প্রশ্ন : আপনার জন্ম তো সিলেটে, কিন্তু সেখানে কখনো থাকা হয়নি.. আলফাজ আহমেদ : না, সিলেটের জকিগঞ্জ আমার দাদা বাড়ি কিন্তু বাবা চাকরির সূত্রে ঢাকাতেই ছিলেন। ছোটবেলায় পলাশী ব্যারাকে থাকতাম আমরা। ১৯৮৫ সালে যখন প্রথম কিশোর লিগ খেলি আমি, তখন পলাশীতেই থাকি। ওরিয়েন্ট স্পোর্টিং, লালবাগ ফুটবল একাডেমির হয়ে পাইওনিয়ার লিগ, দ্বিতীয় বিভাগ লিগও খেলেছি সেই সময়। লালন মিয়া সরকারজি আমাদের কোচ ছিলেন। আমার ফুটবলে হাতেখড়ি তাঁর কাছেই। ১৯৮৫ সালের শেষদিকে আমরা মিরপুরে চলে আসি। তখন এখান থেকে বাসে করে প্রতিদিন প্র্যাকটিসে যেতাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে আমাদের প্র্যাকটিস হতো, খেলা হতো আউটার স্টেডিয়ামে। এখনকার মতো এত যানজট তো আর ছিল না তখন, ২০-২৫ মিনিটেই পৌঁছে যেতে পারতাম। প্রশ্ন : আপনার শৈশবটাই ফুটে উঠল এই বর্ণনায়, কিন্তু আপনার পরিবারের কেউ তো খেলাধুলায় ছিলেন না, ছোটবেলা থেকে খেলাধুলার প্রতি এই উৎসাহটা পেয়েছেন কোথা থেকে? আলফাজ : দেখুন আমাদের সময় ঢাকা শহরে অনেক মাঠ ছিল। খেলাধুলার একটা পরিবেশই ছিল তখন। এখানে-ওখানে বিভিন্ন টুর্নামেন্ট হতো, আমাদের পাইওনিয়ার লিগ, কিশোর লিগের খেলা হতো আউটার স্টেডিয়ামে আর স্টেডিয়ামের ভেতর তখন সাব্বির ভাই, কায়সার ভাই, মুন্না ভাইদের জমজমাট ফুটবল, সেসব নিয়ে মাঠের বাইরেও মাতামাতি। উৎসাহের তাই কমতি ছিল না কোনো দিক থেকে। আমিও যখন ভালো খেলতে থাকলাম, দেখলাম সবার আদর পাচ্ছি, সবাই আমাকে গুরুত্ব দিচ্ছে...। আর বাসার কথাই ধরুন না...! বাবা প্রতিদিন হাতে বাসভাড়াটা ধরিয়ে দিতেন, আমি যাতে প্র্যাকটিসে যেতে আসতে-পারি। ওই বয়সে এই সাপোর্টটুকু না পেলে তো আমার কিছু করার ছিল না। হয়তো আর ফুটবলারই হওয়া হতো না। প্রশ্ন : তখন থেকেই কি আপনি স্ট্রাইকার পজিশনে খেলেন? আলফাজ : না, না, আমি ছিলাম মিডফিল্ডার। কিশোর লিগ বলেন পাইওনিয়ার লিগ বলেন, আমি সব সময় মিডফিল্ডার হিসেবেই খেলেছি। স্ট্রাইকার হিসেবে খেললাম তো বেশ পরে। রহমতগঞ্জ, আরামবাগেও আমি মিডফিল্ডার। মোহামেডানেও নাম লিখিয়েছি মিডফিল্ডার হিসেবেই। অনেকটা ঘটনাক্রমে আমার স্ট্রাইকার হয়ে যাওয়া। ১৯৯৬ সালে মোহামেডানে তখন স্ট্রাইকার সংকট, কোরিয়ান কোচ ছিলেন ক্যাং; তিনিই প্রথম আমাকে স্ট্রাইকার হিসেবে খেলালেন। প্রথম দুই ম্যাচেই বোধহয় গোল করেছিলাম, বাংলাদেশ বয়েজ ও ভিক্টোরিয়ার বিপক্ষে। এরপর থেকেই মোটামুটি নিয়মিত