প্রশ্ন : এমন সময়ে আপনার সাক্ষাৎকার নিতে বসেছি, যখন পর দিনই (২০ মে) আবাহনী-মোহামেডান দ্বৈরথ। ইতিহাসে এই দুই দলের প্রথম ম্যাচেই গোল করেছিলেন আপনি। সেই গোলের গল্প শুনেই শুরু করতে চাই। অমলেশ সেন : এই দুই দলের চির বৈরিতার শুরু কিভাবে, সেটি আগে বলে নিলে ভালো হয় না? প্রশ্ন : নিশ্চয়ই। বলুন। অমলেশ : ১৯৭০ সালে আমি, সালাউদ্দিন ও গোলাম সারোয়ার টিপুরা মোহামেডানেই ছিলাম। কিন্তু স্বাধীনতার পর আমাদের সবার নতুন দল আবাহনীতে যোগ দেওয়াটা ওরা ভালোভাবে নিতে পারেনি। আবার ওয়ান্ডারার্স থেকেও কিছু খেলোয়াড় আবাহনীতে চলে এসেছিল। নিশ্চয়ই জানেন, ওই সময়ের ওয়ান্ডারার্স কত বড় দল ছিল! দুটো দল ভেঙে শুরু থেকেই আবাহনীও বড় দল হয়ে উঠেছিল। ওই ভাঙন থেকেই আসলে বৈরিতার শুরু। যদিও মাঠে আবাহনী-মোহামেডানের দেখাটা একটু দেরিতেই হয়েছিল, ১৯৭৩ সালে। আগের বছর বেশ কয়েকটি ম্যাচে মারামারির ঘটনায় ফুটবল ফেডারেশন সিদ্ধান্ত নেয় লিগ আর হবে না। প্রশ্ন : এবার মোহামেডানের বিপক্ষে প্রথম গোলের গল্পটি শোনান। অমলেশ : বহু দিন...বহু দিন পর কেউ এই গল্প শুনতে চাইছে বলে আমি সত্যিই অন্য রকম ভালোলাগায় ডুবে যাচ্ছি। ফুটবলের সেই রমরমাও নেই যে মাঝেমধ্যেই কেউ না কেউ ইতিহাসে আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচের প্রথম গোলটির কথা তুলে মনে দোলা দেবে। ১৯৭৩ সালে প্রথম দেখায় আবাহনী ২-০ গোলে জিতেছিল। প্রথম গোলটি করেছিলাম আমিই। পরেরটি সালাউদ্দিন। আমার গোলটি কিভাবে করলাম, বলি শুনুন। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অধিনায়ক পিন্টু ভাই (জাকারিয়া পিন্টু) তখন মোহামেডানের স্টপার ব্যাক। মোহামেডানের গোলরক্ষক বল ধরে বাম দিকে পিন্টু ভাইকে পাস দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমি চেজ করি। আমাকে এগিয়ে যেতে দেখে পিন্টু ভাই আবার গোলরক্ষককে ব্যাক পাস দেন। কিন্তু বল গোলরক্ষকের কাছে যাওয়ার আগেই আমি ক্ষিপ্রতার সঙ্গে ছোঁ মেরে ধরে নিয়ে গোল করে দিই। কত দিন পেরিয়ে গেছে! অথচ মনে সেই গোলের রিপ্লেটা আজও কত পরিষ্কার! প্রশ্ন : আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচ নিয়ে উন্মাদনার ছবিটাও নিশ্চয়ই স্মৃতিতে খুব স্পষ্ট। তা এখনকার অবস্থা দেখলে কতটা দুঃখ হয়? অমলেশ : বিশেষ করে দর্শক গ্যালারির দিকে তাকালে বুকের হাহাকারটা টের পাই। অথচ স্বাধীনতার আগে ও পরের প্রায় আড়াই দশকজুড়ে গ্যালারি থই থই করত। এখন আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচেও গ্যালারি খা খা করে। পরিতাপের বিষয়, গত অনেক বছর ধরেই মোহামেডান চ্যাম্পিয়নশিপ লড়াইয়ে নেই। যদিও এই বছর ওরা ভালো করছে (২০ মে আবাহনীর বিপক্ষে ১-০ গোলের জয়ও পেয়েছে)। প্রশ্ন : কিন্তু সামগ্রিকভাবেই ফুটবল নিয়ে এ দেশের মানুষের উন্মাদনার ছবিটা বিলীন হয়ে গেছে। এটা ক্রিকেটের সাফল্য নাকি কেবলই ফুটবলের ব্যর্থতা? অমলেশ : এখানে আমি একটি কথাতেই উপসংহার টানতে চাই। পরীক্ষাই যদি না হয়, তাহলে আপনার সারা বছর পড়াশোনা করে লাভটা কী? আমাদের ফুটবলের অবস্থাও তাই। খেলোয়াড় বের করে আনার টুর্নামেন্টই তো হয় না। আমাদের ফুটবলের মানও তাই পড়ে গেছে। জাতীয় দলেও এখন ১১ জন ভালো খেলোয়াড় নেই। বড়জোর চার-পাঁচজন ভালো। খেলোয়াড়দেরও আমি খুব বেশি দোষ দিতে চাই না। কারণ ভালো মানের