ ইত্যাদি শব্দের পৌনঃপুনিক ব্যবহার করে পাঠককে আরো অনিশ্চিত বাস্তবতার দিকে ঠেলে দিয়েছেন।
এই তুলনার ক্ষেত্রে আরো দেখা যাবে, মার্কেসীয় জাদুবাস্তবতার বিষয়টি ভীষণভাবে সমাজমুখী। ব্যক্তির অভিজ্ঞতা সমাজের ভেতর সঞ্চারিত হয়। অন্যদিকে শহীদুল জহিরের অলীক ঘটনা সমষ্টির অভিজ্ঞতা থেকে ব্যক্তির দিকে সঞ্চারিত হয়। তাঁর গল্পের দুর্বোধ্যতা বা সিদ্ধান্তহীনতা অনেক সময় মানুষের চেতনার জগতে প্রবেশ করে তাকে জাগিয়ে তুলতে ব্যর্থ হয়। অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত গল্পটি হয়ে ওঠে মিথিক্যাল বা লোকজ গল্প। কোথাও কোথাও রূপকথার প্রবণতা আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যেটি ‘ডুমুরখেকো মানুষ’ গল্পে আরো পরিষ্কার হয়ে ওঠে। তাই বলা চলে, মার্কেস যে মুহূর্তে রূপকথার ভেতর থেকে বের হয়ে আসেন, শহীদুল জহির সেই মুহূর্তে রূপকথা বা ফ্যান্টাসির ভেতর প্রবেশ করেন। এখানে রূপকথা ও জাদুবাস্তবতার পার্থক্য হিসেবে এটুকু বলা প্রয়োজন : জাদুবাস্তবতায় বাস্তবতার সঙ্গে জাদু-উপকরণ মিলেমিশে যায়। কিন্তু রূপকথায় যা ঘটে, সবকিছু জাদুময়। গল্পের কাঠামো, সেটিং, টোন, বিষয়বস্তু—সবকিছু মিলে একটা অবাস্তব ক্ষেত্র তৈরি করে। অর্থাৎ বলা যেতে পারে, জাদুবাস্তবতা হলো fantastic elements with realistic details। ঠিক এর বিপরীত স্বভাবকে বলা যেতে পারে রূপকথা realistic elements with fantasti details. যে কারণে ‘অ্যারাবিয়ান নাইটস’, ‘লর্ড অব দ্য রিংস’ বা ‘নারনিয়া’ ফ্যান্টাসি হিসেবে চিহ্নিত। এটা যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে আসে না। কিন্তু জাদুবাস্তবতার মধ্যে যে অলীক বাস্তবতা, সেটা মানুষ বিশ্বাস করে। তাই শহীদুল জহিরের সাহিত্যকে মার্কেসীয় জাদুবাস্তববাদ হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ থাকে না।
অনেক সমালোচক শহীদুল জহিরের গল্পকে সুরিয়ালিজম বা পরাবাস্তব গল্প হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। শহীদুল জহিরের গল্পগুলোকে সম্পূর্ণ পরাবাস্তব গল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। সুরিয়ালিজমে চেতন ও অবচেতনের একটা বন্ধন গড়ে ওঠে। অন্য কথায়, স্বপ্নের সঙ্গে জাগতিক বিষয় যুক্ত হয়ে স্বপ্নবাস্তবতার সৃষ্টি করে। বিষয়টা ভীষণভাবে ব্যক্তিগত। শহীদুল জহিরের গল্পগুলো অবচেতন থেকে আসেনি। শহীদুল জহির নিজেও বলছেন যে তিনি বেশ সময় নিয়ে গল্প লেখেন। অনেক সময় কাঠামোটা পূর্বপরিকল্পিত থাকে। অর্থাৎ তিনি লেখার সময় সচেতন থাকেন। এই সচেতনতা থেকে তিনি ‘চতুর্থমাত্রা’র মতো গল্প লিখেছেন ক্রিয়াপদের