হয়ে গেছি এই পজিশনে। ওই বছর অটো ফিস্টার যখন আবার আমাকে জাতীয় দলে ডাকলেন, সেটা স্ট্রাইকার হিসেবেই। প্রশ্ন : তার আগে আরামবাগে খেলেই তো আপনি জাতীয় দলে খেলার পথ করে ফেলেছিলেন। আপনার ঠিক কখন থেকে মনে হতে লাগল, আপনাকে দিয়ে বড় কিছু সম্ভব বা বড় ফুটবলার হবেন? আলফাজ : এই ভাবনাটা এসেছে রহমতগঞ্জে থাকতেই। ওখান থেকেই তো শীর্ষ পর্যায়ে খেলা শুরু। মনে আছে প্রথম বছর চার-পাঁচটা ম্যাচের বেশি খেলতে পারিনি, কিন্তু পরের লিগেই ১৮টা ম্যাচ খেলি। নতুন একজন খেলোয়াড়ের জন্য এটা কম কথা নয়। অন্তত নিজেকে চেনাতে পেরেছি সেই সময়। ফলটা হাতেনাতে পাই। ১৯৯৪ সালে আবাহনী চার্মস কাপে অতিথি খেলোয়াড় হিসেবে আমাকে সঙ্গে নেয়। এসেই যোগ দিই আরামবাগে। আবাহনীতেও থাকতে পারতাম। আর মোহামেডান থেকেও কথা বলেছিল, কিন্তু আমি ভাবলাম এই মুহূর্তে আমাকে নিয়মিত খেলার সুযোগ করে নিতে হবে। আবাহনী, মোহামেডানে তখন তারকার ভিড়, বেশির ভাগ সময় হয়তো বেঞ্চেই কাটাতে হবে। আমি তাই আরামবাগই বেছে নিয়েছি। এবং একবছর আরামবাগে খেলেই আমি কোরিয়ান কোচ ক্যাংয়ের স্কোয়াডে ডাক পাই, সার্ক গোল্ড কাপের জন্য। প্রশ্ন : ওই বছর মোহামেডানেও ঢোকেন। আপনি ১৯৯৫ সাল থেকে টানা সাত বছর খেললেন সাদা-কালোদের হয়ে, মুক্তিযোদ্ধা, ব্রাদার্স হয়ে আবার মোহামেডানেই ফিরেছেন; কিন্তু নিজের সেরা এই সময়টায় আরেক বড় দল আবাহনীতে দেখা গেল না আপনাকে... আলফাজ : ২০০৩ সাল পর্যন্ত তো দুই ক্লাবের মধ্যে একটা চুক্তিই ছিল যে একদলের খেলোয়াড় অন্যরা নেবে না। চাইলেও আমার তাই যাওয়ার সুযোগ ছিল না। আর ২০০২ সালে মুক্তিযোদ্ধায়, এরপর ব্রাদার্সে গেলাম। এই সময়টায় কিন্তু এমনও শুনতে হয়েছে যে আলফাজ বুড়ো হয়ে গেছে, তাকে দিয়ে আর হবে না- সে জন্য হয়তো ডাকেওনি। অথচ ২০০৩-০৪ মৌসুমে ব্রাদার্সকে আমরা লিগ জেতালাম, সাফ চ্যাম্পিয়নশিপও জিতলাম ওই বছর। আবাহনীতে একেবারে খেলিনি তা অবশ্য না। ২০১০ সালে গেলাম। লিগে হয়তো সেভাবে নিয়মিত ছিলাম না। তবে বরদলুই ট্রফির ফাইনালে আমার গোলেই কিন্তু শিরোপা জিতেছে আবাহনী। প্রশ্ন : ব্রাদার্স ইউনিয়নের বছরটার কথা বলুন, আপনারা গিয়েই দলটাকে প্রথমবারের মতো লিগ শিরোপা জেতালেন... আলফাজ : হ্যাঁ, ব্রাদার্স সেবার শিরোপা জেতার মতোই দল গড়েছিল। এখনকার শেখ জামাল যেমন বা গত বছর শেখ রাসেল যেমন সেরা সব খেলোয়াড় একসঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল, ২০০৩ সালে