খেলোয়াড় বের করে আনতে যে রকম সাংগঠনিক দক্ষতার দরকার, সেটিরও বড়ই অভাব আমাদের। যদি শুনতে চান, একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝাতে চাই আমার উঠে আসাও নিয়মিত কিছু টুর্নামেন্টেরই ফল। প্রশ্ন : অবশ্যই শুনব। বলুন প্লিজ। অমলেশ : আমাদের সময়ে শিক্ষাবোর্ড থেকে আন্তস্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় ফুটবল হতো। বিশ্ববিদ্যালয় ফুটবলের সেরা খেলোয়াড়দের বেছে নিয়ে ইস্ট পাকিস্তান কম্বাইন্ড ইউনিভার্সিটি দলও গড়া হতো, যেটি জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে খেলত। ১৯৬৮ সালে আমার গোলে ঢাকা বিভাগকে হারিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে কম্বাইন্ড ইউনিভার্সিটি দল লাহোরে চূড়ান্ত পর্বেও খেলতে যায়। ওই টুর্নামেন্টের পর আমি ও প্রতাপ দা (প্রতাপ শংকর হাজরা) পাকিস্তান জাতীয় দলের ট্রায়ালেও ডাক পেয়েছিলাম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা থাকার কারণে আমার অবশ্য শেষপর্যন্ত ওই ট্রায়ালে যোগ দেওয়া হয়নি। প্রশ্ন : কিন্তু যত দূর জানি, এর অনেক আগে থেকেই আপনি ঢাকার লিগ মাতাতে শুরু করেছিলেন। অমলেশ : মাতিয়েছিলাম কি না জানি না। তবে ফায়ার সার্ভিসের হয়ে ঢাকা লিগের দ্বিতীয় পর্বে খেলতে এসে ভালোই খেলেছিলাম। আমি বগুড়া জেলা দলে খেলতাম। ওই দলের দুই-তিনজন তখন ঢাকায় ফায়ার সার্ভিসে খেলতেন। তাঁরাই ১৯৬২ সালের শেষ দিকে আমার ঢাকায় খেলার বন্দোবস্ত করেন। আর ঢাকায় আসার পথে কত যে মজার মজার ঘটনা। প্রশ্ন : একটা একটা করে শুনতে চাই। অমলেশ : সাত্তার ভাই নামের এক ভদ্রলোক ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার ছিলেন। তিনি নিজে আমাকে বগুড়ায় আনতে যান। কিন্তু এক বন্ধুর অনুরোধে আগে থেকেই শান্তাহারে খেপ খেলতে যাওয়ার ব্যাপার চূড়ান্ত হয়ে থাকায় তিনি গিয়েই আমাকে নিয়ে রওনা দিতে পারেননি। তাঁকেও আমার সঙ্গে সঙ্গে শান্তাহার যেতে হয়। সেখান থেকে তাঁর সঙ্গে ঈশ্বরদী আসি ঢাকার ফ্লাইট ধরতে। ভাবলে এখনো অবিশ্বাস্য লাগে। ওই প্রথম আমার ঢাকায় আসা। তা-ও আবার প্লেনে চড়ে! মনে আছে, তখন ভাড়া ছিল ২৭ টাকা। প্রশ্ন : ফুটবল হুট করেই আপনার পৃথিবীটা বদলে দিয়েছিল, তাই না? অমলেশ : একদম। ঢাকায় পৌঁছার পরই আমাকে নিয়ে আসা হয় তখনকার এক অভিজাত রেস্তোরাঁয়। জীবনে প্রথমবার প্লেনে চড়া আর দামী রেস্তোরায় খাওয়া সেই প্রথম। সেখান থেকে আমাকে নিয়ে যাওয়া হয় সদরঘাটে ফায়ার সার্ভিসের হেড অফিসে। বক্স ক্যামেরায় আমার ছবি তোলা হলো। তখনকার দিনে খেলার এক-দুই ঘণ্টা আগেও রেজিস্ট্রেশন করানো যেত। রেজিস্ট্রেশন করিয়ে বিকেলেই টিনের বেড়া দেওয়া আউটার স্টেডিয়ামে প্রথম ঢাকা লিগের ম্যাচ খেলতে নেমে যাই। প্রশ্ন : প্রথম ম্যাচেই বাজিমাত করেছিলেন? অমলেশ : অনেকটা সে রকমই। প্রতিপক্ষ ছিল ঢাকেশ্বরী কটন মিলস। তখনকার দিনে ২-৩-৫ ফরমেশনে খেলা হতো। রাইট ইন ও লেফট ইন, দুই পজিশনে খেলেই আমি অভ্যস্ত ছিলাম। লিঙ্কম্যান বলতে যা বোঝায়, আমি ছিলাম তাই। কিন্তু ফায়ার সার্ভিস আমাকে নামিয়ে দিয়েছিল সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসেবে। প্রথম ম্যাচেই আমি দুই গোল করে বসি। দুর্ভাগ্য যে আরেকটি বল বারে লেগে বাইরে চলে যায়। নইলে হ্যাটট্রিকই হয়ে যেত। আপনি বলছিলেন না, পৃথিবী