হবিগঞ্জের আদমপুর জঙ্গলে এশিয়াটিক ব্ল্যাক বিয়ার বা আমাদের উপমহাদেশীয় কালো ভালুকের কথা শুনে আসছিলাম অনেক দিন ধরেই। বন বিভাগের লোকজন ছাড়াও অনেকেই দেখেছে। কিন্তু বিশাল এই অরণ্যে সহসা এদের দেখা পাওয়া দুষ্কর। মূলত এই অঞ্চলে প্রচুর মৌচাক রয়েছে, যেটা ভালুকের সবচেয়ে প্রিয় খাবার। আমরাও অনেক মৌচাক দেখলাম। বন বিভাগের ডাকবাংলোয় পৌঁছানোর পর জানলাম, একজন ভালুকের মুখে পড়েছে দিনকয় আগে। সেদিন আর সেই গ্রামে যেতে পারলাম না। পরের দিন সকালে উঠেই রওনা হলাম। বনের ভেতর দিয়ে অনেকটা পথ হাঁটার পর গ্রামটা পেলাম। যীশু ভাই আমাদের দলের নেতা, শিবলী ভাই তাঁর সেনাপতি। গিয়ে দাঁড়ালেন বাড়ির উঠানে। সুরুজ আলী আর তাঁর স্ত্রী আঙ্গুরী বেগম দুজনই বৃদ্ধ। বয়স হবে ষাটের মতো। জঙ্গলের ওপরই নির্ভরশীল তাঁরা। নিত্যদিন তাঁদের বনে যেতে হয়। বন আছে বলেই তাঁরাও আছেন। ছেলেও আছে তাঁদের। তবে কুলিয়ে উঠতে পারে না। তাই বৃদ্ধ বয়সেও বনে জীবিকার সন্ধান করতে হয়। সুরুজ আলী আয় করেন ঝাড়ু বানিয়ে। ঝাড়ু বানান এক ধরনের গাছ দিয়ে, যেগুলো তিনি জঙ্গল থেকে সংগ্রহ করেন। অন্যান্য দিনের মতো সেদিনও সুরুজ আলী জঙ্গলে গিয়েছেন। সঙ্গে স্ত্রী আঙ্গুরী বেগম ও দুটি ছোট মেয়ে। গ্রাম থেকে তিন কিলোমিটারের মতো পথ যেতেই গাছ কাটতে তাঁরা একটা টিলার ওপরে ওঠেন। হঠাৎ সুরুজ আলীর চোখে পড়ে দুটি কালো ছোট বাচ্চা। ঝোপের পাশে খেলছিল বাচ্চা দুটি। সুরুজ আলীর কাছে বাচ্চা দুটিকে উদের (ভোঁদড়ের) বাচ্চা বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু তাঁর ধারণা ছিল ভুল। একটু কাছে যেতেই কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটি বিরাট কালো লোমশ প্রাণী তাঁদের ওপর আক্রমণ চালায়। সেটি ছিল মা ভালুক। আঁচড়ে-কামড়ে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলে তাঁকে। এ সময় বাচ্চা মেয়ে দুটি পালিয়ে যেতে পারলেও আঙ্গুরী বেগম রয়ে যায় তাঁর স্বামীর সাহায্যার্থে। সুরুজ আলীকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন তিনি। এতে আরো বেশি আহত হন। সুরুজ আলী ও আঙ্গুরী বেগমের আর্তনাদে বনে কাজ করছিল- এমন কিছু লোক ছুটে আসে। মা প্রাণীটি তার বাচ্চা দুটিকে নিয়ে ততক্ষণে পালিয়ে গেছে। গ্রামবাসী তাঁদের হাসপাতালে নিয়ে যায়। কিন্তু টাকা-পয়সার অভাবে সামান্য চিকিৎসা নিয়েই ফিরে আসেন তাঁরা। সুরুজ আলীর আঘাত বর্তমানে কিছুটা শুকিয়ে গেলেও আঙ্গুরী বেগমের অবস্থা গুরুতর। তাঁর বুকের হাড় ভেঙে গেছে, সারা শরীরে কামড়ের দাগ। ঘাগুলো দেখলেই গা শিউরে ওঠে। সামান্য ওষুধ আর যৎসামান্য চিকিৎসা নিয়ে তাঁরা কতটুকু সুস্থ হবেন কিংবা আদৌ সুস্থ হতে পারবেন কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়। আমরা আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু টাকা-পয়সা দিয়ে পরিবারটিকে সাহায্য করলাম। এরপর গ্রামবাসীকে একত্র করে জঙ্গল ও এখানকার জীবজন্তু সম্পর্কে আমাদের ক্ষুদ্র জ্ঞান থেকে কিছু কথা বললাম। জঙ্গলে চলার পথে বন্য প্রাণী চোখে পড়লে কী করতে হবে, হঠাৎ বন্য প্রাণীর অস্তিত্ব অনুভব করলে কিভাবে সেটাকে বিরক্ত না করে নীরবে সে স্থান ত্যাগ করতে হবে, সেটা সম্পর্কে বললাম। যদিও জঙ্গলে চলার পথে এসব ব্যাপার তাদের জানা আছে, কিন্তু তার পরও অসতর্কতায় বিপদ ঘটে। এর আরেকটি কারণ বন্য প্রাণী সম্পর্কে গ্রামবাসীর অতি উৎসাহ। আর যেহেতু এই অঞ্চলে ভালুকের আনাগোনা রয়েছে এবং বিগত কয়েক বছরে বেশ কয়েকটি ভালুকের আক্রমণের ঘটনাও শোনা গেছে, তাই কিছুটা সতর্কতা অবশ্যই নেওয়া উচিত। এত বড় আক্রমণের পরও সুরুজ আলী ও আঙ্গুরী বেগমের বেঁচে ফিরে আসাটা আশ্চর্যের ব্যাপার বৈকি! বুড়ো মানুষটার চোখে-মুখে এক ধরনের মৃত্যুভয় মিশ্রিত আনন্দ ছিল। তাঁর বৃদ্ধা স্ত্রী তাঁকে পালিয়ে না গিয়ে তাঁর পাশে থেকে যুদ্ধ করেছেন। সেই বীরত্ব হয়তো বইয়ে জায়গা পাবে না, কিন্তু গ্রামের মানুষ মনে রাখবে, সহমর্মী হবে। এশিয়ান কালো ভালুক নিয়ে কিছু কথা এশিয়ান কালো ভালুক এশিয়া ও আমেরিকা মহাদেশের বিভিন্ন এলাকায় পাওয়া যায়। এই ভালুকের আকার মাঝারি ও গলায় সাদা আকারের ইংরেজি ভি-এর মতো দাগ আছে। এরা মুন বিয়ার নামেও পরিচিত। বিভিন্ন প্রকারের ভালুকের মধ্যে এশিয়া ও আমেরিকা মহাদেশের ভালুকের প্রজাতি আলাদা। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম, বিশেষ করে বান্দরবান ও কাপ্তাইসহ সিলেটের বেশকিছু বনে এদের আবাসস্থল রয়েছে।