ব্রাদার্সও প্রায় তাই করে। আমি, আরমান, টিটু, মনোয়ার, রজনী, বিপ্লব- আমরা সবাই একসঙ্গে ওখানে যোগ দিই। শিরোপা জেতার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী ছিলাম শুরু থেকেই। আল্টিমেটলি সেটাই হয়। প্রশ্ন : আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচ নিয়ে নিশ্চয় স্মরণীয় স্মৃতি আছে... আলফাজ : অনেক! মোহামেডানের জার্সি গায়ে আবাহনীর বিপক্ষে আমার অনেক গোলও আছে। তার মধ্যে যদি মনে করতে হয়, ২০০৫ সালের জাতীয় লিগের ফাইনালটার কথা বলতে পারি। আমি মোহামেডানের অধিনায়ক ছিলাম, ২-০ গোলে আমরা জিতি। দুটি গোলেই আমার অবদান, একটি করেছি, অন্যটি করিয়েছি। আরেকটি ম্যাচের কথা বলতে পারি ১৯৯৯সালে, মিরপুর স্টেডিয়ামে হয়েছিল সেই লিগের ম্যাচ। এমন যে আবাহনীর সঙ্গে ওই ম্যাচ জিতলে এক ম্যাচ হাতে রেখেই আমরা চ্যাম্পিয়ন হয়ে যাই। সেই ম্যাচ আমরা ৩-০ গোলে এগিয়ে গিয়েছিলাম প্রথমার্ধেই। আবাহনীর সঙ্গে এমন ডমিনেটিং পারফরমেন্স কমই হয়েছে। যে কারণে এখনো মনে আছে ম্যাচটার কথা। আর তিন গোলের আমিই দুটি করেছিলাম। প্রশ্ন : আবার জাতীয় দলের প্রসঙ্গে ফিরি। ১৯৯৬ সাল থেকে জাতীয় দলেও তো আপনি নিয়মিত... প্রশ্ন : হ্যাঁ, ১৯৯৫ সালে মিয়ানমারে চার জাতি ফুটবল আসরে খেলি। ওটাতে আমরা চ্যাম্পিয়নও হয়েছিলাম। এরপর সাফের দল থেকে অটো ফিস্টার বাদ দিয়েছিলেন। পরে ১৯৯৬ সালে আবার তিনিই ডেকে নিয়েছেন। মোহামেডানের হয়ে (এএফসি) কাপ উইনারস কাপে ভালো খেলি সে বছর, লাওসের বিপক্ষে হ্যাটট্রিকসহ চার গোল ছিল ঢাকায়, এরপর অ্যাওয়ে ম্যাচেও করি আরেক গোল। এই পারফরমেন্স আবার জাতীয় দলে ফেরাসহ বড় একটা স্বীকৃতিও এনে দেয়, এএফসির 'প্লেয়ার অব দ্য মান্থ' হই। জাতীয় দল বা ক্লাব ফুটবল কোনো পর্যায়েই এরপর আসলে আমাকে পেছনে তাকাতে হয়নি। ২০০৮ সাল পর্যন্ত জাতীয় দলের হয়েই ১০০-রও বেশি ম্যাচ খেলা হয়ে গেছে আমার। প্রশ্ন : অর্জনের প্রসঙ্গ যখন এলো... সেরা অর্জন নিশ্চয় ১৯৯৯ সাফ ফুটবলের সোনা জয়, ফাইনালে আপনার গোলেই তো জিতল বাংলাদেশ... আলফাজ : নিঃসন্দেহে, আমার ক্যারিয়ারের এটা সেরা অর্জন। সাফে বাংলাদেশের প্রথম শিরোপা বলে কথা। নেপালে ওই ফাইনালটাই আসলেই কঠিন ছিল ওদের মাঠে। আমার একটা গোলই পুরো ছবিটা পাল্টে দিয়েছিল.. নাহ্, সেই স্মৃতি ভোলার নয়, পুরো স্টেডিয়াম স্তব্ধ করে দিয়ে আমি ঠোঁটে আঙুল চেপে ছুটছি। আরেকটা দিক দিয়ে এই শিরোপাটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, সেটা হলো সাফ গেমসের ওই আসরেই কিন্তু শেষবার মূল জাতীয় দল খেলার সুযোগ পেয়েছি। এরপর তো অনূর্ধ্ব-২৩ টুর্নামেন্ট হয়ে গেছে এটা। ২০১০ সালের এসএ গেমসেও তো আমরা সোনা জিতলাম, কিন্তু ১৯৯৯ সালের সঙ্গে তুলনা চলে না। প্রশ্ন : আর ২০০৩ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ ফুটবল... আলফাজ : এই সময়টায় ধারাবাহিকভাবেই আমরা ভালো খেলছিলাম। দেশের মাটিতে টুর্নামেন্ট বলে বেশ আলোড়নও হয়েছিল সে সময়। বাংলাদেশের জার্সি গায়ে ৯১৯৯ সালের পর ২০০৩-র সাফ- এই দুটি শিরোপাই আমার কাছে অনন্য। আমি গর্বিত যে বাংলাদেশের ফুটবলের সবচেয়ে বড় দুটি অর্জনেই আমার অবদান আছে। প্রশ্ন : বর্তমান জাতীয় দলটাকে কেমন দেখছেন? আপনাদের সময়ের সঙ্গে যদি তুলনা করেন, দক্ষিণ এশিয়ায় অবস্থানটা কি ধরে রাখতে পারছে তারা? আলফাজ : এই অঞ্চলে ভারত আমাদের মূল প্রতিপক্ষ। গত কয়েকটি ম্যাচে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ ভালোই করেছে। তবে ভারত যতটা এগোনোর কথা ততটা এগোতে পারেনি। আমাদের চেয়ে তাদের সুযোগসুবিধা সবদিক দিয়েই বেশি। কিন্তু মাঠের খেলায় কখনোই আমাদের চেয়ে খুব বেশি ওরা এগিয়ে থাকতে পারেনি। আমি তাদের বিপক্ষে খেলেছি, যেমন ১৯৯৮ সালে গোয়া সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে গ্রুপ পর্বে আমরা ড্র করেছি, তারপর ফাইনালে হেরে গেছি। ১৯৯৯ সালের সাফ গেমসের সেমিফাইনালে আবার তাদের আমরা হারিয়েছি, দুবাইয়ে বিশ্বকাপ বাছাই পর্বের একটা ম্যাচ ড্র হয়েছে, ২০০০ সালে আবার এক গোলে হেরেছি, কিন্তু ২০০৩ সালেই আবার ওদের আমরা হারিয়েছি ঢাকায়। তো লড়াইটা সমান সমানই ছিল সব সময়। গত সাফে ও এরপর একটা প্রীতি ম্যাচেও যেটা দেখা গেল যে আমরা পিছিয়ে গেছি ভাবা হচ্ছিল, কিন্তু আসলে আমরা পেছাইনি। ভারত বরং তাদের সুযোগসুবিধা নিয়ে যতটুকু এগোনোর কথা সেটা পারেনি। প্রশ্ন : বাংলাদেশের ফুটবল পেছায়নি বলছেন, সামনে কী সম্ভাবনা দেখছেন তাহলে... আলফাজ : পেছাইনি, এই অর্থে বলেছি যে সামর্থ্যটা এখনো আছে। বিদেশি কোচিং স্টাফ এসেছে, তারা ভিন্ন কিছু যোগ করছে, ভিন্নভাবে এগোনোর চেষ্টা করছে, এটা ইতিবাচক। একটা সময় বলা হতো, বাংলাদেশের ফুটবল রেজাল্ট পেলেই ঠিক পথে এগোবে। সেই কাঙ্ক্ষিত রেজাল্ট আমার ১৯৯৯ সালে এনে দিলাম। ২০০৩ সালে আবার জিতলাম। কিন্তু এই যে সম্ভাবনা... এটা তো ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশের বর্তমান জাতীয় দলও ভারতের সঙ্গে ম্যাচ দুটো দিয়ে তাদের সম্ভাবনাটা প্রমাণ করছে, কিন্তু তা ধরে কতটা এগিয়ে যাবে এটাই প্রশ্নসাপেক্ষ। প্রশ্ন : সাম্প্রতিক ম্যাচগুলো নিয়ে কী বলবেন, যেমন বঙ্গবন্ধু কাপ, তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তান ম্যাচ... আলফাজ : এখন ওরা অনেক বেশি ম্যাচ খেলতে পারছে যা আমাদের সময় পাইনি। আমরা বিভিন্ন টুর্নামেন্ট আর বাছাই পর্বের ম্যাচগুলোই শুধু খেলেছি, এখন দেখা যাচ্ছে ওরা এই ম্যাচগুলো তো খেলছেই, পাশাপাশি অনেক প্রীতি ম্যাচও হচ্ছে, প্রস্তুতিমূলক ম্যাচ খেলছে। কিছু দিন পরই যেমন ওরা মালয়েশিয়ায় খেলতে যাবে। এর আগে থাইল্যান্ডে গেছে, ভারতে গেছে, ঢাকায়ও ম্যাচ হচ্ছে, সিঙ্গাপুর খেলে গেল, এর আগে জাপান অনূর্ধ্ব-২১ দল এসেছে, কোরিয়ার ক্লাব খেলেছে, শ্রীলঙ্কা-নেপাল তো বোধ হয় কয়েকবার করে এলো। এটা খুব ইতিবাচক দিক জাতীয় দলের জন্য। তবে অন্য দিকটা হলো আমাদের খেলোয়াড় সংকট আছে। ফুটবল ফেডারেশনকে এদিকটাতে নজর দিতেই হবে। পেশাদার লিগ শুরুর পর থেকে দলগুলোর বিদেশি এনে খেলানোর প্রবণতা এতটাই বেড়ে গেছে যে আমাদের স্থানীয় খেলোয়াড়রা উঠতে পারছে না। হিসাব করে দেখুন পেশাদার লিগ শুরুর পর গত আট বছরে কতজন বিদেশি এসে খেলে গেল আমাদের এখানে! সেই তুলনায় জাতীয় দলের খেলোয়াড় কয়জন বেরিয়েছে, একেবারেই না। আর এখন কি না বলা হচ্ছে, বিদেশিদেরই নাগরিকত্ব দিয়ে জাতীয় দলে ঢোকানো হবে! এখানে ফুটবল ফেডারেশনের ব্যর্থতা ছাড়া আমি আর কিছু দেখি না। প্রশ্ন : ক্লাব ক্যারিয়ারের এক মৌসুম তো আপনি কলকাতায়ও খেলেছেন.. আলফাজ : হ্যাঁ, মোহনবাগানে। এক মৌসুম না ঠিক ছয়টা ম্যাচ খেলেছিলাম ওদের হয়ে। তখন ব্যারেটো ছিল, আমাকে খেলানো হয়েছিল ওর ঠিক নিচে। আহামরি কোনো অভিজ্ঞতা নয়, আমার নিজের একটা ইচ্ছা ছিল, শখ বলতে পারেন, কলকাতায় গিয়ে খেলা। ডাক পাওয়ার পর শখটা পূরণের জন্যই শুধু গেলাম। ওখানে ক্যারিয়ার গড়ব বা লম্বা সময় খেলব, এমন ইচ্ছাও ছিল না। প্রশ্ন : ফুটবলের শেষ তারকাও বলেন কেউ কেউ আপনাকে, নিজে এটাকে কিভাবে দেখেন? আলফাজ : এটা সত্যি, ফুটবল তারকারা এখন ক্রিকেটারদের পেছনে পড়ে গেছেন। কিন্তু একটা সময় তো ফুটবলাররাই সব ছিলেন। নব্বইয়ের দশকে সেই ক্রেজ আমি দেখেছি, তারকাখ্যাতি যদি বলে সেটাও পাওয়া হয়েছে। তারপর ২০০০ সালের পর থেকেই এই মানটা পড়তে থাকল আর ক্রিকেটাররা