বদলে যাওয়ার কথা। পর দিন সকালেই সেটি আরো ভালো বুঝতে পারি। প্রশ্ন : ঘটনাটি খুলে বলুন। অমলেশ : সদরঘাটে ফায়ার সার্ভিসের হেড কোয়ার্টারের পাশেই ছিল খেলোয়াড়দের মেস। পরের দিন সকালে ডিরেক্টর জেনারেল সিদ্দিক সাহেব তাঁর অফিসে ডেকে পাঠান আমাকে। তিনি তখন ফুটবল ফেডারেশনেরও কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি আচমকা আমাকে একটি প্রস্তাব দিয়ে বসেন। আমি তখন কেবল মেট্রিক পাস করে বগুড়া আযিযুল হক কলেজে প্রথম বর্ষে পড়ি। তিনি আমাকে স্টেশন অফিসার পদে চাকরির প্রস্তাব দিয়ে বসলেন। যে পদে চাকরি করতে কমপক্ষে এইচএসসি পাস করা লাগে। তিনি বললেন, আমার যে শিক্ষাগত যোগ্যতা, তাতেই চলবে। নামেমাত্র একটি পরীক্ষা হবে এবং পরীক্ষা যেহেতু তাঁদের হাতেই, কাজেই আমাকে চাকরি দেওয়া কোনো সমস্যাই নয়। লোভনীয় প্রস্তাব নিঃসন্দেহে। কিন্তু আমি না করে দিই। ওই এক বছরই (১৯৬২) ঢাকা লিগে খেলে আমি বগুড়া ফিরে যাই। ১৯৬৯ সালে আবার ইস্ট এন্ডের হয়ে ঢাকা লিগে ফেরার মাঝখানে লম্বা বিরতি। প্রশ্ন : অর্ধ যুগের লম্বা এ বিরতির কারণ কী? অমলেশ : কারণটা পারিবারিক। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর ভাইবোনদের মধ্যে কেবল আমার বাবা কালিপ্রসন্ন সেনই এই বাংলায় ফিরে আসেন। বগুড়ায় দত্তবাড়ী বলে এক জমিদারি এস্টেট ছিল। ১৯৫৬ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয়ে গেলেও ১৯৫৮ পর্যন্ত বাবা জমিদার পরিবারের ম্যানেজার ছিলেন। পরের বছর তিনি মারা যান। একই বছর আমার বড় ভাই কমলেশ সেনও এপার ছেড়ে ওপার বাংলায় চলে যেতে বাধ্য হন। বগুড়া আযিযুল হক কলেজ ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক ছিলেন তিনি। ছাত্র ইউনিয়ন করা আমার বড় ভাই লেখালেখিও করতেন। মার্শাল ল-র বিরুদ্ধে একটি লেখার কারণে আর্মিদের রক্তচোখ ছিল তাঁর দিকে। তাই সবার পরামর্শে কলকাতায় চলে যান তিনি। ১৯৫৯ সালে কমলেশ ওপার বাংলায় চলে যাওয়ার পর মা অমিয় প্রভা সেন ও পরিবার দেখাশোনার দায়িত্ব পড়েছিল আমার ওপর। যে কারণে ফায়ার সার্ভিসের লোভনীয় প্রস্তাব পায়ে ঠেলে আমাকে বগুড়ায় ফিরে যেতে হয়। পরিবারের কারণে লম্বা বিরতি নিয়ে আমি আবার ঢাকার লিগ খেলি ১৯৬৯ সালে। প্রশ্ন : পরের বছরই ঐতিহ্যবাহী মোহামেডানে নাম লেখান? অমলেশ : হ্যাঁ, সুযোগটা করে দেন তৎকালীন ক্রিকেট বোর্ডের নির্বাচক ফারুক ভাই। তিনি আবার মোহামেডানের ফুটবল ম্যানেজারও ছিলেন। ইস্ট পাকিস্তান কম্বাইন্ড ইউনিভার্সিটি টিমে খেলার সময় তিনি আমার খেলা দেখেন। তিনিই আমাকে মোহামেডানে ভেড়ান। সেবার অবশ্য আমরা রানার্স আপ হই। চ্যাম্পিয়ন হয় ইপিআইডিসি (ইস্ট পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন)। পরে যেটা বিজেএমসি হয়। মোহামেডানের হয়ে মাঠে নামতেও কত ঘটনা! ইস্ট এন্ডের সঙ্গে ক্লিয়ারেন্স নিয়ে গণ্ডগোল ছিল। যে কারণে লিগের প্রথম দিকের কিছু ম্যাচ তো খেলতেই পারিনি। প্রশ্ন : এরপর উত্তাল একাত্তর। আপনিও ফুটবলকে হাতিয়ার বানিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন। অমলেশ : হ্যাঁ, দেশ যখন ক্রমেই জ্বলে উঠছে, আমি দর্শনা দিয়ে ওপারে চলে যাই। ডেপুটি হাই কমিশনার হোসেন আলী একদিন ঘোষণা দিয়ে বসেন, কলকাতার পূর্ব পাকিস্তান হাই কমিশন এখন থেকে বাংলাদেশের পক্ষে কার্যক্রম চালাবে। হাই কমিশন থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে খেলোয়াড়দের যোগাযোগ করতে বলা হলো। খেলোয়াড়দের রাখা হয়েছিল পার্ক সার্কাসের কোকাকোলা বিল্ডিংয়ে। আমিও সেখানে গিয়ে উঠি। কৃষ্ণনগরে স্বাধীন বাংলা দলের প্রথম ম্যাচ খেলার সময়ও কত ঘটনা! তখনো বাংলাদেশকে কেউ স্বীকৃতি দেয়নি। তাই বাংলাদেশের পতাকা উড়াতে দেওয়ায় আপত্তি ছিল নদীয়ার ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের। কিন্তু আমরাও বলে দিই, পতাকা উড়াতে না দিলে খেলবই না। অবশেষে তিনি রাজি হন। যে জন্য তাঁকে সাসপেন্ডও করা হয়েছিল। পরে অবশ্য চাকরি ফিরে পেয়েছিলেন। স্বাধীন বাংলা দলের হয়ে মুম্বাইয়ে খেলতে গিয়ে দুটো অভিজ্ঞতার কথাও না বললেই নয়। প্রশ্ন : বিশেষ কারো সঙ্গে দেখা হওয়ার স্মৃতি? অমলেশ : ঠিক ধরেছেন। তখনকার দিনে ক্রীড়াবিষয়ক বেশ নামকরা ম্যাগাজিন ছিল স্পোর্টসউইক। তাঁদের নামেই গড়া স্পোর্টসউইক একাদশের বিপক্ষে মুম্বাইতে আমরা ৩-১ গোলে জিতেছিলাম। ওই ম্যাচ খেলতে আমাদের বিপক্ষে মাঠে নেমেছিলেন নবাব পাতৌদি (ভারতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক মনসুর আলী খান পাতৌদি)। তিনি ঠাট্টা করে বলেছিলেন, 'তোমরা তো মুক্তিযোদ্ধা। দেখো, আমাকে আবার ইনজ্যুরড করে দিও না।' ওই ম্যাচ দেখতে আরেকজন ব্যক্তিত্বপূর্ণ লোকও উপস্থিত ছিলেন। তিনি সুর সম্রাট শচীন দেব বর্মণ। 'তুমি এসেছিলে পরশু, কাল কেন আসোনি?' কিংবা 'মুক্তা যেমন সুক্তির বুকেতে, আমাতে তুমি তেমনি, প্রেমের রাজ্যে শুধু তুমি'- আহা, কী দারুণ সব গান তাঁর! তাঁকে খুব কাছ থেকে দেখতে পাওয়ার অনুভূতি তাই ছিল অসাধারণ। প্রশ্ন : স্বাধীনতার পর আবাহনীতে নাম লেখানোর গল্পটা কী? অমলেশ : মায়ের অসুস্থতার কারণে আমি দেশে ফিরেছি বেশ বিলম্বে। ১৯৭২ সালের জুলাইতে। ওই বছর লিগও শুরু হয় দেরিতে। কলকাতায় খেলতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হকি দলের খেলা দেখতে গিয়ে প্রতাপ দার সঙ্গে দেখা। তিনি বললেন দেশে ফিরে মোহামেডানের হয়ে খেলতে। এর কিছু দিন পর স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের ম্যানেজারও (তানভীর মাজহার তান্না) আবাহনীর জন্য জার্সি কিনতে কলকাতায় গিয়ে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনিই আমাকে জানান যে সালাউদ্দিন ও টিপু তত দিনে আবাহনীতে যোগ দিয়ে ফেলেছে। আমিও রীতিমতো ধন্দে পড়ে যাই, কোথায় খেলব! ১৯৭২ সালে লিগ শুরুর আগের দিন দেশে ফিরে শেষপর্যন্ত আবাহনীর হয়েই রেজিস্ট্রেশন করে ফেলি। প্রশ্ন : সেই থেকে আপনি শুধুই আবাহনীর। একটা কথাই চালু হয়ে গিয়েছিল যে 'অ-তে আবাহনী, অ-তে অমলেশ।' অমলেশ : (হাসি...) হ্যাঁ, এই কথাটা প্রথম তাঁর কোনো একটি লেখায় লিখেছিলেন কবি ও ক্রীড়া লেখক সানাউল হক খান। আর আবাহনীতে আমি এত স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতাম যে ক্লাবঘরই আমার ঘরবাড়ি হয়ে উঠেছিল। স্বাধীনতার পর পরিবারের সবাই যেহেতু কলকাতায় থিতু হয়ে গিয়েছিল, তাই এখানে একা আমি ক্লাবেই থাকতাম। ১৯৮২ সালে জয়শ্রী সেনকে বিয়ে করার পরেই না প্রথম ছোট্ট একটি ভাড়া বাসায় উঠি। আর আমার বিয়ের ঘটক ছিল পাইলটের (জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক খালেদ মাসুদ) বাবা প্রখ্যাত ফুটবলার শামসু (শামসুল ইসলাম)। প্রশ্ন : তাই নাকি? অমলেশ : (হাসি...) হ্যাঁ। আমার স্ত্রী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে অনার্স করা। আমিও একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসে পড়েছি। এ জন্য অনেকেই মনে করেন আমাদের হয়তো প্রেমের বিয়ে। আসলে প্রস্তাবটা নিয়ে এসেছিল পাইলটের বাবা শামসু। প্রশ্ন : যাঁর সঙ্গে আপনার মাঠের বোঝাপড়াটাও বেশ চমৎকার ছিল বলে জানি। অমলেশ : সেই বোঝাপড়াটা দুজনের সঙ্গে খুব বেশি ছিল- সালাউদ্দিন ও শামসু। সালাউদ্দিনের জীবনের ৯০ শতাংশ গোলই আমার পাস থেকে করা। ওর ব্যক্তিগত দক্ষতায়ও গোল করেছে। তবে আমার পাস থেকেই বেশি। পাইলটের বাবা শামসুও আমার পাস থেকে অনেক গোল করেছে। দুজনকে আমার পছন্দ ছিল এ জন্য যে সুযোগ বানিয়ে দিলে ওরা খুব একটা নষ্ট করত না। এ জন্য ওদের সঙ্গে ভালো বোঝাপড়াও তৈরি হয়ে গিয়েছিল। বলটা কোথায় দিলে গোল হতে পারে, সেটি আমার খুব ভালো জানা ছিল। আর আমার পায়ে বল দেখলে ওরাও বুঝে ফেলত আমি কোথায় বলটা দিতে পারি। প্রশ্ন : যদিও আপনি ফুটবল মাঠে প্রায় সব পজিশনেই খেলেছেন। অমলেশ : এটা ঠিক, গোলকিপিং ছাড়া আর সব পজিশনেই খেলেছি। ঢাকার লিগে শুরুই করেছিলাম ফরোয়ার্ড হিসেবে। ১৯৭৪ থেকে পুরোদস্তুর মিডফিল্ডার হিসেবে খেলি। ১৯৮৪ সালে খেলা ছাড়ার আগে আবাহনীর হয়ে ডিফেন্ডার পজিশনেও খেলেছি কত! প্রশ্ন : নিজে কোন পজিশনে খেলে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন? অমলেশ : মিডফিল্ডে। কারণ এখানে খেললে অনেক বড় জায়গা নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে খেলা যায় এবং অন্যদের দিয়ে খেলানোও যায়। প্রশ্ন : ফুটবল মাঠে নানামুখী দক্ষতার জন্যও আপনি স্মরণীয় হয়ে আছেন। আপনার নিজের মুখেই সেই বিশ্লেষণটা শুনতে চাই। অমলেশ : (হাসি...) হ্যাঁ, আমার নিজেরই মনে হয় বেশ কিছু দক্ষতা আমার ছিল। যেমন উইথ দ্য বল অর্থাৎ রানিংয়ের ওপর বল ড্রিবল করতে পারতাম। গতিও বেশ ছিল। পাওয়ারফুল শুট করতে পারতাম। যে জন্য দূরপাল্লার শটে গোলও আছে আমার অনেক। কয়েকটি গোল তো এখনো চোখে ভাসে। একটির কথাই বলছি। ১৯৬৯ সালে ইস্ট এন্ডের হয়ে মোহামেডানের বিপক্ষে। মোহামেডানের গোলরক্ষক তখন শান্টু (শহীদুর রহমান)। আমরা গোল খাওয়ার পর সেন্টার থেকে দ্বিতীয় টাচেই গোল করি। শান্টুকে পোস্ট ছেড়ে গজ সাতেক এগিয়ে থাকতে দেখেছিলাম। দূর পাল্লার শটে আমি ওর মাথার ওপর দিয়ে বল জালে জড়াই। এ ছাড়া আমি স্ক্রিনিং বা শিল্ডিংও খুব ভালো করতে পারতাম। বল নিয়ন্ত্রণেও আমার সুনাম ছিল। আর এসব নানামুখী দক্ষতায় আমার ছোটবেলার খেলাধুলারও ভূমিকা ছিল। প্রশ্ন : ও আচ্ছা, ঘটনাবহুল ক্যারিয়ার নিয়ে আলোচনা করতে করতে আপনার ছোটবেলায় নজরই দেওয়া হয়নি। এই সুযোগে যদি ছোটবেলা নিয়ে সংক্ষেপে একটু ধারণা দেন। অমলেশ : জন্ম আমার বগুড়ায়। বাড়ির পাশেই আলতাফুন্নেসা মাঠ। শোওয়ার ঘরের জানালা দিয়ে খেলা দেখা যেত। খুব ছোটবেলায় টেনিস বলে ফুটবল খেলতাম। বল কন্ট্রোলের জন্য আমার যে সুনাম ছিল, সেটি ওই টেনিস বলে ফুটবল খেলেই রপ্ত করি। শুটিং পাওয়ার ও ড্রিবলিংটা সম্ভবত আমার জন্মগত। আর গতির জন্য অ্যাথলেটিক্স। বগুড়া মিউনিসিপ্যাল হাইস্কুলে পড়ার সময় টানা পাঁচ বছর আন্তস্কুল ক্রীড়ায় অ্যাথলেটিক্সে অংশ নিয়েছি। এর মধ্যে চার বছর লং জাম্প, ট্রিপল জাম্প, ১০০ ও ৪০০ মিটারে প্রথম হয়েছি। আমার