আষাঢ়ী-ফুলের মুখে রোদের জিকির
তীব্র ঢেউ প্রকৃতির খোঁপায় নজর
ভরা-মৌসুমে আকাশে বিচ্ছেদের জ্বর
পর্দা খুলে মনোচোখে মেঘের শহর
ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে সামনে গেলেই
ক্ষত বুক রোদ্রভেজা সুখের আলোয়।

আষাঢ়ী-ফুলের মুখে রোদের জিকির
তীব্র ঢেউ প্রকৃতির খোঁপায় নজর
ভরা-মৌসুমে আকাশে বিচ্ছেদের জ্বর
পর্দা খুলে মনোচোখে মেঘের শহর
ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে সামনে গেলেই
ক্ষত বুক রোদ্রভেজা সুখের আলোয়।

মানুষ গোলাপ গ্রামে যাবে
চা-বাগানে যাবে
যাবে শাপলা বিলে
লালপদ্ম ঝিলে
শিমুল বাগানে
লালা খালে
সাদা পাথরের জলে
রাতারগুলে
জলে-স্থলে
পাহাড়ে পাহাড়ে—
কোথাও যাব না আর
আলুক্ষেতে বসে বসে বিকাল দেখিব
সূর্য নামিবে ধীরে
কাঁধে তুমি রাখিবে তোমার কাঁধ
মরমিয়া খোঁপা যেন ভেঙে ভেঙে পড়ে—
পৃথিবীতে ঘুরেফিরে আসে যেন এই শীতকাল
তুমি আমি দোঁহে মিলে
দেখিব আনাজ ফুলে নামিছে বিকাল।

অন্ধি-সন্ধি ফন্দি-ফিকির বৃথা যখন সবি
ঠিক করেছি অবশেষে নাম লেখাবো আমি
কেল্লাফতেহ বাক্যবাগীশ চাটুকারের দলে,
বলবে তারা ‘এতদিন কোথায় ছিলে কবি?’
ধান্দাবাজির এই জমানায় আজো তুমি ভাবো
আসনখানি তোমার জন্য শূন্য পড়ে রবে?
তা হলে আর দেরি কেন? চরণতলে বসে তার
বলতে শুরু করো : ঈষৎ বাঁকা নাসা তোমার
বাঁশির মতো লাগে,
নৃত্যপাগল চড়ুই পাখি চক্ষু এমন
দেখিনি তো আগে।
ভুবনমোহন ওই হাসিতে মুক্তো যেন ঝরে
দেখে আমার ইচ্ছে করে
মুক্তো ও তার মালকিনকে জড়িয়ে ধরে
খাই লুটোপুটি,
স্বর্গ হতে নেমে আসা, অমিয়ধারা
দু’হাত ভরে লুটি।
জন্মাবধি বুকের ভেতর পুষে রাখা ভালবাসার কথা
সাহস করে দেবীর কাছে যেই বলেছি আমি
অমনি তিনি রেগেমেগে যষ্টিহাতে ওঠেন গর্জে : ‘গেলি?’
আর আমি তখন বালাই ষাট, থুক্কু, বলে
দে ছুট দে ছুট, পার হয়ে যাই বেলাবেলি
তেপান্তরের মাঠ
‘যাব ফের? কানমনি ভাই,’
প্রেম করিতে আর যদি যাই...।

শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার
জন্ম : ১ সেপ্টেম্বর ১৯৩৫
মৃত্যু : ২৯ জুন ২০২৬
আমি তখন সেকেন্ড ইয়ারে। আর্ট কলেজে কিছুটা গোঁড়ামি ছিল সে সময়। মনোয়ার স্যার (মুস্তাফা মনোয়ার) জয়েন করে সেটা ভেঙে দিয়েছেন। এর জন্য কিছু সমস্যাও হয়েছিল। তখন তিনি ভেরি ইয়াং, সম্ভবত ২৫ বছরের তরুণ। তাঁর আইডিয়া স্বতন্ত্র। একজন টিচার জলরঙের একটা ছবি আঁকতে সাত দিন লাগিয়ে দিতেন। মনোয়ার স্যার বলতেন, আরে সাত দিন একটা ছবিতে পানি লাগলে কাগজই ময়লা হয়ে যাবে। জলরঙের ছবি হলো কবিতা। তেলরঙের ছবি গদ্য। অয়েল পেইন্টিংয়ে যত কাজ করে, তত কোয়ালিটি বাড়ে। জলরং হচ্ছে কবিতা, এটা নাড়াচাড়া করা যাবে না। এটার কতগুলো ধর্ম আছে, ট্রান্সপারেন্সি, অল ফোকাস। কিন্তু স্বল্প সময়ের সৃষ্টিই অনেক কথা বলে। তাঁর ছবি আঁকার ফিলোসফি, আইডিয়া ছিল আলাদা।
তিনি ছিলেন অসাধারণ মানুষ। সব সময় মুখে হাসি লেগেই থাকত। যেখানে ডাকতেন, যেতেন। স্পেনে আমার বাসায় গিয়েছিলেন। আমি বলেছিলাম—স্যার, আপনার জ্ঞানের প্রশংসা সবাই করে। বললেন—কেন এই কথা বললে? বললাম—স্যার, আপনি শিল্পের কোন বিষয় জানেন না? বললেন—তুমি ঠিকই বলেছ, আমি একটা বিষয় নিয়ে থাকতে বোর হয়ে যাই। একটা টেকনিকে পড়ে থাকতে বিরক্ত লাগে। তিনি এতগুলো টেকনিক জানার পর আমাদের দেখিয়ে গেছেন, দিয়ে গেছেন। তিনি যদি নিজের কাজ, নিজের জীবন নিয়ে পড়ে থাকতেন, আমরা পেতাম না। তাঁর গড়া পাপেটের ফিগার অত্যন্ত অ্যাট্রাক্টিভ, পারফেক্ট গ্রামের লোকের চরিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। সেখানে নাটকীয়তা ছিল অসাধারণ। তাঁর জলরঙের কাজ অসাধারণ। টেলিভিশনের শুরুতে বাংলা নাটকে অসাধারণ কাজ করেছেন। তাঁর পরিবার খুবই সংস্কৃতিমনা। বাবা গোলাম মোস্তফা খ্যাতিমান কবি। সেখান থেকেও তিনি পেয়েছেন। আর্ট কলেজে শিক্ষকতা করার সময় পলিটিক্যাল ঝামেলায় পড়লেন। তিনি ছিলেন অতি আধুনিক। সেটা অনেকে ভালোভাবে নেয়নি। তিনি কখনো
এক বিষয়ে স্থির থাকেননি। একজন একটা বিষয় নিয়ে পড়ে থাকবে, এটা আমারও ভালো লাগে না।
আগে কার্টুন আঁকত মানুষ খবরের কাগজে। মুস্তাফা মনোয়ার লিভিং কার্টুন করলেন। সেটা লন্ডনে হয়েছে, আমেরিকায় হয়েছে কার্টুন হিসেবে। পলিটিক্যাল ফিগার, ফিল্ম স্টার—মানুষকে হাসানোর জন্য। মনোয়ার স্যার ড্রয়িংয়ে খুব ভালো ছিলেন। তাঁর মতো কার্টুন ড্রয়িং আর কাউকে করতে দেখিনি বাংলাদেশে। উপস্থিত বুদ্ধি ছিল চমৎকার। দু-তিনটি শাড়ি দিয়ে স্টেজ করে দিতেন। সেটা অল্প সময়ের মধ্যেই। তখন তো ডিজিটাল যুগ ছিল না। চিত্রশিল্প, কার্টুনের বাইরে তিনি দক্ষ ছিলেন গান, নাটকে। আমাদের ব্যাচের চার-পাঁচজন শিল্পীকে টেলিভিশনে নিয়ে গেছেন। তিনি টেলিভিশনের আধুনিকায়ন করেছিলেন। এই যে টেলিভিশনের রূপ চেঞ্জ করা, মডার্ন করা, এথিক-এসথেটিকস বাড়ানো—তিনি দক্ষতার সঙ্গে করেছিলেন।
তাঁর বাসায় শেষ গিয়েছিলাম কয়েক মাস আগে। তখন তিনি বিছানায়। আমাকে দেখে খুবই খুশি হলেন।
ছবি আঁকা, শিল্পের নানা বিষয় ছিল তাঁর আরাধনা। তিনি আমাদের যা দিয়ে গেছেন, তা অনেক। যেখানে হাত দিয়েছেন, সেখানেই সোনা ফলিয়েছেন।