উঠতে থাকলেন। তবে আমি যত দিন মাঠে ছিলাম, মনে হয় না, ক্রিকেটারদের চেয়ে খ্যাতি বলুন, সম্মান বলুন, আমার কম ছিল। অর্থাৎ এখন যেমন ফুটবলাররা পিছিয়েই পড়েছেন, আমার ক্ষেত্রে অন্তত সেটা হয়নি। যেকোনো জায়গায়ই গেছি সমান মর্যাদা-মনোযোগও পেয়েছি। প্রশ্ন : স্ট্রাইকার আলফাজের বড় গুণ কী ছিল আপনার চোখে... আলফাজ : আমার রানিংটা ভালো ছিল, তারপর পজিশনাল সেন্স। অনেক গোল করেছি আমি। কিন্তু কখনোই মনে করিনি গোল করাটাই শুধু আমার কাজ। গোল করানোতেও আমি সমান স্বচ্ছন্দ ছিলাম। আমার ভালো লাগত একটা বল সুন্দর জায়গায় দিতে পারলে। মনেপ্রাণে আমি আসলে মিডফিল্ডারই ছিলাম। মাঠে অন্যদের সঙ্গে সমন্বয়টাই আসল। তাহলে গোল করা যেমন সহজ, করানোও। ২০০৫ সালের দিকে ক্রুসিয়ানি এসে আমাকে অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে খেলালেন, ক্যারিয়ারের ওই সময়টাও আমি উপভোগ করেছি। প্রশ্ন : আপনার নিজের আইডল কে ছিলেন? আলফাজ : আমার প্রিয় ছিল সাব্বির ভাই। ছোটবেলা থেকেই মোহামেডানের ভক্ত ছিলাম, সেই সঙ্গে সাব্বির ভাইয়ের। তাঁর মতো মিডফিল্ডার হয় না। তাঁর ভক্ত আসলে সারা বাংলাদেশে। আমরা তখন বড় ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখি এই সাব্বির ভাইদের দেখেই। সাব্বির ভাই, মুন্না ভাই, কায়সার ভাই তাঁদের তারকাদ্যুতির মধ্যেই আমরা বড় হয়েছি। আর হ্যাঁ, দিয়াগো ম্যারাডোনা... ফুটবল দিয়ে গোটা বিশ্বটাকেই তো তিনি মাতিয়ে দিয়ে গেছেন। ১৯৮৬ সালের সেই ম্যারাডোনাকে তো ভোলা যায় না। তখন আমি কিশোর ফুটবলে। প্রতিটা কিশোরেরই স্বপ্ন তখন একজন ম্যারাডোনা হওয়ার। আমি তো সেই দলের সবার আগেই ছিলাম। প্রশ্ন : আপনার নিজের ক্যারিয়ারের লম্বা একটা সময় আরমান মিয়ার সঙ্গে খেলেছেন, সতীর্থ খেলোয়াড় হিসেবে নিশ্চয় তাঁকেই এগিয়ে রাখবেন... আলফাজ : আরমান আর আমি ছোটবেলা থেকে একসঙ্গে। সেই কিশোর লিগে একসঙ্গে খেলেছি। তখন থেকেই বন্ধুত্ব, বোঝাপড়া। ১৯৮৫ সালেই ঢাকায় ভারতের জুনিয়র দলের সঙ্গে একটা প্রীতি ম্যাচ হয়েছিল, আমরা ১-০ গোলে জিতি। আমি আর আরমান একসঙ্গে খেলেছি। তারপর তো মোহামেডানেও পেলাম। এরপর জাতীয় দলে, মিয়ানমারে চারজাতি টুর্নামেন্ট দিয়ে শুরু। ২০০৩ সালে ব্রাদার্সেও আমরা একসঙ্গে খেললাম। ওর সঙ্গে আসলেই আমার বোঝাপড়াটা আর সবার চেয়ে বেশি ছিল। প্রশ্ন : ক্যারিয়ারে যাঁদের সঙ্গে খেলেছেন, তাঁদের নিয়ে একটা দল করতে হলে কাকে কাকে রাখবেন? আলফাজ : সিনিয়র, জুনিয়র, ব্যাচমেট- অনেক খেলোয়াড়ই তো ছিলেন। তাঁদের মধ্যে থেকে সেরা একটা দল করা সহজ হবে না। অবশ্য আমি সিনিয়রদের কমই পেয়েছি। আমার ব্যাচের খেলোয়াড়ই ছিলেন বেশি। সিনিয়রদের মধ্যে মুন্না ভাইকে বছর দুয়েকের মতো পেয়েছি। এদিকে মোহামেডানে সাব্বির ভাই ১৯৯৩ সালে পায়ে ব্যথা পেলেন, আমি দলে ঢুকি ১৯৯৫-এ। ১৯৯৩ সালে অবশ্য তাঁর বিপক্ষে খেলেছি, তখন আমি জুনিয়র, খুব সম্ভবত রহমতগঞ্জে। তিনি অবশ্য ইনজুরি থেকে ফিরে আরেকটা মৌসুম খেলেছিলেন মোহামেডানে। তো গোলরক্ষক থেকে যদি শুরু করি, তবে আমিনুল থাকবে প্রথমেই। স্টপার ব্যাক জুয়েল রানা, মোনেম মুন্না, লেফট ব্যাক মাসুদ রানা, রাইট ব্যাক...আলমগীরকে রাখা যেতে পারে; মিডফিল্ডে আরমান মিয়ার সঙ্গে থাকতে পারে... নুরুল হক মানিক, লেফট মিডফিল্ড...নামকরা অনেক খেলোয়াড়ই তো আছেন, সবাইকে আমি পাইওনি, সে ক্ষেত্রে রকিব, ডানে সাব্বির ভাইকেই রাখলাম। সেভাবে তাঁকে পাইনি ঠিক, কিন্তু আমার প্রিয় খেলোয়াড় হিসেবেই জায়গাটা তাঁর জন্য থাকল। আর স্ট্রাইকার? আমার দলে আমি যদি থাকতে পারি তাহলে আমি, নকিব। আমাদের সময় ৪-৪-২-য়েই বেশি খেলা হতো, সেভাবেই সাজালাম। প্রশ্ন : দুজনই এখন মাঠের বাইরে, পেছন ফিরে তাকালে ঠিক কী অনুভূতি হয়.. আলফাজ : আমি তৃপ্ত। ক্লাব ফুটবল, কি জাতীয় দলে, যতদিন খেলেছি নিজের সেরাটা মেলে ধরতে পেরেছি। মোহামেডানের হয়ে ১৯৯৬ ও '৯৯ সালে লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়েছি, ব্রাদার্সের হয়ে ২০০৩ সালে জিতেছি, টানা চারটা জাতীয় লিগ শিরোপা আমার, পেশাদার লিগে প্রতিটি আসরে আমার হ্যাটট্রিক আছে- এগুলো সবই মনে রাখার মতো। দেশের হয়ে লম্বা একটা সময় সুনাম নিয়ে খেলেছি। আসলে দেশের সুনামের জন্যই খেলেছি। ১৯৯৮ সালে সাফের রানার্স আপ হওয়ার পর '৯৯ সালে চ্যাম্পিয়ন হয়েছি, ২০০৩ সালে আবার শিরোপা জিতলাম। ২০০৫ সালেও ফাইনাল খেলেছি, অর্থাৎ এই সময়টায় দেশের ফুটবলের একটা মান আমরা ধরে রাখতে পেরেছিলাম। যেটা নিয়ে এখনো আমার গর্ব হয়। প্রশ্ন : ক্যারিয়ারে কঠিন সময় যায়নি কখনো? আলফাজ : কঠিন সময় তো অনেক গেছে। ১৯৯৫ সালে চারজাতি টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়ে এলাম আমরা মিয়ানমার থেকে। কিন্তু আসার পরই সেই দল থেকে আমি বাদ পড়ি। ক্যারিয়ারের শুরুতে এটা একটা ধাক্কার মতো ছিল আমার জন্য। মিয়ানমারে জাতীয় দলের সঙ্গে ওটা আমার দ্বিতীয় ট্যুর