ক্রিকেট খেলারও শুরু ফুটবলের আগে থেকে। পাড়ার দল বাইটন ক্লাবের হয়ে ১৯৫৬ সালে ক্রিকেট খেলার শুরু। আমি ওই দলের ওপেনিং ব্যাটসম্যান ছিলাম। একই দলের হয়ে পুরোদমে ফুটবল খেলার শুরু তারও এক বছর পর, ১৯৫৭ থেকে। প্রশ্ন : আবার আবাহনী প্রসঙ্গে ফিরি। এই দলের হয়ে খেলার সময় টালমাটাল সময়ও তো পার করেছেন অনেক। অমলেশ : তা আর বলতে! ১৯৭৫ সালে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সময় বাংলাদেশ জাতীয় দল মারদেকা টুর্নামেন্টে খেলতে মালয়েশিয়ায়। ওই দলে আমিসহ আবাহনীর পাঁচ-ছয় জন। তো একদিন আমি, সালাউদ্দিন, আশরাফ আর বাটু মিলে ট্যাক্সিতে ঘুরতে বেরিয়েছি। আমাদের পরিচয় জেনে পাঞ্জাবি ট্যাক্সি ড্রাইভার বলল, 'তোমাদের প্রেসিডেন্টকে তো মেরে ফেলা হয়েছে।' সে নাকি রেডিওর খবরে শুনেছে। আমরা তো বিশ্বাসই করিনি প্রথমে। জানতাম যে কাশ্মীরের তখনকার চিফ মিনিস্টার শেখ আব্দুল্লাহ অসুস্থ ছিলেন। আমরা ভাবলাম নামের মধ্যে 'শেখ' থাকাতে হয়তো ড্রাইভার গুলিয়ে ফেলেছে। পরে হোটেলে ফিরে নিশ্চিত হলাম যে ট্যাক্সি ড্রাইভার ভুল বলেনি। প্রশ্ন : এরপর তো শেখ কামাল প্রতিষ্ঠিত আবাহনী থাকবে কি না, সেটি নিয়েই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। অমলেশ : কোনোমতে মারদেকা কাপ শেষ করে ঘটনার সপ্তাহখানেক পর আমরা দেশে ফিরি। লিগের বাকি খেলাগুলো আবাহনী খেলবে কি খেলবে না, তা নিয়ে দ্বিধায় পড়ে যাই সবাই। এর মধ্যেই একদিন ধানমণ্ডি ১৪ নম্বরে সাদেক ভাইয়ের (আবাহনীর ফুটবল ও হকি দলের সাবেক অধিনায়ক আব্দুস সাদেক) বাসায় হওয়া এক মিটিং থেকেই অন্য রকম এক টিম স্পিরিট তৈরি হয়ে যায়। আমরা ঠিক করি, আবাহনী খেলবে এবং ক্লাব যেভাবে চলছিল, সেভাবেই চলবে। প্রশ্ন : বঙ্গবন্ধু ও শেখ কামালকে নিয়ে আপনার কিছু স্মৃতিকথাও শুনতে চাই। অমলেশ : সংগঠক হিসেবে শেখ কামাল ছিলেন আনপ্যারালাল। বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে তিনি ক্লাবটি দাঁড় করিয়েছিলেন। তিনি ছাত্রলীগ করলেও ক্লাবে এসে বলতেন, 'এখানে কোনো পলিটিক্স হবে না। এখানে শুধু খেলা হবে। পলিটিক্স হবে পার্টি অফিসে গিয়ে।' অনেক মজার মজার প্যারোডি গান করতেন তিনি। ক্লাবের হয়ে ক্রিকেটও খেলতেন। অধিনায়ক আলিউল ভাই (প্রয়াত আলিউল ইসলাম) মাঝেমধ্যে তাঁকে ড্রপ করলেও রিঅ্যাক্ট করতেন না কোনো। ১৯৭৪ সালে আবাহনীর হয়ে আইএফএ শিল্ডে খেলতে গিয়ে দুর্গাপুরে আমি কোমরে চোট পাই। তিনটি হাড় ভেঙে যাওয়ায় দেড় মাস কলকাতার হাসপাতালে থাকতে হয় আমাকে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে কলকাতার বাংলাদেশ হাই কমিশন আমার সুচিকিৎসার বন্দোবস্ত করে। এমন চোট যে আমি আবার মাঠে নামতে পারব কি না, তা নিয়েই ছিল সংশয়। যাই হোক দেশে ফেরার পর বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করি। তিনি দেখতে চান কোথায় চোট পেয়েছিলাম। আমি দেখালাম। তিনি আমার কোমরে হাত বুলিয়ে বলেন, 'যা, আমি আশীর্বাদ করে দিলাম। তুই আবার খেলতে পারবি।' আর বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর আমাদের প্রিয় আবাহনীকে হেয় করার কম চেষ্টাও হয়নি। প্রশ্ন : কিভাবে? অমলেশ : একটি উদাহরণ দিলেই বুঝবেন। ১৯৭৮ সালের ব্যাংকক এশিয়ান গেমসের জন্য দল ঘোষণা হয়ে যায়। অধিনায়ক হিসেবে নান্নুর (মনোয়ার হোসেন) নামও ঘোষণা হয়। এরপর