সম্পূর্ণ ভবিষ্যৎ কাল প্রয়োগ করে। আবার ‘ধুলোর দিনে ফেরা’র মতো গল্পহীন গল্প লিখেছেন। পরাবাস্তব গল্প এভাবে ভেবেচিন্তে আসে না। এটা একটা কবিতার মতো মুহূর্ত থেকে আসে। আবার লক্ষ করা যায়, শহীদুল জহিরের গল্পে নির্মিতির দিক থেকে স্বপ্নের বড় কোনো ভূমিকা নেই। [‘চতুর্থমাত্রা’ এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম] এবং কাঠামোগতভাবে শহীদুল জহিরের গল্পগুলো ব্যক্তিগত তো নয়ই, কখনো কখনো পুরো মহল্লার। সুতরাং এসব বিবেচনায় তাঁর গল্প পরাবাস্তব নয়। তবে পরাবাস্তব গল্পের অনেক বৈশিষ্ট্য তাঁর গল্পে আছে। যেমন স্বপ্নে ঘটে যাওয়া ঘটনার মতো তাঁর অনেক গল্পে ঘটনার ভেতর কোনো যৌক্তিক সংযোগ থাকে না। পরাবাস্তব গল্পের মতোই শহীদুল জহিরের অনেক গল্পে আখ্যান বা অবয়ব বলে কিছু নেই।
ভালো করে পাঠ করলে মনে হবে, শহীদুল জহিরের গল্পে জাদুবাস্তবতা, পরাবাস্তবতা ও রূপকথার বিষয় আছে। কিন্তু এমনভাবে আছে, যা আগের কোনো লেখকের মধ্যে দেখা যায়নি। তিনি এ ক্ষেত্রে নিজস্ব ভাষা ও বর্ণনারীতি তৈরি করে নিয়েছেন।

শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার
জন্ম : ১ সেপ্টেম্বর ১৯৩৫
মৃত্যু : ২৯ জুন ২০২৬
আমি তখন সেকেন্ড ইয়ারে। আর্ট কলেজে কিছুটা গোঁড়ামি ছিল সে সময়। মনোয়ার স্যার (মুস্তাফা মনোয়ার) জয়েন করে সেটা ভেঙে দিয়েছেন। এর জন্য কিছু সমস্যাও হয়েছিল। তখন তিনি ভেরি ইয়াং, সম্ভবত ২৫ বছরের তরুণ। তাঁর আইডিয়া স্বতন্ত্র। একজন টিচার জলরঙের একটা ছবি আঁকতে সাত দিন লাগিয়ে দিতেন। মনোয়ার স্যার বলতেন, আরে সাত দিন একটা ছবিতে পানি লাগলে কাগজই ময়লা হয়ে যাবে। জলরঙের ছবি হলো কবিতা। তেলরঙের ছবি গদ্য। অয়েল পেইন্টিংয়ে যত কাজ করে, তত কোয়ালিটি বাড়ে। জলরং হচ্ছে কবিতা, এটা নাড়াচাড়া করা যাবে না। এটার কতগুলো ধর্ম আছে, ট্রান্সপারেন্সি, অল ফোকাস। কিন্তু স্বল্প সময়ের সৃষ্টিই অনেক কথা বলে। তাঁর ছবি আঁকার ফিলোসফি, আইডিয়া ছিল আলাদা।
তিনি ছিলেন অসাধারণ মানুষ। সব সময় মুখে হাসি লেগেই থাকত। যেখানে ডাকতেন, যেতেন। স্পেনে আমার বাসায় গিয়েছিলেন। আমি বলেছিলাম—স্যার, আপনার জ্ঞানের প্রশংসা সবাই করে। বললেন—কেন এই কথা বললে? বললাম—স্যার, আপনি শিল্পের কোন বিষয় জানেন না? বললেন—তুমি ঠিকই বলেছ, আমি একটা বিষয় নিয়ে থাকতে বোর হয়ে যাই। একটা টেকনিকে পড়ে থাকতে বিরক্ত লাগে। তিনি এতগুলো টেকনিক জানার পর আমাদের দেখিয়ে গেছেন, দিয়ে গেছেন। তিনি যদি নিজের কাজ, নিজের জীবন নিয়ে পড়ে থাকতেন, আমরা পেতাম না। তাঁর গড়া পাপেটের ফিগার অত্যন্ত অ্যাট্রাক্টিভ, পারফেক্ট গ্রামের লোকের চরিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। সেখানে নাটকীয়তা ছিল অসাধারণ। তাঁর জলরঙের কাজ অসাধারণ। টেলিভিশনের শুরুতে বাংলা নাটকে অসাধারণ কাজ করেছেন। তাঁর পরিবার খুবই সংস্কৃতিমনা। বাবা গোলাম মোস্তফা খ্যাতিমান কবি। সেখান থেকেও তিনি পেয়েছেন। আর্ট কলেজে শিক্ষকতা করার সময় পলিটিক্যাল ঝামেলায় পড়লেন। তিনি ছিলেন অতি আধুনিক। সেটা অনেকে ভালোভাবে নেয়নি। তিনি কখনো
এক বিষয়ে স্থির থাকেননি। একজন একটা বিষয় নিয়ে পড়ে থাকবে, এটা আমারও ভালো লাগে না।
আগে কার্টুন আঁকত মানুষ খবরের কাগজে। মুস্তাফা মনোয়ার লিভিং কার্টুন করলেন। সেটা লন্ডনে হয়েছে, আমেরিকায় হয়েছে কার্টুন হিসেবে। পলিটিক্যাল ফিগার, ফিল্ম স্টার—মানুষকে হাসানোর জন্য। মনোয়ার স্যার ড্রয়িংয়ে খুব ভালো ছিলেন। তাঁর মতো কার্টুন ড্রয়িং আর কাউকে করতে দেখিনি বাংলাদেশে। উপস্থিত বুদ্ধি ছিল চমৎকার। দু-তিনটি শাড়ি দিয়ে স্টেজ করে দিতেন। সেটা অল্প সময়ের মধ্যেই। তখন তো ডিজিটাল যুগ ছিল না। চিত্রশিল্প, কার্টুনের বাইরে তিনি দক্ষ ছিলেন গান, নাটকে। আমাদের ব্যাচের চার-পাঁচজন শিল্পীকে টেলিভিশনে নিয়ে গেছেন। তিনি টেলিভিশনের আধুনিকায়ন করেছিলেন। এই যে টেলিভিশনের রূপ চেঞ্জ করা, মডার্ন করা, এথিক-এসথেটিকস বাড়ানো—তিনি দক্ষতার সঙ্গে করেছিলেন।
তাঁর বাসায় শেষ গিয়েছিলাম কয়েক মাস আগে। তখন তিনি বিছানায়। আমাকে দেখে খুবই খুশি হলেন।
ছবি আঁকা, শিল্পের নানা বিষয় ছিল তাঁর আরাধনা। তিনি আমাদের যা দিয়ে গেছেন, তা অনেক। যেখানে হাত দিয়েছেন, সেখানেই সোনা ফলিয়েছেন।
আমাকে একবার বলেছিলেন—কোনো কাজ অভ্যাসে পরিণত হলে ধীরে ধীরে শেওলা ধরতে থাকে। সে চেঞ্জ হয় না। একই বিষয়ের ওপর ঘুরপাক খেতে থাকে। ছবি আঁকার ক্ষেত্রে তুমি যা আঁকো, তার বাইরে কী করতে পারো, সেটাই চেষ্টা করতে হবে। ছবি আঁকা ফ্যাক্টরি প্রোডাক্ট নয়। প্যারিসে শুনেছি প্রোস্টিটিউজম আর্ট আছে, করাপ্টেড আর্ট আছে, ফ্যাক্টরি প্রোডাক্ট আছে; যেমন—ছবি আঁকে আর বিক্রি করে। থট নেই, এটা একটা অভ্যাস। মনোয়ার স্যার বলতেন, ক্রিয়েটিভ আর্ট হলো তুমি যা করো, তার বাইরে গিয়ে করতে হবে। যদি মিরাকেলি নতুন কিছু ঘটে যায়, সেটাই আনন্দ। ক্রিয়েটিভ প্রসেসে এটাই আমার ভেতর আছে এখনো। এসব আমাদের শিখিয়েছেন। আমি তাঁর বাসায় গিয়ে ছবি আঁকতাম। খাওয়াদাওয়া করতাম। আর্টিস্টের বাইরে তিনি বিরাট মানুষ ছিলেন। তাঁর ভাবনাগুলো আমরা বহন করব অনেক অনেক বছর। ছবির এথিক-এসথেটিকস কিভাবে গ্রো করে সেটার অনেক কিছু দিয়ে গেছেন তিনি। এটার অভাব এদেশে। আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে বলছি, আমার শেষ শিক্ষককে হারালাম। আমার বয়সও ৮৫ প্রায়।