ছিল। যখনি মনে হচ্ছিল, জায়গাটা তৈরি করে ফেলছি, তখনি আমি বাদ পড়লাম। ফলে আবার সব নতুন করে শুরু করতে হয়। প্রচুর পরিশ্রম করেছি আবার জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার জন্য। তখন আসলে প্রতিদ্বন্দ্বীও অনেক ছিল। মিডফিল্ডে আটজন ছিলেন দলের সঙ্গে, বাইরে ১২ জন। মাঠে নামার জন্য মানিক ভাই, আরমান, রকিব, রঞ্জন, মামুন জোয়ার্দার, স্বপন, গাউস, জাকির সবাই তৈরি, আপনি কাকে রেখে কাকে খেলাবেন! এমন অবস্থা। প্রশ্ন : ফুটবল ছাড়া এই সময়টা কেমন যাচ্ছে? আলফাজ : ফুটবল ছাড়া তো নয়, কোচিংয়ে জড়িয়েছি জানেন তো। সি লাইসেন্সটা করা হয়ে গেছে। মোহামেডান টিমের সঙ্গে কাজ করেছি, এখন সেনাবাহিনীর কোচের দায়িত্বে। মাঝখানে মহিলা ফুটবল দল নিয়ে গেলাম দেশের বাইরে। এখন পুরোপুরি আসলে কোচিংয়েই মনোযোগ দিচ্ছি। খেলোয়াড় হিসেবে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে সেটার প্রয়োগ ঘটানোর ইচ্ছাটাই এখানে মূলত কাজ করছে। তবে আমার লক্ষ্য বড়। খেলোয়াড়ি জীবনে যেমন সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলেছি, এখানেও তাই। অন্তত জাতীয় দলের দায়িত্ব নিতে চাই। তবে তাড়াহুড়ার কিছু নেই। আমি ধাপে ধাপে এগোচ্ছি। এখন কোচিংটা অনেক বেশি ডেভেলপ করেছে। আমাদের দেশেও অনেক কোচই বেশ ভালো করছেন। তাঁদের কাছ থেকেও শিখতে চাই। প্রশ্ন : শেষ প্রশ্ন, বর্তমান খেলোয়াড়দের জন্য আপনার কী বার্তা? আলফাজ : নিজের চেষ্টাটা বাড়াতে হবে। আমি যেমন নিজে নিজে অনেক অনুশীলন করেছি। আপনার ঘাটতি যেখানে থাকবে, অফসিজনে সেটি নিয়ে কাজ না করলে উন্নতি করা সম্ভব নয়। নিজের দুর্বলতাটা কোথায় সেটা নিজেকেই সবার আগে বের করে নিতে হবে। তারপর কোচের পরামর্শ তো আছেই। আমি এই মিরপুর স্টেডিয়ামেই একা একা অনেক অনুশীলন করেছি, সকালবেলা চলে আসতাম। সিটি ক্লাব মাঠে দুপুর ১২টা থেকে ৩টা-৪টা পর্যন্ত একা একাই বল নিয়ে সময় কাটিয়েছি। বাঁ পায়ের ক্রসটা ঠিকঠাক হচ্ছে না, ওটাই বারবার অনুশীলন করতাম। শ্যুটিং, ড্রিবলিং... তাও করতাম একা একা। মাঝেমধ্যে আমিনুলকে ডাকতাম, ও পোস্টে থাকত, আমি হেড-শ্যুটিংয়েই সময় পার করতাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা। এমনটা ছাড়া আসলে হয়ও না, আপনি বিদেশি কোচের অধীনে তিকিতাকা খেলছেন, কিন্তু ওয়ান অন ওয়ানে ডিফেন্ডারকে বিট করতে হবে তখন কিন্তু সেই ব্যক্তিগত নৈপুণ্যই দেখাতে হবে, তিকিতাকায় চলবে না।