হঠাৎ একদিন অধিনায়ক পরিবর্তন করা হয়। এতে আমরা আবাহনীর খেলোয়াড়রা অপমানিত বোধ করি। আমরা একযোগে সাতজন দল থেকে নাম প্রত্যাহার করে নিই। এ জন্য আমাদের সাসপেন্ডও করা হয়। পরে ফুটবল ফেডারেশনের সামনে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের আন্দোলনের মুখে সেই সাসপেনশন প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। তবে আমাদের পরিবর্তে যাঁদের পাঠানো হয়েছিল, তাঁদের কাউকেই গেমসের ভিলেজে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। প্রশ্ন : আবাহনীর পাশাপাশি আপনি জাতীয় দলেও সুনামের সঙ্গে খেলেছেন। তা জাতীয় দলের হয়ে মধুরতম স্মৃতি কোনটি? অমলেশ : অনেকেই জানেন না, এমন একটি তথ্য এই সুযোগে আপনাদের জানাতে চাই। প্রথম বাংলাদেশি ফুটবলার হিসেবে সালাউদ্দিন হংকংয়ের ক্যারোলিন হিল দলের হয়ে সেমি-পেশাদার লিগ খেলতে গিয়েছিল। তবে প্রথম অফারটি কিন্তু পেয়েছিলাম আমিই। ১৯৭৫ সালের মারদেকা কাপে হংকংয়ের সঙ্গেও খেলা ছিল আমাদের। ওই সময় হংকং জাতীয় দলের কোচ ক্যারোলিন হিলেরও কোচ ছিলেন। জাতীয় দলের গোলরক্ষকও একই দলের। ম্যাচটি আমরা বড় ব্যবধানে হেরেছিলাম যদিও, তবু খুব সম্ভবত খেলা দিয়ে আমি নজর কাড়তে পেরেছিলাম। তাই আমাকে প্রস্তাব দেওয়া হয় ওই দলে খেলার। পরে সালাউদ্দিনকে প্রস্তাব দেওয়া হলে ও সেটি লুফে নেয়। প্রশ্ন : আপনি লুফে নিলেন না কেন? অমলেশ : ওদের এক বছরের চুক্তির প্রস্তাবটি আমার পছন্দ হয়নি। আমি চাচ্ছিলাম দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি। তা ছাড়া আমি তখন দেশে জামিল গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজে চাকরি করি। এটি নন-বেঙ্গলিদের প্রতিষ্ঠান ছিল। স্বাধীনতার পর সরকার এটি অধিগ্রহণ করে। এক বছরের চুক্তিতে গিয়ে ফিরে এসে যদি চাকরিটা না থাকে, এসব ভেবে খুব একটা ভরসা পাইনি। প্রশ্ন : খেলোয়াড়ি জীবন থেকেই আপনি কোচিংয়ে হাত পাকিয়েছিলেন। আবাহনীর খেলোয়াড় কাম কোচও ছিলেন। সেটার শুরু কিভাবে? অমলেশ : কোচিংয়ের ঝোঁকটা আমার ছোটবেলা থেকেই ছিল। স্কুলজীবন থেকেই আমি দলকে অনুশীলন করাতাম। এমনকি শেখ কামালও নির্দ্বিধায় আমাকে বলতেন, 'অমলেশ দা, টেন্টের দায়িত্ব কিন্তু আপনার।' ১৯৭৪ সালে সালাউদ্দিনের মাধ্যমে আবাহনীর কোচ হয়ে আসা ঢাকায় ওয়াইএমসিএর ফিন্যান্স ডিরেক্টর পদে কর্মরত উইলিয়াম বিল হার্টও আমার ওপর খুব আস্থাশীল ছিলেন। ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডস যে খেলাটা খেলেছিল, তিনি আমাদের সেটাই শিখিয়েছিলেন। সেই তিনিও কোনো কারণে আসতে না পারলে বলে যেতেন, 'আমি না থাকলে দল সামলাবে অমলেশ।' এরপর ১৯৭৫ থেকে '৮০ সাল পর্যন্ত তো আবাহনীর কোনো কোচই ছিল না। ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত ফুটবল খেলা সাদেক ভাই আর আমি মিলে চালাতাম। তিনি মূল কোচ আর আমি সহকারী। তিনি সময় দিতে না পারলেও আমি চালিয়ে নিতাম। আমাদের দুজনের অর্জন হলো, ১৯৭৭ সালে আবাহনী অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন। প্রশ্ন : বাংলাদেশে পেশাদার ফুটবলের জগতেও তো আপনি সফলতম কোচ। অমলেশ : তা বলতে পারেন। এই যে এখন পেশাদার ফুটবল লিগের অষ্টম আসর চলছে। এর মধ্যে প্রথম তিনবারই আবাহনী চ্যাম্পিয়ন আমার কোচিংয়ে। প্রশ্ন : একটি চাকরির জন্য ক্যারোলিন হিলে না যাওয়া আপনাকে খুব বৈষয়িক বলেই মনে করাবে। কিন্তু অনেককেই বলতে শুনেছি, আপনি একদমই সে রকম নন। অমলেশ : দেখুন, আমাদের পারিবারিক মূল্যবোধ কখনো লোভে পড়ার শিক্ষা দেয়নি। আর আমি কখনো টাকার পেছনে দৌড়াইনিও। কারণ টাকা আপনাকে হয়তো সুখ দেবে কিন্তু শান্তি না-ও দিতে পারে। জীবনে অনেক খেলোয়াড়ই তো দেখেছি, যারা দাবি-দাওয়ার একটু এদিক-সেদিক হলে দিব্যি অন্য ক্লাবে যোগ দিয়ে ফেলেছে বাড়তি পারিশ্রমিকে। আর আমি বড় অফার পেয়েও কখনো আবাহনী ছেড়ে যাইনি। ১৯৮২-৮৩ মৌসুমের কথা বলি। মৌসুম শেষে শ্রীলঙ্কান খেলোয়াড় পাকির আলী ও অশোকাকে বিদায় করতে হবে। কিন্তু ফান্ডে পর্যাপ্ত টাকা নেই। আমার সেবার চার লাখ টাকা পাওয়ার কথা। আমি বললাম, আমার টাকাটা ওদের দিয়ে হলেও বিদায় করুন। পরে ওই টাকাটা আমি আর পাইনি। দাবিও করিনি। এখন তো পেশাদার ফুটবলের যুগ। চুক্তি হয় আর তাতে একটা অঙ্কও লেখা থাকে। কিন্তু যা লেখা থাকে, তার চেয়ে অনেক কমই পাই। তবুও অভিযোগ নেই। অনেক ফুটবলারই ব্যবসা-বাণিজ্য করে হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। আর আমার ঢাকার বুকে এক খণ্ড জমিও নেই। শুনেছি লটারিতে অংশ নিয়ে অনেকে সরকারি প্লটও নেয়। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, আমার যদি পাওয়ার যোগ্যতা থাকে, তাহলে সেটা নিজে চেয়ে নিতে চাই না। প্রশ্ন : কোনো আফসোস-অভিযোগ? অমলেশ : নাহ, বাঁচবই আর কয় দিন? অনেক পেয়েছি, কম তো নয়। তবু একটা পরিতাপ আছে। আবাহনী ক্লাব আমাকে যথেষ্ট সন্মান দেয়। তবে টাকা-পয়সার ব্যাপারে মূল্যায়ন করেনি। হ্যাঁ, আমি এ বিষয়ে উদাসীন ছিলাম। তাই বলে ক্লাবও উদার হয়নি। যোগ্যতা অনুযায়ী পারিশ্রমিক পাইনি কখনোই। যাক গে, শেষ জীবনে এসব খুব বেশি বলতেও চাই না। প্রশ্ন : আপনার পরিবার নিয়ে একটু ধারণা চাই। অমলেশ : স্ত্রী আর তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে আমার সংসার। ছোট ছেলে ঈশান সেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে কম্পিউটার সায়েন্সে পড়ে। মেয়ে অহনা সেন ক্লাস এইটের ছাত্রী। আর বড় ছেলে অর্নব সেন এক দুর্ঘটনায় মাথায় চোট পাওয়ায় ওর জীবন থেকে বেশ কিছু বছর হারিয়ে গেছে। ও এখন ক্লাস টেনে পড়ে। প্রশ্ন : শেষ প্রশ্ন। বাংলাদেশ ফুটবলের পুরো সময়টাই আপনি দেখেছেন। ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ফুটবলার কে? অমলেশ : আসলে জনপ্রিয় ফুটবলাররাই সেরার মাপকাঠিতে এগিয়ে থাকে। জার্মানির বেকেনবাওয়ারের মতো দুয়েকজন ব্যতিক্রম আছেন অবশ্য। এখন যেমন সেরা বাছতে গেলে তর্কটা মেসি আর রোনালদোকে নিয়েই হয়। আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ ফুটবলার কে, এই প্রশ্নেও লড়াই হবে সালাউদ্দিন ও এনায়েতের মধ্যে। স্টাইল, গোল করার ক্ষমতা, টেকনিক ও গতি- এসব সালাউদ্দিনকে এগিয়ে রাখে। ওর আবার দুটো দুর্বলতা ছিল। ট্যাকলিং ও হেডিংয়ে কম যেত। নিচ থেকে দলকে খেলানোর দিক থেকে আবার এনায়েত এগিয়ে। দূরপাল্লার শট, ট্যাকলিং ও বল হোল্ড করায়ও এনায়েত আগে থাকবে। তবে ওপরে শাফলিং করে জায়গা নিয়ে গোল পজিশনে চলে যাওয়া, উইথ দ্য বল ও রানিংয়ে সালাউদ্দিন এগিয়ে। আমার বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত সালাউদ্দিনই আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ ফুটবলার।