দেশে এসথেটিক মেডিসিন শিল্প দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। ফিলার থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক লেজার থেরাপিসহ বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসার চাহিদা বাড়ছে। তবে এই শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও সৌন্দর্যচর্চা নিয়ে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির মতো চ্যালেঞ্জও
সামনে আসছে।
স্ট্যাটিস্টার মার্কেট ফোরকাস্ট অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের স্কিন ট্রিটমেন্ট বাজারের আকার প্রায় ১৬ কোটি ৬৬ লাখ ডলারে পৌঁছবে। ক্রমবর্ধমান সৌন্দর্যসচেতনতা, ত্বকের চিকিৎসার চাহিদা বৃদ্ধি এবং উন্নত ডার্মাটোলজি সেবার প্রসারের কারণে আগামী বছরগুলোতেও এই বাজারের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক মেডিক্যাল এসথেটিকস বাজারের বর্তমান আকার ১৮ থেকে ২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে। আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরে এই বাজার বার্ষিক গড়ে ১০ থেকে ১৩ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে ৩৫ থেকে ৪৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছতে পারে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, স্বাস্থ্যসেবা খাতের মধ্যে এটি অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল বিশেষায়িত সেগমেন্ট।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় এসথেটিকস বাজার যুক্তরাষ্ট্র। উচ্চ ক্রয়ক্ষমতা, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং দক্ষ চিকিৎসকের সহজলভ্যতার কারণে দেশটি এই খাতে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। ইউরোপও একটি পরিণত বাজার, যেখানে অ্যান্টি-এজিং চিকিৎসা ও স্কিন রিজুভেনেশনের চাহিদা উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল বর্তমানে সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল বাজার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। চীন, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও থাইল্যান্ডে মধ্যবিত্তের আয় বৃদ্ধি, সৌন্দর্যসচেতনতা এবং মেডিক্যাল ট্যুরিজমের প্রসারের ফলে এই অঞ্চলে বিনিয়োগ ও বাজার সম্প্রসারণ দ্রুত হচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও এই শিল্পের অন্যতম চালিকাশক্তি। ইনস্টাগ্রাম, টিকটক ও ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মে সৌন্দর্যবিষয়ক কনটেন্ট, বিফোর-আফটার ছবি, ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং এবং ডিজিটাল প্রচারণা মানুষের মধ্যে এসথেটিক চিকিৎসার গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে; বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ত্বকের যত্ন ও প্রতিরোধমূলক অ্যান্টি-এজিং চিকিৎসার প্রবণতা বাড়ছে।
একই সঙ্গে বৈশ্বিক মেডিক্যাল ট্যুরিজম শিল্পও এসথেটিকস বাজারকে নতুন গতি দিচ্ছে। তুলনামূলক কম খরচে উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রতিবছর লাখো মানুষ দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ক, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ভারতের মতো দেশে ভ্রমণ করছেন। এতে শুধু চিকিৎসা নয়, পর্যটন, হোটেল, পরিবহন ও সংশ্লিষ্ট সেবা খাতও লাভবান হচ্ছে।
ঢাকার বাসিন্দা চল্লিশোর্ধ্ব এক নারী পারভীন খান বিশ্বাস করেন, জীবনে কোনো আক্ষেপ নিয়ে বেঁচে থাকা উচিত নয়। সৌন্দর্যচর্চার প্রতি আগ্রহী এই নারী গত দুই বছরে আন্ডার-আই ফিলার, লিপ ফিলার এবং ডবল চিন রিমুভালের মতো একাধিক কসমেটিক প্রক্রিয়া করিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘চেহারা নিয়ে সবারই কিছু না কিছু অনিরাপত্তা থাকে। কেউ সেটাকে মেনে নেয়, কেউ আবার পরিবর্তনের চেষ্টা করে। আমি দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছি এবং এতে আমার কোনো অনুশোচনা নেই।’