আমাকে একবার বলেছিলেন—কোনো কাজ অভ্যাসে পরিণত হলে ধীরে ধীরে শেওলা ধরতে থাকে। সে চেঞ্জ হয় না। একই বিষয়ের ওপর ঘুরপাক খেতে থাকে। ছবি আঁকার ক্ষেত্রে তুমি যা আঁকো, তার বাইরে কী করতে পারো, সেটাই চেষ্টা করতে হবে। ছবি আঁকা ফ্যাক্টরি প্রোডাক্ট নয়। প্যারিসে শুনেছি প্রোস্টিটিউজম আর্ট আছে, করাপ্টেড আর্ট আছে, ফ্যাক্টরি প্রোডাক্ট আছে; যেমন—ছবি আঁকে আর বিক্রি করে। থট নেই, এটা একটা অভ্যাস। মনোয়ার স্যার বলতেন, ক্রিয়েটিভ আর্ট হলো তুমি যা করো, তার বাইরে গিয়ে করতে হবে। যদি মিরাকেলি নতুন কিছু ঘটে যায়, সেটাই আনন্দ। ক্রিয়েটিভ প্রসেসে এটাই আমার ভেতর আছে এখনো। এসব আমাদের শিখিয়েছেন। আমি তাঁর বাসায় গিয়ে ছবি আঁকতাম। খাওয়াদাওয়া করতাম। আর্টিস্টের বাইরে তিনি বিরাট মানুষ ছিলেন। তাঁর ভাবনাগুলো আমরা বহন করব অনেক অনেক বছর। ছবির এথিক-এসথেটিকস কিভাবে গ্রো করে সেটার অনেক কিছু দিয়ে গেছেন তিনি। এটার অভাব এদেশে। আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে বলছি, আমার শেষ শিক্ষককে হারালাম। আমার বয়সও ৮৫ প্রায়।
তিনি আমাদের মাঝে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তাঁর জায়গা কেউ পূরণ করতে পারবে না।
তাঁর কোনো অহংকার ছিল না। মাটির মানুষ ছিলেন। সহজভাবে শিল্পচর্চা কিভাবে করা যায়, সে বিষয়ে নজর রাখতেন। অনেক প্রোগ্রাম করেছেন শিশুদের নিয়ে। শিশুদের মনন গঠনে প্রোগ্রামগুলো অনন্য ছিল। যারা সংস্কৃতির চর্চা করে, তারা সব দিকেই মনোয়ার স্যারকে পাবে।
তিনি একটা ব্রাশ দিয়ে ছবি আঁকতেন। সেই ব্রাশ তখন তেমন পাওয়া যেত না। ফ্ল্যাট ব্রাশ। আমার সব সময় ওই ব্রাশটার দিকে নজর থাকত। ভাবতাম ব্রাশটা যদি আমার হতো। আমি তো ছাত্রজীবনে কাজ করতাম। একদিন বাইরে কাজ করতে করতে স্যার বললেন—নাও, এই ব্রাশটা নিয়ে নাও। আমি যেন স্বর্গ হাতে পেলাম। সেই ব্রাশ দিয়ে হাজার হাজার ছবি এঁকেছি।
এর ৪০ বছর পর স্পেনের মাদ্রিদে আমার বাসায় স্যার ছিলেন সাত দিন। তাঁকে নিয়ে গিয়েছিলাম আল হামরাসহ অনেক জায়গায়। আমার বাংলোয় ছবি আঁকছি। স্যার বললেন— দেখি, আমি টেস্ট করি। ব্রাশ নিতে গিয়ে এটা-ওটা দেখে একটা ব্রাশের দিকে নজর দিয়ে বললেন—আরে, এইটা তো আমার ব্রাশ। তুমি এখনো রেখেছ ব্রাশটা! বললাম—হ্যাঁ স্যার, এটা আমার একটা ইম্প্রেশন। ইউ আর মাই টিচার। আপনার কাছ থেকে যা পেয়েছি, তা হারাইনি। শুধু ছবি আঁকার ক্ষেত্রেই নয়, সেন্স অব আর্ট, ভিজ্যুয়াল সেন্স—অনেক কিছুই তিনি শিখিয়েছেন। ছবি মানে শুধু কাগজে, ক্যানভাসে আঁকা নয়; এর ভেতর অনেক মেকানিজম আছে। তিনি সেগুলো জানতেন। তিনি বিরাট মানের মানুষ এবং বিরাট মাপের শিল্পী। আমার সেকেন্ড ইয়ারে টিচার হয়ে আসেন কলকাতা থেকে। তাঁর টিচিংয়ের পদ্ধতি সম্পূর্ণ আলাদা। আউটলুক ভিন্ন। তিনি ছিলেন ফিউচারিস্ট। শিল্পের নানা বিষয় ধারণ করা এক সুখী মানুষ।
অনুলিখন : মোহাম্মদ আসাদ

বাবা খ্যাতিমান কবি গোলাম মোস্তফা। সেই সুবাদে শৈশব থেকেই শিল্প-সাহিত্যের সঙ্গে বসবাস মুস্তাফা মনোয়ারের। ১৯৫৯ সালে কলকাতা চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে স্নাতক হন। শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন সরকারি চারুকলা ইনস্টিটিউটে (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ)। বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রতিষ্ঠালগ্নে যোগ দেন সেখানে। ছিলেন শিল্পকলা একাডেমি ও জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক। দেশের পাপেটকে নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করেন। শিল্পকলায় অবদানের জন্য একুশে পদক লাভ করেন ২০০৪ সালে।