তিনি আমাদের মাঝে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তাঁর জায়গা কেউ পূরণ করতে পারবে না।
তাঁর কোনো অহংকার ছিল না। মাটির মানুষ ছিলেন। সহজভাবে শিল্পচর্চা কিভাবে করা যায়, সে বিষয়ে নজর রাখতেন। অনেক প্রোগ্রাম করেছেন শিশুদের নিয়ে। শিশুদের মনন গঠনে প্রোগ্রামগুলো অনন্য ছিল। যারা সংস্কৃতির চর্চা করে, তারা সব দিকেই মনোয়ার স্যারকে পাবে।
তিনি একটা ব্রাশ দিয়ে ছবি আঁকতেন। সেই ব্রাশ তখন তেমন পাওয়া যেত না। ফ্ল্যাট ব্রাশ। আমার সব সময় ওই ব্রাশটার দিকে নজর থাকত। ভাবতাম ব্রাশটা যদি আমার হতো। আমি তো ছাত্রজীবনে কাজ করতাম। একদিন বাইরে কাজ করতে করতে স্যার বললেন—নাও, এই ব্রাশটা নিয়ে নাও। আমি যেন স্বর্গ হাতে পেলাম। সেই ব্রাশ দিয়ে হাজার হাজার ছবি এঁকেছি।
এর ৪০ বছর পর স্পেনের মাদ্রিদে আমার বাসায় স্যার ছিলেন সাত দিন। তাঁকে নিয়ে গিয়েছিলাম আল হামরাসহ অনেক জায়গায়। আমার বাংলোয় ছবি আঁকছি। স্যার বললেন— দেখি, আমি টেস্ট করি। ব্রাশ নিতে গিয়ে এটা-ওটা দেখে একটা ব্রাশের দিকে নজর দিয়ে বললেন—আরে, এইটা তো আমার ব্রাশ। তুমি এখনো রেখেছ ব্রাশটা! বললাম—হ্যাঁ স্যার, এটা আমার একটা ইম্প্রেশন। ইউ আর মাই টিচার। আপনার কাছ থেকে যা পেয়েছি, তা হারাইনি। শুধু ছবি আঁকার ক্ষেত্রেই নয়, সেন্স অব আর্ট, ভিজ্যুয়াল সেন্স—অনেক কিছুই তিনি শিখিয়েছেন। ছবি মানে শুধু কাগজে, ক্যানভাসে আঁকা নয়; এর ভেতর অনেক মেকানিজম আছে। তিনি সেগুলো জানতেন। তিনি বিরাট মানের মানুষ এবং বিরাট মাপের শিল্পী। আমার সেকেন্ড ইয়ারে টিচার হয়ে আসেন কলকাতা থেকে। তাঁর টিচিংয়ের পদ্ধতি সম্পূর্ণ আলাদা। আউটলুক ভিন্ন। তিনি ছিলেন ফিউচারিস্ট। শিল্পের নানা বিষয় ধারণ করা এক সুখী মানুষ।
অনুলিখন : মোহাম্মদ আসাদ

বাবা খ্যাতিমান কবি গোলাম মোস্তফা। সেই সুবাদে শৈশব থেকেই শিল্প-সাহিত্যের সঙ্গে বসবাস মুস্তাফা মনোয়ারের। ১৯৫৯ সালে কলকাতা চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে স্নাতক হন। শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন সরকারি চারুকলা ইনস্টিটিউটে (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ)। বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রতিষ্ঠালগ্নে যোগ দেন সেখানে। ছিলেন শিল্পকলা একাডেমি ও জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক। দেশের পাপেটকে নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করেন। শিল্পকলায় অবদানের জন্য একুশে পদক লাভ করেন ২০০৪ সালে।