একসময় বাংলাদেশে এসথেটিক মেডিসিন ও কসমেটিক ডার্মাটোলজি মূলত লেজার চিকিৎসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ২০০৪ সালে ডা. ঝুমু খান লেজার মেডিক্যাল সেন্টার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশে লেজারভিত্তিক চিকিৎসার পথিকৃৎ হিসেবে যাত্রা শুরু করেন। শুরুতে দাগ, তিল অপসারণ এবং লেজার হেয়ার রিমুভালের মতো মৌলিক সেবা দেওয়া হলেও এখন সেই পরিসর অনেক বিস্তৃত। বর্তমানে বোটক্স, ফিলার, লেজার গ্লো থেরাপি, পিআরপিসহ পাওয়ার থ্রেড লিফট এবং আধুনিক অ্যাকনে স্কার ট্রিটমেন্টসহ নানা উন্নত চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে ঢাকায় প্রতিষ্ঠানটির দুটি শাখা রয়েছে, যা ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ করছে। ডা. ঝুমু জাহানারা খান বলেন, ‘আজ থেকে দুই দশক আগে, ২০০৪ সালে যখন বাংলাদেশে প্রথম এসথেটিক লেজার ক্লিনিক গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিই, তখন চারপাশ থেকে শুধুই প্রশ্ন আসত। লেজার চিকিৎসা কী? এটি কি আদৌ নিরাপদ? ত্বক বা চুলের চিকিৎসায় এটি কিভাবে কাজ করবে? নতুন এই প্রযুক্তি নিয়ে মানুষের মনে যেমন ছিল অপার কৌতূহল, তেমনি ছিল এক ধরনের ভয় আর সংশয়। কিন্তু আমি জানতাম, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশকেও এগিয়ে যেতে হবে। উন্নত বিশ্বের আধুনিক চিকিৎসার সুফল আমাদের দেশের মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়াই ছিল
আমার লক্ষ্য।’
চিকিৎসায় নতুন প্রযুক্তির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মেডিক্যাল সায়েন্সের আধুনিক অগ্রযাত্রার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো অন্তর্ভুক্ত করেছি এআই মোড লেজার হেয়ার রিমুভাল প্রযুক্তি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক এই সিস্টেমটি প্রতিটি রোগীর ত্বকের ধরন অনুযায়ী অত্যন্ত নির্ভুল, দ্রুত ও নিরাপদ চিকিৎসা নিশ্চিত করে। বিশ্বমানের প্রযুক্তি দেশেই সাশ্রয়ী মূল্যে পৌঁছে দিতে আমরা নিরলস কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের চিকিৎসাসেবা এখন আরো বিস্তৃত
ও সুসংহত।’
তবে এসথেটিক চিকিৎসার ব্যয় তুলনামূলকভাবে বেশি। উন্নতমানের ১ মিলিলিটার বোটক্স বা ফিলারের দাম ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা। মাইক্রোব্লেডিং শুরু হয় আট হাজার টাকা থেকে। ফেস লিফটিংয়ের খরচ ২০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। প্রযুক্তি, ক্লিনিক এবং ফলোআপ সেবার ওপর এই ব্যয় নির্ভর করে। অন্যদিকে ফেস ভি-শেপিংয়ের প্রাথমিক খরচ প্রায় এক লাখ টাকা।
বিশ্লেষকদের মতে, এগুলো অপরিহার্য চিকিৎসা নয়, বরং বিলাসী সেবা। তাই এসব চিকিৎসা গ্রহণ অনেকটাই আর্থিক সক্ষমতা, ক্রয়ক্ষমতা এবং ব্যক্তির মানসিকতার ওপর নির্ভর করে। বেশির ভাগ ক্লিনিক চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি অনুমোদিত ডার্মাটোলজিক্যাল পণ্যও বিক্রি করে, যেগুলোর দামও তুলনামূলক বেশি।
মেডিক্স সিগনেচার ক্লিনিকের কনসালট্যান্ট ডা. ফাতেমাতুজ জোহরা অন্তরা জানান, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্বকে বলিরেখা, শুষ্কতা এবং উজ্জ্বলতা কমে যাওয়া স্বাভাবিক। আধুনিক এসথেটিক চিকিৎসা এসব পরিবর্তনকে ধীর করতে এবং ত্বকের স্বাভাবিক সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করে।
তিনি বলেন, ‘বয়সজনিত কারণে মুখের ভলিউম কমে যায়, তা পুনরুদ্ধারে ডার্মাল ফিলার ব্যবহার করা হয়। ঠোঁট, গাল, চিবুক ও চোখের নিচের অংশে ফিলার প্রয়োগ করে মুখমণ্ডলে আরো তারুণ্যময় ও আকর্ষণীয় লুক আনা সম্ভব।’




